ইউজার লগইন

ব্লগার রাসেল পারভেজের সাক্ষাৎকার (প্রসঙ্গ শাহবাগ আন্দোলন)

ব্লগার রাসেল পারভেজ মারা গেলেন ১৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২০। তার সঙ্গে আমার ২০১৩ সালের নভেম্বর মাসে দীর্ঘ আলাপ হয়। শাহবাগের ওপর গবেষণা কাজ করতে গিয়ে তার একটি দীর্ঘ সাক্ষাৎকার নেওয়ার সুযোগ হয় সেসময়। সেই সাক্ষাৎকারের একটি অংশ প্রকাশ পায় ‘শাহবাগের জনতা’ গ্রন্থে (২০১৫)। সেই অংশটিই পুনপ্রকাশিত করলাম ব্লগে।
তার সাক্ষাৎকারের দ্বিতীয় অংশ অপ্রকাশিত। কথা ছিল দীর্ঘ সময় পর সেটি প্রকাশ করার। অপ্রকাশিত অংশটি নিশ্চয় প্রকাশ করবো কোনো একদিন।

প্রশ্ন: শাহবাগ আন্দোলনটা যে ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারির ৫ তারিখ শুরু হলো,এখানে আপনার যুক্ত হওয়াটা কীভাবে হলো?

রাসেল পারভেজ: পাঁচ তারিখ হরতাল ছিল। তো ঘুম থেকে উঠলাম,উঠে দেখলাম কাদের মোল্লার ফাঁসি হয়নি। কাদের মোল্লার ফাঁসি না হওয়ার পরে প্রতিক্রিয়া তো একটা ছিল। প্রতিক্রিয়াটা কনফিউজড অবস্থায় ছিল। কনফিউশন ছিল কারণ আমার প্রথম থেকেই মনে হচ্ছিল ট্রাইব্যুনালের যে কিছু দুর্বলতা আছে;সো কাদের মোল্লাকে সম্ভবত সেজন্য ফাঁসি দেওয়া হয়নি। তখনও আমি সংবাদ পড়িনি। সে সময় আরেক ব্লগার আরিফ জেবতিকের সাথে কথা হলো আমার। জেবতিককে আমি বললাম আমার অনুভূতি যে,সম্ভবত কাদের মোল্লার কেইসে এমন কিছু ঘটে গেছে যে আদালত (ট্রাইব্যুনাল) মনে করছে যে কাদের মোল্লার যে অপরাধ করছে সেটা সুপ্রিমকোর্টে তারা বহাল রাখতে পারবে না সেজন্য কোনো একটা শাস্তি দিয়ে ফেলছে।

পরে দেখা গেলো আদালত (ট্রাইব্যুনাল) বলছে যে সবকটি অপরাধ তারা সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণ করতে পারছে। তারপরে তো আর কিছু করার ছিল না। কারণ তখনও ওই কনফিউশনটা ছিল যে আসলে আমরা কী প্রতিক্রিয়া দেখাবো। কারণ আদালতের রায়ের বিরোধিতা করার গ্রাউন্ড থাকতে হয়। সেরকম কোনও গ্রাউন্ড ছিল না।

তখনও যেহেতু রায়ের কপি পাওয়া যায়নি অনলাইনে, সেহেতু সরাসরি কোনো একটা সিদ্ধান্তে চলে যাওয়া যে অবিচার হয়েছে ন্যায়বিচার হয়নি– এরকম কোনও পরিস্থিতিতে যাওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। তারপর দেখা গেলো বাঁধন প্রথমে কিছু একটার ডাক দিয়েছে।

তারপর দেখা গেলো ফোরাম একটা ডাকছে পরের দিন। এই পরিস্থিতিতে আমি গেলাম ইউনিভার্সিটিতে। আমি গেলাম মূলত ছাত্র ইউনিয়ন একটা মশাল মিছিলের আয়োজন করেছিলো। পাঁচ তারিখ বিকালে। সেখানে গেলাম। সেখানে যাওয়ার পরে আর ফোরামের ওখানে যাওয়া হয়নি। আমি সেখান থেকে সোজা বই মেলায় গিয়েছি। বইমেলা থেকে ফিরে দেখলাম শাহবাগের মোড়ে লোকজন বসে আছে, তো আমি আর শাহবাগের মোড়ে বসিনি। আমি সরাসরি বাসায় চলে এসেছি। আমি বাসায় এসে শুনলাম শাহবাগের মোড়ে লোকজন বসে আছে। এই-তো! ছয় তারিখের আগে একমাত্র মশাল মিছিল ছাড়া আমি সেভাবে যুক্ত হইনি।

