১১৭৭২৯ আর সেই নয়টা মাস
- “খবরদার! সরাতে না মানা করেছি ওটা।”
- “হুহ! কিচ্ছু করা যায় না ছাতার এই মেশিন দিয়ে তাও রেখে দিছেন, এত্তো করে বলছি এটাকে স্টোররুমে রাখি, তা না অকাজের জিনিসটা রাখতে হবে একদম সামনে!”
- “যতন না করলে রতনও চমকায় না, মুছে পুছে রাখবি, ঠিকই কাজ দেবে। এতো ভালো মেশিন আজকাল তৈরীই হয় না, আজ ৪০ বছরেও চলছে এটা। আর সবচেয়ে বড়ো কথা এটার সাথে জড়িয়ে আছে আমার কতো স্মৃতি। মুক্তিযুদ্ধের সেই কষ্টের সময়ও তোদের বাপ-দাদাও পারেনি আমার কাছ থেকে এটাকে দূরে রাখতে।”
ফুপু ভাইঝি মিলে ঘরদোর সাফ করতে করতে রাগারাগি চলছিল দাদুর সাথে। পুরানো সেলাই মেশিনটা নিয়ে দীদা’র আদিখ্যেতা অনেক। দীদা’র সাথে পান খেতে যেমন মজা পায় বিন্তি তেমনি গল্প শুনতেও, কিন্তু দীদা একটা বিষয় নিয়ে বলা শুরু করলে গল্পের মূল কথা থেকে সরে গিয়ে লতায়পাতায় কই কই যে চলে যায় তা ইয়ত্তা নেই। তাও মাথায় ঘুরতে লাগলো এখনকার কথাগুলো। অবসর পেতেই বিন্তি পরদিন ধরে বসলো,
- “সত্যিই বলছো দীদা, যে দাদু তোমার জন্যে এই ভারি মেশিন কাধেঁ করে ঢাকা থেকে সেই গ্রাম পর্যন্ত গিয়েছিল? ”
- “হুম, এখনকার দেখা এই খিটখিট আর ক্যাটক্যাট করা বুড়ো নয় অন্যরকমই এক মানুষ ছিলো উনি তখন। আর আমাদের ভাগ্যও ছিলো অনেক ভালো, কি করে যেন সবকিছুতেই পার পেয়ে গেছি আমরা।”
‘৬৭তে বিয়ে করেই ঢাকাতে চলে এলাম দু’জনের সংসার সাজিয়ে। উনি সারাদিন অফিস করতেন আর এই স্বজনহীন ঢাকা শহর আমার কাছে বিদেশবিভূইঁয়ের চেয়ে কম কিছু ছিলো না। এইটুকুন একঘরের কাজ, সদ্য হওয়া ছেলেকে সামলানো সব করেও অনেক অলস সময় থাকতো আমার, সেই সময়ে একদমই সেলাই না জানা আমার জন্যে কেনা এই সিঙ্গার কোম্পানীর সেলাই মেশিন। পারি না পারি নিজের ছেলেটাকে সাজানোর জন্যে নিত্যনতুন কাপড় বানানোই হয়ে উঠলো আমার নেশা, উল্টোপাল্টা অনেকগুলোর মাঝে দু’একটা ভালো জামা হলেই খুশিতেই আমি আটখানা থাকতাম। আমার সদ্য শুরু করা সংসারের প্রথম দামি জিনিস এই সেলাই মেশিন। টুকটুক করে চলতে লাগলো সময়।
১৯৭১ এর উত্তাল দেশের পরিস্থিতি, সরকারি চাকুরে তোর দাদু’র পোষ্টিং ঢাকার মিরপুর ১নম্বরে, তখন এই রেশনিং এরিয়ার পরিচিতি ছিলো আরডি৭ নামে, এরই মাঝে দ্বিতীয়বারের মতোন মা হতে যাচ্ছি। দল বেধেঁ উনারা ৭ই মার্চের ভাষন শুনতে গেলেন, ফিরে এসে কি উত্তেজনা উনাদের। অফিস করতে হবে তাই নিজে থেকে গেলেন আর ৯ইমার্চে গ্রামের বাড়ি পাঠিয়ে দিলেন আমাদের, ২৩/২৪ এ আমাদের বাড়ি এলেন কথা ছিল ছুটি শেষে ফিরে যাবেন ২৬/২৭ এর