জীবনের জে.এস.সি পরীক্ষা
জীবন ক্লাস এইটে পড়ে।সামনে তার জে.এস.সি পরীক্ষা।তার জীবনের সবচেয়ে অপছন্দের বিষয় হচ্ছে পড়া লেখা।পড়া লেখাটা যে কে আবিষ্কার করেছিল!জীবনের প্রায় ইচ্ছে হয় তাকে খূঁজে বের করে গুলি করে করে মেরে ফেলতে।শুধুমাত্র পড়ালেখার জন্য তার জীবনের সব হাসি আনন্দ মাটি।বলা যায় জীবনটা যন্ত্রণায় একেবারে ভাজা ভাজা হয়ে গেছে।
টিভি দেখতে তার কতো ভালো লাগে।বিশেষ করে ঋত্মিক রোশন আর সালমান খানের হিন্দি ছবিগুলো।সে সালমানের মতো নাচতেও পারে।মাঝে মাঝে এইচবিও চ্যানেলের ইংলিশ ছবিও দেখে।কম্পিউটারে গেম খেলতেও ভালো লাগে।তার বন্ধু প্রান্ত থেকে মাঝে মাঝে সে গেমসের সিডি আনে গোপনে।আবার গোপনেই তা কম্পিউটারে ইনস্টল করে বন্ধুকে ফেরত দিয়ে দেয়।কিছুই গোপনে করতে হতো না,যদি তার আপু বাসায় না থাকতো। তার স্বাধীন জীবন যাপনের একমাত্র বাধা হচ্ছে তার আপু।
আপুর যখন চাকরী হয়েছিল এবং ফেনীতে পোস্টিং হয়েছিল তখন বাসার সবাই ভীষণ মনখারাপ করলেও সে কিন্তু ভেতরে ভেতরে দারুণ খুশি হয়েছিল।কারন এখন আর তার স্বাধীনতায় কেউ হস্তক্ষেপ করবেনা।বাসায় তার বড় ভাই ও পড়ালেখা নিয়ে তাকে যথেষ্ট যন্ত্রণা দেয়।কিন্তু সেক্ষেত্রে তার ভরসা হচ্ছে মা।মায়ের কাছে তার সব আব্দার।বাসায় বড় ভাইয়া,আপু কেউ না থাকলে মা তাকে ডেকে রিমোট হাতে দিয়ে বলে, টিভি দেখ। কম্পিউটারে গেম খেললেও মা কিছু বলে না। এই যে পরীক্ষায় সে প্রতিবারই ফেল করে মা একটুও রাগ করে না। সে তো সব লিখে আসে পরীক্ষার খাতায়,টিচার নম্বর না দিলে সে কি করবে।এই কথাটা মা ছাড়া কেউ বুঝে না।এই যে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় অংকে ডাবল জিরো পেয়েছে মা কিছু বলে নি।কিন্তু আপুটা কি যা নাযেহাল করল তাকে।শুধু আপু নাযেহাল করলেও হতো।তা না,বাবাকে দিয়েও বকা শুনিয়েছে।বাবা তার রিপোর্ট কার্ডে সাইন পর্যন্ত করে নি।এজন্য স্কুলের নাঈমা টিচার তাকে কানে ধরে দশবার উঠবস করিয়েছে।
মাত্র কয়েকদিন আগে রোযার ঈদ গেল,সে সারাক্ষণ মুখ গোমরা করে বসে থাকতো।তার বন্ধুরা স্কুলে যখন শপিং এর গল্প করতো সে শুনে যেত। কারণ কোনো বিষয় নিয়ে তার একটু বেশি আগ্রহ হলেই আপু বলে, পড়ালেখা ছাড়াতো দুনিয়ার সব বিষয় বুঝে।গাধা একটা।
আপুর মুখে শুনে শুনে অন্যরাও বলে।তাই এবার সে আগে থেকেই ঠিক করে রেখেছিল শপিঙের ব্যাপারে কিছুই বলবে না।
মাঝখানে কিছুদিন সে বেশ শান্তিতে ছিল।যখন আপু ফেনীতে ছিল।যদিও আপু প্রতি বৃহস্পতিবারে চলে আসতো,তারপর ও সপ্তাহের বাকী পাঁচটা দিন তো শান্তিতে কাটতো।তখন বাসায় সে ছিল রাজা।বাবা সকাল বেলা অফিসে চলে যেত।বড় ভাইয়া কলেজে থাকতো।মেজো ভাইয়া থাকে ঢাকায়।বাসায় শুধু সে আর মা।যেদিন স্কুলে যেত না, সেদিন বেলা করে ঘুম থেকে উঠতে পারতো।কত আরামের দিন ছিল!
আপুটা কেমন করে যেন বদলি হয়ে আবার তাদের কাছে চলে আসলো।
