ইউজার লগইন

জীবন অন্যত্র - মিলান কুন্ডেরা (পঞ্চম কিস্তি)

শেষ পর্যন্ত কি সে সুখী হয়েছিলো? একদম না: বরং সংশয় আর আত্মবিশ্বাসের টানাপোড়েনে পড়ে গিয়েছিলো সে; আয়নার সামনে পোষাক খুলে দাঁড়িয়ে, নিজেকে চোখ মেলে দেখতে গিয়ে সে প্রায়শঃই উত্তেজনা টের পেতো, আবার মাঝে মাঝে নিজেকে মনে হতো সারাশব্দহীন মরা মাছের মতোন । এরপর অন্যকোনো চোখের পরিসরে ছেড়ে দিতেই শরীরময় ছড়িয়ে পড়তো অনিশ্চয়তার স্রোত।

যদিও সে আশা আর নিরাশার দোলাচলে দোল খাচ্ছিলো, তবুও সেই ছেড়ে দেয়া পুরনো আচরণগুলো থেকে সে দূরে সরে আসে; তার বোনের টেনিস র‍্যাকেট আর তাকে মুশরে দেয় না, শরীর যেনো একটা শরীর হিসেবেই সাড়া দেয়, তার মনে হয় এভাবেই হয়তো বেঁচে থাকার মানে খুঁজে পাওয়া যেতে পারে। এই নতুন প্রাপ্তিকে সে মরিচীকার মতোন ছলনা হিসেবে নয় বরং বাস্তব সত্য হিসেবেই পেতে চাচ্ছিলো, যা টিকে থাকবে জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত; সে চাইছিলো ইঞ্জিনিয়ার তাকে লেকচার হলের বিস্তৃত বেঞ্চি থেকে, বাবা-মায়ের আভিজাত্য থেকে সরিয়ে নিয়ে যাবে বহুদূর, ভালোবাসার চটক থেকে জীবনের অভিযাত্রায়। এ কারনেই সে গর্ভ ধারনের বিষয়টাকে বিবেচনা করছিলো বেশ আগ্রহের সাথে: নিজেকে, ইঞ্জিনিয়ারকে আর তাদের অনাগত সন্তানকে তিনটি তারা হিসেবে উদীয়মান দেখে সে, যারা খুব শীঘ্রই সারা বিশ্বজগতেই সাড়া ফেলে দিতে পারে।

আগের অধ্যায়ে যদিও আমি কিছু বিষয় বিস্তারিত বলে দিয়েছি: কবির মা খুব তাড়াতাড়িই বুঝে নিয়েছিলো তার এই ভালোবাসার মানুষটি আসলে শুধু ভালোবাসার রোমাঞ্চেই আগ্রহী, জোড়া তারা হিসাবে আলো ছড়ানোর কোনো আগ্রহই তার ছিলো না কোনোকালে। কিন্তু আমরা জানি তাতে কবির মা একেবারেই ভেঙে পড়েনি...তার আত্মবিশ্বাস কোনোভাবেই নুয়ে পড়েনি প্রেমিকের শীতলতায়। কিছু বিষয় পাল্টে গিয়েছিলো এরফলে। কবির মায়ের শরীর প্রেমিকের চোখের পরিসরে ঠিকই ছেড়ে দেয় সে, কিন্তু তার সাথে নতুন এক ইতিহাসের নির্মাণও ঘটে; অন্য সকলের জন্য শরীরের পটভূমি ছেড়ে না দিয়ে এমন একজনের জন্য শরীর বিছিয়ে দেয়া, যে তখনো দেখতেই শিখেনি। শরীরের বাইরের রূপ সেখানে কোনো বিবেচনায় থাকে না। অস্তিত্বের কোনো এক অতল থেকে আরেকটা শরীরকে ছুঁয়ে দেখা যা হয়তো কখনোই কেউ দেখেনি। বাইরের জগতের চোখ কেবল এর প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় বাস্তবতাটুকুই দেখতে পায়, এমনকি তার শরীরের জন্য ইঞ্জিনিয়ারের কোনো মতামতই আর গ্রহনীয় থাকে না, কারণ পরম লক্ষ্যের দিকে যাওয়ার পথে, শীর্ষ অনুভূতিতে পৌছানোর যাত্রায় তাদের কোনো ভূমিকাই আর গনায় ধরা যায় না। শরীর তার পূর্ণ স্বাধীনতা আর নিয়ন্ত্রণের কৌশল খুঁজে পায়, ক্রমশঃ বেড়ে গিয়ে কুৎসিত হয়ে উঠে শরীরের মধ্যভাগ, কিন্তু সেদিকে কবির মায়ের কোনো খেয়াল থাকে না, কারণ তার শরীর কেবল বেঁচে থাকে তার জন্যই, যে তার শরীরে ছড়িয়ে দেয় গর্বিত অনুভূতি।

প্রজননের পর কবির মায়ের শরীর বিদ্যমানতা পেরিয়ে এক নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করে। যখন তার স্তনবৃন্তে সন্তানের আনাড়ি মুখের ছোঁয়া লাগে, তখন যেনো একটা মিষ্টি কাঁপুনি বুক থেকে ছড়িয়ে পড়ে সারা শরীরে; এর সাথে বাস্তবতঃ তার প্রেমিকের ছোঁয়ার খুব বেশি পার্থক্য যদিও থাকে না, কিন্তু অন্য কি যেনো মিশে থাকে এর পরতে পরতে: এ যেনো শান্তির পরশ, পরিতৃপ্তির সুখ। এর আগে কখনো এমন অনুভূতির অভিজ্ঞতা হয়নি তার; প্রেমিক যখন তার স্তনে চুমু খেয়েছে, সাময়িক শিহরণ তৈরী হয়েছে হয়তো সংশয় আর অবিশ্বাসের মোড়কে, আর এই ছোট্ট মুখের স্পর্শে সে প্রতিনিয়তঃ আরেকটি শরীরের যূক্ত হওয়ার আবেশ টের পায় পুরোপুরি, নিশ্চিতভাবেই।

চতুর্থ কিস্তি

তুতীয় কিস্তি

দ্বিতীয় কিস্তি

প্রথম কিস্তি

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মীর's picture


ভাল লাগলো যথারীতি।

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ মীর...

আনিকা শাহ's picture


আপনার অনুবাদের খোঁজ পেলাম হঠাৎ করেই। আগে Life is Elsewhere পড়ি নি, আপনার অনুবাদ পড়ে ভাল লাগল। ভাল থাকবেন। পরবর্তী পর্বসমূহের আশায়...

ভাস্কর's picture


ধন্যবাদ আনিকা শাহ...

সালাহ উদ্দিন শুভ্র's picture


বস ...আমি এখন কুন্ডেরায় আছি। অদ্ভূত লেখনি তার। পুরাটা একলগে পড়তে দিয়েন।

ভাস্কর's picture


কোনটা পড়তেছো?

তানবীরা's picture


আবার শুরু করলাম পড়া

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...