প্রশ্ন: ফেসবুকে একটা গ্রুপ খোলা হয়। কাদের মোল্লার রায়ের পরপর, মানে পাঁচ তারিখ বিকালে। আপনি কি সেই গ্রুপটা তখন দেখেছিলেন?

রাসেল পারভেজ:
কাদের মোল্লার রায়ের পর বাঁধনের (বাঁধন স্বপ্নকথক) একটা ইনভাইটেশান ছিল। আর ফোরামের পেইজ থেকে একটা ছিল। ফোরামেরটা ছিল ছয় তারিখ বিকালে। আর বাঁধনেরটা ছিল একেবারে তাৎক্ষণিক, ওটা আমি দেখেছি। কিন্তু মনে নেই যে ‘গোয়িং’ দিয়েছিলাম নাকি দেইনি। দেখলে বলতে পারবো। আমার নজরে আসছিল। আর যারা যাচ্ছিল তাদের অনেককে আমি চিনতাম।

প্রশ্ন: আপনি কি নিয়মিত যাতায়াত করতেন শাহবাগে? ছয় তারিখের পর থেকে কি আপনার নিয়মিত যাতায়াত ছিল?

রাসেল পারভেজ: ছয় তারিখ থেকে মার্চের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত প্রায় নিয়মিত।

প্রশ্ন: এই যাতায়াতে কী সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো ইনফ্লুয়েন্স ছিল? যেমন ধরুন, মানুষজন যাচ্ছে, ছবি আপলোড করছে এসব কিছু কি কোনো প্রভাবক হিসেবে কাজ করেছে যাওয়ার পেছনে?

রাসেল পারভেজ: আলাদাভাবে ওইরকম কোনো ইনফ্লুয়েন্স ছিল না। আমার যাওয়ার কারণটা আসলে ব্যক্তিগত উৎসাহ থেকেই। আরেকটি কারণ ছিল যে, এখানে এক ধরনের আশার একটা জায়গা ছিল। এই আন্দোলন কিছুটা পরিবর্তন আনতে পারে। যেহেতু দীর্ঘদিন ধরে আমরা বেশকিছু দাবি নিয়ে অনলাইনে লেখালেখি করেছি। আমার মনে হয়েছে যে এখানে অংশগ্রহণটা বজায় রেখে যদি কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তনের দিকে যাওয়া যায়। এছাড়া কিছু ভূমিকা সোশ্যাল মিডিয়ার থাকতে পারে।

অ্যাক্টিভিজমের জায়গা থেকেও বড় জায়গা ছিল দায়িত্ব নিয়ে অংশগ্রহণ করা কিংবা পুরো বিষয়টাকে একটা শেপ দেওয়া। তখন আসলে অধিকাংশ সময় আমি এই বিষয়টা নিয়েই লেখালেখি করেছি। অংশগ্রহণও অনেক বেশি ছিল। নিজের লেখা,নিজের ভাবনা,নিজের একটা বিশ্লেষণ।

যদি আমরা ১৫ (ফেব্রুয়ারি) তারিখ পর্যন্ত আন্দোলনের প্রথম ধাপ ধরে নেই। তাহলে তখন পর্যন্ত বিষয়টা ছিল বিচারের দাবি আদায় কেন্দ্রীক অর্থাৎ আন্দোলনকে এমন একটা জায়গায় নিয়ে যাওয়া যাতে বিচারের দাবিটা আদায় হয়। আন্দোলনের দ্বিতীয় ধাপে এসে রাজীব হত্যার পর থেকে বিষয়টা ছিল সবার অংশগ্রহণ আরও নিশ্চিত করা। রাজীব মারা যাওয়ার পর থেকে আমাদের সবার চেষ্টা ছিল ব্লগারদের মধ্যে এবং ফেসবুকারদের মধ্যে যেসব ব্যক্তিগত ঝুট ঝামেলা ছিল সেগুলো যেন মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে। মানে হচ্ছে সবাইকে একসঙ্গে রাখা। এই দুই জায়গার বাহিরে অন্য কোনো অংশগ্রহণ আসলে আমার নেই।