তার আনন্দের জীবনটা আবার ভাজা ভাজা হয়ে যাচ্ছিল।ঠিক এসময় আপুর বিয়ে হয়ে গেল।আপুর জন্য একটু মন খারাপ হলেও নিজের মুক্তির কথা ভেবে সেই মন খারাপ ভাব কে খুব একটা পাত্তা দেয়নি সে।ভেবেছিল এবার আর কোনোভাবেই আপু তাকে জ্বালাতে পারবেনা।কিন্তু না,কিছুদিন পরেই আপু হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে আবার বাসায় চলে আসল।তার জীবনের দুঃখ বোধহয় আর কোনো দিন কাটবেনা।আপুর বর শামীম ভাইয়াটাকে কত পছন্দ করে সে।অথচ সেই শামীম ভাইয়াও কিনা একদিন তার সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে বসেছে।অবশ্য শামীম ভাইয়া পরে তাকে বলেছে ঘটনা এমন হবে জানলে তিনি কোনোদিনই তার আপুকে একথা বলতো না।বিষয়টা ছিল তার ক্লাস টেষ্টের খাতা দেখা নিয়ে।তার আপু যখন তাকে জিজ্ঞেস করল,বুবু তোর ক্লাস টেষ্টের খাতা দেয়নি?
সে বলেছিল,না।(আপু তাকে আদর করে বুবু ডাকে।)
এরপর সেদিনই শামীম ভাইয়া বাসায় এলো।শামীম ভাইয়ার সাথে মজা মজা করতে করতে হঠাৎ করে শামীম ভাইয়া জিজ্ঞেস করল তোর পড়ালেখা কেমন চলছে?ক্লাস টেষ্টের খাতা দিয়েছে?
সে ভাবলো শামীম ভাইয়াকে সে এতো পছন্দ করে শামীম ভাইয়ার সাথে মিথ্যা বলা ঠিক হবে না।তাই সে বলল দিয়েছে।ফেল করেছি।
কিছুক্ষণ পরেই আপু হুংকার দিয়ে তাকে ডেকে বলল,তুই এত বড় শয়তান হয়েছিস!আমাকে মিথ্যা বললি!এরপর তার গালে ঠাস ঠাস করে কয়েকটা চড় লাগিয়ে বলল,খাতা বের কর।ঘটনার আকস্মিকতায় বিহবল হয়ে সে বিছানার তোষকের নিচ থেকে খাতা বের করেছে।এ ঘটনায় আপুর উপর তার ততটা রাগ হয়নি,যতটা রাগ হয়েছে শামীম ভাইয়ার উপর।শামীম ভাইয়া আবশ্য পরে তাকে বলেছে,তুই যে তোর আপুকে মিথ্যা বলেছিস একথা আমাকে বললেই তো আমি তোর আপু কে বলতাম না।তোর আপু তোর পরীক্ষা নিয়ে টেনশন করছিল তখনই কথা প্রসংগে তোর খাতার কথা বলেছি।
তারপর কিছুদিন শামীম ভাইয়ার উপর তার অনেক অভিমান ছিল।এরপর একটা সময় সে দেখল গল্প করার মতো শামীম ভাইয়া ছাড়া তার আর কোনো আপনজন নাই।তাছাড়া সেদিন তো ভুলটা তার নিজেরই ছিল।শামীম ভাইয়াকে তো সে বলেনি খাতার ব্যাপারটা গোপন রাখতে।
শামীম ভাইয়া তাকে গেমসের অনেক সিডি কিনে দেয়।মাঝে মাঝে বেড়াতেও নিয়ে যায়।অনেক মজার মজার কথা বলে।বইমেলা থেকে তাকে মীনা-রাজুর বই কিনে দেয়।আপু কাজে ব্যস্ত থাকলে শামীম ভাইয়ার সাথে সে অনেক গল্প করে।তার স্কুলের বন্ধুদের গল্প।শামীম ভাইয়া তাকে বলে,তোর শুধু বন্ধু আছে।বান্ধবী নাই? তখন সে আরুশা আর লিলিদের গল্প করে।তারপর আবার ভাইয়াকে নিষেধ করে দেয় আপু যেন না জানে।
প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় অংকে ডাবল জিরো পাওয়ার পর আপু রাগ করে তার টিচারকে বাদ করে দেয়।বলে, তোর পড়ালেখার দরকার নাই।তুই গিয়ে রিকশা চালা।
বাসার টিচার না থাকায় তার যে কি ভাল লাগছিল!বিকাল বেলার সময়টাতে সে পাড়ার বন্ধুদের সংগে হাঁটতে বের হতো।আপু অফিস থকে ফেরার আগেই আবার বাসায় চলে আসতো।মা কিছু বলতো না।তাই আপুও কিছু জানতো না।সেই সুখ ও তার বেশিদিন টিকলো না।আপু তার জন্য নতুন প্রাইভেট টিচার রেখেছে।টিচার কে খুব একটা সুবিধার মনে হচ্ছে না।কেমন গম্ভীর হয়ে থাকে।প্রথম দিনই অপনয়ন অংক করতে দিয়েছে।সে সবগুলো অংকের ই উত্তর মিলিয়েছে।তারপরও তার টিচার সবগুলো অংকই কেটে দিয়েছে।কারণ সবগুলো অংকেই সে প্লাস-মাইনাস ভুল করেছে।
