ইউজার লগইন

একটি জানালার গল্প (দুই)

প্রায় একবছর এই চাকরীটা আমি চালিয়ে গিয়েছি। তখন আমার বয়স মাত্র বাইশ বছর।

প্রতিমাসেই আমি দুই হাজার ইয়েনের বিনিময়ে মাসে ত্রিশ বা তার চাইতে বেশি এমন চিঠি লিখে দিতাম লিদাবাশি জেলার ছোট্ট এক অদ্ভুত কোম্পানীর জন্য, যারা নিজেদের কলম সমবায় নামে ডাকতো।

"মূগ্ধ করবে, তোমার চিঠিও!" কোম্পানীর বিজ্ঞাপনে এমন লাইন সেসময়টায় সবাইকে আকষর্ণ করেছিলো। প্রথমেই একটা এককালীন ফি আর মাসিক টাকা দিয়ে একজন নতুন সদস্য মাসে চারটি চিঠি লিখতে পারতো কলম সমবায়কে। আমরা যারা কলম শিক্ষক ছিলাম তারা তাদের চিঠির জবাবে ভুল ধরিয়ে দিতাম, মতামত জানাতাম কিংবা ভবিষ্যতের রূপরেখা তৈরী করে দিতাম ঠিক উপরের চিঠিটার মতোন করে। সাহিত্য বিভাগের ছাত্র কল্যাণ অফিসে একটা চাকরীর বিজ্ঞাপন দেখে ইন্টারভিউ দিতে গিয়েছিলাম। সেবার কিছু ব্যক্তিগত ঘটনায় আমার গ্র্যাজুয়েশন কোর্সে এক বছরের জন্য ইস্তফা দিতে হয়েছিলো, বাবা-মা জানিয়ে দিয়েছিলেন আমার মাসিক খরচের টাকা ধীরে ধীরে কমিয়ে দেয়া হবে। সেই প্রথম আমি নিজের জন্য টাকা রোজগারের চিন্তা করতে বাধ্য হলাম। আর তার অংশ হিসেবেই ইন্টারভিউতে আমাকে বেশ কিছু বিষয়ে লিখতে বলা হলো, এক সপ্তাহ পর জানতে পেলাম কাজটা আমাকে দিয়ে দেয়া হয়েছে। তারপর এক সপ্তাহের প্রশিক্ষণের মধ্য দিয়ে জানলাম কোনসব ভুল, কিভাবে শুধরে দিতে হবে, সাথে আরো কিছু ব্যবসায়িক কৌশল, যার কোনোটাই খুব কঠিন কিছু ছিলো না।

সদস্যদের সবাইকে তাদের বিপরীত লিঙ্গের একজন কলম শিক্ষকের সাথে জুড়ে দেয়া হোত। আমার সাথে চৌদ্দ থেকে তেপান্ন বছর বয়সী এমন চব্বিশজন সদস্যের চিঠি চালাচালি হতো, যার বেশির ভাগ ছিলো পচিশ থেকে পয়ত্রিশ বছর বয়সী। বলাই বাহুল্য যে তারা আমার চাইতে বয়সে বড় ছিলো। প্রথম মাসে আমি খানিকটা ঘাবড়ে গিয়েছিলাম, যেসব মহিলার সাথে আমার চিঠিতে যোগাযোগ হতো তারা কেবল লেখক হিসেবেই আমার চাইতে ভালো ছিলো না, যোগাযোগ বিষয়ে তাদের অভিজ্ঞতাও ছিলো আমার চাইতে অনেক বেশি। এর আগে কালে ভদ্রে আমাকে চিঠি লিখতে হয়েছে, কিভাবে যে প্রথম মাসটা কেটে গেলো আমি টেরও পাইনি। সবসময়েই শিরদাড়ায় একটা শীতল অনুভূতি বয়ে যেতো, মনে হোত শিগগিরি সদস্যেরা একজন নতুন কলম শিক্ষক চেয়ে বসবে, যার অধিকার তাদের দেয়া হয়েছিলো সমবায়ের নিয়মে।

মাস চলে গেলো, কিন্তু একজন সদস্যও আমার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তুললো না। উপরন্তু, মালিক পক্ষ জানালো আমি নাকি সদস্যদের মাঝে বেশ জনপ্রিয়। দু'মাস পর আমি টের পেলাম আমার আয় বেড়েছে বেশ, ধন্যি আমার "পাণ্ডিত্য"। অদ্ভুত! এই মহিলারা আমার শিক্ষার উপর সম্পূর্ণ আস্থা রেখে চলছিলো। এটা বুঝতে পারার পর অনেক আয়েশে আর উদ্বেগহীন আমি তাদের সমালোচনা করতে শুরু করলাম।