দিকে। কিন্তু ২৫মার্চের পাকিস্তানি বাহিনীর ওই জঘন্য কালোরাত, এরপর পর স্বাধীনতার ঘোষনা - সব মিলিয়ে দাদু’র আর ঢাকা যাওয়া হয়ে উঠেনি। এতোকিছুর মাঝে ছেলের মা হলাম আবারো। আমার ৪/৫ বছরের সাজানো সংসারের সব পড়ে রইল মিরপুরের সেই বাড়িতে, এতোকিছুর মাঝেও মন কেমন করতো সেগুলোএ জন্যে। একসময় সরকারি ঘোষনা এলো অফিসাররা যেন কাজে যোগদান করে, নয়তো তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে। সবার মানা করার পরও ঢাকায় কাজে গেলেন উনি। মিরপুর তখন বিহারিদের আড্ডাস্থল, যখন তখন বাঙ্গালীদের জবাই করে ফেলা হচ্ছে, তাই আরডি৭ এ না গিয়ে অফিসাররা জয়েন করলেন মুল কার্যালয়ে, পোস্তাগোলার ফ্লাওয়ার মিলের দায়িত্ব পড়লো উনাদের ক’জনের উপর। ওইদিকেরই একটা মেস এ থেকে কাজ করতে শুরু করলেন। পড়ে রইল মিরপুরে সাজানো আমার সংসার, ওইবাসার কাছেই থাকতেন দূরসম্পর্কের এক খালা, খোজঁ নিয়ে জানা গিয়েছিল যে তখনো অক্ষত আছে সেই ভাড়াবাসা। ওইখালার ছেলেরা আপনভাইয়ের চেয়েও বেশি জানতো এই বুবুকে, কেন জানি মনে হয় সম্পর্কের বাধঁনগুলো অনেক প্রানবন্ত আর অটুট ছিলো। সেইভাইয়েরা নিজ দায়িত্বে বুবু’র ঘরের সব মালপত্র নিয়ে রেখেছিলো নিজেদের বাড়তি জিনিষ রাখার ঘরে। খালার বাড়ির পাশেই থাকতেন নামী সাংবাদিক আহসানুল্লাহ চৌধুরী, দোতলা উঠছে সবে সেই বাড়ির নাম ‘রীতা ভিলা’। সাংবাদিকের বাসা নিরাপদ এই ভেবে অনেকেই আশ্রয় নিয়েছিলো সেই বাড়িতে। যেদিন ওইদিকে পাকিস্তানী আর তার দোসররা হামলা করলো, আহসানুল্লাহ চৌধুরীর সাথে সেদিন জবাই করে ফেলা হয়েছিল ১৫০ মতো নিরীহ মানুষদের। ৮০/৮৫ সালেও তেমনি অসমাপ্ত দোতলাটা নিয়েই দেখা গিয়েছিল ওই বাড়িটাকে। তান্ডবের হাত থেকে বাদ যায়নি খালারাও, যার ঘরে ৫টা উঠতি বয়েসের ছেলে আছে তারাতো লক্ষ্য হবেনই হামলার। বিশাল বাড়ি লুটপাট করে, ৮/১০টা দুধেল গাইকে গোয়ালে আটকে আগুন দিয়ে দেয়া হলো, আগুন লাগানো হলো মূল ঘরেও, যাবার সময় লাইন বেধেঁ জবাই করা হলো জোয়ান যাদের পাওয়া গেল। অন্যভাইরা পালিয়ে, লুকিয়ে থাকতে পারলেও বাড়ির বড়ো ছেলেটা রেহাই পায়নি। তবে আল্লাহর অশেষ রহমতে এই জবাই করা গলা নিয়েই বেচেঁ গেলো ও! চিরতরে কথা বলা বন্ধ হয়ে গেছে ওর, চিরচেনা নাম মহিউদ্দিন পালটে বোবা নামেই পরিচিত হয়ে, গলায় এক গভীর ক্ষত নিয়ে বেচেঁ আছে আজো।
এতোকিছুর মাঝে আশ্চর্যজনকভাবে অক্ষত রয়ে গেলো আমার ঘরের জিনিষগুলো, এককোনার বন্ধ ঘরে লুটপাটও হয়নি, আগুনও লাগেনি! সবকিছুর মাঝে অক্ষত রয়ে গেছে আমার সেলাই মেশিনও!
