হাতুড়ে গদ্য (বারেকের টিভি)
বাজারের ঠিক শেষ মাথায় বারেকের চা’র দোকানটা। মৃত্যুর দিন গুনতে থাকা বুড়ো বাবলা গাছটা দাঁড়িয়ে এতদিন ধরে কিছু মানব শিশুর বিভিন্ন উচ্চতার অত্যাচার সহ্য করে আসছিল। তার চিরল পাতার ছায়ার নাগালের ভিতরেই বারেক দোকানটা শেষ পর্যন্ত বসিয়েই ফেলল। মফস্বলের এই মৃতপ্রায় বাজারে দোকান বসানোর মত নির্বুদ্ধিতা নিয়ে বাজারের লোকেরাও বারেককে কম খোঁচায়নি, সে নিজ সিদ্ধান্তে অনড়। সাধারন চা’র দোকানগুলো যেমন হয় বারেকের দোকান তা থেকে উন্নত কিছুই না। বরং খরচ কমানোর জন্য কেরসিন স্টোভের বদলে মাটির চুলা বসিয়েছে, যেটা ধরাতে তাকে প্রতি ভোরেই নাকাল হতে হয়। তবে একটা বিশেষত্ব আছে তার দোকানে। সেটা আর কিছুই না, একটা ১৪ ইঞ্চি সাদা-কালো টিভি। যার এন্টেনাটাকে একটু কায়দা করে, পাশ দিয়ে চলে যাওয়া ডিশের তারের সাথে প্যাঁচ খাইয়ে দেয়া হয়েছে।
অলস দুপুরের বাবলার চিরল ছায়ায় হেলান দিয়ে অনেকেই বসে থাকে। এককাপ চায়ের সাথে একটা টোস্ট বা একটা বন নিয়ে মুলতঃ টিভির অনুষ্ঠানই সবাই খেতে পছন্দ করে। হয়ত কখনো কোন নায়কের রিকশা চালাতে চালাতে শিল্পপতির মেয়ের সাথে প্রেমের সম্পর্ক তাদের হাতে থাকা শুকনো বিস্কুটকে ক্রীমের নরম আবরণে ঢেকে রাখে। নয়ত কোন গানের দৃশ্য দেখে পাশে বসা জনের পিঠে থাবা দিয়ে “মাগীর দুধ দুইটা দেখছোস? শালার অক্করে গাছপাকা আমের লাহান” বলে উত্তেজনা প্রশমণের ব্যর্থ চেষ্টায় জোরে জোরে চায়ের কাপে চুমুক দেয় কেউ। এই চুমুকের সময়ই অনেকে খেয়াল করে তাদের কাপে আর তলানি ছাড়া কিছুই অবশিষ্ট নেই। ফের জমিয়ে বসে লুঙ্গির খুট থেকে কেউ কেউ বিড়ি বের করে, কেউ বের করে খুচরো টাকা।
মাঝ সকালে আসেন কিছু বয়স্ক মানুষ। তাদের কারো মুখে তৃপ্তির আলো ঝলমল করে, কারো মুখে ভরসা হারানো আঁধারের ছোঁয়া। তাঁরা বসেন, এক বা দুই কাপ চা খান। টিভিতে দেখায় মিছিল, নাটক, রাস্তায় জ্বলতে থাকা আগুন কিংবা দেখায় রাজধানীর কোনো বড় দালানে ঢুকতে বেরোতে থাকা মানুষ। বয়স্ক চা প্রেমীরা তাকিয়ে থাকেন চুলোয় জ্বলতে থাকা আগুনের দিকে। মাঝে মাঝে চোখ তুলে টিভিতে দেখাতে থাকা বিবিধ সাদাকালো আগুনের সাথে বাস্তবের রঙ্গিন আগুনকে মিলিয়ে দেখেন। কখনো কাশির দমকে বাঁকা হতে হতে বারেককে আরেকটা আদা চা’র অর্ডার দেন কেউ। কেউ বা বাবলার শরীরে, মধ্যমায় লেগে থাকা চুনের শেষাংশ মুছতে মুছতে রক্তের মত পানের পিক ছুড়ে দেন রাস্তার ধুলোর দিকে।
নানা বয়েসী শিশুরা প্রায় সারাটা দিনই আশেপাশে খেলা ধুলা করে। আর বড়দের উচ্চারিত নানান শিক্ষা জমা রাখতে থাকে মগজের বিভিন্ন কুঠুরীতে। মাঝে মাঝেই সেগুলোর সফল প্রয়োগ চলে অপেক্ষাকৃত কম শক্তির অধিকারীর উপরে। কখোনো সখোনো দোকানে আসার উপলক্ষ্য পেলে মন্ত্রমুগ্ধের মত চেয়ে থাকে সাদাকালো শিশু বা বয়স্ক লোকেদের দিকে। কচি মনে হয়তো সাদাকালো আর রঙ্গীন বাস্তবের পার্থক্য করতে পারে না। তাদের বিস্ময় হয়ত এতটুকুই যে, এত সুন্দর করে সেজে থাকা মানুষ গুলোর মুখ বা জামা-কাপড়ে আমাদের মত রঙের ছোঁয়া নেই কেন?.