প্রশ্ন: আরেকটি বিষয় যে,পাঁচ তারিখ সবাই শাহবাগ গেলো এবং এক পর্যায়ে সবাই রাস্তাও দখল করে নিলো। আপনার কী মনে হয়, এটি কী পূর্ব পরিকল্পিত ছিল নাকি হুট করে একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে আমরা শাহবাগ ছাড়বো না।

রাসেল পারভেজ: যারা যারা পাঁচ তারিখে শাহবাগে ছিল তাদের অনেকের সঙ্গেই পরবর্তীতে আমার কথা হয়েছে। আমার মনে হয় না যে সিদ্ধান্ত শাহবাগ দখলের ছিল। প্রাথমিকভাবে– আচ্ছা ঠিকাছে কিছুক্ষণের জন্য বসে থাকা যায়। শাহবাগে ওরা বসেছে পাঁচটা থেকে সাড়ে পাঁচটার দিকে। আমি দেখেছি সাতটার দিকে। দেখলাম ওরা মোমবাতি জ্বালিয়ে বসে আছে। খুব বেশি হলে দুই থেকে তিনশ লোক ছিল, এর বেশি তখনও নজরে আসেনি। তখন অনেকের সাথে কথা বলে মনে হয়েছে যে এটা পূর্ব পরিকল্পিত ছিল না। একদল মানুষ হঠাৎ করে সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে তারা শাহবাগে বসবে। তারপর তারা বিষয়টাতে আনন্দ পেয়েছে,আরও অনেক ঘটনা একসাথে ঘটেছে, মানে মোর অর লেস এটা এক ধরনের ক্ষমতার ভারসাম্যের জায়গা ছিল। ক্ষমতার ভারসাম্যের জায়গা বলতে,বোয়ান এবং তাদের সঙ্গে আরও কিছু সোশ্যাল অ্যাকটিভিস্ট যারা বসলো তাদের সাথে যখন পুলিশ আসলো, পুলিশ তখন কন্ট্রোল করেছিল জায়গাটা। তখন এখান থেকে ছাত্র ইউনিয়নকে ডাকা হয়েছিল। ছাত্র ইউনিয়ন কিংবা গণতান্ত্রিক ছাত্র ঐক্য তখন মশাল মিছিল করছিল।

তো তাদের ডাকা হলো- আপনারা আসেন। ওরা মশাল মিছিল নিয়ে বাংলামোটর গিয়েছিল। মিছিল নিয়ে ফেরার পথে ওরা এখানে বসেছে। তারপর সেখানে আসছে উদীচীর লোকজন। আটটা থেকে দশটার দিকে যখন লোকজন বাড়ছে তখন সেখানে মূলত বামপন্থীদের প্রাধান্য বেশি।

বোয়ান সাধারণত অনলাইনে যারা আওয়ামী লীগের আদর্শে বিশ্বাস করে এ ধরনের কিছু লোকের সংগঠন। তারা একেবারে আউট নাম্বার্ড হয়ে গেলো। বামপন্থী দুইটা সংগঠন যখন একসঙ্গে ইন করলো তখন তাদের ধারণা ছিল আন্দোলনটা তাহলে বামপন্থীরা ডমিনেট করবে।

বামপন্থীরা যদি ডমিনেট করে তাহলে তাদের ভয় ছিল তারা হয়তো যা চাচ্ছে তা পাবে না। তবে তারা কী চাচ্ছিল? এমন প্রশ্নের উত্তর তখনও জানা ছিল না। সে কারণে তারা ছাত্রলীগকে ফোন করে নিয়ে আসলো। ছাত্রলীগের নাজমুল সোহাগ যখন দশটার দিকে মিছিল করে এখানে ঢুকলো এবং একই সঙ্গে যখন এটা বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে যাওয়া শুরু করলো। তো মোটকথা হচ্ছে, প্রথম যারা সংগঠক ছিলেন তাদের সংখ্যালঘু হওয়ার ঝুঁকি এবং দ্বিতীয়ত মিডিয়া হঠাৎ করে এটাকে পিক করে নেওয়া! এই দুটো একসাথে না ঘটলে হয়তো শাহবাগের মোড় থেকে রাত দশটার পরে লোকজন চলে যেত। শুরুর ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু হয়ে যাওয়ার ভয় আর মিডিয়ার ইন্ধন ছাড়া অন্য কোনো কারণ ছিল না।