মিরপুর ১ এ “নাহার সোপ” নামের ছোট্ট একটা সাবানের কারখানা আর মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে রেশন দোকান ছিলো আমাদের, সেই রেশনদোকান সূত্রেই পরিচয় সাংবাদিক আবু তালেবের সাথে, ভালোই হৃদ্যতা ছিলো, গাড়ি পাঠিয়ে দিতেন উনার মিরপুরের বাসায় নেয়ার জন্যে, দু’ছেলে এক মেয়ে নিয়ে সহজে আপন করে নেয়া এক পরিবার ছিলো তার। মার্চের শেষদিকে বিহারিরা যেসময় সব লুটপাট আর হত্যাযজ্ঞ চালাচ্ছিল, আমাদের দোকানের অন্য ছেলেরা পালিয়ে আসলেও পিওন যিনি ছিলেন উনি পালাতে গিয়ে আবু তালেব সাহেবের বাড়ির কাছেই ধরা পড়লেন, হয়ত ভেবেছিলেন এতো নামী মানুষের বাড়ি হামলা করবে না বিহারিরা, কিন্তু তখনই দোতলা থেকে নামিয়ে নিজ বাড়িতে স্ত্রীর সামনেই নৃশংসভাবে মেরে ফেলা হচ্ছিল সাংবাদিক আবু তালেবকে। অতিরিক্ত চেচাঁমেচি আর গালাগালির কারনে আক্রোশে আমাদের পিওনকে নাকি সেই বাড়ির সামনেই টুকরোটুকরো করে কেরোসিন দিয়ে পুড়িয়ে মারা হয়েছিল। রেশন দোকানের কর্মচারীরা পালিয়ে যেতে পারলেও পালাতে পারেনি আমাদের সাবানের কারখানার ছেলেগুলো, রাতের অন্ধকারে বাইরে থেকে তালা দিয়ে আগুনে পুড়িয়ে মারা হয়েছিলো সেই ৯/১০ জনকে।
এইসবই পরিচিতজনদের থেকে শোনা কথা। কাজে যোগ দিয়ে একদিন সময় করে রওনা দিলেন মিরপুরের দিকে, উদ্দেশ্য চেনাজান জন আর দোকান, কারখানা, নিজের মালপত্রের খোজঁ নেয়া। আসাদ্গেটের কাছে আসতেই অনেকের সাথে পাকড়াও করে নিয়ে যাওয়া হলো মোহাম্মদপুরের এক খোলা জায়গায়, যেখানে শুইয়ে রাখা হয়েছে নানান দিক থেকে আনা অনেককেই জবাই করার জন্যে। চোখ বুজেঁ ক্রমাগত আল্লাহর নাম নেয়া আর মানত করার ছাড়া করার কিছুই নেই তখন। অপেক্ষা আরো কিছু জন হলেই শুরু হবে হত্যাযজ্ঞ। চারপাশে টহল দিয়ে আর গল্পগুজবে মশগুল বিহারিরা। এই চোখ বুজেঁ থাকার মাঝেই কানে এলো এক পরিচিত কন্ঠস্বর। চাকুরির সুবাদের ঢাকা শহরের নানান খাবারের ফ্যাক্ট্ররি খোলার লাইসেন্সের দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন বলে বাঙ্গালীদের পাশাপাশি অনেক বিহারির সাথেও পরিচিতি ছিলো, শুধু তাদের কোন কাজে লাগাবার শখ ছিলো না। জবাই হবার অপেক্ষারত অবস্থায় চোখ মেলে তেমনি মুখচেনা এক বিহারির দেখা মিললো। ভাঙ্গা ভাঙ্গা উর্দুতে ডাক দিয়ে তার দৃষ্টি আকর্ষন করতেই চিন্তে পেরে সেই বিহারি কাছে এসে টেনে তুলে বলে উঠলো, “আরে! সাব জ্বি আপ”। এরপর অন্যদের বুঝালো ইনি তার পরিচিত তাই ছেড়ে দিতে হবে একে। কাপঁতে কাপঁতে মনে আল্লাহ অশেষ শুকরিয়া এনে ফিরে এলেন গেন্ডারিয়ার ঘরে।
