একাকীকথন ২
ইচ্ছে ছিলো দক্ষিনমুখী একটা বারান্দা হবে, আয়েশ করে সকালের চায়ের ওম নিতে নিতে পারিপার্শিক খবরাদি জানা যাবে, অলস কোন দুপুরে বারান্দা পেরিয়ে রোদেলা হুটহাট এসে পড়বে শোবার ঘরটায়। সাধসাধ্য দু’টাই থাকা স্বত্তেও বাড়ির গা ঘেষে দরদর করে দালানকোঠা উঠে পড়ায় সেই আশায় গুড়ে বালি। নিজে যেমন এতটুকু জায়গায়ও না ছেড়ে ফ্লাট তুলেছেন ঠিক তেমনি পাশের প্লটের জনও, তাও স্বস্তি এটুকুই যে পূর্বদিকটা রাস্তা বিধায় তাতে বারান্দা করে বসার যোগার হয়েছে।
নানান ভাবনার রৌদ্রজ্জ্বল সকালটা বিষাদে ছেয়ে দিলো দিনের পত্রিকাটা। দু’টা ভিন্ন ধাচেঁর খবর “মুক্তিযুদ্ধকালীন ঘটা নারী নির্যাতনের বিচারের দাবীতে সোচ্চার জনতা” আর “গণধর্ষনের শিকার জনৈকা”। কিছুপর বিষাদ ছাপিয়েও অবাক লাগল এই আশ্চর্য মিল এতো দিন পর উপলব্ধি হলো বলে, এটা সম্ভব হয়েছে ঐ খবর দু’টো পাশাপাশি কলামে ছিলো বলেই।
খন্দকার বাড়ীর চেয়ারম্যান চাচা শান্তিকমিটিতে যোগ দেয়াতে যেমন ধিক্কার উঠেছিল আড়ালে আবডালে আবার গ্রামের অনেক বাড়ীর লোকেরা হাঁপ ছেড়ে বেচেঁছিলো, শুধু তার চেষ্টার কারনেই নাকি এগ্রামের বৌ-ঝিয়েদের কোন ক্ষতি হয়নি। যদিও মুক্তিযুদ্ধ শুরুর দিকে অন্যান্য গ্রামের মতোনই এখানেও পাকিস্তানী সেনারা তছনছ করেছে। সেসময় মেরে-ধরে নিয়ে যাওয়াদের মাঝে বিনু ফুপুও ছিলেন। বিনুফুপুর বলার মতোন তেমন কোন বৈশিষ্ট্য ছিলো কিনা আজ মনে পড়ে না। তবে মনে আছে যুদ্ধ শেষ হবার আগেই বাড়ি ফিরে ছিলেন উনি, গর্তে বসা চোখ আর অদ্ভুত ফ্যাকাশে দেখতে লাগা সেই বিনুফুপুকে ঘরে তোলা যাবে কিনা এই নিয়ে দেন-দরবারও হয়েছিলো। এখন ভাবতে আশ্চর্যই লাগে সেই ভয়াল আতংকের সময়ও মানুষ মানবতা ভুলে তুচ্ছ অহমের ঘেরাটোপে আচ্ছন্ন হতে পারে। শেষ পর্যন্ত চেয়ারম্যান চাচার মধ্যস্ততায় বারবাড়ীতে যায়গা হয়েছিলো বিনুফুপু’র। অন্যবাড়ীর বৌ-ঝিয়েরা চলে যাবার পরই শরিকীপুকুরে গোসলে যেতে পারতেন উনি, যেন জাতকুল হারানো মেয়ে, কিন্তু ঘর-উঠান নিকানো কিবা অন্যান্য গৃহস্থালী কাজের সময় ঠিকই ডাক পড়তো তার। বিয়ের পর যদিও অতসব নিয়মনীতি মেনে চলতে হতো না, কিন্তু কেউ না কেউ ঠিকই এটা ওটা কথার মাঝে মনে করিয়ে দিতে ভুলত না উনার সেই দূর্বিষহ সময়ের কথা। অনেকের বাচ্চাই অসুস্থ থাকে তা নিয়ে তেমন কিছু শোনা যেত না কিন্তু বিনুফুপু’র ছেলেটার জন্যে গ্রামের মেয়েদের অনেকের আফসোসের অন্ত থাকত না, তাদের মতে “আহারে, পোলাটা অসুখবিসুখে তো ভুগবোই, মায়ের দুধ কি ওর কপালে জুটছে নাকি ঠিক মতোন, মিলিটারীরা রাখছে নাকি বিনুরে ঠিকঠাক”। সেই সব কানানাকির