ইউজার লগইন

অভিলিপি: তার কান্নার পাশে আমার নির্জন, ভায়োলিন-ব্রাত্য চিনে রেখে

অভিলিপি: তার কান্নার পাশে আমার নির্জন, ভায়োলিন-ব্রাত্য চিনে রেখে


আমাকে সে টোকা দিয়ে বলল, 'কেমন আছো? সময় কেমন কাটছে?'

এই শীত যাচ্ছি যাচ্ছি সকালে কিংবা ভাসুরের চোখ দিয়ে বোরকার আড়ালে থাকা বধুকে দেখার মতো উঁকি দিচ্ছে দিচ্ছে বসন্তে কেমন আছি এইটুকু ভাবার অবসর নেই। হয়তোবা প্রতিদিনের ক্লান্তি-অক্লান্তি শেষে নিজেকে খুব গোপনে ব্যবচ্ছেদ মতো করে সময় কাটা হয় না। তাই চুপ রই। দায়সারা উত্তর দিই। সে মনে করে তাকে উপেক্ষা করছি, পাখিরা যেমন সুবোধ রোদের সন্ধানে সাইবেরিয়া প্রস্থান করলে আমাদের সীমানায় অতিথির মর্যাদা পায় তেমনি তার কাছে আমি এখন অতিথি; অতিথির সাথে দীর্ঘপরিসরে গল্প করা যায়, কবিতাপাঠ করা যায় না।
আমিতুমি তাই জলসন্ধি।


অনেকদিন পর বাইরে বেড়িয়ে এলাম। একা একা। সভ্যতা যত উন্নতি করছে মানুষ বাইরে বাইরে তত সংবদ্ধ হচ্ছে- আর নিজের ভিতরে ভাদ্রমাসের প্রতিথযশা কাশফুলের মতো নিঃস্ব হচ্ছে। তাই নিজেকে নিজের মতো করে একটু চরিয়ে আসার সুযোগটা অবহেলার নয়। নিজেকে একা পেয়ে মনটা বিয়ের প্রস্তাব দেয়! খুব ভালবেসে কারো চোখের পানি, স্বপ্নের লাবণ্য হাতে নিতে দ্বিধা হবে না, তবে কারো পাণিপ্রার্থী হতে মন বাধ সাধে! সম্পর্ক হলো ভালবাসার ভাললাগার প্রণয়তাঁর- সীমান্তের কাঁটাতাঁরের চে' তীক্ষ্ম ধারালো আর সর্বদা জানান দেয় এমন।


এমন রাতে ঘুমাতে ইচ্ছে করে না। গান শুনতে ইচ্ছে করে না। শৌখিন অন্ধকারে আমি তোমাকে গড়ি। তুমি তাতানো মোমের মায়া, পুড়তে পুড়তে মোমশিল্প রেখে যাও। আলো নিভে গেলে টেবিলের উপর পড়ে থাকে- অন্ধকারের মৃত ঈগলগুলো আর আমার কলমের কাছে গত জীবনের যুদ্ধবাজ আমার একটি শিরনাস্ত্র।


খুব মাথা ব্যথা হলে কিংবা জ্বরের ঘোরে পড়লে জীবনানন্দ দাশ পাঠ করতে ইচ্ছে হয়। হয়ে উঠে না। ইচ্ছে জিয়ে রাখার মাঝে সুখ আছে, সুখ জীবনের কাছে শৈশবের মোয়া।
তরকারীতে হালকা ঝাল না থাকলে যেমন বাঙালির মুখে স্বাদ জাগে না, তেমনি জীবনবাবু না পাঠ করলে বাঙালি কবিরা কবি হয়ে উঠে না।

নিজেকে নিজের মতো করে প্রকাশ করতে পারতে পারাই শ্রেষ্ঠতম সাহিত্য। ধর্ম-ও এক ধরনের সাহিত্য। সাহিত্য মন ভুলিয়ে রাখে।


