জীবন অন্যত্র - মিলান কুন্ডেরা (তৃতীয় কিস্তি)
তবে তরুণ ইঞ্জিনিয়ার একটা বিষয়ে কোনরকম জবরদস্তি ছাড়াই খানিকটা কোমল প্রতিবাদী অবস্থান নিতে পারে বলে আমার মনে হয়: তাদের শোবার ঘরে একটা ভারী মার্বেল পাথরের টেবিলের উপর একটা নগ্ন পুরুষ মূর্তি রাখা ছিলো; মূর্তিটি তার নিটোল নিতম্বের উপর ভর দিয়ে রাখা বাম হাতে একটা বীনা ধরে আছে; আর ডানহাতের ভঙ্গীমাটা এমন যেনো এই মাত্র সে বীনার তারে আঙুল চালিয়েছে; ডান পাটা খানিকটা বাড়িয়ে রাখা, মাথাটা একটু ঝুকে আছে, কিন্তু চোখ দুটো আকাশের দিকে মেলে দেয়া। তবে এই পুরুষ মূর্তিটি অসম্ভব রূপবান, কোকড়া-কাঁধ ছাড়ানো চুল, যে শ্বেতপাথর খুড়ে তার শরীর তৈরী হয়েছে তার কোমল আভায় মনে হয় কিছুটা নারীসূলভ কমনীয়তা আর দেবতাসূলভ কৌমার্য্যের ছাপ পড়েছে সারা শরীরে; দেবতাসূলভ শব্দটা আমি কেবল উপলব্ধি থেকে বললাম বিষয়টা কিন্তু এমন নয়, মূর্তির পায়ের কাছে খোদাই করে লিখে রাখা নাম অনুযায়ী, বীনা হাতে এই মানুষটি হলেন গ্রীক দেবতা এ্যাপোলো।
কবি'র মা যদিও কালেভদ্রে মূর্তিটির দিকে তাকান। বেশিরভাগ সময়েই মূর্তির তাকানোর ভঙ্গীর কারনে খানিকটা অস্বস্তি কাজ করে বলে আর বাকী সময়ে ইঞ্জিনিয়ার সাহেব তার টুপি, জুতো কিম্বা গন্ধওয়ালা মোজা মেলে দেন মূর্তির মাথায় শরীরে, সঙ্গীতের দেবতারে এমন অপমানও সইতে হয়!
কবির মা তার বাবার উপর ক্ষেপে থাকার কারন কেবল তার রসবোধের খামতি বিষয়টা কিন্তু এমনও নয়: কবির মা আসলেই বুঝতে পারেন এ্যাপোলোর কাঁধে মোজা মেলে দিয়ে তার স্বামী কেবল মজা করছেন বিষয়টা এতো সোজাসাপ্টা নয়, ইঞ্জিনিয়ার এর মধ্যদিয়ে তাকে জানিয়ে দিতে চাচ্ছেন যে তার চূপ থাকাটা আদৌ সবকিছু মেনে নেয়া নয় বরং সে কবি'র মায়ের জগতকে অস্বীকার করতে চাইছে সৌন্দর্য্যের এই নিয়ম ভেঙে।
এভাবেই শ্বেত পাথরের সাধারন মূর্তিটি সত্যিই দেবতা হয়ে উঠে, যেই দেবতা মানবজীবনে হস্তক্ষেপ করে, যে সবকিছু দেখে চোখ মেলে, এলোমেলো করে দেয় মানুষের গন্তব্য আবার রহস্য উন্মোচনেও তার বিস্তৃত ভূমিকা। নববিবাহিত কন্যা এই দেবতাকে তার মিত্র বলে গণ্য করতে শুরু করে, নারীর স্বপ্নালু কল্পনায় সে মূর্তিটিকে প্রায়শ জীবন্ত দেখে, যার চোখের মনির রঙ পাল্টে যায়, কখনো-সখনো যেন শ্বাস নেয় বুক ভরে। সে এই ছোট্ট অর্ধনগ্ন মানুষটার প্রেমে পড়ে যায়, তার জন্যেইতো এতো অপমান সইতে হচ্ছে মানুষটাকে। দেবতার সুন্দর মুখের দিকে তাকিয়ে কবি'র মা প্রার্থনা করেন তার সন্তানটিও যেনো তার স্বামীর এই ছোট শত্রুর মতোন দেখতে হয়। তখন সে ভেবে নিতে পারবে তার সন্তানের বাবা আসলে ঐ ইঞ্জিনিয়ার নয় বরং এই দেবতার ঔরসেই তার জন্ম। সে দেবতার কাছে প্রার্থনা করে তার পেটের ভ্রূণটাকে যাতে পাল্টে দেয়া হয় ঠিক যেমন টিশিয়ান তার এ্যাপোলোকে এঁকেছিলো ফেলে দেয়া নষ্ট একটা ক্যানভাসের গায়ে।
নিজেকে ভার্জিন মেরী'র মতোন ভাবতে শুরু করে সে, কোন পুরুষের সাথে সম্পর্ক ছাড়াই যে গর্ভে সন্তানের ভ্রূণ তৈরী হয়েছে, এভাবেই তার মাতৃত্বের ধারণা ডালপালা মেলে, যেনো তার সন্তানের কোন বাবা নেই যে অনধিকার হস্তক্ষেপ করবে তার জন্মে, তার প্রবল ইচ্ছা জাগে এই সন্তানের নাম হবে এ্যাপোলো, যে নামটি শুনলে তার মনে হয় "যে শিশুর পিতা কোন মানুষ নয়". যদিও সে জানে এরকম মেকী, অমানবীয় নামের কারনে তার অনাগত সন্তানকে ভালোই ঝামেলা পোহাতে হবে, এরকম নামের জন্য সে আর তার সন্তান পরিণত হতে পারে কৌতুকে। একারনে সে একটা চেক নাম খুঁজতে শুরু করে এই প্রাচীন গ্রীক দেবতার সাথে মিল রেখে। শেষ পর্যন্ত তার মনে হয় তার সন্তানের নাম হবে জেরোমিল ( যার অর্থ, "যে বসন্ত ভালোবাসে" বা "বসন্ত যাকে ভালোবাসে"), অন্য সবার এই নামটি ভীষণ পছন্দ হয়।
আর মজার ব্যাপার হচ্ছে, বসন্তের লাইলাক ছাওয়া পথের মাঝ দিয়েই কবি'র মাকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়; যেখানে শিশু কবি তার জঠর থেকে গড়িয়ে পড়ে এই মাটির পৃথিবীতে।





সকালে একবার খুইজা গেছি...
