ইউজার লগইন

সাজানো ঘর

সতের বছর ধরে তিল তিল করে সাজিয়েছে সে। যেখানে যে জিনিসটি মনে ধরেছে কেনার চেষ্টা করেছে। সেই পছন্দের জিনিসটি এনে তুলেছে নিজের ঘরটিতে। এ ঘরের প্রতিটি ইট, বালু, সিমেন্টে জড়িয়ে আছে সে। তার নকশী করা কাঁথা, বিছানার চাদর, বালিশের কভার সব কিছু যেখানে সে রেখেছে সেখানেই আছে। শোকেজের কাঁচের তৈজসপত্র, আলমারিতে রাখা ভাঁজে ভাঁজে সাজানো শাড়ি, গহনা সব কিছু আছে। দেয়ালে টানানো ছবিতে কী সুন্দর হাসি। তিনপুত্র নিয়ে সাজানো ঘর। ঘরের সামনে ছোট্ট ফুলের বাগান। একটু দূরে পেয়ারা গাছ, জাম্বুরা গাছ, জলপাই গাছ সব আছে। শুধু সে মানুষটি নেই। সতের বছর আগে নতুন বউ হয়ে যে এসেছিল এ বাড়িতে। পুরনো ভাঙা ঘর দেখে সে কী বিস্ময়! বাবা কেমন করে পছন্দ করল এ বাড়ি! কিন্তু কিছুদিন থাকার পর বাড়ির প্রতিটা মানুষকে ভীষণ মনে ধরে যায় তার। সবাইকে আপন মনে হয়। এদের ছেড়ে বাবার বাড়িতে গেলে এদের জন্য মনটা বিষাদে ভরে ওঠে। এরা যে ভীষণ ভালোবাসে তাকে। এদের ভালোবাসায় রানী ভুলে যায় তার বাবার অট্টালিকা ছেড়ে ভাঙা ঘরের বউ হয়ে আসার দুঃখ। তার বাবা পছন্দ করেছিল তার বরটিকে। নিজের মেয়ের জন্য একজন ভালো মানুষ খুঁজেছিলেন পাত্র হিসেবে। ধনী ছেলে অনেক পাওয়া যায় কিন্তু যোগ্য এবং ভালো মানুষ খুব কম পাওয়া যায়। বাবার ধারণা যে মিথ্যা ছিল না কিছুদিন পরই টের পায় রানী। রানী হয়ে ওঠে তার শ্বশুরবাড়ির রানী, সবার চোখের মধ্যমনি। স্বামীর সীমিত আয়ের টাকা একটু একটু করে সঞ্চয় করে স্বামীর ভাঙা ঘরের চেহারা বদলে দেয়। বদলে দেয় ননদ-দেবরদের ভাগ্য। সবার জন্য কী ভালোবাসা। কেমন করে সবার ভালো হবে, কেমন করে ভালো থাকবে সবাই এই ভাবনাতেই কেটে গেছে রানীর সতেরটি বছর। এই সতের বছরে তিনটি ছেলে নিয়ে রানীর স্বপ্ন যেন আরও বিস্তৃত হচ্ছিল।
এখন সবই আছে। শুধু রানী নেই। দেয়ালে টানানো হাসিমাখা সেই ছবিটা এখন সবার কষ্টের সঙ্গী। রানী মারা গেছে। মাত্র তেত্রিশ বছর বয়সে এই পৃথিবীর সঙ্গে সব সম্পর্ক চুকেবুকে দিয়ে রানী চলে গেছে।
রানীর দু’বছর বয়সী ছেলেটার কী কান্না! সে মাকে চায়। বড় ছেলেটা ক্লাস নাইনে পড়ে। মেজোটা ক্লাস ফাইভে। রানীর মৃত্যুর শোকে রানীর স্বামী স্তব্ধ। রানীর সাজানো ঘরের কী হবে!
অভিমানী রানী। ভীষণ অভিমানী। অভিমান করেই ভুল সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে। তার উচিত হয়নি। কিছুতেই উচিত হয়নি।
বোকা মেয়ে জানে না সবার উপর অভিমান করা যায় না।সবাই অভিমানের মর্মার্থ বোঝে না।বেশী কষ্ট হয়েছিল ভাইয়ের উপর।এই ভাই কি সেই ভাই যে তার বোনের জন্য খুঁজে আনতে চেয়েছিল তন্ন তন্ন করে পৃথিবীর সব সুখ।সে যেদিন চলে যাচ্ছিল এ বাড়ি থেকে সম্পর্কের কঠিন ঘেরাটোপ পেরিয়ে এই ভাইই সেদিন গড়িয়ে গড়িয়ে কেঁদেছিল আমার পুতুল বোনটা ছাড়া এই বাড়িতে আর কে থাকবে? কত আদর ছিল তার!ভাই,বড় বুবু ,মেজোবুবু ,বাবা ,মা,বড় চাচা,ছোটো চাচা,এই গাছ,লতা-পাতা,সব কিছুই তাকে ভালোবাসে এমনই তো জানতো সে।কত দ্রুত বদলে যায় সম্পর্ক!