আমার কোন সহগর্ভজ ছোট বোন নেই। জীবনের অনেক নাপাওয়ার মাঝে এই অপাওয়াটা বিরাট কিছু। ইস্কুল-জীবনে অনেক বন্ধু ছোট বোনের গল্প করত, তাদের কীর্তির তারিফ। আমি চুপচাপ শুনতাম, বরাবরই ভালো শ্রোতা।

কিছু কিছু ত্যাদড় ছেলে-ও ছিল। তারা পিঠাপিঠি বয়েসের ছোট বোনের বান্ধবীদের সাথে প্রেম করত! কিংবা ছোট বোনকে মেঘপিয়ন বানাত। কী সব হাস্যকর ব্যাপার। বয়সসন্ধিতে লুকিয়ে সিগারেট খাওয়ার রোমাঞ্চ কিংবা হঠাৎ চোখের জলসায় কোন মেয়ের নারী হয়ে যাওয়া অবলক্ষণ করার মতো ব্যাপার না হলে-ও ছোট বোন বিশেষ কিছু। না থাকা মানুষকে পোড়ায়, আর বিদ্যমান থাকা জিনিসটা আতশকাঁচের নিচে রাখা ডিজেল- খেয়ালে খেয়ালে রাখতে হয়।

আমার এক ভাই মৃত এসেছিল পৃথিবীতে। আমার ঠিক বড়, বড় ভাই'র ছোট- অর্থাৎ দু'জনের মাঝামাঝি। মাঝে মাঝে মনে হয় হয়ত তার মতো আমি-ও মৃত জন্মগ্রহণ করতে পারতাম! কী কারণে কী পরিবেশে সে মৃত এসেছিল সেইসব প্রশ্ন আমি মাকে অনেকবার করেছি- ইনিয়েবিনিয়ে অসংখ্য পরিস্থিতিতে ও সুযোগে। মা বরাবরই নিশ্চুপ। মাকে দেখে মনে হয় তিনি নিজে অপরাধী ভাবেন।

মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাটা চমকপ্রদ। এই যে মাঝে মাঝে মনখারাপের বৃষ্টিতে আমার খুব একা একা ভিজতে ইচ্ছে হলে, ভীড়ের মাঝে নিজেকে বেমানান মনে হলে, কিংবা হেরে গিয়ে জীবনের মানেটা পাল্টে দিতে ইচ্ছে করলে- সেইসব অজস্র সময়ে অসময়ে আমার মৃত অগ্রজ কিংবা না-থাকা-একটি-ছোট-বোন আমার পাশে এসে দাঁড়ায়। আমি অপ্রতিগ্রস্তের মতো তাদের স্পর্শ করি, আমার মননের চর্মে । তাদের জীবনগুলো কখনো কখনো কীবোর্ডের টুকটাকে বা কলমের অক্ষরে গল্প হয়ে যায়।
আমার খুব ইচ্ছে হয় একটা গল্প লিখি তাদের নিয়ে; আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ রচনাটি তাদের নিয়ে হোক।

মানুষের জীবনটা আসলে অগণিত মরুভূমি পাড়ি দেয়ার সমষ্টি। মানুষ অপ্রতুল জীবনে অনেক মরুভূমি পাড়ি দেয়। কখনো কখনো একটির পর একটি, কখনো কখনো সমান্তরালে কয়েকটি। মরীচিকা মানুষ নিজেই তৈরী করে, নিজে সতেজ উদ্দামে রাখার জন্য। অন্য সব মরুভূমির ভিড়ে তাদের না-থাকাটা আমার কাছে একটি সমান্তরাল মরু-অতিক্রম।