এমন উত্তাল সময়ে যখন সব যুদ্ধে যাচ্ছে একেরপর এক, তোমার দাদু দিব্যি গাড়ি করে অফিস যান, কাজ করেন, মাঝে মাঝে খুব রাগ হতো, কেন করছেন এমন। বাবার বাড়ির দিকে মিলিটারি এসে গেছে জানতে পেরে নৌকা করে চলে গেলাম অজগ্রাম শ্বশুরবাড়ির দিকে, কিন্তু মাসখানেক পরেই জানতে পারলাম কাছাকাছি কোন গ্রামে ক্যাম্প করেছে মিলিটারি। জুনের দিকে অফিসের লোকদের পরামর্শে পোস্তাগোলার সাধনা ঔষধালয়ের দু’এক বাড়ি পরেই এক বিহারির বাড়িতে বাসাভাড়া করে আমাদের নিয়ে আসলেন ঢাকায়, যেখানে আছে আরো কিছু বাঙ্গালী পরিবার। সেইখালার বাসা থেকে নিজের মালপত্রগুলো এনে দোতলা বাড়ি’র দু’কামরার একঘরে শুরু হলো সর্বক্ষন অস্থিরতার আতঙ্কের নতুন সংসার। হ্যাঁ, সাথে আছে আমার অক্ষত সেলাই মেশিন।
নতুন বাড়িতে আসার ক’দিন পরই টের পেলাম অচেনা কিছু ছেলে আসে বাসায়, একেকবার ২/৩জন করে, কিছু নিয়ে যায় আবার হাতে করে নিয়েও যায়। অনেক জিজ্ঞসা করার পর কেটে গেলো অনেকসিনের পুষে রাখা রাগ, গর্বে মন ভেরে উঠল। জানতে পারলাম কেন উনার আবার অফিসে যোগদান করা, কেনই বা এই বিহারির বাড়িতে ভাড়া নেয়া। ফ্লাওয়ারমিলের দায়িত্বে থাকা বাঙ্গালী অফিসাররা বাঙ্গালী গাড়ির ড্রাইভারের সাথে যোগশাজে নিয়ম করে আটা, চিনি, তৈল ইত্যাদি খাদ্যদ্রব্য পাচার করে নিয়ে আসতেন নিজেদের ঘরে কিংবা নির্দিষ্টস্থানে যেখান থেকে তা পৌছে দেয়া হতো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে। আর সরকারি দায়িত্ববান অফিসার যিনি কিনা থাকেন শান্তিবাহিনীর সদস্য বিহারির বাড়িতে তার ঘরে অস্ত্র থাকার কথা চিন্তাও করা যায় না, কিন্তু আমার ঘরের এই মুখচোরা লোকটার কাছে ছোট্ট পুটলিতে তাও ছিলো, নিজের নয় ওই ছেলেদের আনা, সেই পুটলি খুলে দেখার সাহস হয়নি আমার। কেন যেন গর্বের সাথে সাথে নিজের দু’টা সন্তান আর পরিবারটার জন্যে ভয়েই শিটিয়ে থাকতাম। বাড়িওলারা খুব মিশুকপ্রকৃতির ছিলো, ৫/৬টা ছেলে, ছেলেদের বৌয়েরা সব মিলিয়ে বড়োসড়ো একটা পরিবার। আমার দূরে দূরে একা থাকা যেন বুঝতে পারতো ওরা, মালিক দেখা হলেই বলতো - “কেন ভয় পাও মা, বিশ্বাস রাখো আমাদের উপর, তোমাদের দেখে রাখবো আমরা, আর মুক্তিরা চলেই আসলে আমাদের প্রতি খেয়াল রেখো তোমরা।”
দেখতে দেখতে ডিসেম্বর এসে গেলো। যতই আন্তরিকতা দেখাক আর নিরাপত্তার আশ্বাস দিক কিছু্তেই শান্তি পেতাম না, মনে হতো যা করে চলছে দিনদিন এদের বিশ্বাস করা যায় না। তবে যতবারই পাড়ায় রেইড দেয়া হলো বিহারিরা এলে বাড়ীওলা দাপট দেখিয়ে কাউকে ভেতরে আসতে দিতো না, আবার একবার জোর গুজব এলো যে মুক্তিবাহিনী এসেছে কাছের পাড়াতেই, সেদিন ঐ বাড়ীর বৌয়েরা স্বর্নের বড় দুটা পোটলা রেখে গেলো আমার ঘরে, একটা ছেলে