কল্যানেই জানতাম, বিনুফুপু’র একবুক নষ্ট করে দিয়েছে মিলিটারীরা। এই সব কানাকানি আরো তুমুলে যেতে পারতো বিনুফুপু’র জামাইয়ের প্রতিক্রিয়ায়, কিন্তু এতো কিছু কখনোই যেন ছুয়েঁ যেত না তাকে, কিংবা গেলেও কেউ সেটা টের পায়নি। কোন মতে মেয়ে পার করে হাপ ছেড়ে বাচাঁর জন্যেই যেন নিজেদের চেয়ে অনেক ছোটবংশের ছেলের সাথে বিনুফুপু’র বিয়ে হয়েছিলো যুদ্ধের পরপরই অনেকের অগোচরেই। সেই ছোটবংশের ছেলে মইনুদ্দিন শুধুমাত্র তার ব্যবহারের মাধ্যমেই গ্রামের সবার মুখ বন্ধ করে দিতে পেরেছিলেন।
বাবুনিটা আমার প্রথম সন্তান, বড়ো সাধের আহলাদের মেয়ে। ১৯/২০ বছরের ওর আদরের কাছে নাকি কিছুই না ছোট ভাইবোন দু’টির ভাগের আদর, এমন অভিযোগ ওদের অহরহই। শুধু বাবা না, মা’ও বড়ো মেয়ে অন্তঃপ্রান, বাবুনি’র শখ, যেকোন চাওয়া শুধু বলার অপেক্ষা সাথে সাথেই পূরনের জন্য মেয়ের মা অস্থির হয়ে উঠেন। কিন্তু মেয়ে যখন জীবনের বড়ো চাওয়াটা চাইলো সেটা গিয়ে আঘাত হানলো উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বাবা আর উচ্চবংশীয় মায়ের অহমে। মেয়ে কি করে পচাঁ শামুকে পা কাটলো এনিয়ে আমাদের কতো আলোচনা, শুধু কি আলোচনা পাড়ার ঐ ছেলে আর তার তৃতীয়শ্রেনীর কর্মচারী বাবা-মা’কে কতোভাবে শায়েশ্তা করা যায় সেই পথে চলেছিলাম। এছাড়া উপায় ছিলো না, কারন মেয়েকে পারিনি বুঝাতে ওই ছেলে তোমার যোগ্য নয় কোন মতেই। নিলু’র পরিবারকে পাড়া থেকে তুলে দেবার জন্যে ওদের বাড়িওলাকে একটু অনুরোধই যথেষ্ট ছিল, মশা মারতে কামান দাগানো আমার পছন্দ না, তাই মেয়ের মায়ের রাগের বশে ওদের ঘরে গিয়ে বকাবকি করাটা আমি পছন্দ করিনি। মেয়ে যেন মোটেই অলস সময় না পায় তাকে বাসায় কম্পিউটার কিনে দিয়ে, তা শিখানোর জন্যে একজন ঠিক করা হয়ে গেলো, ভালো চাকরী করা বিবাহিত একলোক। প্রথম প্রথম ছুটির দিনে শুধু শেখাতে আসতো ছেলেটা, তারপর তার বাসায় যাওয়া শুরু করলো বাবুনি। ওর মা সাথে গেলো ক’দিন, ছেলেটার বৌয়ের সাথে গল্পে সময় পার হয়ে যেত। দেখলাম মেয়ে আমার ভালোই করছে, ছোটভাইবোনকে ঘরে বসে দেখাচ্ছে কি কি শিখলো। হাপ ছেড়ে বাচঁলাম আমরা, অল্প বয়েসের খেয়াল মাথা থেকে নামলো তবে মেয়ের।
মাসছয়েক পরের এক পড়ন্ত দুপুরে কলেজ ফেরতা আমার মেয়ের খবর এলো। আমার বন্ধু মিজান যাকে বাবুনি ছোটবাবা ডাকে, জানালো যে, মিরপুরের একবাড়িওলা ছাদে ওঠার সময় চিৎকার শুনে উদ্ধার করেছে বাবুনিকে সাতজন রেপিষ্টের মাঝ থেকে। নিলু’র সাথে দেখা করিয়ে দেবে বলে ওই বাসায় নিয়ে গিয়েছিলো সেই ভদ্র বিবাহিত কম্পিউটার শিক্ষক। আর এই খবর শুনে ওর মা সিভিয়ার