প্রশ্ন: এই আন্দোলন শুরু হওয়ার পর থেকে রাজনীতির প্রভাব কেমন ছিল? এ সম্পর্কে আপনার কোনো অবজারভেশন আছে?

রাসেল পারভেজ: এখানে দুই ধরনের ব্যাপার আছে। আমি যা জানি, যা দেখেছি এবং যা শুনেছি। সেগুলোই আপনাকে বলছি। ছ’তারিখ সকাল ১১টা পর্যন্ত এটা ছিল বামপন্থীদের দখলে। পরের দিন সকালে দেখলো বিশাল ক্রাউড সৃষ্টি হচ্ছে। মিডিয়া আসা শুরু করেছে। লাইভ হচ্ছে।

হরতালের দিন গোটা ঢাকার লোকজন বুঝল এখানে না আসলে কিছু হবে না। তাই দলে দলে লোকজন শাহবাগে আসা শুরু করেছে। সেই মুহূর্তে শাহবাগে আসলে প্রচলিত রাজনৈতিক দলের তেমন কোনো প্রভাব ছিল না। স্লোগান দিচ্ছিল বামদলের লোকজন। সাধারণভাবে সকল রাজনৈতিক মতবাদের লোকজন সেখানে ঢুকে পড়েছিল।

আলাদাভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতবাদের লোকজন ছিল কিন্তু আলাদা করে কেউ শাহবাগ মোড়টাকে দখল করতে পারেনি। শোনার জায়গা থেকে বললে, শাহবাগ মোড়ে যেহেতু কোনো রাজনৈতিক দলের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কিন্তু, কোনো না কোনোভাবে অংশগ্রহণ করেছিল।

মানে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়া লোকজন থেকে ধর্ম মানে না এমন লোকজন; মানে মৌলবাদী ধার্মিক থেকে শুরু করে মৌলবাদী নাস্তিক পর্যন্ত পুরো অংশটুকুই এখানে অংশ নিয়েছে। এই অংশগ্রহণের জায়গা থেকে আলাদা আলাদা করে কেউ মিডিয়ার সামনে আসেনি। মিডিয়ার সামনে আসা শুরু করলো বোয়ানের লোকজন।

তারাই এই আন্দোলনের বক্তব্যদাতা হয়ে দাঁড়ালো। মানে তারা যা বলবে তাই আসলে শাহবাগ করছে এমন। যদিও আলাদা করে শাহবাগে তৃতীয় দিন থেকে ১০-১২টা কেন্দ্রই ছিল। তবে মিডিয়া যেহেতু মাঝখানটাতে ফোকাস করেছিলো তাই ইমরানরাই আসলে পুরো আলোটা পেলো। তাদের সাথে আওয়ামী লীগের আদর্শের যোগাযোগ ছিল। তাই আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে বিভিন্ন লোক তাদের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে।

আওয়ামী লীগের ইনার কনফ্লিক্টিং প্রত্যেকটা জায়গা থেকেই ইমরানদেরকে ম্যাসেজ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছে। ৮ তারিখের পর থেকে নাসিরুদ্দিন ইউসুফ বাচ্চু এসেছেন বোয়ানের প্রতিনিধি হিসেবে। তবে আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণ আওয়ামী লীগ করেছে এটা বলা যাবে না। এই আন্দোলনের কর্মসূচি নির্ধারণ করার মতো রাজনৈতিক প্রস্তুতি আওয়ামী লীগের ছিল না।

