ইউজার লগইন

একাকীকথণ (৩)

ধানের শীষগুলোর উপর দিয়ে বাতাস খেলে যাচ্ছে কি সুন্দর, ওরা এই কাত হয়ে যাচ্ছে বাতাসের তোড়ে আবার ঝিলিক দিয়েই মাথা সোজা করে দাড়াচ্ছে। ক্ষেতের কাছে ভরা রোদ্দুরের মাঝে এই পুরানোগাছের কাছটাতে ছায়া রইবেই জানতাম, আরো জানতাম এখানে এসে ক্ষয়ে যাওয়া গাছের গুড়িটাতে বসলেই গা ঠান্ডা করা বাতাসে জুড়াবেই মন। কিন্তু তাও কতোদিন পর আসা হলো এখানটায়, নিজেকে এখন দু’দন্ড শান্তি দিতেও মন টানে না, কেবল কষ্টগুলোকে ঠেঙ্গিয়ে দিন পার করাই যেন জীবন, কান্নাও এখন বিলাসিতা।

কতদিন পর কাদঁছি, খুব ইচ্ছে করছে চিৎকার করে গলার স্বর ফাটিয়ে, নিজেকেই খামচেঁ দিয়ে কাদঁতে। বাড়ি থেকে দূরের এই জায়গাটাতে এসেছি হুট করেই, নিজেকে নিয়ে বসতে ইচ্ছে হলো। নইলে হাতের চিঠিটাতে এমনকিছু নতুন নেই যার জন্যে কান্না আসছে। আর ঘটনাটাও মনে তেমন দাগ কাটেনি, যেকোন মানুষের হলেও যেটুকু কষ্ট লাগতো এর বেশি কিছু না। জীবনটায় নতুনকিছুই নেই আর, পুরানকেই রেখে ঢেকে সাজিয়ে পথ চলছি পাছে লোকে কিছু না বলে।

চেনালোকেরা দেখলে ভাববে, মফস্বলের এই শহরে মাঠকর্মীর কাজ করছে বৌ সেটাই কি কম তায় আবার এই ভরদুপুরে ক্ষেতের ধারে বসে হাওয়া খাচ্ছে! এই পাছে লোকে কিছু বলে ভাবনাতে কি এক মিথ্যের জীবনযাপন করে চলেছি, কেবল একটা সামাজিক মর্যাদা রক্ষার নিমিত্তে! কবেই তো সব শেষ, মনেও নেই কোন অনুভূতি। তাইতো এখনকার ঘটনাটাও মনে তেমন দাগ কাটেনি, যেকোন মানুষের সাথে এমনি হলেও যেটুকু কষ্ট লাগতো এর বেশি কিছু লাগছে না। আমার চুপ থাকাকে সবাই ভাবছে, “আহারে, বেশি শোকে মেয়েটা পাথর হয়ে গেছে রে তাই কান্না নাই ওর”।

