ইউজার লগইন

প্রতিশোধ

- সবাইকে হতবাক করে দিয়ে পরী বিয়েতে রাজী হয়ে গেল । বর বগা চৌধুরির ছেলে কামাল ওরফে গাল কাটা কামাল । বাপ হাড্ডিসার বকের মতো ছিল বলে ‘বগা’ মিঞা বা বগা চৌধুরী । আর ‘কামাল’ ! লোকে বলে বাপ কা বেটা ! বাপ ৭১ এ ছিল রাজাকার, আগুন জ্বেলেছিল গ্রামে । যুদ্ধ শেষ হবার ক’দিন আগে পরাজয় আঁচ করে স্বপরিবারে হিজরত করে ছিল । বছর দুই টিকিটি দেখেনি কেউ । তারপর কেমন করে জানি সব ম্যানেজ হয়ে গেল । চৌধুরি ফিরে এল গাঁয়ে । লোকের ধারণা চৌধুরীর বড় মেয়ে ‘ডল’ এর ক্যারিশ্মা সব । অমন অস্পরার মতো মেয়ে যার, তার সাত খুন মাফ না হয়ে পারে ! হল ও তাই । সাংসদ নিজেই তার দায়িত্ব নিলেন। আপন অনূজের সাথে ‘ডল” এর বিয়ে দিলেন । ভাই অবশ্য প্রথমে একটু গাঁই গুঁই করেছিল । কিন্তু অমন টসটসে ডালিম ! কারই বা সাধ্য জ্বিবের জল সামলে রাখে !

- কিছুদিন অবশ্য একেবারে চুপচাপ পড়েছিল চৌধুরি । তারপর একটু একটু ক্ষমতার রক্ত তার শিরায় পুনঃসঞ্চালিত হতে লাগলো । ধীরে ধীরে চৌধুরি ক্ষমতার সিঁড়ি টপকে উপরে চড়তে শুরু করলো । আর মা’শাআল্লা ! এখনতো বগা মিঞা পার্টির কেউ কেটা একজন ! দলবল, ক্যাডার পরিবেষ্টিত হয়ে চলাফেরা করে । বেশ-ভুষায় ও পরিবর্তন হয়েছে । জিন্নাহ ক্যাপ ঝরে গেছে বহু আগে, কাঁধের কাশ্মীরি শাল ও । বিপরীতে এখন তার গায়ে নিত্য শোভা বর্ধন করে দলীয় হাত কাটা মুজিব কোট । কে আর এখন বলতে পারে ৭১ এ চৌধুরি রাজাকার ছিল ! কার এমন বুকের পাটা ! নিজেকে এখনো অবশ্য মুক্তিযোদ্ধা দাবী করেনি চৌধুরি । আর করলেই বা কি ! যুদ্ধের পুরো সময় পাকিস্তানে অবস্থান করে, পাকি সরকারের লোলা লেহন করে, স্বাধীনতার পরে দেশে ফিরে, পার্টিতে যোগ দিয়ে কর্ণেল মালেক যদি মুক্তিযোদ্ধা বনে যেতে পারে, তো বগা চৌধুরির অপরাধ কি ! গত বাইশ বছর ধরে সেওতো কম করেনি লীগের জন্য । তার খামার বাড়িটা এখনো পার্টি ক্যাডারদের আস্তানা । ৭১ এ যারা নিহত হয়েছিলেন, তাদের স্বজনরা আড়ালে আবডালে ফিসফাস করে হয়তো , কিন্তু সামনে আসে কার এমন সাহস ! আর হবেই বা কি করে ! অমন ‘হালাকু’ র মত ছেলে যার; বিবিসি, ভোয়া’র মতো মিডিয়ায় যার নাম বার বার প্রচার হয় , তার বাপের সাথে লাগতে যায় কে ! মুক্তিদের হাতে এখন তো আর নল নাই, ট্যাবলেট ও না । জনক সব জমা নিয়ে নিয়েছেন ৭২ এ । গ্রামের নিরস্ত্র, দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধারা হতাশ চেয়ে থাকা ছাড়া কোন উপায় খুঁজে পায়না ।