এসে ঢুকে পড়লো খাটের তলায়, আরেকজন দাড়ঁ করিয়ে রাখা পাটির ভাজেঁ লুকালো এই বলতে বলতে যে, “ভাবিজি কোই আয়েগা তো বোলনা মাত”। নাহ সেদিন কিছু হয়নি। এরই মাঝে দেখা যেতে লাগলো আকাশে পাকিস্তান আর্মি’র সাথে আমাদের পক্ষের বিমান যুদ্ধ, আর তা আশপাশের বাড়ির ছাদে উঠেই দেখতে যেত দল বেধেঁ অনেকে। খেয়াল করলাম বাড়িওলা তার বিবাহিত ছেলেদের বৌ সমেত করাচী পাঠিয়ে দিলো প্লেনে করে। বাড়ি রয়ে গেলো বুড়ো-বুড়ি আর দু’টা ছেলে। এইসব দেখে নিজেরা চলে যাবার প্রস্তুতি নিতে লাগলাম, জিনিষপত্র বাধাঁছাদা করতে লেগে গেলাম।
ইন্ডিয়া যেদিন আমাদের স্বীকৃতি দিলো সেই ৬ই ডিসেম্বরের দু’দিন পর ভোরে রওনা দিলাম বুড়িগঙ্গা দিয়ে নৌকায় করে। ঢাকার সহায় সম্পদওলা সাচ্ছ্যন্দময়তা থেকে সব হারিয়ে জীবন নিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। নদী পার হতে হতে কতো কি যে চোখে পড়েছে, শখের ক্যামেরাটা কাপড়চোপড়ের ট্রাংকের ভেতরে না থাকলে ঠিকই অনেক ছবি সাক্ষী থাকতো সেইদিনের। তবে ঐসময় মন মানসিকতাও ছিলো না ছবি তোলার। নদী পার হয়েই দৌড়ানো শুরু কখন বিমান হামলা হয়, নয়তো মিলিটারিতে ধরে। সেই ভোর থেকে টানা ছুটে চলে সন্ধার পর আর পারি না বলে হাতপা ছড়িয়ে বসে পড়লাম একখড়ের গাদায়। কোলে একটা বাচ্চা আর অন্যটাকে হাতে ধরে হাটতে হাটতে পায়ে পানি এসে গেছে, শরীর তো চলছেই না আর মন অস্থির ভীষন, ছুটে চলা দলে একটা মেয়ে ছিলো পোয়াতি, দুপুরের পর মেয়েটার ব্যাথা উঠে রাস্তাতেই বাচ্চা হয়ে গেলো। ওদের রেখেই বাকিরা আবার চলা শুরু করেছে, কে জানে কেমন আছে মেয়েটা। একজন কুলি, কাজের ছেলে আর উনার কাধেঁ নানান জিনিসপত্রের গাটরি, সেই সবের সাথে ছিলো আমার মেশিনও! কিছুক্ষন জিরিয়ে নেয়ার ফাকেঁ উনি হাটতে বেরিয়ে চেনা একজনকে পেয়ে গেলেন, একটা বাড়িতে মালপত্রগুলো রেখে অতি জরুরী অল্পকিছু নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়লাম আমরা। কম বয়েসী দুটো ছেলে এসে জুটলো আমাদের সাথে, কথায় কথায় আমাদের হাল জেনে তারপর বললো, - “চলেন আপনাদের একটা ব্যবস্থা করে দেই।“ ওরা নিয়ে গেলো নিজেদের বাড়িতে, মেহমান এসেছে ঢাকা থেকে বলে খালি করে দিলো একটা ঘর তাতে পালঙ্কও আছে, যদিও আরো রাত গভীর হতেই অন্য এক পরিবারও আশ্রয় নিয়ে ছিলো সেই ঘরে, তারা খড় দিয়ে শোবার জায়গা বানিয়ে নিয়েছিলো। রাতে সাথে করে নিয়ে যাওয়া স্টোভে চা বানিয়ে বিস্কুট দিয়ে খেতে দিলাম সবাইকে। অনেকে আশ্রয় নিয়েছিলো ওই বাড়ি আর তার আশপাশের বাড়িতে, এমনকি তাদের গোয়ালঘরও পরিষ্কার করে থেকে ছিলেন কেউ কেউ। যার যেটুকু আছে তাই দিয়ে বাজার