আওয়ামী লীগ যে মাত্রার রাজনীতি করে তার চেয়ে অনেক উপরের মাত্রার রাজনীতি ছিল শাহবাগ। আওয়ামী লীগ হয়তো শেষ পর্যন্ত এটাকে বিভিন্ন কৌশলে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করেছে। কিন্তু আওয়ামী লীগ এটাকে রাজনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেনি। তারপরও শাহবাগ যে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে এই বিষয়ে তারা নিশ্চিত ছিল। এটি অবশ্য আওয়ামী লীগের সাফল্য আর আন্দোলনের ব্যর্থতা বলে আমার মনে হয়। এটার যে স্বতঃস্ফূর্ত সরকার বিরোধী অবস্থান ছিল বা প্রচলিত সমাজবিরোধী অবস্থান ছিল সেই অবস্থানকে স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হতে না দিয়ে এক ধরনের জোর করে একটা নির্দিষ্ট লক্ষ্যে পরিচালনাটা আন্দোলনের এক ধরনের ব্যর্থতা ছিল।

প্রশ্ন: আট ফেব্রুয়ারি যে প্রথম মহাসমাবেশ দেখেছি। সেখানে বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতারা বক্তৃতা দিয়েছে। বলতে হয়, ওইদিন থেকেই সাধারণ মানুষের ধারণা হয়– শাহবাগ রাজনীতিকরণ হয়ে গেছে।

রাসেল পারভেজ: আমার ধারণা হচ্ছে,বোয়ানের আসলে আন্দোলন পরিচালনায় দক্ষ ছিল না। এটাই স্বাভাবিক। তারা ব্লগে লিখে দক্ষ। রাজপথে আন্দোলনে দক্ষ হওয়ার কথাও না। তারা যখন দেখলো তাদের ঘাড়ে প্রতিদিন মানুষের চাপ বাড়ছে। প্রথমদিন সকালে ১০ হাজার থাকলে সেটা বিকালে ২০ হাজার হয়েছে এভাবে প্রতি মুহূর্তে মানুষের চাপ বাড়ছে। ৭ তারিখে মোটামুটি ৪০-৫০ হাজার লোক শাহবাগে আসছে-যাচ্ছে। এত মানুষের ভার বহন করার ক্ষমতা আসলে তাদের ছিল না। আরেকটা বিষয় হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এমন একটা আন্দোলন হচ্ছে যা গোটা দেশকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে। সেখানে ঢাকা ভার্সিটির ছাত্র সংগঠনগুলোকে ডেকে নিয়ে আসা হবে না? তাদের সমর্থন ও সহযোগিতা ছাড়া তো আসলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় এই আন্দোলনটা করা সম্ভব হতো না বলে আমার মনে হয়।

আট তারিখে রাজনৈতিক নেতাদের বক্তব্য শুনে আমার যা মনে হয়েছে তা হলো, অনলাইনে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের বিষয়ে যারা লেখালেখি করতো তাদের মধ্যে যেরকম চেতনা ছিল, যারা আসলে মাঠপর্যায়ে রাজনীতি করে তাদের মধ্যে তেমনটা ছিল না।
তবে সর্বদলীয় আকার পেয়েছে। যেহেতু ফ্রন্ট,ছাত্র ফোরাম, আওয়ামী লীগসহ অনেকেই যোগ দিল। তারমানে শাহবাগ এখন সর্বদলীয়। শুধু পাশে নেই বিএনপি। যেমন এখানে প্রতিটি সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি যেহেতু বক্তৃতা করেছে আমার ধারণা আট তারিখে যখন তারা বক্তব্য দিতে আসে সে পর্যন্ত তারা আসলে এই আন্দোলনের দাবি কী বা এই আন্দোলন কীভাবে সংঘঠিত হয়েছে এই বিষয়ে নিজেদের মধ্যে আলোচনা ছিল না। কারণ তাদের কারও বক্তব্যের সাথে অন্য কারও বক্তব্যের মিল ছিল না।

একটা জায়গা বাদ দিলে পরে এই আন্দোলনকে নিয়ন্ত্রণ করার ক্ষমতা কারও ছিল না। বরং এটা তাদের জীবনে একটা সুযোগ তৈরি করেছে যা হয়তো জীবনে আর কখনো পাবে না। এই সমাবেশে এরকম দুই লক্ষাধিক মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে কোনো কথা বলতে পারার ক্ষমতা আমার ধারণা ওখানে যারা বক্তৃতা দিয়েছে তাদের ভবিষ্যতে আর হবে না।