- তবে বগা মিঞার দূঃখ এক খান আছে । ওই শালার মাষ্টার ! কিছুতেই বাগে আনা গেল না তারে । কি ধাতূতে যে গড়া কে জানে ! তেজ কমেনি একটু ও ! ৭১ এ মাষ্টারের বাপ আর ছোট ভাইটা খুন হয়েছিল আর্মির হাতে । মাস তিনেকের বাচ্চা পরীকে বুক থেকে কেড়ে নিয়ে, ছূঁড়ে ফেলে দিয়ে তুলে নিয়ে গেছিল বউটাকে । বাড়ি ঘর ও জ্বালিয়ে দেছিল ওরা । কিন্তু মাষ্টারকে কখনো শোক করতে দেখেনি কেউ ! কিছু কিছু মানুষ আছেন তারা ভাঙ্গেন কিন্তু মচকান না । মাষ্টারটা ঠিক ওই জাতের । নইলে কি এমন বয়স তখন ! ২৬ এর টগবগে তরুণ ! মায়ের শত কান্নাকাটি, বন্ধু-বান্ধব, পড়শি-স্বজনদের অনুরোধ, চাপ কিছুতেই টললেন না । বিয়ে-শাদী করলেন না আর । মা, এক মাত্র মেয়ে পরী আর স্কুল নিয়ে পড়ে থাকলেন । একটা অজ পাড়াগাঁকে আলোকিত করার দায়িত্ব যেন একা তারই। নিজের সহায় সম্পত্তি দিয়ে একাই তিনি গড়েছিলেন স্কুলটি । আজ আশে পাশের দশ গ্রামে ঘরে ঘরে শিক্ষিত ছেলে মেয়ে । ডাক্তার, উকিল, অদ্যাপক । নিজের মেয়ে পরীও ডাক্তার । তারই ইচ্ছানুসারে গ্রামেই ক্লিনিক করেছে পরী । গ্রামের মানুষের কাছে পরী শুধু ডাক্তার না । তাদের কারো পরী আপা, কারো বা পরীমা !

- ছোট বেলায় তাকে সবাই পরীর মেয়ে বলে ডাকতো । ব্যাঙগাচির লেজ খসার মতো একটু বড় হতেই ‘র’ আর ‘মেয়ে’ খসে গিয়ে পরীর মেয়ে নিজেই হয়ে গেল পরী । পরী দাদুর কাছে শুনেছে মা ছিলেন অপরুপ সুন্দরী । সাত গাঁয়ে তার তারিফ ছিল । কম বয়সী ছেলে ছোকরারা আশে পাশে উঁই জুঁই মারতো পরী দেখার জন্য । পরী আরো শুনেছে, ৭১ এ বাবা চলে যান মুক্তি যুদ্ধে এক রাত । আজকের বগা চৌধুরী তখনো বগা মিঞা বা শুধু বগা । একদিন শুনা যায় বগা মিয়া শান্তি কমিটির চেয়ারম্যান হয়েছে, গরীব ঘরের তরুণ-যুবকদের ফুসলিয়ে বা ভয় দেখিয়ে রাজাকার বাহিনীতে নাম লেখাতে বাধ্য করছে । বাবাকে ও খুঁজতে এসেছিল বার কয় । দাদা প্রতিবারই বলেছিলেন, ওতো কুমিল্লা গেছে স্কুলের কাজে । ফেরেনি । দাদা ছিলেন মসজিদের ইমাম । প্রথম প্রথম তাই দাদার কথা বিশ্বাস করেছিল বগা । কিন্তু পরে বুঝতে পারে বাবা আসলে গেছেন যুদ্ধে, কুমিল্লা নয় ।
- তো বগা একদিন খুব ভোরে রাত থাকতেই পাকিদের নিয়ে আসে গাঁয়ে । দাদা সবে ওজু করে তৈ্রী হচ্ছিলেন মসজিদে যাবার জন্য । বগা বাড়ির সামনে এসে নাম ধরে হাঁক পারে । দাদা তের বছরের ছোট চাচা সহ বের হন ।