চলুক
ওরে কি অসাধারণ রে!!! দাদা, আপনি বস!
এক কথায় অসাধারণ! আপনার এই বইটা অনুবাদ করে একটা বই ছাপানো উচিত। সিরিয়াসলি।
সিরিজটা দারুন লাগছে..
আমি একসাথে ৩টা পর্ব পড়লাম... চলুক
তিন কিস্তি একসাথে পড়লাম। মনে হচ্ছে ভুল করেছি। পুরোটা শেষ হলে একসাথে পড়তে হত।
থাম্বস আপ।
এখনো টানটান আগ্রহ বজায় আছে
চলুক...
কিস্তিগুলো আরেকটু বড় করা যায়না?
প্রতিদিন ৫০০ শব্দের লেখা অনুবাদ করি। এরচাইতে বেশি করতে হইলেতো সবকিছু ছাইড়াতো অনুবাদই করতে হইবো খালি...
ভাস্করদা'র এই লেখাটার জন্য প্রতিদিনই অপেক্ষা করি
অসাধারণ। দুর্দান্ত। ফাটাফাটি।
মুগ্ধ হয়ে পড়তেছি
ধন্যবাদ সবাইরে লেখাটার সাথে থাকনের লেইগা...আমার মতোন অপেশাদার, অনভিজ্ঞের সাথে আপনেরা না থাকলে হয়তো অচীরেই ঝইরা যাইতে হইবো...
আমার পছন্দ হয়নি।
অনুবাদ আক্ষরিক হয়ে যাচ্ছে, টানা পড়তে গিয়ে আরাম লাগে না।
শব্দের ব্যবহারে আরো সতর্কতা কাম্য।
হ...আমিও আবার পড়লাম পুরাটা, আর একইরম অনুভূতি তৈরী হইলো। টানা পড়তে ভালো লাগে না। দেখা যাক কদ্দূর যাইতে পারি, তারপর অনেক শব্দ পাল্টানের দরকার আছে...
ধন্যবাদ আরিফ জেবতিক মন্তব্যের জন্য।
এই বিষয়ে সৈয়দ হকের একটা কথারে গুরুবাক্য মানি।
সৈয়দ হক বলছেন, লিখে জোরে জোরে পড়বে। কানে যে কথাটি খট করে অসুবিধা সৃষ্ঠি করে, সেই শব্দটি বদলাবে।
লেখা আসলে শোনার বিষয়।
তবে কুন্ডেরা অনুবাদ করতে গেলে একটু ঝামেলাও আছে। যেমন গতোকাল একজন ব্যক্তিগত ভাবে একটা শব্দ নিয়া আপত্তি জানাইলেন, আমি তারে ইংরেজী অনুবাদের শব্দটা শোনানের পর তিনি কইলেন এমন পুরান ইংরেজী শব্দ কোত্থেইকা আসলো। কুন্ডেরার লেখায় অনুপ্রাস তৈরীর স্বার্থে কিছু শব্দ ব্যবহারের প্রবণতা থাকে। সরল একটা বাক্যে আমাগো যুক্তাক্ষরের মতোন কঠিন শব্দ ব্যবহৃত হয়...
আর অনেক সিরিয়াস টোনে সে হিউমার করে, ভঙ্গীতে থাকে নিস্পৃহতা...বাংলা ভাষার বাক্যরে ঐরম সিরিয়াস হিউমার টাইপ করতে গেলে শব্দ খুঁইজা পাওয়া কঠিন হইয়া যায়। বাংলা ভাষায় হিউমার করতে গেলে বাক্য সাধারণত একটু সার্কাস্টিক হইয়া পড়ে। কুন্ডেরা আবার সার্কাস্টিক বাক্য তৈরী করেন না। দার্শনিকতারে গুরুত্ব দেয়ার কারনে বাক্যরে আবার খুব বেশি পাল্টানোও যায় না, কারণ তার প্রতিটা বাক্যের একটা মর্তবা থাকে। এক অংশের একটা বাক্য গঠন নিয়া সে অনেক পরে হয়তো একটা পান তৈরী করে যেইটা গল্পের বক্তব্যের জন্য অনেক গুরুত্বপূর্ণ।
যাউগ্গা দেখা যাক, আমি নিজে কাজটা শেষ কইরা আবার রিভিশন দিতে আগ্রহী। তাতে বিকল্প শব্দগুলি মাথায় আসে। আপনের কথার পরেই যেরম আমি কিছু শব্দের সমস্যা ধরতে পারলাম। আবারো ধন্যবাদ, আপনে সমালোচনা না করলে হয়তো আমি নিজে আবার পড়তাম না...আর শোধরানোর আগ্রহটাও থাকতো না।
দারুন লাগলো, চালিয়ে যান
লাইক লাইক লাইক
অসাধারন, অসাধারন আর অসাধারন।
মন্তব্য করুন