রাজনৈতিক সেসব নেতা মানে ছাত্রনেতা যারা সেদিন বক্তৃতা দিয়েছে তাদের জীবনের সবচাইতে বড় অর্জন শাহবাগে দাঁড়িয়ে দুই লক্ষ মানুষের সামনে কিছু কথা বলতে পারা। এমনটাই আমার মনে হয়। এটাই তাদের রাজনৈতিক জীবনের সবচাইতে বড় পিক পয়েন্ট হিসেবে থাকবে। সুতরাং শাহবাগ যে আকার পেয়েছিল তাতে বলা যায় না যে এটা রাজনীতির কাছে বিক্রি তখনো হয়েছে।

প্রশ্ন: আন্দোলন চলাকালীন সময়ে আমরা দেখেছি বিভিন্ন লজিস্টিক সাপোর্ট- যেমন মোবাইল টয়লেট, বিভিন্ন খাবার সরবরাহ হয়েছে। এগুলো নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক হয়েছে তখন। সরকার তো শাহবাগকে সাপোর্ট করছিল। এজন্য শাহবাগে নিরাপত্তাও নিশ্চিত করা হয়। ভেতরে সমস্ত সুযোগ সুবিধা দেওয়া হয়েছিলো। একটা আন্দোলন কী এতো সুযোগ-সবিধা দিয়ে পরিচালিত হতে পারে?

রাসেল পারভেজ: মোবাইল টয়লেটের কাজটা ছিল আসলে সিটি করপোরেশানের। এটা অনেকটা যৌক্তিক। আন্দোলনের পিক সময়ের কথা বলি যেমন ২১ ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত সারাদিনই ৪০-৫০ হাজার লোকজন যাতায়াত করেছে। ২০ হাজার তো কনস্ট্যান্ট উপস্থিত ছিল।

ঢাকা ভার্সিটির যেসব অবকাঠামো ছিল। ইন টার্মস অব সেনিটারি অপশনস,পানির অপশন এসবের ক্ষেত্রে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েরই বাজে অবস্থা। তো সেখানে সামান্য জায়গায় যাদুঘর থেকে শুরু করে টিএসসি পর্যন্ত জায়গাটিতে এত বেশি মানুষকে এসব সেবা দেওয়ার মতো কোনো জায়গা ছিল না। তো এরা কী করতো? এতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান নোংরা হতো। সেখানে সিটি করপোরেশান নিজ দায়িত্বে এসেছে। খুব ভালো কাজ করেছে। রাস্তা পরিচ্ছন্ন করেছে।

পুলিশ প্রোটেকশান এসেছে সরকারের ভয় থেকে। যেহেতু এই তরুণদের সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারছিলো না। তাদের মনে হয়েছে এখানে কোনোভাবে যদি কেউ আক্রমণ করে। তাহলে সারাদেশের তরুণদের পুরো ক্ষোভটাই যাবে সরকারের বিরুদ্ধে। তো সরকার বুঝতে পেরেছিল এই তরুণদের ওপর কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই এবং তারা যাদের ওপর ভরসা করে আছে তাদেরও নাই। তাই সরকার চেয়েছে তরুণরা যাতে কোনোভাবেই ক্ষুব্ধ না হয়।

আমি বলতে পারি, সেই সময়টাতে মানে ফ্রেব্রুয়ারির ৭ থেকে ২১ তারিখ পর্যন্ত লোডশেডিংয়ের পরিমাণও কমে গিয়েছিল। সেই সাথে অপরাধ খুব কম হয়েছে। সরকার আসলে ভয় পেয়েছিল যে এতগুলো তরুণ যেকোনো সময়ে যেকোনো ইস্যুতে ক্ষুব্ধ হয়ে যেতে পারে। তাই সরকার ঝুঁকি নিতে চায়নি।

প্রশ্ন: শাহবাগ আন্দোলনে মিডিয়ার ভূমিকা কেমন ছিল? আপনার কি এমন মনে হয়েছে যে মিডিয়া বায়াজড ছিল পুরো সময় জুড়ে।