করে খাওয়া হতো একসাথে। এভাবেই ৭/৮ দিন থাকার পর এলো সেই মাহেন্দ্রক্ষন, আমাদের বিজয়ের ঘোষনা, সেই কি উল্লাস সবার। শোকরানা নামাজ পড়তে লাগলেন অনেকেই। আবার গোছগাছ করে নিলাম গ্রামের দিকে রওনা দিবো বলে, উনি কুলি নিয়ে গেলেন মালপত্র রেখে আসা সেই প্রথমে থামা গ্রামে। চেনা সেই লোক সব বুঝিয়ে দিতে চাইলেও বাধ সাধলো বাড়ির মাতব্বর শ্রেনীর কিছু লোক, তাদের মতে এগুলো যে লুটের মাল নয় বুঝবো কি করে। যতই সরকারি চাকুরের পরিচয় দেয় কিছুতেই মানে না তারা, শেষে বলে,
- “প্রমান দেখান যে এই সেলাই মেশিন আপনাদের তখন মানবো।“
এতো ঝড়ঝাপ্টার মাঝে কই গেছে মেশিন কেনার রসিদ তা খুজেঁ পাওয়া দুষ্কর, তবু বুদ্ধি করে বললেন, - ”প্রমান আছে আমার স্ত্রী’র কাছে, কিন্তু মেশিন নিয়ে তার কাছে যেতে হবে”।
দলবেধেঁ লোকজন এলো মজা দেখার জন্যে, কিন্তু এইবাড়ির আমরা কেউ কিছু জানি না। উঠনে বসে বলা হলো সবাইকে, আর প্রশ্ন করা হলো আমার উদ্দেশ্যে কি প্রমান আছে যে এই মেশিন আমার। মায়ার এই জিনিসকে আমি প্রতি সপ্তাহে উল্টেপাল্টে খুলে পরিষ্কার করতাম, এর প্রতিটা কোনা আমার নখদর্পনে, আর এখন প্রমান করতে হবে এটা আমার, এ এক পরীক্ষাই বটে। দরজার আড়াল থেকে বললাম, - “মেশিনটা উলটে খুলে দেখেন তার ভেতরের দিকের যন্ত্রে একটা নম্বর খোদাই করা আছে, আর তা হচ্ছে ১১৭৭২৯।“
শাস্বরুদ্ধকর একটা সময় পার হতেই, এক পক্ষের বকাবকি আর অন্যপক্ষের করজোরে মাফ চাওয়ার মধ্য দিয়েই স্বাধীনতার পরদিন ফিরে পেলাম সংসারের অন্যান্য মালপত্রের সাথে আমার সেলাই মেশিন, নম্বর ১১৭৭২৯।





অসাধারণ একটা গল্প পড়লাম জেবীন। মনে হচ্ছে সত্যি ঘটনা মানে জীবন থেকে নেয়া।
এতো ভালো যার লেখার হাত, সে এতো কম লেখে কেনো? মার দেয়া দরকার
ধন্যবাদ তাতা'পু, ঘটনা আসলেই জীবন থেকে নেয়া, বেশ আগে শুনেছিলাম, কিছু ভূমিকা দিয়ে যদিও গল্পাকারে তুলে আনলাম, কিন্তু সব ঘটনা সত্য ... :)
এই গল্পটা লেখার কৃতিত্ব টুটুল্ভাইরে দিতে চাই, উনার সময় আর বিষয়বস্তু বলে দিয়ে লেখা চাইবার ব্যাপারে কমবেশি সবাই পরিচিত, এমনি এক চাওয়া পূরনেই এই লেখাটা। গল্পতো আমরা অনেকই শুনি, মনেও রাখি কিন্তু গুছিয়ে লেখার অনুপ্রেরনা দেওয়া বন্ধু ক'জনই পাই।
আর শামীমকেও ধন্যবাদ, কারন লেখাটা গুছানো সময় ঘটনা মনে থাকলেও তারিখগুলো মনে করতে পারছিলাম না, নেট ঘাটলে পাওয়া দুষ্কর ছিলো না জানি, কিন্তু ওকে অনলাইনে পেয়ে জিজ্ঞসা করতেই ঝটপট উত্তরগুলো পেয়ে গিয়েছিলাম... :)
টুটুল ভাই এটা কাছের লুকের সাথে করে, দূরের লুকদের সাথে না
কাছে আর দূরের পাইলেন কৈ? সব তো আম্রা আম্রাই ...
আম্রা আম্রা কি দূরের হয়?
