ধর্মচিন্তা, রাজনীতি এবং শাহবাগের প্রজন্ম চত্বর।
যুদ্ধাপরাধী স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকার মিরপুরের কসাইখ্যাত বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল আব্দুল কাদের মোল্লার বিরুদ্ধে আনীত ’৭১ এর মুক্তিযুদ্ধের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইনের আওতায় সর্বোচ্চ শাস্তি ফাঁসির পরিবর্তে যাবজ্জীবন কারাদন্ড হয়। এর প্রতিবাদে গর্জে ওঠে সমগ্র বাংলাদেশ- বিশেষ করে বাংলাদেশের ছাত্র ও যুব সমাজ প্রতিবাদমুখর হয়ে ওঠে। শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরে প্রতিবাদের সূচনা হলেও সারাদেশ আজ সকল যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসির দাবিতে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। দিনে দিনে যুদ্ধাপরাধের ফাঁসির দাবি জোড়ালো হচ্ছে। আন্দোলনের দাবালন রাজধানীর সীমানা পেরিয়ে দেশের জেলা, উপজেলা, পাড়া মহল্লা, গ্রামে-গঞ্জে ছড়িয়ে পড়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের দেশপ্রেমী ক’জন ব্লগার ও অনলাইন এ্যাক্টিভিষ্ট আন্দোলনের ডাক দিলেও যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি এখন বাংলাদেশের গণমানুষের দাবিতে পরিণত হয়েছে। টেকনাফ থেকে তেঁতুলিয়া রূপসা থেকে পাথুরিয়া সমগ্র বাংলাদেশজুড়ে শিশু কিশোর, ছাত্র-যুবা, নারী-পুরুষ, আবাল বৃদ্ধ বনিতা সকলের বজ্রকন্ঠে একই দাবি “যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি”। ১ সপ্তাহ পর বিএনপির পক্ষ থেকে শাহবাগের প্রজন্ম চত্বরকে সমর্থন জানালেও সেখানে অসংখ্য ‘যদি’ ‘কিন্তু’ ইত্যাদি শর্ত রয়েছে।
বিএনপি ও জামাত শিবিরপন্থী বেশকিছু বুদ্ধিজীবি কতৃক এই আন্দোলনকে ‘শাহবাগ নাটক’ আওয়ামী লীগ ‘মঞ্চত্ব নাটক’ এবং ‘কিছু নাস্তিক যুবকের আস্ফোলন’ ইত্যাদি বলে উড়িয়ে দেবার অপচেষ্টা চালানো হয়েছে। কিন্তু আন্দোলনের স্পিরিট অনুধাবণ করতে পেরে বিএনপির জামাতের দালাল সেই লেখক বুদ্ধিজীবির দল লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে। শাহবাগের এই আন্দোলনকে নিয়ে অনেক রাজনৈতিক দল পলিটিক্স করতে চেয়েছে। খোদ সরকার দলীয় আওয়ামীলীগ বা ছাত্রলীগ আন্দোলনের নিয়ন্ত্রণ নিতে চেয়েছে কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেনি। এই আন্দোলনের ফসল ঘরে তোলার জন্য বিএনপিও নানাভাবে চেষ্টা করেছে। এই আন্দোলনের ধারাকে সরকার বিরোধী আন্দোলনের রূপ দেওয়ার জন্য বিএনপির পক্ষ থেকে নানারকম কৌশলগত বক্তৃতা বিবৃতি দেয়া হচ্ছে। অনেকে আবার ধর্মের ধোয়া তুলে এই আন্দোলনকে ইসলাম বিরোধী আন্দোলনের রূপ দেয়ার অপচেষ্টা করা হচ্ছে। কিন্তু আমাদের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদেরকে বুঝতে হবে এই আন্দোলন কোন ধর্মের বিরুদ্ধে নয়। এখানে মুসলিম হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টান ধর্ম বর্ণ দল মত নির্বিশেষে সকল শ্রেণী পেশার মানুষ একত্রিত হয়েছে- দাবি একটাই যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে হবে। ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বাঙালী জাতীয়তাবাদের চেতনায়। ধর্মের ভিত্তিতে আমরা স্বাধীন হই নি। যদি তাই হতো তাহলে তো আমরা পাকিস্তানের অধীনেই থাকতাম। স্বাধীন হওয়ার প্রয়োজন ছিল না।