মুখোশ পরা দোষের কিছু না, মুখোশ পরে অন্ধকারবাজি করাটাই জঘন্য। আমার নিজের-ও অসংখ্য মুখোশ আছে, সবার থাকে। মানুষ আর ঈশ্বর মাত্রই মুখোশজীবী। দুই হাজার বছরের-ও অধিক আগে প্রচুর মানুষেরা ধুলোর মুজা পরে, প্রকৃতির পোশাক পরে ভুলনদীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। বিছিন্নভাবে সমষ্টিগত হয়ে! উদ্দেশ্য ছিল মুখোশগুলো নদীতে ছঁড়ে দিবে, জলে বিলীন হয়ে যাক। নদীসকল হাঁফানি নিয়ে প্রতিবাদ করে, সমুদ্দুরসব হরতাল হরতাল বলে ধর্মঘটের জন্য উঠেপড়ে লাগে। ফলে মানুষেরা মুখোশ ফিরিয়ে নিয়ে ঘরে ফিরে। জন্মের সময় এক পিঠ মৃত্যুর সময় অন্য পিঠ- মাঝে পলাতক স্কুইডের মতো অনেকবার রঙ পাল্টে মুখোশগুলোর।


তার কান্নার পাশে আমার নির্জন,
ভায়োলিন-ব্রাত্য চিনে রেখে।
নখ ও নারী জীবনের খোল।


আমার একটা অদ্ভুত খেয়াল আছে। যেমম- কারো চেহারার দিকে তাকালে আমি তার নাকের দিকে প্রথম তাকাই। নাকটা ভালো লাগলে, মানে সুন্দর লাগলে তবে জমে। তারপর দেখি থুতুনী আর ঠোঁট। এরপর শরীরের অন্যদিকে। তবে কখনো পায়ের দিকে তাকানো হয় না।


অনেক কাল আগে মনে হতো জলে ডুবে আমার মৃত্যু হবে। কে কারণে একা একা অনেক কষ্টে সাঁতার শিখে নিয়েছিলাম। মানুষ নাকি সাঁতার আর সাইকেল চালানো কখনো ভুলে না!
ইদানীং মনে হয় আমার মৃত্যু হবে ঘুমের ভিতর কিংবা যানবহনের নিচে পড়ে বিভৎস রকমের।

৩/৩/২০১০

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

ভাস্কর's picture


স্থবির খানিক্ষণ বইসা থাকলাম লেখাটা পড়বার পর। অনুভূতির রোমগুলি শিহরিত হইয়া আছে এখনো...

অনেক ভাল লাগলো আশরাফ...

আশরাফ মাহমুদ's picture


আমি কিঞ্চিৎ দুঃখিত, অতিশয় আনন্দিত বোধ করছি।

কাঁকন's picture


অনেক ভালো লাগলো;

৫ টা বেশি টানলো; আমারো মাঝে মাঝে অযাপিত জীবনের কথা লিখতে মন চায়

আশরাফ মাহমুদ's picture


ও আচ্ছা। জানলাম।

আহমেদ রাকিব's picture


অসাধারন। ৫ পড়ে হতবাক হয়ে আছি। আমারো একটা ছোট বোন আছে, তবে সব সময় আফসোস হতো, একটা বড় বোন কিংবা একটা জমজ বোন থাকলে বোধহয় অনেক বেশি ভালো হতো। এখনো প্রায়ই মনে হয় এই কথা।

আশরাফ মাহমুদ's picture


আমার ছোট বোন থাকলে দারুণ লাগত। যেমন হয়ত বাইরে যাওয়ার আগে সে বলত, 'ভাইয়া আমার জন্য এটা আনবে, ওটা আনবে'। অদ্ভুত সব ব্যাপার। এইসব নাপাওয়াই আমাদের জীবনটাকে গতিশীল রাখে, স্বপ্নমোহে রাখে।

নীড় সন্ধানী's picture


মানুষের জীবনটা আসলে অগণিত মরুভূমি পাড়ি দেয়ার সমষ্টি।
***********************

কী করে লেখেন এমন? প্রতিটি বাক্যই ছুঁয়ে যায়।

আশরাফ মাহমুদ's picture


এরকম প্রশংসায় বিব্রত হই, আবার খুশি-ও লাগে! হা হা।

টুটুল's picture


মানুষের জীবনটা আসলে অগণিত মরুভূমি পাড়ি দেয়ার সমষ্টি।

সুপার্ব!!!
প্রিয়তে রেখে দিলাম

১০

আশরাফ মাহমুদ's picture


টুটুল ভাই, অনেক ধন্যু।

১১

নুশেরা's picture


অদ্ভুত সুন্দর!