চারবছর আগে ও যখন আমেরিকা যেতে রওনা হয়ে আদমব্যাপারীর ফাকঁফিকিরের কারনে গুয়েতেমালা গিয়ে পৌছালো, তখনি বলেছিলাম ফিরে এসো লাগবে না আমার উন্নত জীবন। আমায় বুঝালে, এতো টাকা খরচ করা হয়েছে, কিছুদিন থেকে কিছু করা যায় কিনা একটা চেষ্টা করি অন্তত, নইলে বৌ-বাচ্চা রেখে এই ছন্নছাড়ার জীবনের কি মানে আছে নাকি! হ্যাঁ, ঢাকার ব্যাবসাপাতির অংশ, জমিজিরাত বিক্রি করে আদমব্যাপারীর বায়না মিটাতে হয়েছিল।
আমার বরের বৌ-পাগলামির কথা আশেপাশের সবাই জানে। ঢাকায় সপ্তাহান্তে কাজ শেষ করেই ছুটে আসতো বাড়িতে, ছুটিছাটা শেষে ঠেলেঠুলে ফেরত পাঠাতে হতো তাকে। আদরে আহলাদে আদিখ্যেতায় স্বপ্নময় করে রেখেছিলো যেন আমার জীবনটাকে। আমার মাঝে মাঝে নিজের সুখকেই বিশ্বাস হতো না, সৃষ্টিকর্তার কাছে শুকরিয়া জানাতাম যে দুখি মেয়েটার জীবন এমনি ভরে দেবার জন্যে। মানুষের অনেক নির্দয়তা দেখে দেখে অভ্যস্ত ছিলাম। যতই গুনের হই না কেন, কেবল গায়ের রঙ কালো বলে স্বজনদের গঞ্জনা, বিয়ে হবে কিনা এই নিয়ে তাদের দুঃশ্চিন্তা, ক্লাশের সাথীদের উপহাস, ছেলেদের মজা করা – নানান কিছুর মুখোমুখি হয়েছিলাম। একটা মানুষ জীবনে এসে সব কষ্ট যে দু’হাতে মুছে দিয়ে কি ভীষন পূর্নতায় ভরিয়ে দিয়েছিলো দু’বছর, এখন ভাবলে লাগে ঠিক যেন স্বপ্ন!

গুয়েতেমালায় পৌছানোর বছরখানেক পর্যন্তও ১৫/২০দিনে ফোনে যোগাযোগ হতো, একদিন হুট করেই এলো এক চিঠি। আমি যেন স্বাধীন মতো চলতে পারি, কারুর মতের তোয়াক্কা না করি, নিজেকে ছোট না ভাবি – এহেন সদুপদেশ দেয়ার পর বর আমার জানালো ঘরে আর না ফেরার কথা! নিজের এই দেশ, এই পরিবেশ ভালো না লাগার কথা! তার পরিবারের প্রতি আমার আর কোন দায়িত্ব না থাকার কথা! আমি তো যথেষ্ট বুদ্ধিমতি তাই, এই বিষয়্টা আত্নীয়স্বজনদের যেন বুঝিয়ে বলি আর ব্যপারটা তার পক্ষে বলা সম্ভব নয় তা জানাতেও ভুলেনি! খুব সুন্দর করে কথা বলার পাশাপাশি দারুন করে চিঠি লিখতে জা্নে ও, তাইতো সব একের পর এক অকপটে জানিয়েছে। শুধু পরিবার চেয়েছিলো বলে কষ্ট করে সংসার সংসার খেলার কথা! বিদেশ যাবার আগ পর্যন্ত যা কিছু আমাদের ছিলো তাতে সবটাই অভিনয়ের কথা!

মাঝে মাঝে নিজেই অবাক হই, কি করে পারছি আমি এতো কঠিন সব সিদ্ধান্ত নিতে! বাবার বাড়ি থেকে মফস্বলে এসে আদি শ্বশুরবাড়িতে উঠলাম ছেলেকে নিয়ে। মাঠ পর্যায়ের ছোট এই চাকরিটার পাশাপাশি ভাগবাটোয়ারা করে যেটুকু সম্পত্তি পেলাম, তার কিছু বর্গা চাষে আর মুল ভিটায় তিনটা ঘর করে ভাড়া দিয়ে মা-ছেলের খারাপ চলছে না। সবাই জানে বিদেশে স্বামী কষ্টে আছে সবাইকে ছেড়ে, তাই বৌয়ের এই কাজগুলো ভালোই দেখেছে লোকে। পরের চিঠিতে জানিয়েছিলো, তার অবাক হওয়া যে কেন জানাইনি কাউকে, তবে এইভাবে তার সম্পত্তি নিয়ে থাকাতেও কোন আপত্তি নাই তার।