আমিওতো তাই কইলাম,
আপ্নারা আপ্নারাইতো
তাত'পু... আপ্নেরে নিয়াও আমরা আমরাই কিন্তুক!... নইলে বাকি সব হাট্টিমাটিম টিম তারা গাছে মারে ডিম! সেইটা কার মাথাত পড়ে কে জানে!! :D
জেবীন আপু, লেখাটা অসাধারণ হয়েছে। আজকের দিনে এমন একটা লেখা জরুরী ছিলো। আপনাকে লক্ষ-কোটি ধইন্যাপাতা আর শুভাশীষ। আর আছেন কিরাম? বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা।
এই বড়ো লেখাটা পড়ার জন্যে ধন্যবাদ,
ধইন্যাপাতা পরিষ্কার করে বেছে দিছেন তো? এতো পাতা বাছতে গেলে বিপদে পড়বো না তাইলে...
আপনাকেও বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা...
ফাটা ফাটি একখান গল্প।আমাদের মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাথা হাজার গল্পেও আসলে শেষ হবে না...। বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা জেবিন।
হুম, আমাদের গৌরবগাথাঁ অনেক সমৃদ্ধশালী ফুরাবার নয়...
আপনাকেও বিজয় দিবসের শুভেচ্ছা
আজকের এ মহান দিনে এমন একটা সহজ-সুন্দর পোস্টের জন্য, জেবীন, প্রশংসাসহ ধন্যবাদ। বাস্তবতা ছিল প্রায় এমনই, কিন্তু সে সময়ের নৃশংসতা ফুটিয়ে তুলবার ক্ষমতা বোধহয় কারোরই নেই । সেই আশ্রয়দাতা বিহারীর ভাগ্যে শেষ পর্যন্ত কি জুটেছিল, একটু ছোঁয়াছ থাকলে ভাল হত । সত্যি সত্যিই কিন্তু এমন বন্ধুও আমাদের ছিল । তবে বাস্তবতা এই যে, তাদের প্রয়োজনের সময় অধিকাংশ ক্ষেত্রেই আমরা সহায়তার হাত বাড়াতে পারিনি ।
এটা আমার লেখার অক্ষমতা যে আমি গড়গড় করে গল্পটা বলে যেতে পারি এর সাথে জড়িত নৃশংসতা, আবেগ ফুটিয়ে তুলতে পারি না, নইলে এমন ঘটনাবলীর সাথে ওইসব থাকবে না এটা ভাবাও যায় না। আর বাড়ীওলা বিহারির অন্তিম পরিনতি না হলেও তখনকার পরিস্থিতিতে কিছু হবারই কথা, ঘরের আসবাবপত্রের জন্যে পরে গিয়েছিলেনও ওই দম্পতি সেই বাড়িতে, কিন্তু এখানে শুধু ডিসেম্বর পর্যন্ত ঘটনাবলী রাখতে চেয়েছি আর লেখাও বড়ো হয়ে যাচ্ছে তাই ঐসব আর আনিনি। সেই সময় উপকারী বন্ধু ছিলো কিন্তু তারা সংখ্যায় অতি নগন্য ছিলো না?
ধন্যবাদ নাজমুল ভাই, সুন্দর মন্তব্যের জন্যে ...
এটাকে আমি গল্প না বলে মুক্তিযুদ্ধের সময়ের এক পরিবারের ভয়, আতঙ্ক আর দৈনন্দিন জীবনের কাহিনী বলবো। এমন হাজার হাজার পরিবার আছে আমাদের দেশে। জেবীন, কৃতজ্ঞতা জানাই লেখাটির জন্য... মনে হচ্ছিল পরিবারটির সাথে আমিও আছি...
মেসবাহভাই, আসল ব্যাপারটা ধরতে পারছেন, গুরুত্বপূর্ন ব্যাপার স্যাপার না, আমি মুক্তিযুদ্ধের সময় ঘটে যাওয়া ওই পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের কিছু ঘটনাই তুলে আনতে চেয়েছি ...
ধন্যবাদ :)
দারুন হলো গল্প খানি
লিখে যাও আপু মনি!
ধন্যবাদ কুট্টি দাদাভাই
মজার লেখা যেন পাই... :)
অসাধারণ এক্টা লেখা। জীবন থেকে নেয়া। ধন্যবাদ তোমাকে এমন চমৎকার লেখার জন্য।
ধন্যবাদ বান্ধবি, জীবন থেকেই নেয়া, যদিও অন্যের...
অসাধারণ!!!!!!!!!