সাইনাসের সমস্যাটা দিনকে দিন বাড়ছিল।কী ভয়াবহ কষ্টে কাটে প্রতিটা দিন।ঘুমাতে পারে না।কোনো কাজ করতে পারে না।সারাক্ষণ মাথার ভেতরটাতে যন্ত্রণা হয়।ভাই যদি সেকথা বুঝতো।এক একটা দিন কষ্টের তীব্রতায় মরে যেতে ইচ্ছে করে।ভাইকে বলেছিল তার নাকের ভেতর মাংস বেড়ে যাওয়ার কারণে সাইনাসের সমস্যাটা দিনকে দিন বাড়ছে। ডাক্তার বলেছে অপারেশন করতে হবে।
ভাই কিছুক্ষণ চুপ থাকে।ভেবে দেখে এখন বোন আসা মানে বাড়তি কিছু খরচ।বাড়তি ঝামেলা।বাসায় এমনিতেই শ্বশুর পক্ষের মানুষেড় ভিড়।তার উপর আবার বাচ্চাদের পড়ালেখা। ভাই জবাব দিয়েছে এখন বাসায় ঝামেলা। বাচ্চাদের পরীক্ষা, পরে আসিস।
ভাইয়ের কথা শুনে চোখে পানি চলে আসে রানীর।প্রচণ্ড অভিমান হয় । বাচ্চার পরীক্ষার জন্য তার রোগটাকে কোনো গুরুত্বই দিল না। কী কষ্ট হয় প্রতিদিন তার।
আর তাইতো ভাইয়ের উপর রাগ করে গ্রাম্য ডাক্তার দিয়েই এত বড় একটা অপারেশন করানোর সিদ্ধান্ত নেয় সে।উচিত হয়নি। তার কিছুতেই উচিত হয়নি। রানীর ননদের বাসা ঢাকায়। কিন্তু সে ননদের বাসায় যায়নি। নিজের ভাইয়ের বাসায় না গিয়ে ননদের বাসায় গেলে ভাই রাগ করবে।ভাববে তাকে ছোটো করার জন্যই ননদের বাসায় উঠেছে বোন। আবার ননদের বাসায় যাওয়ার পর ভাই যদি রাগ করে দেখতে না যায় তাকে তাহলে তার শ্বশুরবাড়ির লোকজন ভাই সম্পর্কে খারাপ কথা বলবে। ভাইকে ছোট করতে চায়নি। আর তাইতো এত বড় ভুল সিদ্ধান্ত তার।
আচ্ছা রানী কী বুঝতে পেরেছিল সে মরে যাবে। খুব শীঘ্রই মরে যাবে। তা না হলে মেজো বোনের হাত ধরে কেন বলেছিল, আমার ছেলেদেরকে দেখিস রে বুবু।
রানী মরেছে রানীর মতোই। কাউকে কোনো কষ্ট দেয়নি, যন্ত্রণা দেয়নি। শুধু মনে অনেক অভিমান ছিল বলেই হয়তো মৃত্যুর পরও চেহারাটা ছিল খুব ম্লান। সেই ম্লান চেহারাটা যেন রানীর প্রতি ভালোবাসা আর শোকটা বাড়িয়ে দিচ্ছিল বেশি। রানীর কী কোনো কথা ছিল না। সে তো কিছু বলে যায়নি। তার প্রবাসী স্বামী যেন পাগল প্রায়। রানীর সাজানো সংসার কে দেখবে। রানী শেষের দিকে এই ঘর ছেড়ে কোথাও যেত না। কারণ তার ঘরটা দেখার কেউ নেই। তার ঘরে ময়লা জমবে, ধূলা পড়বে। এগুলো কে পরিষ্কার করবে? কে সাজিয়ে রাখবে তার ঘরটাকে ছবির মতো?
রানীর সাজানো ঘরটা দেখলে কষ্ট বেড়ে যায়। কী আশায় যে মানুষ ঘর সাজায়, কী আশায় যে মানুষ স্বপ্ন দেখে, মৃত্যুর কাছে তো সব হেরে যায়। সব পরাজিত হয়ে যায়। ভেঙে যায় সাজানো ঘর। স্বপ্নে আঁকা ছবি। জীবন এমন কেন?