হার্টএ্যাটাক করেছে এটুকু শুনেই মাথায় রক্ত চড়ে গেলো, মনে হলো এতো কিছুর পরও এই করলো, তবে জাহান্নামে যাক ওই মেয়ে। মিজানকে যা করার করতে বলে ছুটলাম হসপিটালের দিকে মেয়ের মাকে দেখতে। হসপিটালের নানান ঝক্কি, পুলিশের সব দিক সামলিয়ে ক’দিন হসপিটালে রাখার পর মিজান পাড়ার লোকদের কথার তোড় থেকে বাচাঁনোর জন্যে বাবুনিকে রেখে এলো ওর চাচার বাসায়। বাবুনি’র মাকে সামলাতেই ব্যস্ত ছিলাম আমি, একবার শুধু দূর থেকে দেখে এলাম হসপিটালের বেডে ঘুমের মাঝে গলা পর্যন্ত চাদরে ঢাকা ওর শান্ত নিষ্পাপ মুখটা।
বাড়িতে পাড়ার লোকের ঢল নামলো যেন, যারা অবলীলায় বাবুনি’র মায়ের কষ্টে সমবেদনার নুন ছিটানোতেই ব্যস্ত। অনেকেতো বাড়ি বিক্রি করে অন্যত্র চলে যাবার সুপরামর্শ দিয়েই ক্ষান্ত নন, ক্রেতাও যোগাড় করে দিলেন। লোকমুখে জানা গেলো মূল আসামীর বৌ যে কিনা ঘটনার সময় সন্তান প্রসবপরবর্তী সময়ের জন্য তার মায়ের বাড়ি ছিলো পাড়ার বাড়ি বাড়ি গিয়ে বলে বেড়াচ্ছে, তার স্বামী পরিস্থিতির শিকার, বড়োলোকের মেয়ের কতো কীর্তিকাহিনী এখন গরিবের উপর দায় চাপানো হচ্ছে।
জবানবন্দির ভিত্তিতে যেখানে চারজন আসামী ধরা পড়ল তাও কতো গড়িমসি চলল কেস শুরু হতে। আশ্চর্যজনকভাবে ব্যাপারটা মিটমাটের জন্য এলাকার রাজনীতির সাথে জড়িত একজন হিতাকাক্ষী তদবির, সুপারিশ করলো। আমাদের জীবনের সব গুরুত্বপূর্ন সিদ্ধান্তই যেন রাজনৈ্তিক চালে চলতে হবে। জেদ আরো চেপে গেলো যখন শুনলাম বাবুনি নাকি কোর্টে যেতে চাইছে না।
এতোকিছুর মাঝে মা-বাবা, ভাই-বোন ছাড়া চাচার বাসায় ছিলো বাবুনি। কেউ দেখা করতে যাইনি আমরা। ঘৃ্না নাকি রাগ কাজ করেছিলো এক্ষেত্রে জানিনা, শুধু লাগছিলো ওর মুখ আর দেখবো না। যেদিন কেস কোর্টে উঠলো মাস চারেক পর প্রথম দেখলাম ওকে। একটু উদ্ভ্রান্ত আর শুকিয়ে গেছে ও, নইলে সেই আদুরে মেয়ে আমার। সবার সামনে দাঁড়ানো বাবুনিকে লক্ষ্য করে যখন রিপোর্ট পড়া হচ্ছিল, ঠিক তখন আমি জানলাম, আমার মেয়ে উদ্ধার হয়েছিলো তিনটা পাজঁরের হাড়ঁ ভাঙ্গা, কোথায় কোথায় শরীরের মাংশ খুবলে নেয়া, কোথায় ক’পাটি দাঁতের দাগ, হাতের দু’টো আঙ্গুল ভাঙ্গা। কেন যেন বিশ্বাস হচ্ছিল না নিজের কানকে, মেয়ের দিকে তাকাতেই দেখি কি অদ্ভুত দৃষ্টিতে চেয়ে আছে ও, বাবা’র দিকে চেয়ে থাকতে থাকতেই জ্ঞান হারালো বাবুনি।
ওই দূর্ঘটনার একবছর পর বাবুনি নতুন করে কলেজে যাওয়া শুরু করলো চাচার বাসা থেকেই। আমরা দেখা করিনা ওর সাথে, শুধু খরচাপাতি পাঠিয়ে দেই সময় মতোন। ওই কেস তুলে নিয়েছিলাম, দিনের পর দিন আবার মেয়ের ওই দৃষ্টি দেখতে চাইনি। একরকম চলছিলো জীবন, বাবুনি আবার এককান্ড করে বসলো। চাচা’র বাসা থেকে পালিয়ে গিয়ে বিয়ে করলো ও নিলুকে। কেন বিয়ে করলো ওরা