সেসময়ে আমি ব্যাপারটা না বুঝলেও, আসলে এই মহিলাদের একাকীত্ব ছিলো (সমবায়ের পুরুষ সদস্যদের ক্ষেত্রেও অবশ্য একই কথা খাটে)। তারা লিখতে চাইতো, কিন্তু পড়বার কোনো মানুষ ছিলো না তাদের। ফ্যান ম্যাগাজিনে চিঠি পাঠানোর মতোন সামাজিক অবস্থান ছিলো না তাদের। তাদের চাওয়া ছিলো আরো ব্যক্তিগত কিছু - হোক না সেটা সমালোচনা কিংবা ভুল শুধরে দেয়ার মধ্য দিয়ে।

আর এভাবেই আমি পেরিয়ে যাচ্ছিলাম আমার কুড়ি বছরের চৌহদ্দি, বিকলাঙ্গ প্রাচীন শিলের মতোন একরাশ অসার চিঠির উষ্ণ হারেমে।

কতোরকম চিঠি যে ছিলো সেইসব! বিরক্তিকর, মজার অথবা দুঃখের পাঁচালি। দুর্ভাগ্যবশতঃ, এসব চিঠি নিজের কাছে রাখার অধিকার ছিলো না আমার (সমবায়ের নিয়মে কোম্পানিকে সব চিঠি ফেরত দিয়ে দিতে হোত), আর তাই চিঠিগুলোর বিস্তারিত আমার মনেও নেই, কিন্তু জীবনের সর্বক্ষেত্রব্যাপী চিঠিগুলোর উত্থান-পতন আমাকে ভাবায়, গভীর অন্বেষা থেকে শুরু করে নগন্য ছোট্ট কোনো বিষয়ের প্রশ্নে। তাদের পাঠানো বক্তব্যে আমার প্রায়শঃ মনে হোত - বাইশ বছরের একজন কলেজ ছাত্রের কাছে মনে হোত - একেবারেই বাস্তবতা বিবর্জিত, অর্থহীন। আমার জীবনের অভিজ্ঞতা কম বলে এমন উপলব্ধি তৈরী হয়েছিলো এমন নয়। এ বয়সে এসে আমি বুঝতে পারি অন্য মানুষকে কোনো কিছু বোঝানোটা আসলে বাস্তবতা নয়, বরং নিজের মতোন করেই বাস্তবতা তৈরী করে নিতে হয়। আর তাতেই তৈরী হয় মানব জন্মের অর্থবোধকতা। আমি তখন এভাবে বুঝতে শিখিনি, সেইসব সদ্যস্যরাও নয়। যে কারনেই হয়তো তাদের চিঠির বেশিরভাগ ঘটনাকেই আমার একেবারেই দ্বিমাত্রিক মনে হতো।

যখন আমার চাকরীটা ছেড়ে দেয়ার সময় হোলো, আমার অধীন থাকা কোনো সদস্যাই বিষয়টা মেনে নিতে পারে নি। আর এভাবেই আমার মনে হলো এই চিঠি লেখার সমাপ্তিহীন দুনিয়ায় আমার সব পাওয়া হয়ে গিয়েছে, যদিও আমারো খানিক দুঃখবোধ হচ্ছিলো। বুঝতে পারছিলাম এভাবে এতোগুলো মানুষের বন্ধুত্ব আমি আর কখনোই পাবো না।

(চলবে)

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

একজন মায়াবতী's picture


মজার চাকরী তো!!

মীর's picture


চমক একটা আসবে বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু এতটা আশা করি নি। পরের পর্ব তাড়াতাড়ি দিয়েন।

শ্রাবনের মেঘ's picture


মজার চাকরী তো

সামছা আকিদা জাহান's picture


বহ্‌ বেশ অন্যরকম, পরের পর্বের প্রতিক্ষায়।

হাসান রায়হান's picture


জোস

তানবীরা's picture


ভাস্করদা, আমি আবারো বলবো, আর একটু আশপাশ বর্ননা করেন তাহলে পড়তে আরাম হবে। লাইন টু লাইন অনুবাদ ঠিক কেমন যেন লাগে। জানি না বুঝাতে পারলাম কি না। Big smile

মীর's picture


ভাস্করদা' মহান মে দিবসের বিপ্লবী শুভেচ্ছা।
আছেন কেমন? Smile

রশীদা আফরোজ's picture


চমকিত হলাম।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

ভাস্কর's picture

নিজের সম্পর্কে

মনে প্রাণে আমিও হয়েছি ইকারুস, সূর্য তপ্ত দিনে গলে যায় আমার হৃদয়...