ইউজার লগইন

কঠিন সময় আমাদের মা-মেয়ের

আমার মেয়েটা কাঁদছে।আমি পাশের রুমে বসে আছি।হোসনা ওকে কোলে নিয়ে হেঁটে হেঁটে নানান কথা বলে যাচ্ছে।দুধের ফিডারে দুধ বানিয়ে খাওয়ানোর চেষ্টা করছে। মেয়ের সেদিকে কোনো খেয়াল নেই।সে অনবরত কেঁদেই যাচ্ছে।
তার কান্নার শব্দটা আমাকে অস্থির করে তুলছে কিন্তু আমি নিজেকে শক্ত রাখার কঠিন চেষ্টা করে যাচ্ছি।মেয়ের কান্না থামছে না।এবং ওর কান্নার আকুতিতে একটা সময় আমি খেয়াল করি আমার সারা শরীর কেঁপে কান্না চলে এসেছে।আমি অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে সংযত রাখতে পারিনি।
হোসনা যেন আমার কান্না না দেখে সেজন্য দৌড়ে আমি বাথরুমের ভেতর ঢুকে যাই।পানির ট্যাপ ছেড়ে দিই যেন কোনোভাবেই আমার কান্নার ফোঁসফোঁস শব্দে হোসনা ঘাবড়ে না যায়।
মেয়ের কান্না এতক্ষণেও থামেনি দেখে আমি চোখে মুখে পানি দিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে হোসনার কোল থেকে মেয়েকে বুকে টেনে নিই। আমার কোলে আসার সাথে সাথে মেয়ে কান্না থামিয়ে অবাক চোখে আমার দিকে তাকিয়ে থাকে।কি জানি আমার ৪মাস ১০ দিন বয়সী মেয়েটা বোধহয় বিশ্বাস করতে পারছে না তার মা তাকে কেন এত কষ্ট দিচ্ছে।মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আমার চোখ ঝাপসা হয়ে আসে।নিজেকে সামলানো বেশ কঠিন হয়ে পড়ে আমার জন্য।
আজ চার –পাঁচদিন ধরে এই কঠিন কাজটি করতে হচ্ছে আমাকে।
আর একদিন পর থেকে অফিস করতে হবে,৮ঘন্টা অফিস টাইম আর আসা-যাওয়া যানযট সহ প্রায় নয় ,সাড়ে নয় ঘন্টা টানা মেয়েটাকে না দেখে থাকতে হবে । কিন্তু কিভাবে যে থাকব কিছুই বুঝতে পারছি না।
আমি ভাল করেই জানি সব কর্মজীবী মায়েদেরই এই কঠিন বাস্তবতাকে মেনে নিয়েই চলতে হয়। সবারই নিশ্চয় একি রকম অনুভূতি হয়।জীবন এত কঠিন হওয়ার কি দরকার ছিল?এত কষ্টের যে সন্তান তাকে এমন বঞ্ছিত কেন করছি?অথচ আমার যে বিকল্প কোনো উপায়ও নাই।
কী এমন ক্ষতি হতো আমাদের কর্মক্ষেত্রে একটা ডে কেয়ার সেন্টার থাকলে? আমরা মায়েরা তো অন্তত কাজের ফাঁকে ফাঁকে নিজের বাচ্চাটাকে একটু চোখের দেখা দেখতে পারতাম,একটু বুকের দুধটা খাওয়াতে পারতাম।আমাদেরকে আর এমন করে পাষান মা হওয়ার কঠিন চেষ্টা করতে হতো না।
আগে আমার মেয়েটা ঘুমালে আমি ওর পাশে শুয়ে ওকে জড়িয়ে ধরতাম।আমি জানিনা আমার উপস্থিতি টের পেয়ে কিনা(কারণ শুনেছি শিশুরা নাকি ঘুমের মধ্যে ফেরেশতাদের সাথে হাসে) নাকি অন্য কারণে হোক ও হেসে উঠত।কী অদ্ভুত সুন্দর হাসি।ওর হাসি দেখলে আমার মনে হত সারা পৃথিবীটা হেসে উঠেছে। আর গত চার-পাঁচদিন ধরে আমার মেয়েটা ঘুমালে বিশেষ করে দিনের বেলায় ঘুমালে আমি দূর থেকে ওকে দেখি।কাছে যাই না।যেন আমার উপস্থিতি সে টের না পায়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমি হেরে যাই।আমি খুব দ্রুত দৌড়ে অন্য রুমের দরজা লাগিয়ে নিজের মুখ চেঁপে ধরি। চোখের ভেতর জমে উঠা বাষ্পকে আমি কিছুতেই দমিয়ে রাখতে পারি না।
ঘুম থেকে উঠে মেয়ে আমার কিছুক্ষণ এদিক ওদিক তাকিয়ে তারপর কান্না করে উঠে।আগে ও ঘুম থেকে উঠে কান্না করলে আমিই ছুটে গিয়ে ওকে কোলে নিতাম।গত তিন-চারদিন ধরে হোসনাকে নিতে বলি। হোসনাকে বলি ফিডারে দুধ বানিয়ে দিতে।অথচ তখন আমার বুকটা দুধের ভারে টনটন করে উঠে।আর দু’দিন পর তো মেয়েকে এসময় কোলে নিয়ে বুকের দুধ খাওয়ানো সম্ভব হবে না।তাই এখন থেকেই এই নির্মম চেষ্টা।
চেষ্টা ব্যর্থ হয়ে যায়।মেয়ে ফিডার মুখে দিতে চায় না।চিৎকার দিয়ে কাঁদে।এই কান্না সহ্য করার ক্ষমতা হয়তো কোনো মায়েরই থাকে না। আমার ও নেই।আমি মেয়েকে কোলে নিয়ে দুধ দিই মুখে।মেয়ের কান্না থামে।মাকে কাছে পেয়ে কি কি যেন বলে যায় সে। আমিও বুঝে না বুঝে নিজের মতো অনেক কথা বলে যাই।মেয়ে বুঝে কিনা কে জানে।দুধ মুখে রেখেই মাঝে মাঝে হেসে উঠে।মেয়ের হাসি দেখে সুখে আমার চোখ আবার ঝাপসা হয়ে আসে।

