ইউজার লগইন

জীবন অন্যত্র - মিলান কুন্ডেরা (দ্বিতীয় কিস্তি)

প্রথম কিস্তি

আর তাই কবির মা'র জীবন কেটে যাচ্ছিলো ভালোবাসায়, কেবল সেই পাথরের চাইয়ের আড়ালে ভালোবাসাবাসির কয়েক সপ্তাহ পরের আশাহত হওয়ার দিনটি ছাড়া। যখন সে তার প্রেমিককে জীবনের সবচে আনন্দময় খবরটি জানালো, বেশ কয়েকদিন কেটে গেলেও নিয়মিত সেই মাসিক অসুস্থতার দিনগুলো রুটিনমতো আসেনি এমাসে। প্রতিক্রিয়ায় ইঞ্জিনিয়ার প্রেমিক রীতিমতো হতাশ করে দেয়া নিস্পৃহতা নিয়ে বলতে চেষ্টা করলো ( আমার কাছে যদিও তার ঐ নিস্পৃহতাকে বানানো আর অস্বস্তিকর লেগেছে) এটা কিছু নয়, মেয়েদের শরীর মাঝেমাঝেই এমন উদ্ভট আচরণ করে, হয়তো কয়েকদিন পরই আবার ঠিক হয়ে যাবে। কবি'র মা কিন্তু ঠিকই বুঝতে পারলো প্রেমিক তার আনন্দময় অনুভূতিকে এড়িয়ে যেতে চাইছে, মন খারাপ হয়ে গেলো তার, ডাক্তার যেদিন তার গর্ভধারনের খবরটি নিশ্চিত করলো সেদিন পর্যন্ত প্রেমিকের সাথে সে কথা বলতে পর্যন্ত পারেনি। অথচ কবি'র বাবা খবর শোনার সাথে সাথে বললো সে একজন বেশ ভালো গায়নোকোলজিস্টকে চেনে, যে তাদের চিন্তামুক্ত করে দিতে পারে। প্রেমিকের এমন কথায় কবি'র মা কেঁদে উঠেছিলো তারস্বরে।

একজন বিদ্রোহীর এমন করুণ পরিণতি! প্রথমে সে তার বাবা-মা'র কথার বিরুদ্ধে গিয়েছিলো তরুণ ইঞ্জিনিয়ারের জন্য আর এ ঘটনার পর সে ছুটে গেলো বাবা-মায়ের কাছে প্রেমিকের বিচারের আশায়। অভিভাবকেরা তাকে আশাহত করেনি, তারা ইঞ্জিনিয়ারকে ডেকে কথা বললো, চালাক পাত্র শুরুতেই বুঝে নিলো তার পালানোর কোন পথ খোলা নেই, সে সহজেই রাজী হয়ে গেলো অনাড়ম্বর বিয়ের প্রস্তাবে, আর নিজের ব্যবসা শুরু করার জন্য বড় অংকের যৌতুক বুঝে নিলো কবি'র নানা-নানীর কাছ থেকে; তারপর যে বাড়িতে তার নববধু জন্মের পর থেকেই বাবা-মায়ের সাথে কাটিয়েছে সেখানেই উঠে এলো বাক্স-প্যাটরা নিয়ে।

সুবিধাবাদী ইঞ্জিনিয়ারের এমন তড়িঘড়ি কবির মায়ের চোখ এড়াতে পারেনি, সে বুঝে নিলো, আর নিজেকে সরিয়ে নিলো প্রেমের সেইসব রোমাঞ্চকর অনুভূতিগুলো থেকে, সে বুঝতে পারলো প্রবল ভালোবাসার চাইতে বরং অমনোযোগী ভালোবাসাটাই এখন ভালো। নিজের মতোন করেই ভালোবাসা বিনিময় করার অধিকার রয়েছে তার। কারণ তার বাবা প্রাগের সবচাইতে বড় দুটি দোকানের মালিক, কন্যা হিসেবে তার গুরুত্ব ঐ দোকানের হিসাবের খাতার মতোই দামী; সে তার জীবনের সবকিছুই একসময় সপে দিয়েছিলো প্রেমের জন্য (সে একসময় তার বাবা-মাকে ছেড়ে যেতেও রাজী ছিলো ভালোবাসার জন্য), প্রেমিকের কাছ থেকেও সে একই পরিমাণ ভালোবাসার প্রতিদান চেয়েছিলো শুধু। আর তাই প্রেমিকের এই অন্যায় আচরণের জবাব দিতে শুরু করলো সে, এর আগে ভালোবাসার হিসেবের খাতায় যতোটুকু ভালোবাসা সে জমা রেখেছিলো, তার পুরোটা তুলে নিলো প্রথমেই, বিয়ের পর থেকে তার আচরণ একেবারে পাল্টে গেলো , বিরক্তি আর মুখ ঝামটা দিয়ে কথা বলতে শুরু করলো সে স্বামীর সাথে।

