ইউজার লগইন

মনসিন্দুকের এককণা

দিনের পর দিন বাসের জানালা দিয়ে ভোরের লালচে কুসুম রঙা সূর্যটাকে ঘুম ঘুম চোখে দেখতে দেখতে কবে যে ওর প্রতি মোহাচ্ছন্ন হয়ে পড়েছি নিজেই বুঝিনি। সুর্যের নানান রুপ এখনও টানে আমাকে। কষ্ট করে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে বাস স্ট্যান্ডে দাড়ালেও সিটে বসেই একেকদিন একেক লালগোত্রীয় রঙের, ঢঙের (থালাটা ধীরে ধীরে বৃত্তের গন্ডি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তো) সূর্যিমামাকে দেখার জন্য আহলাদের ঘুম কোথায় যে পালাতো। ছোটবেলা সকালবেলার সাধের ঘুমের দরুন কতদিন যে একটুর জন্যে স্কুলবাস মিস করে মন খারাপ করেছি তার ইয়ত্তা নাই। নাহ্‌ , পড়াশুনোর জন্য না, স্কুল শুরুর আগের সময় আর ছুটির পরের জম্পেশ আড্ডার সময়গুলো মিস করলাম এই ভাবনায়। অন্যদের আগে স্কুলে যাওয়া আর দেরি করে বাসা পৌছানো স্কুলবাসের বদৌলতেই শুধু সে সুযোগটুকু এসেছিলো, অনেকসময় বিরক্তি আনলেও তার সাথে সুখস্মৃতি জড়িয়ে আছে অগনিত।

যাওয়ার পথের অসাধারন সকালটা উপভোগ করার পাশাপাশি স্কুল কেন্টিনে বিক্রীর জন্য রাখা গল্পের বইগুলো ফ্রি'তে পড়তে পাওয়া ছিলো বোনাস, এস্যাম্বলির আগে ফেরত দেবার শর্তে কতো কতো বই যে কেন্টিনের মামু'র কল্যানে পড়েছি!! আবার সবার আগে খেলার কোর্টগুলোর দখলও নিতাম আমরা বাসওলীরা। বাস্কেটবলের কোর্টটা থাকত খাঁ খাঁ, পিটিম্যাম জোর করে না আনলে তার ধারে কাছে ঘেষতো না কেউ, যদিও হাডুডু, চি-বুড়ি, কুতকুত- এর কোর্টগুলো দখল নেয়ার জন্য কত্তো কাড়াকাড়ি পড়ত।

বাসায় ফেরার সময়টা ছিলো দুনিয়ার মজার, গোমড়া মুখে সিট আকড়ে বসে থাকা নয়, সারাটা পথ সিট ধরাধরি মারামারি লেগেই থাকত, প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল সিট আর মাত্রাতিরিক্ত যাত্রী থাকত সবসময়। ছোটকালে খারাপ লাগত, দাড়িয়ে ঘুমাতে দারুন অপছন্দ আমার, কিন্তু ওই কাজটাই করতে হতো অগত্যা। সেই ভোর ছয়টায় উঠে সারাটা সময় হুটোপুটি (লেখাপড়া বললাম না) সেরে সাড়ে তিনটায় বাড়ি ফিরলে বাসে তো ঘুম আসাই স্বাভাবিক। অথচ এই সহজ ব্যাপারটা বুঝতো না সিনিয়র আপুগুলো, খোচাঁখুচিঁ চলত তুমুল। তাদের কাছ থেকে পাওয়া সবচেয়ে সুন্দর মন্তব্য হলো - "এই আসছে টাট্টুঘোড়া ম্যারাথনে নামতে"। অনেক বিরক্ত হতাম, তখন কি ছাই জানতাম ঘোড়া দাড়িয়ে ঘুমাতে পারে!!! ঘুমের ঘোরে কতদিন যে আমাকে নির্দিষ্টের চেয়ে পরের স্টপেজে নামতে হয়েছে। আমাদের বাস ড্রাইভার ছিলেন বিহারী একজন, যার মুখটাকে এখন আমি মেলাই হিন্দীছবির অভিনেতা ওমপুরি'র প্রথমকালের সাথে, যখন তার মুখে দেড়'দু কেজি মাংশ অনায়াসে লাগানো যেতো দাগ পূরন করতে। অনেক কড়া ছিলেন ভালোই ধমক দিতেন আমাদের। আমার উল্টোপাল্টা কান্ডে হুমকি দিতেন অহরহই - "আব্বে! এ কল্লামপুরিয়া, থোমার নামে হামি ম্যাডোমের কাছে রাপোট করিবো", যদিও সে রিপোর্টের কার্যকারিতা দেখিনি কখনও। আমাদের রুটটাতে বাসে কোন টিচার আসতেন না, তাই উনিই আমাদের শাসনে আদরে আগলে রাখতেন, "মেয়েরা এমন করে না! এই চেচাঁমেচি বেশি হচ্ছে! ওমুক সিটের ওমুক, জানালা দিয়ে আর ঝুকবে!!!"

