ইউজার লগইন

বাস রে বাস!!

অফিস থেকে যখন গাড়ি পাইনি, বাসই ছিলো ভরসা। বাসে যাতায়াত করার কথা শুনে একবন্ধু বলেছিল, “আহা, এবার দেখবা কতো ধাক্কাধাক্কিতে ওস্তাদ আর ঝগড়াটি তুমি”। আসলেই একেকদিন একেক কান্ড দেখতাম, ধাক্কা দিয়া বাসে ওঠা আগে সিটে বসা নিয়া। সবাই নিরুপায়, আর সবারই অফিস যাবার তাড়া থাকে, আরামে যাবার ইচ্ছে থাকে। বাসে ঝগড়াতে যোগ না দিলেও মজা করে সেইসব দেখাতেই আমার বিমলান্দ।

এখন ঢাকার বাসে মেয়েদের জন্যে ৯টা সিট বরাদ্দ করেছে সরকার। যদিও পাবলিক বাসে দেখিনি এটা, কিন্তু টিকিট কাটা বাসগুলোতে ডানদিকের ৯টা সিট মেয়েদের জন্যে রাখা হয়। বাসের গায়ে ডান পাশে লেখা থাকে “মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধিদের জন্যে বরাদ্দকৃত”। এই বরাদ্দকৃত সিটের ব্যাপারে অনেকেই ওয়াকিবহাল এখন, তবু হরহামেশাই ঝামেলা বেধেঁ যায়।

বৈশাখী বাসে উঠলাম ক’দিন আগে, জমজমাট ভিড়। চিপাচাপা দিয়ে গিয়ে দাঁড়ালাম ড্রাইভারের পেছনের জানালার কাছে। কিছুপর একজন বলে - “পেছনে চলে যান, মেয়েরাতো মাত্র ৫জন বসেছে।“ যাবো কি যাবো না ভাবছি দেখি একলোক নিজেই উঠে দাঁড়িয়ে গেলেন, ওটাতে বসলাম। পরের স্টপেজে আমার কাছ ঘেঁষে একটা মেয়ে এসে দাঁড়াতেই আমিও বললাম, “পেছনে চলে যান, মেয়েদের সিট এখনো বাকি আছে”। দেখলাম মেয়েটা এগিয়ে গিয়েও ফিরে এসে দাঁড়িয়ে রইল। এর কিছুপর দু’জন এলেন, গিয়ে পেছনের লোকদের বললেন, “ভাই এটা মেয়েদের সিট আপনারা উঠে যান।”

বিস্ফোরন যেন ঘটলো বাসে, ঘাউ করে এক চিৎকার দিয়ে উঠলেন ঐখানে বসা লোকটা- “কি যা তা বলছেন, কই লেখা আছে এইকথা!” মহিলা তখন লেখাটা দেখাতেই তার আবারো প্রশ্ন - “কবে থেকে এই সব হাবিজাবি নীতি চালু করছে!! আর লেখা আছে মানলাম, কিন্তু কোথায় বলা আছে যে, ডান দিকের নাকি বামদিকের সিট মহিলাদের। আর আগের মহিলারা তো আমাকে কেউ কিছু বলে নাই, তারা তো দিব্যি দাঁড়ায়ে আছে”। তখন আগের মেয়েটা বলে উঠল, “যেভাবে আপনি চোখ কুচঁকে উঠেছিলেন ঐখানে বসার রুচি করে নাই”। এটা শুনেও দমবার পাত্র নন, “আমি সাভার থেকে বাসে উঠেছি, এতোক্ষন এটা আমার সিট ছিলো, আর আমাকে উঠে যেতে বলছেন!!” ঠিক আমার কানের কাছে দাঁড়িয়ে হাউকাউ চলছিল, পাশের মহিলাকে বললাম, “এতো চিল্লায় যখন উনারেই বসতে দেন ওইখানে”। মহিলা সুন্দর করে বললেন, “এতো কথা কেন বলছেন, নিজেকে ওই সিটে বরাদ্দকৃদের কাতারে ফেলছেন এটাই বলে দেন। আর আপনি বসেন”। কিছু সময় পর লোকটা যেন বুঝছে কি বলেছেন মহিলা। লাফ দিয়ে এবার সিট ছেড়ে দিলেন নিজের সাথের জনকে নিয়ে। মহিলা দু’জন বসলেন।

