মেরুদন্ডের ভিসকসিটি বা সিঁড়ি বেয়ে উঠার গল্প
আমাদের মেরুদন্ড চা'য়ে ভেজানো এনার্জি প্লাস বিস্কুট হয়ে উঠতে থাকে, আর আমরা দিন দিন বাঁকা হয়ে যাই। আমাদের পায়ের নিচে মাটি অবশ্য শক্তইতথাকে। তার উপর ইট-বালু পড়ে, পিচ কিংবা কংক্রীট ঢালাই হয়। শক্ত মাটিতে আমরা মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে থাকি। সিঁড়িবাজ মানসুর, আমাদের অর্ধতরল কশেরুকাগুলো দিয়ে তার সিঁড়ির ডেকোরেশন করে। আমরা তখন ঘেসো জমি থেকে কেলে ভুতদের শ্যাওড়া গাছ কেড়ে নিতে ব্যাস্ত থাকি।
কখনো সিঁড়িবাজ মানসুরের সাথে আমাদের দেখা হয়। তখন হয়তো সে সিঁড়ি দিয়ে নামতে থাকে। আমরাও তার সাথে গড়িয়ে গড়িয়ে নামতে থাকি। আমাদের জন্য তার পায়ে তখন অফুরান সময়। তার হাতে যখন চকলেট-ব্রাউন ওয়ালেট বের হয়ে আসে, তখন হয়তোবা আমাদের ঘাড় লম্বা হয়ে ওঠে, ছোবল উদ্যত সাপের মত। উৎসুক চোখগুলো হামলে পড়ে ওয়ালেটের এখানে সেখানে। নিপুন বীণবাদক যেমন বীণের সুরে সাপকে সম্মোহিত করে রাখে, তেমনি ওয়ালেটের দেয়ালে সাজানো বিভিন্ন ব্যাংকের সোনালী বা প্লাটিনাম তৈলচিত্রে আমরাও সম্মোহিত হয়ে পড়ি। আমাদের সহসা কঠিন ভারটেব্রা আবারো অর্ধতরল হয়ে পড়ে।
সিঁড়িবাজ মানসুরের ছুঁড়ে দেয়া উচ্ছিষ্ট নিয়ে আমরা ফিরে আসি শক্ত বা নরম মাটিতে। আর মানসুর মনোযোগ দেয় সিঁড়ি বেয়ে উঠায়। আমরা রাস্তার পাশের পিঠার দোকানে হাঁটুমুড়ে বসি, দোকানীর সাথে আলগা খাতির জমানোর চেষ্টা করি। মরিচ ভর্তা দিয়ে পিঠা খেতে খেতে শব্দ করে শ্বাস নেই। শ্বাসের সাথে মরিচের সব ঝাল টেনে নেই ভিতরে, এই ঝাল আমাদের মেরুদন্ডকে আরো খানিকটা বিষাক্ত করে। গলিত মেরুদন্ডের বিষ নিয়ে আমরা শক্ত মাটিতে দাঁড়াই। ডানপাশের খোলা দেয়ালটার সামনে গিয়ে পেশাব করি। তারপর গভীর রাতের জন্য অপেক্ষা করি। রাতের গভীরতা পর্যাপ্ত ঘণত্বে পৌঁছুলে বাঁয়ের খাল ঘেষা বাঁশের কাঠামোগুলোয় আমাদের মেরুদন্ডীয় বিষ ঢেলে দেই। বিষের কমলা সোনালী রঙ ছড়িয়ে পড়ে সারাটা বামপাশ জুড়ে। আমরা শক্ত মাটির উপর গড়িয়ে গড়িয়ে দুর থেকে আরো দূরে সরে যেতে থাকি।
আমরা বারেকের দোকানে চা খেতে যাই। আমাদের হাতে থাকে এক প্যাকেট এনার্জি প্লাস বিস্কুট। আমরা চা'য়ের কাপে বিস্কুট ডুবিয়ে তাকিয়ে থাকি বারেকের সাদা-কালো টিভির দিকে। যখন আমাদের বিস্কুটের কথা খেয়াল হয়, ততক্ষণে চা'য়ের কাপের তলায় বিস্কুটটা ঘর-বাড়ি বানিয়ে নিয়েছে। আমরা খুব উৎসাহের সাথে সেই ঘণ চা'তে চুমুক দেই। গলিত, অর্ধতরল বিস্কুটের ভেতর আমরা একটা হলেও শক্ত দানা খুঁজে পেতে চাই।
