ইউজার লগইন

“অক্রোধেন জয়েৎ ক্রোধম”

"রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন" হরহামেশাই শোনা যায় কথাটা। রেগে যাবার সময় কতোটাই বা মনে রাখতে পারি এই হেরে যাওয়াকে। ক্ষণিকের একটা অনুভূতি সারাজীবনের বড় বড় কতো ভবিষ্যত অনুভবগুলোর সাথে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িয়ে যায় বুঝেই উঠতে পারিনা। একটা "রাগ" মুছে দিয়ে যায়, সারাজীবনের স্বপ্ন, অনুরাগ, আশা, সব কিছুকে।

অহরহ ঘটে যাওয়া ঘটনা। একে অপরের উপর ভরসা করা কাছের দু'জন, মনোমালিণ্যের ফলে রাগের বশে নিজেদের একসাথে চলা পথের মোড় ঘুরিয়ে ফেলে। একপর্যায়ে যখন রাগ পড়ে যায়, নিজ নিজ একলা চলা পথে অনেক পাওয়ার মাঝেও শূণ্যতা ঘিরে ধরে। আর তাদের নিত্যদিনের ছোট্ট ছোট্ট মূহুর্তই "নিজ"নয় সেই "নিজেদের" ঘিরে থাকা স্মৃতিগুলোতে চেপে ধরে আষ্ঠেপৃষ্ঠে। যতোই সুখের হোক দমবন্ধ করা সেসব স্মৃতি বার বার মনে করিয়ে দেয় সেই "রাগ" এর কথা। ওই 'রাগ'টা না হলে জীবনে কি হতে পারতো এই ভাবনায় পার হয় অনেকটা সময়।

এই অহরহই শুনতে পাওয়া কাহিনীর ক্ষেত্রে তো রাগের পরিনতি ভোগ করে দু' -জন, হয়তো অন্যেরা তা আচঁ করতে পারে না। কিন্তু যখন একজনের রাগের কার্যফলে যুঝতে থাকে তাকে ঘিরে থাকা সবাই, ব্যাপারটা হয়ে ওঠে বড়োই মর্মান্তিক।
দু'টো সন্তান নিয়ে বেড়ে ওঠা নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবার। হাসি-কান্নার পাশাপাশি অর্থকষ্টের কারনে সৃষ্ট ঝগড়া-হাতাহাতি-মন কষাকষি লেগেই আছে। সেদিন সকালে ঘুম ভাঙ্গলো দেরি করে তার উপর দেখা গেলো অফিস যাবার কাপড় ইস্ত্রি করা নাই। আগের রাতে করা নিত্যকার ঝগড়ার আগুনে যেন নতুন হাওয়া লাগলো। ইস্ত্রি করা অবস্থায়ই থেকে থেকে চলতে থাকা ঝগড়ার মাঝেই বাচ্চারা উঠে পড়লো। স্বামীর উপর করা ঝাজঁ গিয়ে পড়তে লাগলো মেয়েদের উপর, নানান কথায় বলতে লাগলো, "মরিস না কেন তোরা! মর! মর! পাশের ঘর থেকে প্রতিপক্ষের উত্তর, - "আমার মেয়েরা কেন মরতে যাবে, তুই কেনো মরিস না!" এককথা, দুইকথার পর কিছু পরেই ছোটমেয়ের চিৎকার, - "বাবা! মায়ের গায়ে আগুন!"

পোড়া রোগী রাখতে চায় না বেশিরভাগ হাসপাতাল, শেষে ভর্তি করা হলো ঢাকা মেডিকেলে। ডাক্তাররা পোড়ার কারন জিজ্ঞেস করতেই রোগীর উত্তর, - "তাওয়া থেকে রুটি নামিয়ে, ওড়না দিয়ে তাওয়া মুছতে গিয়েই গায়ে আগুন ধরেছে"। যত ঝামেলার উত্তর হবে চিকিৎসা তত দেরিতে শুরু হবে এই এখন বোধ তার আছে। গায়ে কেরোসিন দিয়ে আগুন জ্বালাতে উদ্বুদ্ধ করা মনকে জ্বালানো 'রাগ' শরীরকে পুড়িয়ে এখন হুশ এনে দিয়েছে পুরোই। ২০% পোড়া শরীর নিয়ে বিছানায় থাকার ক'দিন পর মুখোমুখি স্বামী-স্ত্রী, এর মাঝে হাসপাতালের বারান্দা পর্যন্তই ছিলো স্বামীর বিচরন। ক'দিন যাবত আত্নীয়-স্বজন, পাড়া প্রতিবেশি সবার কাছে গঞ্জনা শুনছে, - "কি রে, বৌয়ের গায়ে নাকি আগুন দিছিস?"

