চলচ্চিত্র রিভিউ: হাজারো খাওয়াশেই এ্যায়সি (২০০৩)

ক্রিকেট বিশ্বকাপ চলাকালীন সময়ে গৃহপরিচারিকারে ধর্ষণের অপরাধে সাজাপ্রাপ্ত শাইনি আহুজার ভিন্ন কারাগারে স্থানান্তরের খবরটা পত্রিকার এক কোনায় পইড়া থাকলেও আমার নজরে পড়লো। বিষয়টা আকষ্মিক। ভারতীয় সিনেমার খুব বেশি ভক্ত না হওয়ায় শাইনি আহুজা নামের এই অভিনেতার নাম আগে কখনো শোনা হয় নাই। কিন্তু সাত বছরের দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত এই ধর্ষক পুরুষের সাজারে যখন সালমান খান কিম্বা ফারহান আখতারের মতোন তারকারা লঘু পাপে গুরু দণ্ড বইলা পত্রিকাতে বিবৃতি দিলো তখন একেবারেই অভ্যাসবশতঃ তারে নিয়া ইন্টারেনেটে খোঁজাখুঁজি শুরু করলাম।
এই খোঁজাখুঁজির শুরুতেই একটা বিষয় অনুভব করলাম, জনগণের উইকিপিডিয়ায় যেনো পৃথিবীর তাবৎ লোকের জীবনকাহিনী স্থান পাইবো অচিরেই। তয় শাইনি আহুজা যেনোতেনো কোনো মানের কেউ না। তার প্রথম সিনেমা হাজারো খাওয়াশেই এ্যাইসি (২০০৩)'এর পারফরম্যান্সের তথ্য দিয়াই উইকি এন্ট্রি শুরু হইছে। এই সিনেমাতে অভিনয় কইরা শাইনি ২০০৬ সালে ফিল্মফেয়ার সেরা ডেব্যু তারকার অ্যাওয়ার্ড পাইছিলো। এবং কোনো কারণ ছাড়াই এরপর সেই সিনেমার উইকি এন্ট্রিতে গিয়া খানিকটা ঘোরাঘুরি। খানিকটা বললাম কারণ এইরকম তথ্যপূর্ণ আর্টিকেলে ছবির প্লট বা সামারীতে আমি সাধারনতঃ মনোযোগ দেই না, কারণ যেকোনো সময় যেকোনো সিনেমা দেখার সম্ভাবনা তৈরী হইতে পারে। আর জানা ঘটনার ছবি দেখার আগ্রহ আমার একেবারেই হয় না কোনোকালে।
যাই হোক, একজন ধর্ষক অভিনেতার অভিনীত প্রথম ছবি হিসাবে নয়, বরং এই ছবির পরিচালক সুধীর মিশ্রের একটা ইন্টেনশান দৃষ্টি আকর্ষণ করাতে আসলে হাজারো খাওয়াশেই এ্যাইসি সিনেমার ডাউনলোড দিলাম। আর ডাউনলোড পরবর্তীকালে সিনেমাটা দেখা শুরু করলেও শুরুতে তেমন আগ্রহ পাইলাম না এর শ্লথগতি আর ঘটনায় ঢুকতে না পারার ব্যর্থতার জন্য। এই জন্য কিছুক্ষণ দেখার পর পজ দিয়া ব্রাউজ করতেছিলাম বিভিন্ন ব্লগ সাইটে। এরমধ্যেই নিজের অজান্তে কখন যে ঘুমাইয়া পড়ছি বুঝতেই পারি নাই। সেই ঘুম ভাঙলো সাড়ে তিনটার দিকে। আধাঘন্টা এইদিক ঐদিক কইরা ভোর চারটার দিকে আবারো সিনেমার বাকী অংশ দেইখা ফেলার সিদ্ধান্ত নিলাম।
পরিচালক হিসাবে সুধীর মিশ্রের নামও আমার কাছে অপরিচিত ছিলো। শেষ পর্যন্ত গৃহপরিচারিকা ধর্ষক শাইনি আহুজা মারফত পরিচয় ঘটলো এই লোকের সাথে। আর জানলাম গতো দশকের একটা বেশ ক্রিটিক্যালি অ্যাক্লেইম্ড ছবি চামেলি (২০০৩)'ও তার নির্মিত। আমার মনে পড়লো চামেলি সিনেমা দেখার সময়েও আমার একই অনুভূতি হইছিলো, শুরুতে একটু ধীরগতির বোরডোম তারপর ঘটনার ভেতর ঢুইকা যাওয়ার পর যেনো আর চোখ ফিরাইতে পারি নাই।