সিঁড়িবাজ মানসুর যখন সিঁড়ি বেয়ে উঠতে থাকে, তখন তার চোখকে ঘিরে থাকে সানগ্লাস। সেটা এতই গাঢ় রঙের, যে সিঁড়ির সাজসজ্জা তার চোখের কোনো অংশকেই আঘাত করতে পারে না। গাঢ় সানগ্লাস পড়ে সে আমাদের মাড়িয়ে চলে যায়। আমরা তার চকলেট-ব্রাউন ওয়ালেটের তৈলচিত্র দেখতে পাইনা। আমাদের সম্মোহন কেটে যেতে থাকে। আমরা বারেকের দোকানে ফিরে আসি। এইবেলা আমাদের হাতে এনার্জি প্লাসের প্যাকেট থাকে না। আমরা চা'য়ে সস্তার টোস্ট বিস্কুট ভিজিয়ে ডুবে যাই সাদা-কালো টিভিতে। যখন বিস্কুটের কথা মনে পড়ে, তখন সমগে স্মৃতি জুড়ে এনার্জি প্লাস। আমরা চা'য়ের কাপে চুমুক দিয়ে ঘণ তরল পাই না, বরংকিচছুটা নরম টোস্ট বিস্কুট আমাদের হাতে রয়ে যায়। অনভ্যস্ত আমরা সেই টোস্ট বিস্কুটের দিকে তাকিয়ে থাকি। মুখে পুরে চিবানোর সময় আমরা টের পাই বিস্কুটের কেন্দ্রে কিছুটা মচমচে ভাব। আমাদের বাঁকা পিঠ খানিকটা সোজা হয়ে অঠে। ওদিকে পিচ কিংবা কংক্রীটের জমিতে ফাটল ধরে।
আমরা আস্তে আস্তে চা'য়ে বিস্কুট ভিজিয়ে খাওয়া ভুলতে থাকি। আমাদের নরম পিঠ দৃঢ় হয়ে উঠতে থাকে। আমরা নরম মাটিতেও খাড়া দাঁড়িয়ে থাকি। সিঁড়িবাজ মানসুরের সাথে পাশে পাশে আমরাও সিঁড়ি বেয়ে উঠা শিখি। আমরা একদল ছেলেকে চা'য়ে এনার্জি প্লাস বিস্কুট ভিজিয়ে খাওয়া শেখাতে থাকি।
সিঁড়িবাজ মানসুর একদিন পা হড়কে সিঁড়ি থেকে পড়ে যায়। তার সিঁড়ির অর্ধতরল সাজে খাদ ঢোকে। আমরা সতর্ক হতে শিখি। সিঁড়িবাজ মানসুরের পরিণতিই আমাদের সতর্ক হয়ে উঠতে সাহায্য করে। আমরা সিঁড়ি বানানো বাদ দিয়ে লিফট তৈরীতে মনোযোগ দেই। যদিও আমরা ভিতরে ভিতরে অনুভব করতে পারি লিফটও আমাদের জন্য নিরাপদ নয়। আমরা নতুন একদল মানুষ সংগ্রহ করি। যারা চা'য়ে এনার্জি প্লাস বিস্কুট ভিজিয়ে খেলেও সেটাকে অর্ধতরল হতে দেয় না। তাদের দাঁত শক্ত বিস্কুট খাবার উপযোগী। আমরা তাদের পাশে নিয়ে লিফটে ঢুকি। কয়েকতলা পর্যন্ত তারা আমাদের সাথী হয়, তারপর আমাদের সম্মান দেখাতে লিফট থেকে নেমে দাঁড়ায়। আমরা আরো কয়েকতলা উঠে যাই। নীচের দিকে তাকিয়ে দেখি আমাদের লিফট শ্যাফট জুড়ে অনেক সিঁড়িবাজ মানসুর পড়ে রয়েছে। আমরা নির্লিপ্ত ভাবে কফিতে চুমুক দেই আর এনার্জি প্লাস বিস্কুটের প্যাকেট উড়ে বেড়ায় আমাদের ঘিরে।
_____________________________
বৃত্ত ভাঙ্গার চেষ্টা করি, বৃত্তে বন্দী থেকেই





বৃত্তবন্দী বৃত্ত ভাঙ্গার চেষ্টা করছেন, বৃত্তে বন্দী থেকেই । 'শিকল পরেই শিকল তোদের করবো রে বিকল' । কষ্ট হবে, পিছুলে চলবে না, সাফল্য একদিন আসবেই । শুভ কামনা ।
ধন্যবাদ নাজমুল ভাই...