- মাষ্টার কাঁহা হ্যায় ? হুঙ্কার ছাড়ে মেজর ।

- ‘কুমিল্লা’ ! দাদা উর্দুতে বলছিলেন , ‘মাদ্রাছা কি কামছে যানা পড়া’।

- ‘ ঝুট ! ইমাম হোকে ঝুট বোলতে হো শয়তান কহিঁকা’ ? দাদা কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলেন । বলা হয়নি । মুখের ভিতর রিভলবারের নল পুরে গুলি করেছিল শয়তানটা । সিংহ শাবকের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে মেজরের গলা কামড়ে ধরেছিল ছোট চাচা । সিপাহিদের বেয়নেট তাকে ফালাফালা করে দেয় । সব কিছু আঁচ করতে পেরে পরীকে বুকে ধরে পেছনের বেত বনে লুকিয়েছিল মা । শয়তান বগা রাজাকারদের নিয়ে চুল ধরে টনে বের করে নিয়ে আসে মাকে। মায়ের বুক থেকে কেড়ে নিয়ে পরীকে ছাই এর গাদায় ছুঁড়ে দেয় মেজর। তারপর মাকে টেনে হেঁচড়ে নিয়ে যায় ।
- এসব কতবার শুনেছে পরী ! বলার সময় দাদুর গলা যেত ধরে, চোখে নামতো আষাঢ় ! বলতে বলতে এক সময় শব্দ করে কাঁদতে শুরু করতেন দাদু । কেঁদে কেঁদে হালকা হতেন । তারপর আবার শুরু করতেন । ‘ আমার বউমা’ ! দাদুর কন্ঠ এখন দৃঢ় , চোখ আগুনের গোলা !

- ‘আমার বউমা ছিল বাঘিনীর ছাও ! গাড়ীতে উঠিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নিয়ে যেতে পারেনি । গাড়ী চলতে শুরু করলো । তোকে বুকে ধরে অসহায় আমি তাকিয়ে রইলাম । মনে হচ্ছিল রাস্তার দিয়ে নয় গাড়ী চলছিল আমার বুকের উপর দিয়ে । আমি তখনো অপলক তাকিয়ে । কিন্তু কি আশ্চর্য ! সব কিছু হটাৎ স্থির হয়ে গেল । বড় রাস্তায় উঠার আগ মুহূর্তে সব গাড়ী থেমে গেল এক সাথে । লাফিয়ে পড়ল সেপাইরা । গোলাগুলি শুরু হল বেধড়ক । অনেক মেয়েকে ধরে নিয়ে যাচ্ছিল ওরা । হট্টগোলের সুযোগটা নিতে চেষ্টা করল মেয়েরা । লাফিয়ে পড়ে দৌঁড় দিল অনেকে । কেউ গুলি খেয়ে পড়ে গেল, কেউ কেউ মহাজনদের আম বাগানের মজা পুকুরের কচুরি ফানার তলে লুকাতে পেরেছিল । পরে ওই কুত্তাটা (বগা চৌধুরি) গাঁয়ের লোকদের বলেছিল সে দিনের ঘটনা । মেজর বউ মাকে কোলে বসানোর জন্য টানাটানি করছিল । সুযোগটা হাত ছাড়া করেনি বউমা । মেজরের কোমর থেকে পিস্তলটা টান মেরে নিয়ে নি’ছিল । তারপর কিছু বুঝে উঠার আগে দ্রিম দ্রিম ! লুঠিয়ে পড়ে মেজর । দাদু একটু দম নেন ।
-‘না বউমা আমার পালাতে চেষ্টা করেনি । ড্রাইভারকে ও তাক করেছিল । অভিজ্ঞ ড্রাইভার দ্রুত লাফ দিয়ে নীচে পড়ে চিৎকার শুরু করে। থেমে যায় কনভয় । সেপাইরা দ্রুত পজিশন নিয়ে গুলি চালায় ।দাদু আবার কাঁদতে শুরু করেন ।
-‘লাশটা ও নিয়ে যায় কুত্তা গুলো । দাদু থামেন । দৃশ্যটা কল্পনা করতে চেষ্টা করে পরী । মায়ের ক্ষত বিক্ষত লাশটা পরে নাকি পেট্রল ঢেলে জ্বালিয়ে দি’ছিল । ‘মা’তো জান দিয়ে ইজ্জত বাঁচিয়েছিলেন, প্রতিশোধ ও নিয়েছিলেন । পরী কি করবে আজ ! বাবার জীবন, মান সন্মান, নিজের স্বপ্ন নাকি প্রতিশোধ !
- অপমানটা সহ্য করতে পারছিলনা চৌধুরি । বিজয় মেলায় প্রধান অতিথি হয়ে এসেছিলেন মেজর রফিক । বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা মাষ্টার ইসলামকে মঞ্চে না পেয়ে তিনি খোঁজ করছিলেন । মাইকে ঘোষনা করা হল, ‘কমন্ডার ইসলাম ! আপনি যেখানে থাকুন, দয়া করে মঞ্চে চলে আসুন ! মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী আপনাকে চাচ্ছেন’ ।
- মঞ্চের পাশেই মুক্তিযুদ্ধের আলোক চিত্রের প্রদর্শনী চলছিল । পরীকে নিয়ে সেখানে ঢুকেছিলেন মাষ্টার । সাথে ছিল তার কিছু পুরানো ছাত্র । ঘোষনা শুনে বেরিয়ে এলেন মাষ্টার, সাথের ছাত্ররা ও । মঞ্চের ঠিক পেছনে কন্ট্রোল রুম । ওখানে ঢুকলেন । সেখানে যারা ছিল সবাই উঠে দাঁড়ালো । মাউথ পীচটা হাতে নিলেন মাষ্টার ।
-‘মাননীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী’, দৃঢ় কন্ঠে বল্লেন তিনি, ‘ আমি খুবই দূঃখিত যে আপনার আদেশ পালন করে মঞ্চে আসতে পারছিনা । যেখানে মঞ্চ আলো করে আপনার পাশেই বসে আছে দালাল রাজাকাররা, সেখানে এই নগণ্য মুক্তিযোদ্ধাকে নাইবা ডাকলেন’ !