মায়ের আদরের এই সেই বৌ, বিয়ের সময় যার বর্নণা দিতেন মা পাড়া-পড়শীর কাছে, - "এমন ঘর আলো করা বৌ আনছি, ঘরে আমার আর বাত্তি জালানি লাগবো না।" বিছানায় শুয়ে আছে সেই বৌ গলা থেকে কোমর অবধি পোড়া'তে ঔষধ লাগানো নিয়ে। দু'জনের শুধুই চেয়ে থাকা একে অপরের দিকে। মেয়েদু'টো ফুপু'র বাড়িতেই ক'দিন যাবত আছে তাই একলা ঘরেই লোকের গঞ্জনা শুনে থাকা। মাঝরাতে গোঙ্গানির শব্দে পাশের বাড়ির লোকেরা খবর দিলো আত্নীয়-স্বজনদের। সকাল পেরিয়ে বেলা না গড়াতেই ব্রেইন স্ট্রোকের ধাক্কা সামলাতেই পারেনি ৩৬/৩৭ বছর বয়েসের মানুষটি।

মরে গিয়ে মানুষ কি বেচেঁ যায় সব কিছু থেকে? হয়তো যায়... কিন্তু সাথে করে শতশত দূর্দশায় বেধেঁ দিয়ে যায় অসহায় অনেকদের, যাদের একমাত্র সহায়ই ছিলো সে। বৃদ্ধ মা যে কি্না হাসপাতালে বৌয়ের কাছেই ছিলো দিনমান, এখন ছেলের জন্যে যার মাতম করার কথা, সেই মা দু'দিন যাবত থানা আর হাসপাতালের চক্কর কাটছে ছেলের লাশ দাফনের ব্যবস্থা করার জন্যে। বৌয়ের স্টেইটমেন্ট স্বত্তেও তার বাবা'র পক্ষ যে ক'দিন আগেই আগুন দিয়ে নির্যাতনের অভিযোগে কেস করেছিলো সেটা এখন আটকে ছেলের লাশকে।

................................................................................................................................. আশপাশে ক' দিন শুধু মৃত্যুর খবর পাই, কিছু ধারনার মধ্যেই আর কিছু আশাতীত, যেমনটা উপরের স্বামীটার মৃত্যু। ওই খবরটা শোনার আগেরদিনই নানু মারা গেছেন। আম্মারা খুবই চিল্লাপাল্লা করে কান্নাকাটি করেই চলছেন। আমরা নাতি-নাতনিদেরও মন খারাপ কিন্তু এর মাঝে সবাই আল্লাহ'র প্রতি শোকর গুজার করেছি, এত্তো এত্তো শারীরিক কষ্ট থেকে উনাকে মুক্তি দেয়ার জন্যে। দোয়া করি, এখন যেন শান্তিতে থাকেন উনি।

.................................................................................................................................

শিরোনাম কৃতজ্ঞতাঃ , অদিতি ও ধার করছে রবীন্দ্রনাথের কাছ থেকে। "অক্রোধেন জয়েৎ ক্রোধম" মানে হলো "রাগ না করে, তার উপশম করা"

পোস্টটি ৯ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

হাসান রায়হান's picture


Sad

টুটুল's picture


Sad

মীর's picture


উরিব্বাস অদ্ভুতভাবে লিখেছেন তো। খুবই ভালো লাগলো।

সাঈদ's picture


Stare

নুশেরা's picture


বীভৎস বাস্তবতা। শরীরে আগুন দিয়ে মনের দহনের নির্বাপনচেষ্টা কখন করে মানুষ!

প্লিজ একটা রম্য দাও জেবীন। বিমাকে মাইকে ধন্যবাদ টাইপ কিছু।

জেবীন's picture


ভাবতে অবাক লাগে কতটা রাগ উঠে গেলে গায়ে আগুন ধরায় মানুষ!

আমিও চাইছি মজার কিছু লিখতে...   কিন্তু   "কিচ্ছু পারি না ঘোড়ার ডিম! মেঘ নাই আকাশে সুকুসুকু হিম!! কিচ্ছু পারিনা ঘোড়ার ডিম!!!"

শাওন৩৫০৪'s picture


হুমম, রাগের ফলাফল সত্যি বীভৎস।

জেবীন's picture


হ রে, ভাই,  "রাগ"  কখনো কইল্যজা কাটে, কখনো শইলডা পোড়ায়... 