এবার পাশে দাঁড়িয়ে শুরু তার বক্তিমা। বাসের নীতি থেকে শুরু -“মহিলাদের আলাদা সিট যেহেতু ওইযে এক মহিলা বসে আছেন ছেলের পাশে তাকে তুলে দেয়া হোক”, এরপর নারীনীতি (কি কইলো বুঝি নাই), রাজনীতি - দুই মহিলা দেশের জনজীবনের চৌদ্দটা বাজাইতেছে হেন তেন..., অর্থনীতিতে এসে শেয়ার ব্যাবসার খালেদ ইব্রাহিমের ব্যাপারে তার অভিমত - “নীতির ফান্দে পইরা ব্যাটা কানতাসে এখন, কি এক রিপোর্ট বানাইলো, ছাইড়া দে মা কাইন্দা বাচি ভাবে এখন জনে জনে মাফ চাইতে হইতাছে, এই হইলো আমাদের নীতির হাল”। সাথে দেখি আরো উৎসাহি জনতা, ঠিক যেন রাস্তার চায়ের দোকানের আড্ডা। জ্যামে পইড়া এতোক্ষন কেউ কারে চিনে না টাইপ লোকজনও কি মজায় আড্ডাবাজি করা শুরু করলো, মজাই লাগছিল। কিন্তু সেই লোক সিট ছেড়ে দেবার জ্বালা তখনো ভুলে নাই। আবার তুললেন কিন্তু জঘন্য ভাষায় - “আচ্ছা, সরকার যে ৯টা সিট মেয়েদের জন্যে রাখছে, তার মানে এরা মহিলা মানে মা, বোন মেয়ে। কিন্তু এই ৯জনের বাইরে যারা দাড়িয়ে আছে তারা কোন ক্যটাগরির!!” সবচেয়ে আশ্চর্যের ব্যাপার তার সাথের লোকগুলো হাসছিলো!!
আগারগাঁও থেকে মহাখালী পর্যন্ত চলছিল এইসব। এবার সেই মহিলা কথা বলে উঠলেন, “অনেক বলেছেন এতোক্ষন, এবার শুনুন। প্রথমে আপনাকে যুক্তি দিয়া বুঝাই তারপর না হয় অন্যভাবে বুঝামু। এখানে সবাই একই পরিমান টাকা দিয়ে টিকেট কেটে উঠেছেন, সবারই সমান অধিকার আছে বসবার, কিন্তু আমাদের বাসের যেই অপ্রতুলতা তাতে আমরা বেশিরভাগই দাঁড়িয়ে থাকি, নানান বাজে ব্যাপার ঘটে এই ভিড়ের মাঝে, এইসব এড়ানোর জন্যেই এই সিটগুলা বরাদ্দ করা হয়েছে, মেয়েদের সম্মান দিতে কাউকে অবমাননা করতে নয়। আর যেসব কথা আপনি ক্রমাগত বলে যাচ্ছেন আর অন্যেরা তাতে সায় দিয়ে যাচ্ছেন তা কতটা ভালো কথা তা একটুও আমলে আনছেন না। মুখে বলছেন ঘরে মা-বোন-মেয়ে রেখে এসেছেন কিন্তু আপনাদের বলার ভঙ্গীতে তাদের প্রতি বিন্দুমাত্র শ্রদ্ধা কি আছে? এইবার বলি, আমরা দু’জন কাজ করি ওমুক সংস্থায়(লইয়ার’স ফোরাম জাতীয় কি যেন মনে আসছে না)। এইবার বলেন বুঝছেন কিনা”। “সব মানি কিন্তু তাল্গাছ আমার” টাইপ লোকটা হাল না ছেড়ে আবার বক্তিমা দেয়া শুরু - “আপনারা উকিল, ভালো তো, এইবার বলেন আমারে যে সিট থেকে উঠায়া দিলো এইটা যে নীতিতে করা হইলো সরকার এইসব আজাইরা নীতি বানাইয়া কি বুঝাইতে চাইতেছে?”