- হৈচৈ পড়ে গেল । এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা, তরুণ দলীয় কর্মীরা যারা এতদিন সাংসদের ভয়ে কিছু বলতে পারেনি, তারা চিৎকারে, শ্লোগানে ফেটে পড়লো । ‘নিপাত যাক, নিপাত যাক ! খুনি বগা নিপাত যাক’ ! মন্ত্রী গেলেন ভিষন রেগে । এম পি মিন মিন করে কিছু বলতে গেছিলেন, হুঙ্কারে থামিয়ে দিলেন মন্ত্রী । ‘আমি কিছু শুনতে চাইনা । আপনার সাহস কি করে হল একটা শয়তানকে আমার কোলে বসিয়ে দিতে’ !

- গত বাইশ বছর ধরে তিলে তিলে গড়া চৌধুরির স্বপ্নটা মাষ্টারের একটি মাত্র ফুৎকারে চুরমার হয়ে গেল । অপমান, লজ্জা আর এক বুক যন্ত্রণা নিয়ে সভা ত্যাগ করতে হল তাকে। মাষ্টার সামনে না এসেও এক দলা থুথু ছিটিয়ে দিয়ে গেল তার মুখে । নিজের কক্ষে ঢুকে কবাট দেবার আগে ছেলের সামনে কেঁদে দিল চৌধুরি । ‘তুই থাকতে আমার এত বড় অপমান ! বেঁচে থেকে আর কি হবে’ !

- এ ঘটনার ঠিক দু'দিন পরে কিডন্যাপড্ হয়ে গেলেন মাষ্টার । কেউ জানেনা এটা । সবাই জানে যে মাষ্টার কুমিল্লা গেছেন স্কুলের কাজে । শুধু পরীকে মেসেজটা দিয়েছে কামাল মোবাইল করে । বলেছে, ‘জীবন বাঁচানোইতো আপনার কাজ ডাক্তার সাহেবা ! এবার নিজের বাপেরটা বাঁচান । উনি আমার কেপ্টে ! আমাকে চিনেছেন আশা করি, আমি কামাল, আপনার পড়শী’ !

- হতবম্ব পরীর কন্ঠে কোন স্বর ফোটেনি ! গাঁ গাঁ জাতীয় একটা আওয়াজ বেরিয়েছিল শুধু ।

- ‘ভয় পাবেন না মিস’ ! ওপাশে কামালের শীতল কন্ঠ । ‘খুব দ্রুত একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে আপনাকে , আজ রাত দু’টার মধ্যে । এবারো কিছু বলতে পারেনি পরী ।

- ‘ আগামী ১লা এপ্রিল’, কামাল বলে চলে, ‘ আমাদের প্রিয় ডাক্তার সাহেবার জীবনে সত্যি সত্যি এপ্রিল ফুল ফোটতে যাচ্ছে । উনি স্বেচ্ছায় আমাকে বিয়ে করছেন ওই দিন । বাবা অবশ্য আনুষ্টানিক পয়গাম নিয়ে যাবেন আপনার দাদুর কাছে । ওনাকে হ্যাঁ করানোর দায়িত্ব কিন্তু আপনার । কোন রূপ চালাকি করার চেষ্টা করবেন না । আপনার পিতার জীবন বলে কথা ! পরবর্তী নির্দেশের জন্য অপেক্ষা করুন । লাইন ছেড়ে দেয় কামাল ।

- বেশ কিছুক্ষণ ঘোরের মাঝে কেটে যায় পরীর । বাবাকে কি মেরে ফেলবে কামাল ? তাকে জোর করে বিয়ে করবে ? খাটাসটার সাথে শুতে হবে তার ! ঘৃণায় রি রি করে উঠে তার শরীর ! পরক্ষণে দাদুর একটা কথা কানে বাজে তার ।