আমার মেয়েটার জন্য সবাই দোয়া করবেন।আমার মেয়েটা যেন ভাল থাকে,সুস্থ থাকে।

পোস্টটি ১৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


কিউট পোষ্ট
দোয়া রইলো মা মেয়ের জন্য Laughing out loud

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


মায়ের তুলনা শুধুই মা!
আপনার সুকন্যার জন্য অনেক অনেক দোয়া।

শাহাদাৎ 's picture


কঠিন বাস্তবতা!

সামছা আকিদা জাহান's picture


হা হা হা হা এমনি করেই দিন যাবে মেয়েও একদিন মা হবে Smile

মীর's picture


দোয়া করলাম। মেয়ে ভালো থাকবে, মেয়ের মা ভালো থাকবে এবং বাবাও ভালো থাকবে।

কঠিন সময়ের নতুন আপডেট দেন।

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


রাজকণ্যা আর তার মা দুজনেই অনেক অনেক ভালো থাকুক, দোয়া রইল।

জাহিদ জুয়েল's picture


শুভ কামনা রইল

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মোহছেনা ঝর্ণা's picture

নিজের সম্পর্কে

আমি খুব সাধারণ একজন।জীবন নিয়ে আমার তেমন কোনো অতৃপ্তি নেই।সেদিক দিয়ে সুখী মানুষ আমাকে বলা যায়। জীবনে আমি যা চেয়ছি ,তাই পেয়েছি।তীব্রভাবে চেয়েছিলাম ভালোবাসার মানুষটিকে।সৃষ্টিকর্তা যেদিন সত্যি তাকে শুধুই আমার করে দিয়েছে সেদিন আমি রবীন্দ্রনাথের মতোই মনে মনে বলেছিলাম,আমি পাইলাম,ইহাকে আমি পাইলাম।'বন্ধু ' শব্দটি ভীষণ প্রিয় আমার।আছে কিছু প্রাণের বন্ধুও।বই পড়তে ভালো লাগে।বেড়াতে ভালো লাগে।মাঝে মাঝে মনে হয় যদি ইবনে বতুতার মতো পর্যটক হতে পারতাম! লেখালেখির প্রতি বেশ দুর্বলতা আমার।লিখিও প্রচুর।যা মনে আসে।ওগুলো আদৌ লেখা হয়ে উঠে কি না ,তা আমি জানি না। আমি যখন লিখি নিজেকে আমার মুক্ত মানুষ মনে হয়।আমার মনে হয় আমার একটা উদার আকাশ আছে।লেখালেখিটা হচ্ছে সেই উদার আকাশে নিজের ইচ্ছে মতো ডানা মেলে উড়ে যাওয়া।উড়ে যাওয়া।এবং উড়ে যাওয়া।