তার কিছুদিন আগেই কবি'র মায়ের বড় বোন পারিবারিক বাড়ি ছেড়েছে (বিয়ে করে শহরের কেন্দ্রে একটি এপার্টমেন্ট ভাড়া নিয়ে থাকে তার স্বামীর সাথে) তাই বিশাল বাড়ির নীচতলাতে শহরের বিখ্যাত ব্যবসায়ি থাকেন তার বৌকে নিয়ে আর ইঞ্জিনিয়ার তাদের ছোট মেয়েকে নিয়ে সংসার পাতে দোতলার তিনটা ঘরে -- দুটো বিরাট আর একটা ছোট ঘর --প্রাসাদোপম এ বাড়িটিতে শুরু থেকেই এর সব আসবাব তৈরী ছিলো দরকারমতো। এমন সাজানো ঘর না হলে ইঞ্জিনিয়ার বিপদে পড়ে যেতো, কারণ তার সম্পত্তি বলতে তো কেবল দুটো স্যুটকেস, যাই হোক, তবুও সে ঘরগুলোকে একটু অন্যরকম করে সাজাতে চাইলে কবি'র মা তাতে রাজী হয়নি, যে লোক তার ভালোবাসাকে গাইনোকোলজিস্টের ছুরির নীচে ফেলার চিন্তা করতে দ্বিধা করেনি, তার জন্য বিশ বছর ধরে তার বাবা মায়ের তিল-তিল করে গড়ে তোলা এই বাড়ির কোনকিছুকেই পাল্টে দিতে বিন্দুমাত্র আগ্রহবোধ করে না সে।

চলবে...

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

অদিতি's picture


মসৃণ অনুবাদ।

মামুন হক's picture


এই পর্বও দারুণ লাগলো। ঝড়ের গতিতে চলুক আপনার অনুবাদ Smile

জ্বিনের বাদশা's picture


চলুক চলুক

শওকত মাসুম's picture


বাহ বাহ। চলুক।

হাসান রায়হান's picture


স্মুথ এজ সিল্ক অনুবাদ।

লীনা দিলরুবা's picture


তুমুল!

ভাস্কর's picture


উৎসাহেতো রীতিমতোন আমি ডগমগ...ধন্যবাদ আপনাদের।

মীর's picture


দারুণ হচ্ছে।

টুটুল's picture


ভাললাগছে...
চলুক

১০

জেবীন's picture


ওহ রে, কি মোহ ভঙ্গ! ...

সরল অনুবাদ পছন্দ হইছে...

১১

তানবীরা's picture


যে লোক তার ভালোবাসাকে গাইনোকোলজিস্টের ছুরির নীচে ফেলার চিন্তা করতে দ্বিধা করেনি, তার জন্য বিশ বছর ধরে তার বাবা মায়ের তিল-তিল করে গড়ে তোলা এই বাড়ির কোনকিছুকেই পাল্টে দিতে বিন্দুমাত্র আগ্রহবোধ করে না সে।

মেয়েরা কেনো যে এমন লোহা হয় না, তাইতো সমাজ আগায় না।

অসাধারণ

১২

আবদুর রাজ্জাক শিপন's picture


 

 

প্রথম  কিস্তি আগেই পড়েছিলাম, দ্বিতীয় কিস্তি থেকে শুরু করলাম আবার ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...