ঈদের আগে তার মেজো ভাইয়া ঢাকা থেকে এসেছিল। মেজো ভাইয়া যখনই বাসায় আসে সবাই কি যে খুশি হয়!মেজো ভাইয়া প্রতিবার ঢাকা থেকে আসার সময় তার জন্য কিছু না কিছু কিনে আনবেই আনবে।এবার তার জন্য নতুন ডিজাইনের এম্বুশ করা একটা গেঞ্জি কিনে এনেছে।
বড় ভাইয়াও তাকে অনেক আদর করে।বড় ভাইয়া বলেছে,তুই জে.এস.সি পাস করলে ভাইয়া তোকে একটা মোবাইল কিনে দিব।
মেজো ভাইয়া বাসায় আসার পর সবাই মিলে কি সুন্দর গল্প করে!তারও গল্প করতে ইচ্ছে করে।কিন্তু সমস্যা হচ্ছে গল্পের কোনো না কোনো এক পর্যায়ে পড়ালেখার প্রসংগ চলে আসে।আর তখনই তার চেহারাটা বাংলা পাঁচের মতো হয়ে যায়।সেজন্য এবার মেজো ভাইয়া আসার পর তাদের ড্রইং রূমের আড্ডায় সে অংশগ্রহণ করেনি।এমন কি রোযার সময় ইফতারির টেবিলেও সে কোনো শব্দ করেনি।আপু যখন বাসায় থাকে সে খুব চেষ্টা করে নিঃশব্দে চলাফেরা করার।কারণ আপু তার পায়ের শব্দ শুনলেই তাকে ডাকবে।মাঝে মাঝে আপু এমনিতেই তাকে ডেকে জিজ্ঞেস করে,বুবু তোর কিছু লাগবে?আবার মাঝে মাঝে তাকে অবাক করে বলে,বুবু কম্পিউটারে কোনো মুভি আছে নাকি দেখতো।এইতো সেদিন আপু আর সে একসংগে বসে “আমার বন্ধু রাশেদ” ছবিটি দেখেছে।
সবই ঠিক আছে।কিন্তু সব কিছুর সাথেই পড়ালেখাটা লেজের মতো লেগে আছে।অসহ্য লাগে তার।
জীবনের মনটা ভীষণ খারাপ।তার খুব কান্না পাচ্ছে।গত তিনচার দিন ধরেই তার এমন হচ্ছে।কারণ তার আপু চলে যাচ্ছে।আপুর শরীর এখন সুস্থ হয়েছে।তাই এখন থেকে আপুকে আবার শ্বশুর বাড়িতে থাকতে হবে।আপু তিনচার দিন আগে তাকে রুমে ডেকে বলল,আপু তোকে খুব বকা দিই,তাই না।তুই যে আপুকে একটুও পছন্দ করিস না,এটা আপু জানি।তারপর ও তোকে আপু পড়ালেখা নিয়ে কেন বকা দিই জানিস?দেখ সুমন আইসি.এম.এ পড়ে,রিমন ঢাকা ভার্সিটিতে পড়ে বলে সবাই ওদেরকে কত পছন্দ করে।এখন ওদের ভাই হয়ে তুই যদি জে.এস.সি ই পাস না করিস তাহলে কেউ কি তোকে ওদের মতো ভালোবাসবে?পড়ালেখা না করলে কেউ কাউকে পছন্দ করে না।একটা সময় সবাই তোকে এভয়েড করা শুরু করবে।তখন কি সেটা তোর ভালো লাগবে?
আপুকে সে খুব পছন্দ করে একথা সে আপুকে বলতে পারেনি। তবে সে ঠিক করেছে এখন থেকে সে খুব মনোযোগ দিয়ে পড়বে।জে.এস.সি পরীক্ষাটা অনেক ভালো করে দিতে হবে।তার অনেক কষ্ট হবে।কিন্তু আপু তো খুশি হবে।জে.এস.সি পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করতে পারলে সেদিন সে তার আপুকে বলবে, আপু আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি...।





অনেক দিন পর এত্ত স্বতস্ফূর্ত কোন লেখা পড়লাম। অসম্ভব ভাল লাগলো। চমত্কার।
ধন্যবাদ

অনেক সুন্দর লাগলো...
ধন্যবাদ

পড়লাম।
পড়ে জানানোর জন্য ধন্যবাদ

লেখাটার ভেতরে একদম ঢুকে পড়েছিলাম এবং চরিত্রগুলোকে চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিলাম।
ভাল লাগলো জেনে

অনেক ভয়ে ভয়ে পড়লাম... শেষে আইসা কোন অঘটন ঘটে কে জানে
...
যাউকগা সেইরম কিছু হয় নাই দেইখা স্বস্তি পাইলাম
লোখা ভাল হইছে
থ্যাংকু টুটুল ভাই
চমৎকার লেখা!
ধন্যবাদ
অনেক সুন্দর লাগলো...
ধন্যবাদ
সুন্দর গল্প।
ধন্যবাদ আপু :)

khbue shundor.... khub e touchy... mone hocchilo amr choto vai ter kotha bola hocchilo
মন্তব্য করুন