রক্ত ও কাদা ১৯৭১
১.
আমার একজন আত্মীয় কলেজের ছাত্র। সে নাকি সম্প্রতি এক লাখ ২০ হাজার ইয়েন দিয়ে একটি কঙ্কাল কিনেছে গবেষণার কাজে সহায়ক হবে বলে। কথাটা শুনে আমার কেন যেন ভালো লাগছিল না। পরে জানা গেল, কঙ্কালটি এক বাঙালি মহিলার, যেমনটি আমি দুশ্চিন্তা করেছিলাম। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল ২০ বছরের মতো।
১৯৭১ সালের মার্চ থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রায় নয় মাস বাংলাদেশে পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনীর হাতে ৩০ লাখ মানুষ প্রাণ হারিয়েছিল। দুই কোটি মানুষ হয়েছিল গৃহহারা। এই ছোট্ট দেশের অধিকাংশ এলাকা পরিণত হয়েছিল ধ্বংসস্তূপে।
আমি আমার দায়িত্বের অংশ হিসেবে ঢাকায় এবং না না জানা এক ছোট্ট গ্রামে মোট ৪০০টি মৃতদেহ যথাস্থানে পৌঁছানোর কাজ করেছিলাম। তাদের উপর নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ড চালানো হয়েছিল।
নোয়াখালী জেলা শহরের মাইজদী কোর্টে ছিল রেডক্রস হাসপাতাল। হাসপাতালটি বিদ্রোহী গেরিলাদের চিকিৎসা করেছে বলে অভিযোগ এনে পাকিস্তানি সেনারা ১৯৭১ সালের ১৯ আগস্ট ডাক্তার, নার্স ও রোগীদের মোট ৫৯ জনকে গুলি করে হত্যা করে। ডিসেম্বরে মুক্তিবাহিনী এই হাসপাতালকে মুক্ত করার পর আমি সেখানে গিয়ে দেখলাম, এখানে-সেখানে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের হাড়। তাতে ছড়িয়ে রয়েছে মানুষের হাড়। তাতে জড়িয়ে আছে ওদের বাঁধার জন্য ব্যবহৃত দড়ির সঙ্গে হাতের বালা ও ফুলের নকশা করা শাড়ির টুকরো।
যুদ্ধের অবসানের পরপরই ঢাকার একটি বালিকা বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের মাটি খুঁড়ে ১২ থেকে ১৭ বছরের মেয়েদের ২৫০টি মৃতদেহ উদ্ধার করলাম। যুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর চতুর্দশ ডিভিশনের একটি কোম্পানি বিদ্যালয়টিকে ঘাঁটি করেছিল। মৃতদেহগুলোর একটিকে হাত দিয়ে তুলতে গিয়ে চমকে উঠলাম, তার মুখের চামড়া হঠাৎ খুলে গেল। মুখ থেকে উঠে এল লম্বা চুল।
সরকারি ঘোষণা অনুযায়ী, যুদ্ধ চলাকালীন সময়ে নয় মাসে দুই লাখ মহিলাকে ধর্ষণ করা হয়। তাঁদের মধ্যে অনেককে হত্যাও করা হয়। শুনেছি, কঙ্কাল ব্যবসায়ীরা ভারতের মাধ্যমে বাংলাদেশ থেকে এক হাজার কঙ্কাল জাপানে আমদানি করেছে। আমার আÍীয় যে কঙ্কালটি কিনেছে, সেটিও সম্ভবত ওইভাবে চলে এসেছে। বাংলাদেশ কি এতই কষ্টে আছে যে কঙ্কাল পর্যন্ত বিক্রি করতে হয়!
এই অংশটুকু একটি বইয়ের লেখার ভূমিকা মাত্র। বইটির নাম ‘চিতো-দুরোতো’। বাংলা করলে দাঁড়ায় অর্থাৎ ‘রক্ত ও কাদা’। এর লেখক তাদামাসা হুকিউরা।
জাপানী নাগরিক তাদামাসা হুকিউরা আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের কর্মী হিসেবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সময় দেশটিতে অবস্থান করেন। ১৯৭১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তিনি ঢাকায় পৌঁছান। ততদিনে বাংলাদেশ সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধে জড়িয়ে পড়েছে। হুকিউরা বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয় পরবর্তী তৎকালীন বহু ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি এমন অত্যন্ত কম সংখ্যক বিদেশিদের একজন যারা বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ এবং বিজয় পরবর্তী পরিস্থিতি স্বচক্ষে দেখেছেন। বাংলাদেশে আট মাস থাকার বিরল অভিজ্ঞতা নিয়েই এই বই। বইটির অনুবাদ করেছেন আরেক জাপানি, কাজুহিরো ওয়াতানাবে।
বইটিতে অসংখ্য আগ্রহ উদ্দীপক কথাবার্তা আছে, আছে অনেক ঘটনার বিবরণ। বিদেশি একজনের নির্মোহ দৃষ্টিতে দেখা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে উল্লেখযোগ্য একটি বই রক্ত ও কাদা ১৯৭১।