রাসেল পারভেজ: বাস্তবতা হলো, শাহবাগ যতটা ব্লগাররা তৈরি করেছে তার চেয়ে বেশি মিডিয়ার তৈরি। মিডিয়ার প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় ফুলে ফেঁপে বড় হওয়া একটা আন্দোলন। প্রাথমিক পর্যায়ে আন্দোলন যেখানে ছিল সেখানে হাইলাইট হওয়ার মতো কিছু ছিল না। কিন্তু মিডিয়ার সহযোগিতায়, আমি তো বলবো শাহবাগকে মিডিয়া অনেক স্নেহের দৃষ্টিতে দেখেছে।

যদিও মিডিয়া এটাকে সোশ্যাল মিডিয়ার অবদান বলছে। যখন ফেসবুকে ইভেন্ট খুলে কিছু একটা করার আহ্বান জানানো হলো, ঠিক ওই জায়গাতেই সোশ্যাল মিডিয়ার কাজ শেষ। তার ভূমিকা ওখানে শেষ। এরপর শাহবাগ যে পর্যায়ে গেছে সেখানে সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা ছিল না। পরবর্তীতে মিডিয়া এটাকে শেপ দিয়েছে। মিডিয়ার ১০০ ভাগ সহযোগিতা পেয়েছে শাহবাগ। যা আরব বসন্তে দেখা যায়নি। তবে কট্টর বিএনপি ও জামায়াতের সমর্থক মিডিয়া হাউজগুলো শাহবাগকে বিতর্কিত করার সব আয়োজনই করে রেখেছিল।

প্রশ্ন: এবার একটু রাজীব হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে কথা বলবো। রাজীবকে যে রাতে হত্যা করা হলো সেই রাত থেকেই দেখা গেলো আন্দোলনে একটা নতুন বাঁক আসল। পরদিন দেখলাম আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী গেলেন রাজীবের বাসায়। আবার পরবর্তীতে রাজীবকে নিয়ে নানান ধরনের প্রপাগান্ডা ছড়ানো হলো। এরপরই আন্দোলনে আস্তিক-নাস্তিক বিতর্ক শুরু হলো। একটা বিভক্তি আসলো। এইসব ঘটনার মধ্যে কী কোনো ভুল দেখতে পান?

রাসেল পারভেজ: রাজীবের হত্যাকাণ্ডের বিষয়টা খুবই দুঃখজনক একটা বিষয়। কিন্তু সে সময়ে সমান্তরালে অনেকগুলো ঘটনা ঘটেছে। ১৫ ফেব্রুয়ারি যেদিন ঘটনাটা ঘটলো সেদিনই এক ধরনের আন্দোলনের কর্মসূচিতে পরিবর্তন হলো। তো এটা আগে থেকেই ধারণা করা হচ্ছিলো আন্দোলনের কর্মসূচিতে একটা পরিবর্তন আসবে। কিন্তু এরকম আচমকা যে আন্দোলনের কর্মসূচিটা তিনটা থেকে দশটা পর্যন্ত করা হলো সেটা কেউ মেনে নেয়নি। দশটার দিকে রাজীবের মৃত্যুর সংবাদ আসার পরে আমাদের ধারণা ছিল এটা খুব হিসাব করে একটা হত্যা।

তখন যেহেতু একমাত্র বিরোধীপক্ষ হিসেবে যখন জামায়াত দাঁড়িয়ে ছিল তখন সবার ধারণা ছিল জামায়াতই এই কাজটি করেছে। এখন জামায়াতের সহিংসতা নিয়ে আমরা সবসময় সোচ্চার ছিলাম। সেই জায়গা থেকে আন্দোলন আরও বেগবান হয়েছে। আর আওয়ামী লীগ যেহেতু সবসময় তরুণদের সাথে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল তাই প্রধানমন্ত্রী তাৎক্ষণিক পর্যালোচনা করে দেখেছেন যে তরুণদের সাথে থাকার এই সুযোগ তার হারানো উচিত হবে না। এছাড়াও পরের দিন প্রধানমন্ত্রীর পুত্র জয়ও উপস্থিত ছিল জানাযায়। প্রধানমন্ত্রী কখনই তরুণদের কাঁধছাড়া হতে চায়নি। তাদের সাথে থাকার চেষ্টা করেছেন। সেই চেষ্টা থেকেই তিনি রাজীবের বাসায় গেছেন। রাজীবের হত্যাকারীদের খুব দ্রুত ধরার ঘোষণা দিয়েছেন।