আস্তে আস্তে বড় হলাম, বাসায় ফিরে আসার সময়টা তখন মজাই মজা। কতো কতো দুষ্টুমি, শেষের সিটগুলো দখল করে বেসুরো গানের হুল্লোড়। আমাদের খুব ইচ্ছে করতো বাসের দরজায় দাড়িয়ে হেলপারি করার, হেলপাররুপি বুয়াটাকে একটু সাহায্য করার। কিন্তু যতবারই বলতে যেতাম ধমক অনিবার্য ছিলো। তাও তাও জিজ্ঞাসা করতাম, আশা ছিলো একবার না একবারতো হ্যা বলতেই পারেন, আর আমরাও আদমজী'র ছেলেগুলোর মতো নিজেদের বাসের দরজায় ঝুলবো, ধমাধম বাসে চাপড় দিবো। আদমজী'র বাসের সাথে কিযে অদ্ভুত দ্বন্দ ছিলো! আমাদের বাস দেখলেই তাদের স্পিড হয়ে যেত তুমুল, আর আমাদের বেরসিক ড্রাইভার দিতো আমাদের বাসের স্পিড কমিয়ে। তবে একবার জাহাঙ্গীর গেটটার কাছে জ্যামে পড়ে আমাদেরটা ছিলো সামনে আর ওরা পেছনে আর জ্যাম ছাড়তেই দেখা গেল আমাদের বাস স্টার্ট হচ্ছে না, আমাদের প্রেস্টিজের চৌদ্দটা বেজে গেল, কিছুপরেই আমাদের খুশি দেখে কে যখন বুঝলাম ছেলেরা বাস না ধাক্কা দিলে সামনে যেতে পারবে না। অনেক গাইগুই করে রাগিমুখ নিয়ে ওদের বাসধাক্কা আর পেছনের জানালা দিয়ে আমাদের মুখ ভেংচি - অনেকদিনের মজার টপিকস ছিল আমাদের।

অনেকপরে জেনেছিলাম, আমার জীবনের সবচেয়ে অন্যতম বৃষ্টি ভেজার আর বাসের হেলপারি করার (ক্লাশ টেনের শেষদিন ওই সুযোগ পেয়েছিলাম আমরা) স্মৃতিময় ওই বাসের ড্রাইভার ছিলেন আমাদেরই এক ক্লাশমেটের নানা। আমাদের প্রতি তার আদরের কারনও কি তাই ছিল কিনা কে জানে, তবে এখনও মনে পড়ে ওনার আদুরে ধমক - "আব্বে! এ কল্লামপুরিয়া, থোমার নামে হামি ম্যাডোমের কাছে রাপোট করিবো"।

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

সাঈদ's picture


দারুন স্মৃতি রোমন্থন । নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হইলাম।

সোহেল কাজী's picture


দারুন লাগলো, এক ঢিলে কৈশরে ছুড়ে ফেলার মত লেখা।

অরিত্র's picture


সাবলীল লেখনি আপনার
নস্টালজিয়ায় আক্রান্ত হলাম

আপু এটা ধারাবাহিক লিখেন

জেবীন's picture


আমাকে দিয়ে ধারাবাহিক হয় না, গুবলেট করে ফেলি .... Smile
পড়ার জন্য ধন্যবাদ

নজরুল ইসলাম's picture


অনেক ভালো লাগলো। মনসিন্দুক থেকে এরকম আরো কিছু বের করেন।

কোন স্কুল ছিলো আপনার?

জেবীন's picture


আদমজী স্কুল, জাহাঙ্গীর গেট.. ইত্যাদি এত্তো হিন্টস দিলাম লেখাতে, বলেন তো দেখি নাম....Smile

টুটুল's picture


এবার নিশ্চয় বুঝতে পারছ যে আলসেমি না কৈরা লেখালেখি করলে তুমি ভালই লেখতে পার...

মন দিয়ে লেখালেখি করো :)

জ্যোতি's picture


মেয়েটা বিরাট অলস।কি সুন্দর লেখে কিন্তু খালি ঝিমায়।এবার লেখালেখি কর মন দিয়ে।তোমার লেখা পড়ে কত কি মনে পড়লো!আবার কালকেই ইউনিভাসিটির বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিলাম অনেকদিন পর।অবাক লাগলো যে সেই আমাকে ফিরে পেলাম আর রাতেই দেখলাম তোমার এই পোষ্ট।

অতিথি পাখি's picture


ক্যানো জানি এই টাইপ লেখাই আমার বেশি ভালো লাগে !!!

১০

নীড় সন্ধানী's picture


অনেক সুন্দর একটা লেখা। তারা দেয়ার সিস্টেম চালু হয় নাই এখনো?