সন্ধ্যায়, দোকানীরা তাদের পসরা বন্ধ করে ঘরে ফেরার আগে, পারস্পরিক বিকি-কিনির তুলনা মূলক আলোচনার জন্য আসে। আসলে প্রতক্ষ্য আলোচনার থেকে বেশি প্রাধান্য পায় চা’র সাথে সাথে টা’র বিল দেবার সময়কার পরোক্ষ লাভ-ক্ষতির বিবরণ। এখানেও স্পষ্টতঃ দু’টো শ্রেণী দেখা যায়। যাদের সামর্থ কম তারা বেশী সময় নষ্ট না করে কোনোমতে এককাপ চা খেয়ে চলে যায়। যাবার আগে অবশ্য টিভির সাদাকালো ছবির সাথে নিজেদের সাদাকালো জীবনের মিল দেখে একটু হাসির রঙ মনের ভিতর নিয়ে ঘরে ফিরে যায়। আর দ্বিতীয় শ্রেণীটা বেশ আয়েশ করে অনেক সময় নিয়ে চা খায়। সাথে টিভির সাদাকালো রঙ এর দিকে খানিকটা উপহাস নিয়েই তাকিয়ে থাকে।
রাত অনেকখানি গভীর হলে ঝলমলে গাঢ় রঙ এর জামা-কাপড় পরা কিছু মেয়ে দোকানের আশপাশ দিয়ে ঘোরাফেরা করে। তাদের কেউ কেউ এসে বসে দোকানে। তবে তারা শুধু চা’ই খায়। শুন্য দৃষ্টিতে তারা সাদাকালো টিভির মানুষ গুলোর সাথে সাথে নিজেদের কৃত্রিম রঙ্গীন সাজ আর তাদের ক্রেতাদের ভেতরের কালো চাহিদাটাকে মেলাবার ব্যর্থ চেষ্টা চালায়।
বারেক নিজে কখনো আগ্রহ নিয়ে তার সাদাকালো টিভির দিকে তাকায় না। সে বরং তার খদ্দেরদের মনের ভিতরের নানা রঙের খেলা যেভাবে মুখের পর্দায় ফুটে ওঠে তা নিয়েই মগ্ন থাকতে ভালবাসে। দোকানের ঝাঁপ নামাতে নামাতে বারেক ডাক দেয় “আয় আয়... তু তু তু”। কোথা থেকে জানি একটা কুকুর ছুটে আসে, বাসি বনরুটি গুলো সামনে নিয়ে কৃতজ্ঞতার রঙ ছড়িয়ে দেয় রাতের অন্ধকারে। দোকানের ভিতরে শুয়ে বারেক অনুভব করতে থাকে সাদাকালো জীবনে রঙের খেলা গুলো।





সাথে বিস্কিট না বন?
বুঝছি, এক কাপ আপনের আরেক কাপ ভাবির
২ হাতে ২ কাপ। হিমালয় ৭৭ স্টাইল
ভালো লাগছে আবার কারাপ লাগছে।
ভালো লাগছে, চমৎকার হাতুরে গদ্যে তুরনং আগাইতেছিল।
খারাপ লাগছে, জিনিসটা আরো বাড়তে পারতো।
বৃত্তর মধ্যে কিরম জানি তারাহুরা দেখলাম
টুটুল ভাই, জীবনটাই তো তাড়াহুড়ার
আরো বাড়াতে গেলে হয়ত খানিকটা একঘেয়েমি এসে যেতো...
তারপরও আপনার সাজেশন মাথায় থাকলো...
আপনে লোকদের চা সার্ভ কর্তেছেন, ঘটনা কি?
বারেকের দোকানে কাজ নিসি
না রবোটই বারেক
রবটাঙকেল আপনের দুকানে সাদাকালো টিভি আছে???
লেখা চমৎকার, শিরোনামও।
রোবোটনানার চাও মাশাল্লা খারাপ হয়নাই।
থেংকু নুশেরান্তি...
এপু কি আপনেরে কোনো ভিডু আর ফটুক পাঠাইসে?
না তো। এইখানেই টুটুলদার পোস্টে দেখলাম।
এপুরে ধরেন | ওর নিজের ক্যামেরায় আমি ভিডু কইরা দিসিলাম...
হা হা হা, সেইটা তো সে আমারে দিবে না বলছে
কেনু কেনু কেনু???
চমৎকার লেখা
ধন্যবাদ শাতিল...
আহা! বারেক!
ধন্যবাদ ভাস্কর দা...
একটু ভুল-টুল গুলো ধরিয়ে দেবেন???