স্বাধীনতার উনত্রিশ বছর পর আমার বড় সাধের বড়ো সন্তান আদুরে বাবুনি’টাকে বিনুফুপু’র জায়গায় পেয়েছিলাম। নিজেকে বিনুফুপু’র ভাইদের ভূমিকায় যাদের মতোই মেয়ের কষ্টের চরম মূহুর্তে বুকে টেনে না নিয়ে দূরে ঠেলে দিয়েছিলাম, চাচার বাসায় থাকাকালীন সময়ে চাচী বাবুনিকে পরিবারের সবার সাথে খেতে বসা কিবা টিভি দেখা মানা করেছিলো, ঠিক যেন বিনুফুপু’র উপর পাড়ার অন্যপরিবারদের বিধিনিষেধের মতোই। মইনুদ্দিন বিনুফুপুকে ভালোবেসে বিয়ে করেনি ঠিকই কিন্তু ভালোবাসা পদে পদে বুঝিয়েছে, আর নিলু যার ভালোবাসাটাকে উচ্চস্থানীয় অহমিকায় আঘাত লাগায় পায়ে দলে শেষ করতে চেয়েও পারিনি ঠিকই বাবুনিকে পথ চলার সাথী করে নিয়েছে ও। দু’বছর লেগেছে আমার ভুল ভাঙ্গতে যে আমার বিত্তের লোভেই বিয়ে করেছে ওই ছেলে, ততোদিন কোন যোগাযোগ করিনি বাবুনির সাথে কিন্তু মিজানের মাধ্যমে খবরাখবর নিতাম।
আমি মন থেকে চাই আমাদের বিনু-বাবুনি’রা নির্ভয়ে পথ চলুক, পরিবার সমাজের চিন্তার উন্নতি হোক, অসহায়ের দূর্দিনে তার সহায়-সম্বল কেড়ে না নিয়ে শক্তি হয়ে পথ চলি আর সুবিচারের আশায় নানান প্রতিকূলতার মুখাপেক্ষী না হয়ে দৃঢ়ভাবে অপরাধীর বিচার হোক আমার স্বপ্নের বাংলাদেশে।





সবাই চেষ্টা করলে সবই সম্ভব, আশাতো তেমনই করি
যদি তাই হতো ? তবু আশাবাদী আিম...
আশাতেই তো খেলাঘর বেধেঁ বসে আছি আমরা.।.। দেখি কবে কি হয়
এই আমাদের স্বপ্নের বাংলাদেশ!
এই দেশ আমাদের ভবিষ্যত প্রজন্মকে কি-ই বা দেবে? ভাবতেই ভয় লাগে
আমাদের স্বপ্নগুলো নষ্ট হয় গুটিকয় অমানুষের কারনেই
কিচ্ছু বলার নাই
হ!
কাহিনী মন খারাপ করে দেয়া ।
আমার কাছে এখনো অবাক লাগে, বিরক্ত হই, যখন দেখি শুধুমাত্র উচুবংশ নিচুবংশ করে করে মানুষ গলা ফাটায় ।
(আপু এটা কি গল্প? লেখার কিছু অংশে শব্দ আর বাক্যের বিন্যাস আরো একটু খেয়াল করে দিলে লেখাটা বেশি সুন্দর হত । আর একবার পড়লেই তুমি খুতটা পেয়ে যাবা ।)
এটা দু'জনের সত্য ঘটনা, বিনুফুপু একখানকার যার কথা কেবল শুনেছি, আর বাবুনীকে দেখেছিলাম.।।। দু'টা কাহিনীকে এক করে এই গল্প করলাম আর কি.।।।
লেখা এডিট করে নেবো.। বলার জন্যে ধন্যবাদ আপু...
এমন একটা লেখায় এ কয়টা কমেন্ট?
মেয়েটা এতো কম লেখে কিন্তু কোথায় জানি তার লেখাগুলো অলওয়েজ কথা বলে যায়
কিচ্ছু বলার নেইইইইরে। নির্মম সত্যি
এই সত্যিগুলো অনেক ভোগায় আপু, কাছ থেকে না দেখলে বুঝা যায় না
লেখা পড়ে এতো আন্তরিক মন্তব্য দেওয়ার লাগি ধন্যবাদ তাতাপু
মন্তব্য করুন