- ‘আমার বউমা ছিল বাঘিনীর ছাও’ ! সেই বাঘিনীরই তো সন্তান পরী ! একটা শেয়ালের ভয়ে চুপসে যাবে ? কিছুতেই না ! আশৈশব হৃদয়ে লালিত মায়ের ইমেজটা চোখের সামনে ভেসে উঠে পরীর। নিজের মাঝে প্রচন্ড শক্তি অনুভব করে ! না ! আবশ্যই না ! ওদের আর বাড়তে দে’য়া যায়না । একটি মাত্র পথই পরীর সামনে খোলা এখন । সেটি প্রতিশোধের । পরী ওই পথেই চলবে এখন থেকে । সিদ্ধান্ত নিয়ে নেয় পরী ।

- পরী বেল টিপেন । পিয়ন অবশ্য এরই মাঝে বার কয় পর্দা ফাঁক করে মুখ দেখিয়ে গেছে । বাইরে লম্বা লাইন পড়েছে রোগীদের ।

- ‘ডঃ আরতি’ ! পিয়ন এলে পরী বলেন । রোগীদের মাঝে ফিসফাস শুরু হয়েছে আরো আগে । পরী আপার কি হয়েছে আজ ! রোগী দেখছেন না ! কানে ফোন ধরে বসে আছেন । কথাও বলছেন না ।

- খবর পেয়ে ডঃ আরতি পড়ি মরি ছুটে আসেন । গাউনটা হ্যাংগারে ঝুলিয়ে দিয়ে পরী বলেন, ‘আগামী পহেলা এপ্রিল আমার বিয়ে । যে ক’দিন না আসি ক্লিনিক আপনার দায়িত্বে থাকবে । ডঃ আরতি কিছু বুঝে উঠার আগে পরী গট গট করে বেরিয়ে যান ।

- খবরটা চাউর হয়ে যায় কিছুক্ষনের মধ্যে । গ্রামের সহজ সরল মানুষ গুলো একেবারে ‘থ’ হয়ে যায় । গাল কাটা কামাইল্লারে বিয়া করব পরী আপায় ! হায় আল্লা ! তাবিজ করেছে বেটায় ! তয় আমাগো মাষ্টার আউক ! এই বিয়া আমরা হইতে দিয়াম না । মানুষ গুলা ছোটাছুটি করে । পরীদের বাড়ীতে জমা হতে শুরু করে । পরী কিন্তু বাইরে এসে সাফ জানিয়ে দেন, হট্টগোল করার প্রয়োজন নাই । তারা যেন চলে যায় । পরীর দাদুও ইশারা করে তাদের চলে যেতে । মানুষ গুলা কিছুই বুঝে উঠতে পারেনা । কেউ মাটিতে বসে পড়ে কেউ দাঁড়িয়ে থাকে । মাষ্টার না আসা পর্যন্ত তারা যাবেনা ।