চিঠিটা পেয়ে কান্নাকাটি করে সবাইকে জানানোই স্বাভাবিক ছিলো কিন্তু চারপাশের দেখা নানান ঘটনা মনে করে সিদ্ধান্ত পাল্টেছি। যে সমাজে বিয়ে হবার আগেই নানান কিছুর সম্মুখিন হয়েছিলাম, বিয়ে না হওয়া মেয়েরা প্রতিনিয়ত হচ্ছে, সেখানে স্বামী পরিত্যক্তা মেয়ের জায়গাই বা কই হবে! অপরের কথা বাদই দিলাম, নিজের আত্নীয়রাই মনে কষ্ট দেয়া কথা বলে যায়। মনে পড়ে, একবার এক হলুদে গিয়েছিলাম, একটা দূরসম্পর্কের আপুকে বরের মা বলছেন রিসেপশনে গিয়ে দাড়াঁতে। আপুটা ইতস্তত করে বললেন, আরে আমিতো বড়োবোন কেমন দেখায়। কিচ্ছু হবে না বলে উনার হাতে একটা ডালা ধরিয়ে দিলেন। সুন্দর মতো সব সমাধা হবার পর, বসে সবাই আড্ডা দেবার সময় অনেকে বললো, ওকে আজ অনেক সুন্দর লাগছে। পাশ থেকে শুনি, একজন বলছেন, “হ্যাঁ, ওতো এনজয় করছে খুব বেশি, ইউ নো শিজ সোয়েটিং ফর ম্যারেজ! কেন যে এদ্দিনেও এর বিয়ে হচ্ছে না! তবে এদের জন্যেই কিন্তু সবখানে বর নিয়ে আসি না, কখোন আমাদের জুটিতে এদের মতো কার নজর লেগে যায়!” এই বলে আবার বিচ্ছিরি ভঙ্গিতে হাসি! সবাই কিছুটা অপ্রস্তুত। পাশ থেকে শুনি খালাম্মা স্থানীয় একজন জানতে চাইছে, “কি হয়েছে? “এই কথার মানে কি? কোন গালি এটা?” অন্যজন বললেন, “বলছে যে ও নাকি বিয়ার জন্যে ঘামাইতেছে! আরে, শিক্ষিত মানষের শিক্ষিত ধরনের গালি, আমরা বুঝুম না!” দেখলাম আপুটার কেবল চোখ বেয়ে পানি পড়ছিলো। সেই মহিলার কাছে গিয়ে বলেছিলাম, “কথাগুলো আবার বলেন, আর এইবার কি বলছেন বুঝে তারপর বলেন”। এরপর মোটামুটি হাঙ্গামাই বাধিয়েছিলাম সেদিন। তো এহেন স্বজনময় সমাজে আমার অবস্থান কি হবে তা অনুমান করা কষ্টকর নয়।

তাই, বিদেশের ষ্টোরে ডাকাতরা এসে গোলাগুলি করে ক্যাশ ভেঙ্গে নিয়ে যাবার সময় ওর মাথায় গায়ে গুলি লেগে আহত হয়ে মৃত্যু শয্যায় আছে জেনেও খুব বড়ো কোন কষ্ট লাগেনি মনে। মনটাই তো ভেঙ্গে চুরচুর করে দেয়া হয়েছে সুনিপুনভাবে তাতে আবার কষ্ট কিসের! তাও কাদঁছি কেন জানি না, কাউকে কিছু না বলতে পারার ভারের জন্যেই বোধকরি। মানুষের প্রতি বিশ্বাস নষ্ট হয়ে যায়নি, তবে কারো উপর আশা করা, নির্ভার হয়ে যাওয়া আর কখনোই হয়ে উঠবে না। এমনকি নিজের ছেলেটার উপরও কোন আশা নেই, কেবল কোন অবলম্বন আকড়েঁ বেচেঁ থাকার জন্যেই সবটা। আমি না হয় খেলা ছিলাম, কিন্তু এই দেবশিশুটার প্রতি কেন তার বাবার মায়া জন্মালো না, ভেবে অবাকই লাগে কখনো। কথায় বলে, মাঝে মাঝে আলেমের ঘরে জালেম, শিক্ষকের ঘরে প্রতারকের দেখা মিলে যায়, চেষ্টা করেই দেখিনা আমারটা কি হয়!