শুভেচ্ছা, বৃত্তবন্দী।
আপনাকে দেখে ভালো লাগলো সকাল...
সিঁড়ি বাদ দিয়ে তোমরা যখন লিফটের গল্প শুরু করো(যদিও শার্প কোনো টার্ন না নিয়ে, হালকা চালেই বলো), আমরা ইদানীং খুব সতর্ক, পরিবর্তন টা ভালোর জন্যই নাও হতে পারে, বরং পূর্বেকার খোলামেলা ফাঁদ টাকে বেশ মনোহরী বেড়া দিয়ে আকর্ষনীয় করে তোলো! আগে টেনে হিঁচড়ে নিতে, এখন আমরা টিকেট কেটে ফাঁদে লাফ দেই!
আর জানোতো, আমরা জন্মাই শক্ত টোস্ট চিবানের ইচ্ছে নিয়েই, বেশ অনেক কাল চিবাই বটে, তখন যদিও আমরা ছেলেমানুষির প্রশ্রয় পাই বলে! এর পর আক্রমন হয় দাঁতে, উই ফাইট ব্যাক, আবার আক্রমন হয় দাঁতে, উই ফাইট ব্যাক এগেইন! আবার, আর এইবার, ডেন্টিস্টের ফী অনেক বেশি!
আমরা গল্প করি, এককালে কেমন করে টোস্ট বিস্কিট খেতাম, আমরা চায়ে ডুবিয়ে এ্যানার্জি প্লাস খাই, আর গল্প করি, এককালে কেমন করে টোস্ট বিস্কিট খেতাম।
(এডা একটা কমেন্ট!
)
হৈ ব্যটা। আছো কিরাম? আজকাও চায়ে ডুবায়া এনার্জি প্লাস খাইলাম

মাথার ওপর দিয়া গেছে। আমি শুধু ঘিয়ে ভাজা বিস্কিট আর টিরামিসু বিস্কিট খাই
হায়রে কবে যে আপনার মাথার লেভেলে আসতে পারমু [হতাশার ইমো হৈবে]
আপ্নেরা বড়লুক, হাতের লেখা ভালু, গাছে উঠতে পারেন; ঘিয়ে ভাজা তিরামিসু বিস্কুত আপ্নেরা খাইবেন্না তো কি আম্রা খামু?
:P
এই সিড়ি বাজ মনসুরটা কে? বহুত ঝামেলার লোকতো দেখি...
শোনো... পয়লা একটা প্লেটে এনার্জি প্লাস বিস্কিট নিবা... তার তার উপর চা ঢাইলা দিবা.. তাইলে আর এনির্জিপ্লাস বিস্কিট ভাইঙ্গা পরার সুযোগই থাকব না
... বুঝছো?
এদের কাছে শিখো কিভাবে এনার্জি প্লাস বিস্কিট খেতে হয়
সিঁড়িবাজ মানসুরের থিকা আম্রা যে বেশি ঝালেমার লুক টের্পান্নাই??? আম্রা মানসুররে ফালায়া দিয়া লিফট বানায়া ফেলি???

ভাল লাগল।
ধন্যবাদ উদরাজী ভাই...
'সিঁড়িবাজ'- আমার জন্য আরেকটি ব্লগিয় নতুন শব্দ। কত অজানারে...। গ্রাম্য কোন চায়ের দোকানে বসে শীতের সকালে চায়ের কাপে বেলা বিস্কুট ভিজিয়ে খেয়েছেন কেউ?
গ্রাম্য দোকানে খাইনাই, তবে মফস্বলের দোকানে খাইছি
জহির জহির গন্ধ পাই!
ভালো লাগছে
হু কিছুটা গন্ধতো আছেই...
বাপরে। এরম বাক্য কেমনে লেখেন?
শখত মামা কি ভুই পাইলেন?

১৬
শওকত মাসুম | ডিসেম্বর ৮, ২০১০ - ১০:০৫ অপরাহ্ন
(নতুন মন্তব্য)
বাপরে। এরম বাক্য কেমনে লেখেন?
যেমনেইলিখেন, খুব একটা খারাপ লাগেনি, ভালোই লাগলো।
ভালো লাগাতে পারায় আনন্দিত হ'লাম...
মন্তব্য করুন