-পরীর হাতে সময় মাত্র ৪৮ ঘন্টা । যা করার এরই মাঝে করতে হবে । কি করবেন পরী ! ছুরি ব্যবহার করবেন বিয়ের রাত! পারবেন ! বিষ দেবেন ! এর জন্যতো সুযোগের অপেক্ষা করতে হবে ! না আসা পর্যন্ত শুতে হবে শয়তানটার সাথে ! ভাবতেই গা গুলিয়ে উঠে পরীর । খেই হারিয়ে ফেলেন । চোখ বন্ধ হয়ে যায় ।
- আর কি আশ্চর্য ! সে বন্ধ চোখের তারায় ফোটে উঠে একটা মুখ ! ‘রণি’র ! অমন নিষ্পাপ মুখ পরী দু’টি খুঁজে পায়নি আর । ওই মুখের কোথাও ক্রাইমের কোন চিহ্ন খুঁজে পাওয়া যাবেনা । অথচ রণি আজ তাই ! রাজনীতি তাকে ক্রিমিনাল বানিয়ে ছেড়েছে ! কি ব্রিলিয়েন্ট ছাত্র ছিল রণি ! ষ্টার পাওয়া স্ট্যান্ড করা ! ক্লাশ, লাইব্রেরি আর নিজের রুমই ছিল তার সীমিত জগত ! হৈচৈ পছন্দ করতনা । মিটিং মিছিলে বাধ্য না হলে যেত না । খুব ভাল ছাত্র আর ব্যবহারে অমায়িক ছিল বলে ক্যাডারেরাও ঘাটাতোনা বিশেষ । কিন্তু কি থেকে কি হয়ে গেল ! এক সহপাঠীর ইজ্জত বাঁচাতে এই ভদ্র শান্ত ছেলেটিই এক দিন কালা পাহাড় হয়ে উঠেছিল ক্যাম্পাসে ! তখনকার মেডিক্যালের কুখ্যাত ক্যাডার ন্যাটা বাবু রণির সহপাঠী মৌ’র হাত ধরে অশালীন মন্তব্য ঝেড়েছিল । ভদ্র ভাবে প্রতিবাদ করেছিল রণি । গালে চড় পড়েছিল প্রত্বোত্তরে । আগুন জ্বলে উঠেছিল রণির শিরা উপশিরায় । জনমের প্যাঁদানি খেয়েছিল ন্যাটা । মাস দুই হাস্পতালে পড়ে থাকতে হয়েছিল ! রণির ও জীবনটা তছনছ হয়ে গেল এরপর । লেখা পড়া গেল । জান বাঁচাতে আন্ডার ওয়ার্ল্ডে চলে যেতে হল । একবারতো প্রায় ধরা পড়ে গেছিল । পরীই রিক্স নিয়ে বোরকা পরিয়ে কৌশলে বের করে দেয় ক্যাম্পাস থেকে । রণি কি তা মনে রেখেছে ! পরীর বিপদে পাশে এসে দাঁড়াবে ? হাত বাড়িয়ে দেব ?
- পরী রিং করেন ।
- ‘হ্যালো পরী পা’ ? ওপাশে রণির গলা ।
- ইয়েস ! তোর পরী’পার বড় বিপদ আজ ! পরী সব কিছু খুলে বলে । রণি খানিক সময় নেয় । তারপর বলে,ভয় নেই আপা । আমার ড্রামাররা যাবে আপনাদের পক্ষে বরকে আগ বাড়িয়ে আনতে । প্রোগ্রাম যথা সময়ে অবহিত করা হবে আপনাকে । রণি লাইন ছাড়ে । স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেন পরী । হাত পা ছড়িয়ে শো’ন একটু । সমস্যা এখনও এন্তার ! দাদুকে কনভিন্সড্ করতে হবে,--- সব কিছু না আবার পণ্ড করে দেন ! বাবাকে ও ছাড়িয়ে আনতে হবে কৌশলে । পরী দাদুর ঘরে যান । জীবনের এই প্রথম লড়াইয়ে তাকে অবশ্যই জিততেই হবে ।

- দু’টার অনেক আগেই ফোন দেয় কামাল । অত্যান্ত মোলায়েম কন্ঠে বলে, ‘আপনার সঠিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষা করছি ম্যাডাম’!

- সিদ্ধান্ত তো আপনার । এক দুর্বলের নারীর উপর চাপিয়ে দিয়েছেন । পরী বলে ।

- উপায় ছিলনা মিস ! বাপের মান সন্মান বলে কথা ।

- আর আমারতো বাপের জান ! হ্যাঁ নাবলে কোন অপশন আছে আমার ? যাকগে ওসব ! এখন বাবাকে সোজা আমাদের বাড়ী পাঠিয়ে দেন । আমি চাই সব কিছু স্বাভাবিকভাবে হোক । গাঁয়ের মানুষ জানতে পারলে কিন্তু ------

- কিছুই হবেনা । কথা কেড়ে নিয়ে বলে ‘গাল কাটা’, ‘কেউই চাইবেনা তাদের প্রিয় মাষ্টার সা’ব খুন হউন । সকালে পয়গাম নিয়ে বাবা যাচ্ছেন আপনার দাদুর ধারে । চালাকি করতে যা’য়েন না কইলাম । কাবিন নামায় যথাযত সই করে দিয়েন । রাখলাম তা’লে ।

- বাবার সাথে একটু কথা বলতে চাচ্ছিলাম । পরীর ভেজা কন্ঠ ।

- Not at the moment . লাইন কেটে দেয় কামাল । পরী বিমুঢ় হয়ে বসে থাকে । ভেতর থেকে প্রবল কান্না ঠেলে আসে । কাঁদে পরী ! শব্দ হয়না কোন । শুধু চোখে রাজ্যের ঢল নামে ।

- বগা মিঞার আনন্দের সীমা নাই । তার শেষ স্বপ্নটি পূরণ হবে এবার । শালার মাষ্টারের উদ্ধত মাথা নূয়ে যাবে দু’দিন পর । যে মাষ্টার গত ২৪ বছর কখনো হাত মেলায়নি চৌধুরির সাথে , দু’দিন পর বুক মেলাবে । একেই বলে ওস্তাদের মার শেষ রাতে !