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

অনিমেষ রহমান's picture


জীবন এমনি হয় হয়তো!
পড়লাম।

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


আমার ও মনে হয় জীবন হয়তো এমন ই। :( Sad Sad

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


মন খুব খুব খারাপ হয়ে গেল..

আকাশের উপরতলায় রাণীকে আল্লাহ রাণীর মতই রাখুক..

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


আকাশের উপরতলায় রাণীকে আল্লাহ রাণীর মতই রাখুক..

একই দোয়া আমিও করছি

স্বপ্নের ফেরীওয়ালা's picture


Sad

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


Sad Sad Sad

রন's picture


মাঝে মাঝে মনে হয় "জীবন এমন কেন?" Sad

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


ভাইজান,আমার ও একই কথা মনে হয়।
মাঝে মাঝে মনে হয় "জীবন এমন কেন?"
কিন্তু কেউ প্রশ্নের উত্তর দেয় না।:( Sad Sad

আরাফাত শান্ত's picture


আপসোস এই জীবনে!

১০

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


বড়ই আফসুস!!!!!!!!!Sad Sad Sad

১১

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


Sad Sad

১২

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


Sad Sad Sad

১৩

মীর's picture


কী আশায় যে মানুষ ঘর সাজায়, কী আশায় যে মানুষ স্বপ্ন দেখে

মাঝে মাঝে একেকটা লেখা পড়ে কিছুক্ষণের জন্য ব্ল্যাঙ্ক হয়ে যেতে হয়। এটা তেমনই একটা লেখা।
Star Star Star Star Star Star Star

১৪

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


আমরা যখন ঘটনার বিবরণ জেনে ব্ল্যাংক হয়ে যাই,তাহলে যার সাথে এমন ঘটনা ঘটে তার বেঁচে থাকার মধ্যে আর কতটুকু নির্যাস থাকতে পারে!!!!
সেজন্যই হয়তো প্রকৃতি তাকে কাছে টেনে নেয়।:( Sad Sad
মীর ভাই আপনাকে ধন্যবাদ।

১৫

তানবীরা's picture


এটা কি সত্যি ঘটনা? আমাদের পরিবারে এটার খুব কাছাকাছি ঘটনা ঘটেছে। ভাইবোনদের মধ্যের টাকা পয়সার ফাক অনেক দুরঘটনা ঘটায়

১৬

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


হ্যা, আপু এটা সত্যি ঘটনা।

১৭

আসমা খান's picture


জীবন এমন কেন?

১৮

মোহছেনা ঝর্ণা's picture


আমারও প্রশ্ন , জীবন এমন কেন?

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মোহছেনা ঝর্ণা's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি খুব সাধারণ একজন।জীবন নিয়ে আমার তেমন কোনো অতৃপ্তি নেই।সেদিক দিয়ে সুখী মানুষ আমাকে বলা যায়। জীবনে আমি যা চেয়ছি ,তাই পেয়েছি।তীব্রভাবে চেয়েছিলাম ভালোবাসার মানুষটিকে।সৃষ্টিকর্তা যেদিন সত্যি তাকে শুধুই আমার করে দিয়েছে সেদিন আমি রবীন্দ্রনাথের মতোই মনে মনে বলেছিলাম,আমি পাইলাম,ইহাকে আমি পাইলাম।'বন্ধু ' শব্দটি ভীষণ প্রিয় আমার।আছে কিছু প্রাণের বন্ধুও।বই পড়তে ভালো লাগে।বেড়াতে ভালো লাগে।মাঝে মাঝে মনে হয় যদি ইবনে বতুতার মতো পর্যটক হতে পারতাম! লেখালেখির প্রতি বেশ দুর্বলতা আমার।লিখিও প্রচুর।যা মনে আসে।ওগুলো আদৌ লেখা হয়ে উঠে কি না ,তা আমি জানি না। আমি যখন লিখি নিজেকে আমার মুক্ত মানুষ মনে হয়।আমার মনে হয় আমার একটা উদার আকাশ আছে।লেখালেখিটা হচ্ছে সেই উদার আকাশে নিজের ইচ্ছে মতো ডানা মেলে উড়ে যাওয়া।উড়ে যাওয়া।এবং উড়ে যাওয়া।