পুরো লেখাটিই উদ্ধৃতি দেয়ার মতো। তবু একটুখানি আলাদা করে-

মানুষ আর ঈশ্বর মাত্রই মুখোশজীবী। দুই হাজার বছরের-ও অধিক আগে প্রচুর মানুষেরা ধুলোর মুজা পরে, প্রকৃতির পোশাক পরে ভুলনদীর কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল। 

১২

আশরাফ মাহমুদ's picture


Tongue Laughing out loud Angry

১৩

শাওন৩৫০৪'s picture


...কবি তার পূর্ণ প্রতিভায়....বাহ, প্রিয়তে নিলাম...

১৪

আশরাফ মাহমুদ's picture


হা হা। এখানে প্রতিভার কিছু নেই। শুধু অনুভূতি ব্যক্ত করা হয়েছে।

১৫

সাঈদ's picture


অসাধারন ।

১৬

আশরাফ মাহমুদ's picture


সাঈদ ভাই, শুভেচ্ছা।

১৭

শওকত মাসুম's picture


খুব ক্যাজুয়াল ভঙ্গীতে লেখাটা পড়তে শুরু করেছিলাম। খানিকক্ষন পড়েই মোটামুটি স্তব্ধ হইয়া গেছি। অসাধারাণ।

ছোট বোন নিয়ে এ ধরণের আক্ষেপ আমারও ছিল।

এতো সুন্দর লেখেন কেমনে?

১৮

আশরাফ মাহমুদ's picture


মাসুম ভাই, একটু বেশি বলা হলো। আর রম্যে আপনি অন্যতম সেরা। আলোকিত ব্যক্তিরা সবকিছু আলো করে রাখেন।

১৯

জ্যোতি's picture


৫ নং টা নিজের অনেক কথা বলে দিলো।আর পুরো লেখাটা পড়ার পড় মন্তব্য করার সাহস আমার নাই। মুগ্ধ হলাম।

২০

আশরাফ মাহমুদ's picture


বেলীপা, সাহস নাই বলে ফাঁকিবাজি করলেন। Wink এবার থেকে তো কাশাপা ডাকতে হবে। Rolling On The Floor

২১

জ্যোতি's picture


এরৈ!!!!!বেলিপা কেডা?মাইনাস।ফাঁকিবাজি না। সত্যি বলছি।

২২

আশরাফ মাহমুদ's picture


আপনি সামুর জয়িতা না? প্রোফাইল-ফিকে বেলীফুলের ছবি থাকত! Sad
নাকি আমি প্রিয়তি আপার সাথে তালগোল পাকায়ে ফেললাম!

২৩

জ্যোতি's picture


সামুর জয়িতা ঠিকাছে।বেলীফুল সবচেয়ে প্রিয় ফুল। কিন্তু গুটিকয় দুষ্টু পোলাপান নামের বারোটা বাজাইয়া বেলীপা বানাইছে।সবডিরে মাইনাস।

২৪

আশরাফ মাহমুদ's picture


আমি কি ভুলিতে পারি
বেলীপার ভাত তরকারি Smile)

২৫

একলব্যের পুনর্জন্ম's picture


দারুন !

২৬

আশরাফ মাহমুদ's picture


অর্পু, ধন্যবাদ জানাই।

২৭

তানবীরা's picture


২৮

আশরাফ মাহমুদ's picture


এমন বড় গোলাপ যদি দিদি না দিয়ে অন্য কেউ দিতো! Wink

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আশরাফ মাহমুদ's picture

নিজের সম্পর্কে

http://ashrafovi.blogspot.com

আমার রচনাই আমি

ashraf_ovi অ্যাট yahoo.ca

© আশরাফ মাহমুদ