- না কোন ত্রুটি রাখেনি বগা মিঞা । পুরো গ্রামকে সাজিয়েছে । দাওয়াতও করছে পুরো গ্রামকে । ২২ গরু ১০ খাসি জবাই হয়েছে । এত ঝাকঝমক আর কখনো হয়নি গাঁয়ে । এখন সব কিছু ভালয় ভালয় হয়ে গেলে হয় !

- মাষ্টারকে ১০টার দিকে নামিয়ে দে’য়া হয়েছে বাড়ীর সামনে । ড্রাগের প্রভাবে এখন আচ্ছন্ন । ঘণ্টা ক’য় মাথা তোলা তার পক্ষে সম্ভব না । এরই মাঝে সব কিছু চুকে বুকে যাবার কথা । অতঃপর মাষ্টারের তেজ যদি কমে !

- পরীদের বাড়ীও লোকে লোকারণ্য । গাঁয়ের মানুষ ভেঙ্গে এসেছে । যদিও অনেকে এখনো হা হুতাশ করছে ! পরী কেন যে এমন করলো ! সরল মানুষ গুলার বুঝে কিছুতেই আসেনা ! ছোটরা অবশ্য বেশ হৈ হল্লোড় মচাচ্ছে । সবাই উন্মুখ, বর কখন আসবে !

- ‘ঐ ঐ’ একজন চিৎকার পারে, ওইযে বরের গাড়ী হাজীর পুলের ওপাড়ে । বাজিতে আগুন দেয় ছেলেরা । দম দম ফাটছে ওগুলো । দ্রিম দ্রিম ! ফাঁকা গুলি ছুঁড়ে জবাব দেয় বরের কনভয় ।

- কিন্তু না । সব কিছুকে চাপিয়ে একটা বিকট শব্দ পুরো গ্রাম কাঁপিয়ে দেয় । হতভম্ব গ্রাম বাসী দেখে হাজীর পুল বরের কনভয় শুদ্ধ আকাশে উঠে গেছে । হুটাহুটি লেগে যায় । চিৎকার আর আহত বর যাত্রীদের কান্না মিলে এক ভয়ঙ্কর পরিবেশ তৈরী হয় । কেউ বুঝতে পারেনা কি হয়েছে ? কেন হয়েছে ? কি করে হয়েছে ? মানুষ ছোটা ছোটি শুরু করে, সাহার্য্যের হাত বড়িয়ে দৌঁড় যায় । শুধু একজন বুঝতে পারেন, রণির মিশন সফল হয়েছে । যদি নাও হত, পরী জানে, এ বিয়ে হতো ‘প্রতিশোধ’ এর । পরী আলতো হাতে কোমরে মাউজারটার অস্থিত্ব অনুভব করেন । রণি ব্যর্থ হলে এটার প্রয়োজন পড়তে পারতো । এখন আর দরকার নাই । আজই রণিকে রিটার্ন করতে হবে ।

- পরী উঠে বাবার ঘরে যান । নিঃসাড় পড়ে আছেন বাবা । মাথাটা কোলে নিয়ে বসে আছেন দাদু । শুকনো চোখ ! অশ্রু কবে শুকিয়ে গেছে ওই চোখের ! পরী নীচু হয়ে বাবার পা ছুঁলেন । তারপর দাদুর কানে দিলেন খবরটা । বিস্ফারিত চোখে দাদু দেখেন ২৭ বছর আগের সে বাঘিনী তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ।

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সাঈদ's picture


ভালো লাগলো ।

এ টি এম কাদের's picture


ভাল থাকুন ।

রাসেল আশরাফ's picture


দাদা কিছু একটা বলতে চাচ্ছিলেন । বলা হয়নি । মুখের ভিতর রিভলবারের নল পুরে গুলি করেছিল শয়তানটা ।

মুখের মধ্যে কাওকে গুলি করলে সে বাঁচলো কি করে?