ভয়াবহ একটা অংশ এখানে বলি। লেখক লিখেছেন-'গত ৫ মে (১৯৭২) আমি নেপালের কাঠমান্ডু গিয়েছিলাম। সেখানে অপ্রত্যাশিতভাবে এক ব্যক্তির সংগে দেখা হলো। হাতিয়া দ্বীপের রাজাকার বাহিনীর কমান্ডার সৈয়দ সেখানে দাঁড়িয়ে। বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে উত্তরে বললো, 'কাঠমান্ডুর পাকিস্তান দূতাবাস থেকে দিনে তিন নেপালি রুপি করে দেয়।'
তাদের উদ্দেশ্য জানতে চাইলে উত্তরে সৈয়দ বলল, 'আমাদের লক্ষ্য পূর্ব পাকিস্তানে কায়েদে আজম মোহাম্মদ আলী জিন্নাহর আদর্শে একটি মুসলিম রাষ্ট্র কায়েম করা। এই লক্ষ্য পূরণের জন্য আমরা অস্ত্র ব্যবহার করতে দ্বিধা করবো না। লোভী ভারতের সংগে জোট বেঁধে পূর্ব পাকিস্তানের হিন্দু ও আওয়ামী লীগ আমাদের ওপর যে সামরিক অত্যাচার চালিয়েছিল, আমরা অবশ্যই তার প্রতিশোধ নেব।' এই বলে সৈয়দ কোমরে বাঁধা রিভলবার আমাকে দেখাল। ততক্ষণে আমরা কথা বলছি দেখে সৈয়দের সাত-আটজন সহযোগী আমাদের ঘিরে ধরেছে। তারা সবাই তীক্ষ্ম দৃষ্টিতে আমাকে দেখছিল।
২.
চারপাশে তাকিয়ে দেখলে রাজাকার কমান্ডার সৈয়দদের এখনো দেখা যায়। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার চলছে। এখন তারা কিন্তু আবার সামনে আসতে চাচ্ছে। আর একারণেই বইটির প্রাসঙ্গিকতা আছে।





মন্তব্য করার কারণ হলো শুধুমাত্র মাসুম ভাইকে বোঝানো, পড়েছি। বলতে পারতাম নীরবে পড়ে গেলাম, কিন্তু সেসকল মন্তব্য গতানুগতিক হয়ে গেছে, এই মূহুর্তে এইসকল ব্যাপারা গতানুগতিক সুশীল আর থাকতে মন চায় না, থাকবো ও না।
একমত
কিনে ফেলবো কাল পরশু!
ভাল লাগবে পড়তে
আপনার স্ট্যাটাসে এই কথটাই বলতে চেয়েছিলাম...
প্রিয়তে নিলাম এবং ফেসবুকে শেয়ার দিলাম।
বইটা পড়ার ইচ্ছা হচ্ছে।
সুযোগ হলেই পইড়েন
আমরা সব কিছু বিক্রি করতে পারি, এমনকি নিজেদেরকেও, খুবই সস্তায়...
~
১৯৭৩ সালেই এই প্রশ্নটি তিনি করেছিলেন
সেইটাই
বইটা কই পাওয়া যাবে ??
রক্ত ও কাদা ১৯৭১—তাদামাসা হুকিউরা \ অনুবাদ: কাজুহিরো ওয়াতানাবে \ প্রকাশকাল: এপ্রিল ২০১২ \ প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন \ প্রচ্ছদ ও অলংকরণ: কাইয়ুম চৌধুরী \ মূল্য: ৩০০ টাকা
আপনার আমার মত আমজনতা ছাড়া এই দিকে কারো কী নজর আছে বলে মনে হয় ?
সবার নজর রাখতে হবে
পড়ার ইচ্ছা আছে
পড়ো
কিনব ইনশাল্লাহ্....
ওক্কে
আপনার বই পড়ার লিস্ট দেখে, লেখা পড়ে বইগুলি পড়তে আগ্রহ হয়। একদিন পড়ব হয়ত। এমন লেখা চলুক।
পড়ো, পড়ার কোনো শেষ নাই
এই রাজাকার দের ব্যাপারে সাধারন মানুষের ঘৃনা আছে, রাজনীতিবিদদের নাই তাই এখনও ওদের দেখা যায়।
একমত
বইটা পড়ার ইচ্ছা হচ্ছে।
লেখার প্রথমটুকু পড়ে ভাবছিলাম ভাইজান কতো সিনিয়র

শেষটুকু পড়ে ভাবলাম, যাক ঠিকাছে ন
সিনিয়র??? আমি তো ওনলি ৩৫+
বইটি একজন বিদেশির দৃষ্টিতে দেখা বলে তার কাছে অনেক কিছু ভাল লাগে নাই। তবে পরিস্থিতি বিবেচনা তাকেও করতে হয়েছে। সুতরাং বইটি পড়তে হলে অনেক কিছু বিবেচনায় আনতে হবে
মন্তব্য করুন