এতোক্ষনে সামনে থেকে একটা কম বয়েসি ছেলে বলে উঠলো, “মামু যা বলছেন এইবার চুপ যান, সিটে বসা মাত্র একজনের কথায় আপ্নের গায়ে এতো জ্বালা ধরছে বাকি ৮জন আর অন্যরা শুরু করলে জানালা দিয়া লাফ দেওন ছাড়া উপায় থাকবো না! আপ্নের মতো আজাইরাদের কারনে বাকি আমরা খারাপ হই সবার সামনে। আসেন আপ্নে আমার সিটে এসে বসেন তাও আজাইরা প্যাচাঁল পাইড়েন না”। কিছুতেই হার না মানা মামু আবারো বলে ঊঠলো, “আরে, সিটে বসার জন্যে না, আমি তো সম অধিকার নীতির কথা তুলছিলাম!” এবার মৌচাকে যেন ঢিল পড়লো! সামনের দিকের এক মহিলা চিৎকার দিয়ে বলা শুরু করলেন, “এইগুলারে ভালো কথায় বুঝানোর কাম না, দুইটা জুতার বাড়ি না পড়া পর্যন্ত থামে না এরা। এই যে আমার কাছের লোকটা তাল মিলাইয়া বলছিলো, ঘরে টিকতে পারি না ঘরের মহিলাগো জ্বালায়, বাইরেও এরা শান্তি দেয় না। আরে বেটা তুই রাস্তার বেহায়া বলেই রাস্তায় শান্তি খুজঁতে যাস আর ঘরের মানুষের বদনাম করস! পারবি চলতে একটা দিন ঘরের সেই অশান্তির মহিলারে ছাড়া, সেইতো কুত্তার মতো লেজগুটাইয়া ঘরেই ফিরা যাবি! ঘর সামলে কত কষ্ট না হলেই কি মেয়েরা বাইরে কাজ করতে আসে?” সবাই আগের লোকটারে বাদ নতুনজনকে ঘুরে দেখতে লাগলো, আর সেই লোক যেন সুপারম্যান হইয়া বাসের ছাদের ছোট্টখোলা জায়গাটা দিয়া ঊড়াল দেয়ার পথ খুজঁতাছিল! বাকি মহিলারাও কি কি যে সব বলতেছিল সব বুঝে আসছিল না। কিন্তু বিরাট হাউকাউ। এরই মাঝে আমার স্টপেজ চলে এলো, বারবার লাগছিল আরে এতো জলদি কেম্নে পৌছে গেলাম!

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

কামরুল হাসান রাজন's picture


পেরথম নাকি? Big smile

মাহবুব সুমন's picture


ঐ শালাদের চাবকানো দরকার Crazy

রোবায়দা নাসরীন's picture


একজনের কথায় আপ্নের গায়ে এতো জ্বালা ধরছে বাকি ৮জন আর অন্যরা শুরু করলে জানালা দিয়া লাফ দেওন ছাড়া উপায় থাকবো না! আপ্নের মতো আজাইরাদের কারনে বাকি আমরা খারাপ হই সবার সামনে। আসেন আপ্নে আমার সিটে এসে বসেন তাও আজাইরা প্যাচাঁল পাইড়েন না”

তাও ভালো কেউ একজন বুঝেছে...... বাসের ঝগরা একটি সাধারন বিনোদন, এই ভেবে ভুলে ,,,,

একজন মায়াবতী's picture


একদিন আমি একজনকে বললাম মহিলা সিটটা ছেড়ে দেন। ভদ্রলোক আমাকে দেখালো ঐটা মহিলা সিট না।
ব্যাপক আনন্দের সহিত আমি দাঁড়াই থাকলাম আর সুখী হইলাম এই ভেবে যে ভাগ্যিস উনি আমাকে দেখালো ঐ সিটের উপর প্রতিবন্ধী লেখা। ভদ্রলোককে তাই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ভেবে মাফ করে দিলাম Rolling On The Floor

বাসে উঠলে তাই সাথে সাথে মোবাইল বের করে কানে হেডফোন লাগিয়ে বসি।

নাজ's picture


ভাগ্যিস উনি আমাকে দেখালো ঐ সিটের উপর প্রতিবন্ধী লেখা। ভদ্রলোককে তাই বুদ্ধি প্রতিবন্ধী ভেবে মাফ করে দিলাম