এখন ওই সময়টাতে তাৎক্ষণিকভাবে যতটুকু তথ্যে যেসকল কর্মসূচি নেওয়া যায় সেগুলোই নেওয়া হয়েছে। নিন্দা জানানো হয়েছে, বিচারের দাবি জানানো হয়েছে, রাজীবের জানাযা করা হয়েছে এখানে।

ওই সময়ের প্রেক্ষিতে এগুলোকে রাজনৈতিক ভুল পদক্ষেপ মনে হয়নি। আমার ধারণা রাজীবের খুব ঘনিষ্ঠ মানুষজন ছাড়া অধিকাংশেরই আসলে তার লেখার বিষয়ে তেমন কোনো ধারণা ছিল না। যখন জানা গেলো রাজীব আসলে এভাবে লিখে অভ্যস্ত। তখন এটা আওয়ামী লীগের জন্য অবশ্যই বিব্রতকর ছিল।

আওয়ামী লীগ এবং বিভিন্ন মিডিয়ায় তারা চেষ্টা করেছে– সেসব রাজীবের লেখা না, এরকম বিষয় প্রতিষ্ঠা করতে। এটাও এক ধরনের ডিলেমা বলা যায়। যেহেতু আমাদের রাজনীতিতে এ ধরনের নাস্তিকদের বিচার চাওয়া যাবে না। এমন ধারণা প্রতিষ্ঠিত বা প্রচলিত রাজনৈতিক নেতারা এমন ধারণা পোষণ করেন তাই পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ মনে করেছে এটা তাদের একটা বড় ধরনের ভুল হয়েছে। কিন্তু এটা তো আসলে ভুল ছিল না।

তরুণরাও যেহেতু রাজীবের লেখার সাথে পরিচিত ছিল না তাই তারাও একজন আন্দোলনকারীর মৃত্যু হিসেবেই বিষয়টা দেখেছে। প্রতিবাদ করেছে। ‘আমার দেশ’ পত্রিকা বা অনলাইনে যারা অন্দোলনের বিরোধিতা করছিল তারা যেভাবে রাজীবের লেখাগুলোকে হাইলাইট করার চেষ্টা করেছে, তাতে বিষয়টা দাঁড়াচ্ছিল যে রাজীবকে হত্যা করা সঠিক হয়েছে। আর যেভাবে বিষয়টা কলুষিত করার চেষ্টা করেছে যেখানে দাঁড়িয়ে শাহবাগও এক সময় মনে করতে শুরু করলো তারাও মনে হয় বিশাল বড় একটা ভুল করলো। এরপর শাহবাগ প্রমাণ করার চেষ্টা করলো তারা আসলে নাস্তিক না। তারা ধার্মিক। তারা ধর্মকে শ্রদ্ধা করে।

প্রশ্ন: মিডিয়া হিসেবে আমার দেশের ভূমিকাকে আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করেন?

রাসেল পারভেজ: এই ধরনের উগ্র পত্রিকা আসলে সব দেশেই আছে। কিন্তু সময়ের সাথে সব দেশেই একটা সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে যে গণমাধ্যম কখনো খুব বেশি ঘৃণা কিংবা উসকানি ছড়ায় না। আমার দেশ সম্পূর্ণ সময়টাতেই এমন একটা অবস্থান নিলো। তারা সবসময়েই ডানপন্থী রাজনীতির সমর্থক ছিল। দুঃখজক বাস্তবতা হলো মুক্তিযুদ্ধের সময় যারা এধরনের অপরাধ করেছে বা যারা এখন মানবতাবিরোধী বিচারে দণ্ডিত হচ্ছে তারা সবাই উগ্র ডানপন্থী। তাই পত্রিকাটি রাজনৈতিক কৌশলের কারণে শুরু থেকেই এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছে। বিরোধিতা করতে গিয়ে তারা যেভাবে যে ভাষায় প্রতিবেদন প্রকাশ করা শুরু করলো সেটা আসলে বিশ্বের অন্য কোথাও সম্ভবত করা হয় না। এটা খুব বাজে সম্পাদনা বা সাংবাদিকতা কৌশল।

(প্রথম পর্ব সমাপ্ত)

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.