১১

হাসান রায়হান's picture


তুমি যে কেনো লেখোনা বুঝে আসেনা। আমি এমন লিখতে পারলে সারাদিন খালি লিখতাম আর লিখতাম। এই লেখা পড়ে আমার স্কুলজীবনের কথা মনে পড়ল।

আমার  স্কুলজীবন অবশ্য মোটেও আনন্দদায়ক ছিলনা। পড়ালেখা করর মত জঘন্য জিনিসের কথা মনে হইলেই বিবমিষা হইত। তার উপর তিন কিমি হেটে যাইতে হইত। স্কুল ছুটির পর তাড়াতাড়ি বাসায় ফিরে কখন কার্টুন দেখব সেই চিন্তায় থাকতাম। স্কুবি ডু ছিল আমাদের ফেভারেট।

আমার  বাল্য বন্ধু বাবলু আমি একসাথে ফিরতাম কমলাপুর রেললাইন এর উপর দিয়া। রেল স্টেশনে দুইটা বইয়ের দোকান ছিল। কতদিন দাড়াইয়া বই দেখছি। মনে হইত বইয়ের দোকান না স্বপ্নের দোকান। ভাবতাম বড় হয়ে এরকম দোকান দিব আর সারাদিন বই পড়ব। একবার ১০ বারোটা বই কিনলাম। আরথার কোনাল ডয়েল, জুল ভার্ন। আহ সেকি আনন্দ ! সারাক্ষণ বুঁদ হয়ে পড়া।

 

১২

টুটুল's picture


আবার জুলভার্ন?

১৩

জেবীন's picture


আমার স্কুল জীবন দারুন কেটেছে,
অনেকটা শাসনের মাঝে যেটুকু সুয়োগ মিলতো অনেক উপভোগ্য ছিলো, ঘরকুনো এই আমি'টার ওই স্কুল বেড়ানোই (পড়ালেখা বলিনি কিন্তু) আনন্দের উৎস ছিলো ......

বইয়ের দোকান দেয়ার ইচ্ছে না হলেও দল বেধে দোকানে দাড়িয়ে বই বাছাই আর কে কতটা চাদা দিয়ে কোন কোনটা কিনবে তা ঠিক করতাম আমরাও .. থান্ডারক্যাটস ছিলো ১নং পছন্দের

১৪

জেবীন's picture


টুটুল@ এখানেও জুলভার্ন!!Laughing

১৫

মলিকিউল's picture


নস্টালজিক করে দিলেন...... সেই স্কুলে যাওয়া আর ফিরে আসার পথে ঘটানো অনেক কিছু মনে পড়ে গেলো.....।

 

তুমুল লেখা......।

১৬

মানুষ's picture


ওয়ও! অনেক দিন পর জেবীন কে জবীনরুপে দেখলাম। জিতে রাহো!

১৭

জেবীন's picture


তুমি স্বরুপে হাজির হয়ে আলোকিত করো সব সেটাই চাই....

১৮

সুমনা's picture


জটিল লেখা। ছোট্ট বেলায় ফিরিয়ে নিয়ে গেলেন।পঞ্চতারকার অপশান টা কে ভীষন মিস করছি।

১৯

জেবীন's picture


সাঈদ, সোহেল @ ধন্যবাদ পড়ার জন্য

টুটুল, জয়িতা @ আপনাদের কারনে ফাকিবাজ হইতে পারলাম কই?

আতিথি পাখি, মলিকিউল@ ভালো লাগছে জেনে ভালো লেগেছে...

নীড়সন্ধানী,সুমনা@ আপনার কমেন্ট করেছেন এতেই ভাল লাগলো, তারা কি কমেন্টের কাজ করে?

২০

তানবীরা's picture


আমার স্কুল গোয়িং এতো আনন্দময় ছিল না। বাড়ি দশ কদম হাটলেই স্কুল। তারমধ্যে সারা রাস্ত জুড়ে পাড়ার মুরুব্বীদের আনাগোনা। মুরুব্বীরা তীক্ষন দৃষ্টি রাখতেন কার মেয়ে কতোটুকু বেদ্দপ হইছে দেখার জন্য। আর আমাদের আপ্রান চেষ্টা থাকতো, আমরা কতোইইইইই নক্ষী সেটা পেরমানের জন্য। আপনার লেখা পড়ে ভালো লাগলো। অন্যের সুখের কথা শুনতেও কতো সুখ।

২১

জেবীন's picture


আররে! সব সময় কি সুখে ছিলাম নাকি?... অনেক কষ্টের মাঝের একফালি সুখকেই মনের সিন্দুকে আগলে রাখি...

আর আমরা মেয়েরা লক্ষী না হইলে আর কে হবে তা? Tongue out

২২

বিষাক্ত মানুষ's picture


হুমমমমমমমমমমম

২৩

লোকেন বোস's picture


আপনি খুব সুন্দর করে কৈশোরটা বর্ণনা করলেন। এরকম গল্প আরো পড়তে চাই

২৪

নুশেরা's picture


জেবীনের 'মনসিন্দুক' কথাটা কোত্থেকে এসেছে-- এ ধরণের গবেষণা হয়তো কেউ করবে একদিন। সেদিন আমি ব্যাপক ভিআইপি!

এককণা দিলে চলবে না। এমন অজস্র কণা চাই।

২৫

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


অসাধারণ।
এইটার সিরিজ চাই।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.