Rolling On The Floor

উলটচন্ডাল's picture


এইসব লোকরে থাপড়ানো দরকার। মুখ খুললেই চটকানা মেরে আবার মুখ বন্ধ করে দেওয়া। একবেলা এই ট্রিটমেন্ট চললে এমনিতেই সিধা হয়ে যাওয়ার কথা।

হাসান রায়হান's picture


ডেইলি এই ক্যাচাল দেখতে হয়। আগে বেশি হইত এখন কমতেছে।

জ্যোতি's picture


বাসের এই ক্যাচাল প্রায়ই দেখতে হয়।তবে আমি বাসে উঠে যদি দেখি মেয়েদের সীটে কোন ছেলে বসা তাকে উঠিয়ে তারপর বসি।

সাঈদ's picture


বাসে চড়ে কিছু জিনিস খেয়াল করেছিঃ

১। সবাই অতি মাত্রায় নীতি সচেতন । কন্ডাকটর ভাড়া বাবদ ১ টাকা বেশী নিলেই একশ টাকার এনার্জি খরচ করে তার চৌদ্দ গুষ্টি উদ্ধার করে।

২। দেশের দূর্নীতি নিয়ে গলা ফাটায়ে বিশাল বক্তিমা দেয় চান্স পেলেই, অথচ দেখা যায় নিজে টিকেট কাটছে ১০ টাকার কিন্তু যাবে ১২/১৫ টাকার গন্তব্য পর্যন্ত।

৩। সবাই খুব রাজনীতি সচেতন হয়ে উঠে।

৪। সিট ছাড়ার কথা বললে নিজের অধিকার সচেতন হয়ে উঠে,

১০

লিজা's picture


আমি কলেজে বাসেই যাই । প্রায়ই মহিলা সিটে বসা নিয়ে ঝামেলা হয় । এটা বেশি হয় মানুষ বেশি থাকলে । তবে যারা এই ধরণের কথা বলে, তাদের সাথে কোন তর্কে যাওয়াই উচিত না । এরা সাধারনত চরম অভদ্র আর অশিক্ষিত ( সর্বোচ্চ সার্টিফিকেটওয়ালারাও হতে পারে ) এদের জাস্ট ইগ্নোর করা উচিত ।

১১

শিবলী's picture


হাহাহা

উচিত হয়েছে। তবে এখনও কিছু মানুষের নিচতা দেখে অবাক লাগে এদের কারোর প্রতি কোন শ্রদ্ধা আছে কিনা

১২

শওকত মাসুম's picture


বুঝনের বয়স থেকে এসব দেখে আসছি।

১৩

তানবীরা's picture


“এইগুলারে ভালো কথায় বুঝানোর কাম না, দুইটা জুতার বাড়ি না পড়া পর্যন্ত থামে না এরা। এই যে আমার কাছের লোকটা তাল মিলাইয়া বলছিলো, ঘরে টিকতে পারি না ঘরের মহিলাগো জ্বালায়, বাইরেও এরা শান্তি দেয় না। আরে বেটা তুই রাস্তার বেহায়া বলেই রাস্তায় শান্তি খুজঁতে যাস আর ঘরের মানুষের বদনাম করস!

আন্টিরে কদমবুছি Big smile

১৪

মেসবাহ য়াযাদ's picture


অনেকদিন এইসব বাস কাহিনী থেকে বঞ্চিত। অন্তত ৬/৭ বছর। ৪ বছর থেকে মোটর সাইকেল... বাকী ২/৩ বছর অফিসে যাতায়াত করতাম রিকশায়... আফসুস ! Wink

১৫

নিশ্চুপ প্রকৃতি's picture


এখনও হএ...তবে কম...প্রথম প্রথম এত ক্যাচাল হত...... Crazy

১৬

নাজ's picture


জটিল!
সবাই যদি এমন করে প্রতিবাদ করতে পারতো, তাহলে সমাজের এইসব কীটগুলো কবেই মরে-পঁচে পরিস্কার হয়ে যেত।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.