ভুল ধরামু মানে! একটা কথাই কইতে পারি বারেকের দোকানের টুল গুলি নিশ্চিত ভাঙ্গা...
এমনে হতাশ করেন কেন??? আপনাদের লেখা দেখলে আমার মনে হয় আমার সব লেখায় হাবিজাবি হইতেসে
সেইখানে আপনেরা কি একটু সাজেশন দেবেন তা না 
আপনে মিয়া পরের মেলায় হাতুরে গদ্যের বই প্রকাশের কথা ভাবতে থাকেন...সাজেশন দিয়া শিক্ষক হওন যায়...লেখক হওন যায় না...
একটা আগাগোড়া দিনলিপির ঝরঝরে, সাবলীল বর্ননা।
পাঠ করার জন্য অনেক ধন্যবাদ...
হাতুড়ে গদ্যগুলা বলার টোনটাও কি আকইরকম রাখার সিদ্দান্ত নিছো? তাইলে কিছু কওয়ার নাই....শুধু কৈ, একই রকম ভালো হৈছে....কিন্তু একটা আলাদা টোনের কিছু দেও না...
একই রকম লাগলো? আমি তো অন্য গুলোর থেকে একটু আলাদা করতে চাইছিলাম
তোমার কথা মাথায় থাকলো, অন্য স্বাদের লেখার চেষ্টা করব অবস্যই...
এপু ভিড্যু দিতারবো না
(আমার ধারনা)... বাংলাদেশ থিক্কা এই ব্যান্ডউইথে ক্যাম্নে দিপে?
টাইম লাগপ তয় আপ তো করতারবো
কেমন জানি লাগলো...অনেকটা "শেষ কইরা দিলেন?" ভাব!
আমার এই সমস্যাটা আছে :( শেষের দিকে এসে আর ধৈর্য্য রাখতে পারি না
এখানে সবাই খাওয়া দাওয়া করছে....কিন্তু খাওয়া যেন শেষ হচ্চে না..যেমন গল্পটাও।
সব কিছু শেষ হয়ে গেলে কি চলে???
ভালো লাগলো অনেক; ভাষার কারুকাজ কম থাকায় আলফেসানীর চেয়ে বারেক রেই বেশি আপন বেশি চেনা মনে হইতেছে;
হ... তুমি তো আবার ভাষার কারুকাজ লাইক কর না
বারেকের দুকানে আইসা দেখু রোবুট নানায় চা বেঁচতাছে... দুকান আর চা দুইডাই ভাল্লাগছে... ফিউচারে চা এর লগে বিস্কিট আর বাটারবন খায়া যাওনের আশায় আছি..
আহারে কত দিন বাটারবন খাই না

শালার বয়স জিনিসটা আসলেই একটা ভেজাইল্লা আইটেম
ফু ওয়াং এর লুকজনে আমাগো কথা মনে কইরা প্যাকেটজাত বাটারবন বাইর করছে... আইজকাল প্রায়ই হাপিসের নিচের টং এ গিয়া চা দিয়া এইডা খায়া আসি... খ্রাপ না... একদিন টাইম কইরা নাবিস্কোর পিছে আয়া পড়েন খাওয়ামুনে...
...আহারে বাটার বন...আর আছিলো ক্রীমরোল...গরমের দিনে সাইয মত ধরতে না পারলে রোলের পিছন দিয়া পুচুৎ কৈরা ক্রীম বাইর হিয়া যাইতো....
পরে আবার বাইর হৈছিলো কাটার বন....ছোটো বোনে স্কুল থেইকা ফেরার পথা আইনা খাওয়াইতো....
একটা বাটারবন, একটা কলা আর এক কাপ চা....আহা
তুমি বয়া বয়া আহা আহা
করো আর আমি এট্টু আগেই এডা খায়া আইছি... একখান কলা, দুই টেকার এক প্যাকেট বিস্কুট আর চা এর লগে একখান ফু ওয়াং বাটার বন... আহা... 
ফুং এর বাটারবন কুনু বাটারবন হৈলো??? আসল বাতার্বনের অমৃতের মত স্বাদ কি ফুং বাটারবনে আছে???
তুমারে তীব্র মাইনাস
আমার বাটারবন খাইতে ইচ্ছা করতেসে 
একবার টানা ছয়মাস তিন বেলা বাটার বন আর চা খাইয়া কাটাইছি...তারপরেও বাটার বন অমৃত সম। তখন খাইতাম এনার্জি আর কার্ব-এর সম্মিলিত খাবার হিসাবে। এখন খাই ঐ সময়ের স্মৃতিস্বরূপ।
আহা স্মৃতি...
লাইক্কর্লাম। সুন্দর লেখা অতি মনোরম
থেংকু থেংকু...
মাঝে বেশকিছুদিন হওয়া হয়ে গেছিলেন মনে হয়?
মন্তব্য করুন