শুধু পরীকে মেসেজটা দিয়েছে কামাল মোবাইল করে ।

পরীর বিয়ের ঘটনা যুদ্ধের ২৪ বছর পর সেই সময় কী দেশে মোবাইল এখন কার মতো সহজ লভ্য ছিলো?
গল্পের প্লট হিসাবে আমার কাছে খুবই দূর্বল লেগেছে।আশাকরি পরবর্তী গল্পে যত্নবান হবেন।

এ টি এম কাদের's picture


রাসেল ভাই, আপনার মন্তব্যের জবাবটা কিভাবে জানিনা নীচে চলে গেছে । কষ্ট করে পড়ে নিতে অনুরোধ করছি ।

টুটুল's picture


অসাধারণ লেখা...

এ টি এম কাদের's picture


টুটুল ভাই, মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ।

এ টি এম কাদের's picture


১) দাদাতো বাঁচেননি আপনি ওনাকে জিন্দা পেলেন কই ! " ৭১ এ মাষ্টারের বাপ আর ছোট ভাইটা খুন হয়েছিল আর্মির হাতে" যিনি বেঁচেছিলেন তিনি পরীর দাদী । দাদীকে অনেকে দাদু, দিদা ইত্যাদি ডাকে । দয়া করে একটু মনোযোগ দিয়ে পড়লে ভালো হয় ।

২) ২৪ বছরই বা পেলেন কই ! লাষ্ট পেরায় পরিষ্কার লেখা ২৭ বছর ! ৯০ এর দশকের মাঝামাঝি বাংলাদেশে ব্যাপক ভাবে নাহলেও মোবাইলের চল হয়েছিল । ৯৭ তে আমিও ঘরে ব্যবহারের জন্য মোবাইল পঠিয়েছিলাম । গল্পের সময়টাও ঐ সময়ের । স্বরণ করুন মেজর রফিক কোন সময়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী ছিলেন ।

৩) দাদা আমিতো জাত লেখকনা । লেখায় দূর্বলতা থাকতেই পারে !

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ ।

রাসেল আশরাফ's picture


দাদা আর দাদু গুলানোর জন্য দূঃখিত।

মোবাইল নিয়ে লেবু কঁচলাতে পারতাম ভালো লাগছে না। তাই ক্ষ্যান্ত দিলাম।তবে যে গল্প পড়ে পাঠেক বিভ্রান্ত হয় সেখানে লেখকেরও কিছু না কিছু দায় আছে।
=============
আপনার এর আগের একটি গল্প খুব ভালো লেগেছিলো। সেই কারনে বলেছিলাম।আশাকরি ভুল বুঝবেন না।
প্রতিমন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ।

এ টি এম কাদের's picture


রাসেল ভাই, ভুল বুঝারতো কোন প্রশ্নই আসেনা । দায় অবশ্যই আমার । এরকম হওয়া উচিৎ হয়নি । ভবিষ্যতে অবশ্যই যত্ন নেব । পরামর্শের জন্য আবারও ধন্যবাদ !

১০

উচ্ছল's picture


ভালু হইছে। Big smile

১১

জেবীন's picture


গল্প ভালো লাগছে, Smile
সিনেমার স্টাইল

১২

নাহীদ Hossain's picture


দারুন হইছে লেখা। এই ঘটনা সত্য হইলে আরো খুশি হইতাম ....

১৩

এ টি এম কাদের's picture


দশমিক শূণ্য একভাগ সত্য । ঐযে মাষ্টার ইসলাম (ছদ্মনাম), মেজর রফিক ,মঞ্চে যেতে আপত্তি ইত্যাদি ।

১৪

রায়েহাত শুভ's picture


নাটকীয়তা একটু বেশিই লাগতেছে...

১৫

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


লেখা ভাল লাগল। ভাল থাকুন, লিখতে থাকুন।।

১৬

তানবীরা's picture


গল্প ভালো লাগছে,
সিনেমার স্টাইল

Big smile

১৭

নেয়ামত's picture


যুদ্ধের পুরো সময় পাকিস্তানে অবস্থান করে, পাকি সরকারের লোলা লেহন করে, স্বাধীনতার পরে দেশে ফিরে, পার্টিতে যোগ দিয়ে কর্ণেল মালেক যদি মুক্তিযোদ্ধা বনে যেতে পারে, তো বগা চৌধুরির অপরাধ কি !

১৮

প্রিয়'s picture


লেখা ভাল লাগল।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

এ টি এম কাদের's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি একজন নগণ্য মুক্তিযোদ্ধা । বিদ্যুৎ প্রকৌশলী । স্বাধীনতা পরর্বতী রাজনীতির প্রতি প্রবল বীতশ্রদ্ধ । অসামপ্রদায়িক চিন্তাধারায় বিশ্বাসী ।
'৭৮ এ নানা কারণে চাকুরি বিদেশে চলে আসি ।