হাজারো খাওয়াশেই এ্যাইসি সিনেমার গল্পের প্রেক্ষাপট ১৯৬৯'এর ভারত। এক বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই ছাত্র আর এক ছাত্রীর এই গল্প আসলে সেই সময়কার ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতা আর কন্ট্রাডিকশনের। তখন সারা ভারতেই নক্সালবাড়ি আন্দোলনের প্রভাব বিস্তৃত হইতেছে। আবার প্যারালেলি ভারতীয় বূর্জোয়াগিরীর যেই বিস্তার আজকের যূগে দেখা যায় সেইটার শুরুটাও তখুনি হইছিলো। সিনেমার দুই চরিত্র সিদ্ধার্থ আর ভিক্রাম এই দুই শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বশীল চরিত্র। সিদ্ধার্থ পড়াশোনা শেষে বিহারে চইলা যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় পার্টির কাজে, তার স্বপ্ন হিন্দু বর্ণবাদের অবসান আর ভিক্রাম সংগ্রামী ব্যবসায়ি। তাদেরই বন্ধু লন্ডন ফেরতা গীতার অনুরাগ সিদ্ধার্থের প্রতি। যদিও সিদ্ধার্থ ভালোবাসে গীতারে কিন্তু তার প্রথম ভালোবাসা রাজনৈতিক অ্যাক্টিভিজম। আর ভিক্রাম গোপনেই গীতার প্রতি অনুরক্ত।
গল্পের এদ্দূর পর্যন্ত প্রকাশ করাটাই মনে হয় সমিচীন, এর বেশি কইলে ছবি দেখার আনন্দটা নষ্ট হইতে পারে। তবে রাজনৈতিক ইতিহাস বর্ণনার এই ছবির নিরাবেগ উপস্থাপণরীতি আমার ভালো লাগছে। পরিচালনা বা গল্প বলার ক্ষেত্রে পরিচালক একেবারেই বাস্তবানুগ অর্থাৎ রিয়ালিস্ট ঘরানার অনুসরণকারী। রিয়ালিস্ট ঘরানার ছবিতে সাধারনতঃ পরিচালকের নিজস্ব ইন্টারপ্রিটেশনেই জীবনকে দেখা হয় বেশি। ঠিক যেমন প্রামাণ্যচিত্রের বেলায় পরিচালক কেবল স্ক্রিনে তার পছন্দের আয়তক্ষেত্র অঞ্চলরে আবদ্ধ করে। কিন্তু হাজারো খাওয়াশেই এ্যাইসি'তে ভারতীয় রাজনৈতিক ইতিহাসের লিপিবদ্ধকরনের কৌশলে কোথাও পরিচালকের ব্যক্তিগত অভীপ্সার ছোঁয়া পাওয়া যায় না।
ছবির চিত্রগ্রহণে ছিলেন একজন ফরাসী জ্যাক বুকি। আহামরী সিনেমাটোগ্রাফি না হইলেও ২০০৩'এর অন্যান্য ভারতীয় সিনেমার সাথে এর পার্থক্যটা বোঝা যায় বেশ ভালোভাবেই। মিজো সিন ডেভেলপ করার ক্ষেত্রে তার মুনশিয়ানা বেশ। তবে এই ছবির প্রাণ এর সম্পাদনা। এই বিভাগেও একজন ফরাসী ক্যাথেরিন ডি হোয়ার্ট কাজ করছেন। মূল গল্প বলার ঢঙে বেশ ছড়ানো একটা ভাব ছিলো। এমন ছড়ানো রাজনৈতিক ইতিহাসের গল্পরে কোনো পরিচালক যখন স্বল্প পরিসরে দেখাইতে চায় তখন আসলে সম্পাদকের কৃতিত্ব অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়। যদিও একটা ক্লীশে রীতির টাইম ল্যাপে ভরপুর ছবিটা...কিন্তু ফেইড আউট আর ফেইড ইনের এই ক্লীশে টেকনিকটা আমার কাছে অন্ততঃ বিরক্তিকর লাগে নাই। অনেক্ষেত্রে বরং প্রয়োজনীয় মনে হইছে।