মানুষ's picture


রাগ আর কতক্ষণই থাকে? রাগের পরে যে অহম আর অভিমান জন্মায় সেটাই বরং চিরস্থায়ী।

১০

আরণ্যক's picture


ভয়ংকর কাহিনী । কিন্তু খুবই বাস্তব -- রাগের মাথায় এমন সব কথা বলি/কাজ করি যে পরবর্তীতে নিজেকেই অমানুষ মনে হয় ।
এখন রাগকে জয় করতে শিখেছি।

১১

অতিথি's picture


নিয়মিত মেডিটেশন করতে পারিনা রাগ ও নিয়ন্ত্রনে রাখতে পারি না ।

১২

মুকুল's picture


Sad

১৩

অদিতি's picture


অসম্ভব সুন্দর পোস্ট জেবু। ভাল লাগল।নীচে আবার আমার কথা লেখার দরকার কি ছিল? পাগলী!

১৪

নজরুল ইসলাম's picture


Sad

১৫

সাহাদাত উদরাজী's picture


রাগের কারনেই অনেক সংসার গুলো ভেঙ্গে যায়। বাস্তব।

এ লিখটা আমার পরিবার'কে পড়াতে পারলে ভাল লাগত, কিছু জানত। কিন্তু আমার ভয়, এ লিখটা পড়ে সে হয়ত আরো রেগে যাবে। হয়ত বলবে - তুমি আমাকে রাগী ভাব। আরো বলতে পারে - জেবীন, মেয়েটা কে? তার সাথে তোমার কি সম্পর্ক!

হে মোর জালা! মেয়েদের রাগ দেখে দেখে আমি অস্থির। আমার দাদী ছিলেন ভীষন রাগী, আমার মা ও কম না! আমার ফুফুরা - এককথায় ইন্টারন্যাশনাল! আর আমার ওয়াইফ! তার জন্য আমার মনে হয় আমি হার্টের রোগী হয়ে গেলাম! গুনছি অজানা পথের দিন।

আচ্ছা মেয়েরা এত রাগ করে কেন?

১৬

তানবীরা's picture


ডেল কার্নেগী থেকে হারবাট ক্যাশন মুখস্থ করছি কিন্তু কোন কাম হয় নাই, যা ছিলাম তাই আছি Sad

১৭

সাহাদাত উদরাজী's picture


আপা, আপনার এত রাগ দেখান ক্যান!

১৮

মামুন ম. আজিজ's picture


রাগ ঘৃণাতুল্য ..........আমি রাগ ঘৃণা করি
কিন্তু পরিহার করি না কেনো?

১৯

মুক্ত বয়ান's picture


শিরোনাম দেইখা ভাবছিলাম, জ্ঞানের কথা কইবেন। এখন তো দেখি ঈশপের গল্প কইলেন!!! তাও দু:খ দু:খ কাহিনী। Sad Sad
মনটাই খারাপ হয়ে গেল।

২০

জ্যোতি's picture


কাল রাতেই পোষ্ট পড়েছিলাম। পড়ে মন্টা খারাপ হলো। কিছুই আসলে বলার নেই।
একটা মজার লেখা দেও বান্ধবী।

২১

মেসবাহ য়াযাদ's picture


আমি রাগি না।
রাগ শরীরের ক্ষতি করে।
আমার অনেক অভিমান হয়।
অভিমান করে মনের ক্ষতি।
মাঝে মধ্যে এতটাই অভিমান হয়,
মনে হয় সব ছেড়ে-ছুড়ে চলে যাই, অজানায়।
যাওয়া হয়না। ছেলেদের জন্য। ওদের
মায়ের জন্য। আমি সবাইকে অনেক ভালোবাসি...।

চমৎকার লেখাটার জন্য তোমাকে একদিন
স্পেশাল ফুচকা খাওয়াবো...

২২

জেবীন's picture


ক্যান জানি, আননার ফুচকা আমার কিসমতে থাকে না, দেখেন না সবসময় মিস করি...  Frown

বাই দা ওয়ে,  স্পেশাল ফুচকা'র জন্যে কবে কোথায় যোগাযোগ করবো?,... Innocent

২৩

মেসবাহ য়াযাদ's picture


যে কোনো দিন বিকাল বেলায়, ধানমন্ডি ৫ এ....

২৪

নাহীদ Hossain's picture


Shock Sad

২৫

শওকত মাসুম's picture


আমার রাগ নাই।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.