একাকীকথণ ১

একাকীকথণ ২

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মেসবাহ য়াযাদ's picture


মনটা কি বেশি খারাপ দিদি ?
অনেক সুন্দর একটি লেখা। গল্পের রমনীর দুঃখটা কেনো জানি বড় বেশি করে বাজলো হৃদয়ে........... Sad

জেবীন's picture


হুম,
অই মূল ঘটনা জানার পর অনেক কষ্ট লাগছে। আজব কথা হলো এই লেখা পড়ে আরেকজন জানালো, আমাদের চেনার মাঝেই নাকি একজনের বৌয়ের একই হাল প্রায়! ঘুরে ফিরে কি একই ঘটনার বৃত্তে আটকে থাকি আমরা! Sad

রায়েহাত শুভ's picture


তুমি শালা এত কম লেখো কেন? Crazy Stare Angry

জেবীন's picture


এম্মা! স্টার মার্কস কনে গেলু! Tongue

রায়েহাত শুভ's picture


আমারে দিয়া সুশীলামতি হইবো না Tongue

একজন মায়াবতী's picture


আগের পর্ব গুলা মিস করসিলাম। এখন পড়ে আসলাম।
কষ্টের হলেও লেখা ভালো লাগসে

জেবীন's picture


সবগুলো পর্ব পড়ার জন্যে ধন্যবাদ গো মায়াবতী। Smile
নতুন কিছু লেখা দেও না।

লীনা ফেরদৌস's picture


হায় হায় ! নাম প ইড়া ভাব্লাম তোমার নিজের ক থায় বুঝি লিখছ Smile আস্তে আস্তে পড়তে পড়তে আমারতো টাস্কি খাওনের অবস্হা Shock বর, ছেলে, Tongue

গল্পটা টাচি

জেবীন's picture


Smile চেষ্ট করছি লেখার, তবে কষ্টের কথা কেম্নে তুলতে পারছি জানি না

১০

জ্যোতি's picture


ধানের শীষ পড়ে ভাবলাম বিম্পির কথা কইবা। কইলা না।
এত মায়া পাইলা কই?
একটা কথা--- বৌ পাগল বরের কুনু সন্ধান তো পাইলাম না ।

১১

জেবীন's picture


নাহ, আসলেই ঝামেলা কইরা ফেল্লাম! ধানের শীষের কথা কইলাম আর নৌকা আনলাম না লেখায়! আরে ক্ষেতের পাশ দিয়া একটা খাল কাইট্টা ফেল্লেই তো নৌকা নামাইতে পারতাম! আফসুস! এই ভুল আর করমু না! Wink

আসলেই লোকদেখানি গুলা ভন্ডই। Stare

১২

আরাফাত শান্ত's picture


মনটা খারাপ হলো!

১৩

জেবীন's picture


হ রে ভাই! কাহিনিই এমনতর Sad

১৪

ফাহমিদা's picture


চোখের সামনে ঘটে যাওয়া ভীষণ সত্য ঘটনাগুলো খুব সুন্দরভাবে লিখেছেন আপু, সবগুলো পর্ব পড়ে এলাম...

১৫

জেবীন's picture


থ্যাঙ্কস আপু, সময় করে সবগুলো পড়ার জন্যে। Smile

১৬

আহমাদ মোস্তফা কামাল's picture


সুন্দর একটা লেখা। কোমল একটা অনুভূতিতে মনটা আর্দ্র হয়ে উঠলো...

১৭

বিষাক্ত মানুষ's picture


কি বলবো বুঝতাছি না Sad

১৮

তানবীরা's picture


কিছু বলার নেই। এ হলো নারীদিবস, এই আমাদের হাল।

কিন্তু লিখেছিস অসাধারণভাবে

১৯

লিজা's picture


Sad এই রকম ঘটনা তো অহরহই ঘটে । এই লোকগুলোকে ধিক্কার Crazy

২০

জেবীন's picture


আবোলতাবোল লেখাগুলা পড়ার জন্যে ধন্যবাদ সব্বাইরে Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.