:) পড়িবার লাগি ধইন্যা
মডু'রে ধন্যবাদ, ব্যড়াছ্যড়া লেগে যাওয়া লেখাটাকে ঠিক করে দেয়ার জন্যে...
যদিও কিছু আগে যখন ব্লগে ঢুকতে পারছিলাম না, রুমিয়া'র সাথে মিলে মডু'র হাত পায়ের নেহারী বানানো প্ল্যান বানাইতেছিলাম, খালি তাতা'পু র অপেক্ষায় ছিলাম রেসিপিটা পাবার জন্যে... এফবি'তে কি দারুন ছবি দিছেন নেহারীর ... আহা
আজকের দিনে এমন একটা গল্প পড়ে অনে......ক ভালো লাগলো।তোমাকে এত্তগুলো ধন্যবাদ
ইস্ তোমরা কত্ত সুন্দর করেই না গল্প লেখ!!
কবিতা পারি না... বকবকানিতে ওস্তাদ তো, তাই কিছু একটা করার জন্যে গফ রে লেখা বানানিরচেষ্টা দেই আর কি...
ধন্যবাদ পড়ার জন্যে...
পুলাপান তো এবি জমায়া ফেলতাছে.. আহহহহহ... চমতকার পোস্ট..। সকালে পড়ছিলাম.। অহন কমেন্টাইতে আইসা সব ভুইলা গেছি
..। যাউগ্গা, মূল কথা হইল যা মনে হইতাছে আমগো এবি ব্লগে মজমা জমতাছে.. আজকে আর কালকে এই দুইদিনে দারুণ কতটা লেখা পড়লাম.. 
জেবীনরে ঘনঘন তাগাদা দেয়ার তাগাদা দিয়া গেলাম টুটুল রে
হবে না!... আমার পাওনা কথা আমারে দেও!... অন্যের আমানত এম্নে কইরা ভুলে থাকলে কেম্নে হবে!!!... মনে করে আমার কথা দিয়া যাইবা কড়াভাবে আশা করতেছি!...
আর মজমা বসতেছে দেখছো, নিজে নাই কেন তাতে?... লেখা দেও না প্লিজ...
এত ভালো গল্প পড়া হয় নাই অনেকদিন। অনেকটা ডিটেকটিভ ঘরানার গল্প। অসাধারণ। জেবীনের হাত সোনা দিয়া বান্ধায় রাখার কাম
সোনার ভরি শুঞ্ছি ৪২হাজার এর মতোন, তাইলে হাত বান্ধানির খরচ ক্যাল্কুলেশনে বসুম?... 8) সেই পরিমান স্বর্ন দিয়া দিয়েন আমি এমনি এ হাত বান্ধা রাখুম... :p
ধন্যবাদ আপু পড়ার লাগিয়া... :)
পড়লাম আর প্রিয়তে রাখলাম। দুই একটা সিকোয়েন্স আমার জীবিকা ও জীবন-এ লাগতে পারে। অবশ্য খানিকটা উল্টেপাল্টে ব্যবহার করবো। তবুও আপনার পারমিশন চেয়ে রাখছি। দেবেন তো?
ভুল হয়ে গেল - জীবিকা অথবা জীবন হবে। ধন্যবাদ।
জীবন থেকে নেয়া, এরকম সমৃদ্ধ গল্প, ঠিক বিজয় দিবসেই আসলো। টানটান চমৎকার। দাদুকে সালাম।
কাহিনীগুলো জানতাম আরো আগে থেকেই, গল্পটা লেখলাম বিজয় দিবসের জন্যেই... ভালো লাগছে যেনে ভালো লাগলো নীড়'দা, আপ্নে যেই দারুন টানটান গল্পের বুনুনি গাথেঁন অনেক পছন্দ সেটা...
জেবীনের লেখা বলেই একটু সময় নিয়ে পড়লাম ...
সিম্পলি সুপার্ব
স্যালুট তোমারে..
:) থ্যাঙ্কু থ্যাঙ্কু...
জেবীন, হ্যাপী বাড্ডে!
ধন্যবাদ শাওন...
গল্পের কথা কিছু বললেন না যে?... লেখা পড়ে ভালো লেখিয়েরা কিছু মতামত দিলে ভালো লাগে...
জেবীন যে কেন কম লেখে?
লেখাতে যে পারি না... ঠেলা ধাক্কা না খাইলে এক্কেবারেই পারি না...
মন্তব্য করুন