ইতোমধ্যে শাহবাগের এই আন্দোলনকে ইসলাম ধর্মের বিরুদ্ধে আন্দোলন হিসাবে আখ্যায়িত করার জন্য জামাত শিবির নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন ব্লগে অপপ্রচার চালানো হচ্ছে। এই আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য ইতোমধ্যে আন্দোলনের অন্যতম একজন সহযোদ্ধা ব্লগার রাজীব হায়দারকে নৃশংসভাবে খুন করার হয়েছে। খুনের কারণ হিসাবে পত্রপত্রিকায় বিভিন্ন রকমের অপব্যাখ্যা প্রদানের অপচেষ্টা করার হচ্ছে। অনেকে বলছে ব্লগার রাজীব একজন নাস্তিক ছিল। জামাত ও ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে আমার ব্লগ, সামহোয়ারইনব্লগ এ নিয়মিত লেখালেখি করত। এই কারণে ছাত্রশিবিরের সশস্ত্র ক্যাডার বাহিনী রাজীবকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে। এখানে বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমান ভাইদেরকে বলতে চাই জামাত বা ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে লেখা মানে ইসলামের বিরুদ্ধে লেখা নয়। জামাত শিবির ইসলাম ধর্মের নামে নিরীহ মানুষ খুন করে। এরা ভন্ড প্রতারক। এরা ধর্মকে ক্ষমতায় যাওয়ার হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে। আপনারা কি জানেন জামায়াতের হেড অফিস কোথায়? পাকিস্তানে। তাহলে আপনাদেরকে বুঝতে হবে জামাত শিবির বাংলাদেশের কোন রাজনৈতিক দল নয়। এরা বাংলাদেশে পাকিস্তানের এজেন্ট হিসাবে কাজ করে। এরা যদি কোনদিন বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতা পুরোপুরি হাতে পায়, তাহলে আবার বাংলাদেশকে পাকিস্তানের অঙ্গরাজ্য হিসাবে পূর্ব পাকিস্তান বানাবে। ৪২ বছর পরও জামাত শিবিরের অনেক কর্মী সমর্থক আছেন যারা সুযোগ পেলেই বলে দেশ স্বাধীন হয়ে কোন লাভ হয়নি। তারা এখনো দাবি করে বাংলাদেশ পাকিস্তানের অধীনে থাকতেই ভালো ছিল। এরা পাকিস্তানের প্রেতাত্মা।
ধর্ম এবং রাজনীতি এক জিনিস নয়। ধর্ম মানুষের হৃদয়ের অনুভতি। ধর্মের বিষয়ে সৃষ্টিকর্তার সাথে স্ব স্ব ব্যক্তির হিসাব জড়িত। কেউ যদি ধর্মের কোন অনুশাসন না মানে সেবিষয়ে সে নিজে সৃষ্টিকর্তার নিকট জবাবদিহি করবে। এখানে আমার আপনার বা জামাত শিবিরের কিছু করার নেই। যারা একেশ্বরবাদে বিশ্বাস করে না তারা নাস্তিক। কিন্তু যারা শাহবাগে আন্দোলন করছে তাদের পরিচয় আস্তিক বা নাস্তিকের নয়। আমাদের প্রথম পরিচয় আমরা বাংলাদেশের নাগরিক। লাখ শহীদের রক্ত ও মা বোনদের সম্ভ্রমের বিনিময়ে বাংলাদেশের এই স্বতন্ত্র নাগরিকত্ব অর্জন করতে হয়েছে। আর জামায়াতে ইসলামী এবং ছাত্রশিবির এই স্বতন্ত্র নাগরিকত্ব চায়নি। এরা পাকিস্তানের নাগরিকত্ব পক্ষ ছিল। আপনারা জানেন ’৭১ মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ঠিক পূর্ব মুহুর্তে পাকিস্তান জামায়াতের পূর্বাঞ্চলের নেতা গোলাম আযম পাকিস্তানে পালিয়ে যায়। বাংলাদেশের স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৭১ সালে গোলাম আযমসহ বাংলাদেশের স্বাধীনতাবিরোধী ৩৮ জন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের নাগরিকত্ব বাতিল করেন। ১৯৭১ সালেই স্বাধীন বাংলাদেশে পাকিস্তানের এজেন্ট জামায়াতে ইসলামীর রাজনীতির কবর রচিত হয়েছিল। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করার পর ১৯৭৮ সালে পাকিস্তানের এই প্রেতাত্ম যুদ্ধাপরাধী গোলাম আযম জিয়াউর রহমানের আনুকূল্যে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসে এবং পরবর্তীতে এখানে স্থায়ীভাবে বসবাস করার জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে অনুমতি দেয়া হয়। বাংলাদেশ জন্মের ইতিহাসে জঘন্যতম রাজনৈতিক দৈলিয়তের সূচনার সূত্রপাত তখনই শুরু হয়। জিয়াউর রহমান একজন সেক্টর কমান্ডর ও বীর মুক্তিযোদ্ধা হয়েও স্বাধীনতা বিরোধী রাজাকার পাকিস্তানের প্রেতাত্ম গোলাম আযমকে কেন বাংলাদেশে রাজনীতি করার অনুমিত দিলেন তা আজও বাংলাদেশের জনগণের নিকট বিরাট প্রশ্নবোধক চিহ্ন হয়ে রয়েছে। যদিও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে ক্ষমতার লোভে এবং আন্তর্জাতিক রাজনীতির চাপে জিয়াউর রহমান এটা করছিলেন।
ইসলাম ধর্মের ইতিহাসের দিকে তাকালে আমরা দেখতে পাই যে, এই ভারতীয় উপমহাদেশে মূলত পীর আওলিয়া ফকির দরবেশগণ ইসলামের দাওয়াত নিয়ে এসেছে। আমাদের ভারতবর্ষে ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য কোন রক্ত ঝরাতে হয়নি। কারণ ইসলাম ধর্ম প্রচারকারী পীর আওলিয়াদের চারিত্রিক গুণে মুগ্ধ হয়েই এখানকার সরলপ্রাণ মানুষ ইসলাম ধর্মের সুশীতল ছায়াতলে সামিল হয়েছে। ইসলাম প্রচারক পীর আওলিয়াগণ রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার জন্য ধর্মকে ব্যবহার করেনি বা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার প্রতি তাদের কোন লোভ লালসাও ছিল না।
বাংলাদেশের সচেতন নাগরিক হিসাবে আমাদের প্রাণের দাবি স্বাধীনতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধী রাজাকারদের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করার জন্য রাষ্ট্রের যা যা করার তাই করবে এবং আইন করে জামাত শিবিরের রাজনীতি নিষিদ্ধ করতে হবে। সেই সাথে ’৭১ এ যারা সরাসরি বাংলাদেশের বিরোধিতা করেছিল তাদের নাগরিকত্ব বাতিল করে বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত করতে হবে তবেই আমাদের নতুন প্রজন্মের সাহসী সৈনিক রাজীবসহ সকল মুক্তিযোদ্ধার আত্মা শান্তি পাবে।
শুভ্র সরকার, জাপান।





কেবল মাত্র নিজেই পোস্ট দিয়ে যাবেন,
আর কারও পোস্টে কমেন্ট করবেন না!
এই ব্যাপারটা কি ঠিক বলে মনে হয় আপনার কাছে?
এবি কিন্তু একটি ব্লগ, কোন সংবাদপত্র নয়।
Of course, but to be honest now I am very busy with my final thesis. Nonetheless, I also liked most the writings.
মন্তব্য করুন