হাজারো খাওয়াশেই এ্যাইসি ভারতের রাজনৈতিক অস্থিরতার ছবি। বর্ণবাদ বিরোধের ছবি। ক্ষমতার আসল রূপ উন্মোচনের ছবি। এইরম এক ছবিতে শাইনি আহুজা কিম্বা কে কে মেনন দুইজনই অসাধারণ অভিনয় করছে। ভারতীয় মেলোড্রামার প্রভাব একদম নাই বলা যাইবোনা কিন্তু অভিনয় রীতিতেও সুধীর মিশ্র রিয়ালিস্ট থাকার চেষ্টা করছেন ভালোভাবেই।
একজন ধর্ষক অভিনীত ছবি দেখার ব্যাপারে অনেকের হয়তো আপত্তি থাকতে পারে...কিন্তু আমার সাজেশন, ছবিটা দেখতে পারেন...ভালো লাগবো।





বুঝলাম না আপনি ছিবি টি কী আমাদের দেখতে বললেন? আমি এই ছবি দেখার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছি তার কৃতকর্মের জন্য। সালমাল মদপ্য অবস্থায় গাড়ি চালিয়ে মানুষ হত্যাকারী তার কাছে তো সবই লুধু অপরাধ।
হ্যা ছবিটা দেখতে কইলাম। আমার কাছে ছবিটা বেশ ভালো লাগছে এমনকি শাইনি আহুজার অভিনয়ও...
শাইনি'রে তো ভালো পাইতাম। কিন্তু এই ঘটনা জানতাম না।
মুভিটা ভাল্লাগসে।
ঘটনা বিশ্বকাপের আগের...বিশ্বকাপের কারনে শাইনির কারাগারে স্থানান্তর হয় নাই...
অভিনেতা এবং সিনেমার নাম দু'টোই এই প্রথম শুনলাম। খুব সম্ভবত হিন্দি সিনেমা নিয়ে অনাগ্রহ কারণ এটার। সুযোগ পেলে দেখে ফেলব। আমার রুমমেট হিন্দি মুভির সাইকো প্রেমী। ওর কাছেও থাকতে পারে। না হলে জিপি মডেম দিয়ে মুভি নামানোর সাহস নেই
মুভিটা আমি মুক্তি পাওয়ার পরেই দেখেছিলাম, ডিভিডি টা এখনও আছে। চমৎকার একটা ছবি। কোনো বাড়াবাড়ি নাই ছবিটায়, মেয়েটাও ভাল অভিনয় করেছিল।
শাইনি মোটামুটি ভালো কয়েকটা ছবি করেছিল। লাইফ ইন মেট্রো, খোয়া খোয়া চাঁদ এর এটাতো আছেই।
এটা সম্ভবতঃ ২০০৯ এর ঘটনা। আপনি আসল মজাটাই জানেন না,
গৃহকর্মী পুলিশরে কমপ্লেইন করার পর শাইনি বলছে, এটা স্বাভাবিক ব্যাপার। ঘরে বউ না থাকলে গৃহকর্মীর কাছে যায় পুরুষরা
আর ইন্টারেষ্টিং হলো শাইনির বউ বলছে, শাইনি এমন কিছু করতেই পারে না। তাও শাইনির স্বীকারোক্তির পর বউ এ বিবৃতি দিছে ..................পতিভক্তি
সিনেমা টা মাত্র দেখা শেষ করলাম।
প্রায় মাস তিনেক আগেই নামাইছিলাম আপনের এই পোস্টটা পৈড়া, তখনই দেখা শুরুও করছিলাম ... কিন্তু আগাইতে পারি নাই। প্রথমে একটু বিরক্তও লাগছে।হার্ডডিস্কের চিপায় পৈড়া ছিলো তখন থিকা মুভিটা।
জায়গা খালি করার জন্য পুরানা জিনিসপাতি ডিলিট করার উদ্দেশ্যেই আসলে সিনেমাটা আবার দেখা শুরু করছিলাম ... শেষ কইরা মুগ্ধ হইয়া গেলাম।
প্রত্যেকটা চরিত্রর অভিনয়ই ভালো লাগছে। প্রধান তিন চরিত্রের তিনজনরে যদি মার্ক দেই তাইলে শাইনি আহুজা আর কে কে মেননরে দশে নয় কইরা দিলেও চিত্রাঙ্গদা সিং রে দশে দশ দিমু।
আমিতো বিরক্তির বিষয়টা এই কারনেই উল্লেখ করছিলাম লেখায়...
মন্তব্য করুন