ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্নের অপমৃত্যু...

প্রভার স্কুল থেকে বাড়ি ফেরার একমাত্র পথ কোটাখালী খালের পাড়ের রাস্তাটা। প্রতিদিন এ রাস্তা ধরেই প্রায় দুই মাইল পথ পায়ে হেঁটেই ফিরতে হয় ওকে। অবশ্য এই দূরত্বটুকু কোন সমস্যা নয়, কেবল তালুকদারের হাটখোলার জায়গাটা পার হবার সময় কেবল বুকের ভিতর দুরু দুরু ভয় লাগে। ঐখানের ক্লাবঘরটার মধ্যে বসে যে লোকগুলো আড্ডা দেয় সবসময়, ওদের চাহনিটা যেন কেমন। লোকগুলো কেমন ফ্যাল ফ্যাল করে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে আর আজেবেজে কথা বলে। ও অনেকদিন ভেবেছে মাকে বলবে কিন্তু বলেনি, মার চিন্তা হবে তাই। প্রতিদিন মায়ের কষ্ট দেখে, তাঁর জন্য কিছু করতে না পেরে ভীষণ মন খারাপ লাগে প্রভার। সেই বাবা মারা যাবার পর থেকে মা একাই লড়ে যাচ্ছে বাঁচার জন্য, নিজে না খেয়ে হলেও ওর জন্য খাবারের ব্যবস্থা করেছে। কত গঞ্জনা সহ্য করে, ঝড়বৃষ্টি মাথায় নিয়ে কখনো মানুষের বাড়ি, কখনো চালের কলে কাজ করে চলেছে। এসব ভাবলে মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় ও নিজে মার জন্য কিছু করে। কিন্তু কি করবে ও? আর মা চান ও লেখাপড়াটা শিখুক। এইসব মানুষের শকুনি দৃষ্টি এড়িয়ে স্বপ্নের বাস্তবায়ন কতটুকু সম্ভব জানেনা প্রভা।
আজও স্কুল থেকে ফেরার সময় তালুকদারের হাটখোলার কাছে আসতেই একই অবস্থা ওর। খালের পাড়ে বসে তাস খেলায় ব্যস্ত পলাশ, মজনু, কাসেম আর গিয়াস। প্রভা ঐ জায়গাটা পার হবার সময় লক্ষ্য করে হারু মেম্বরের ছেলে গিয়াস ওর দিকে তাকিয়ে আছে। প্রায় প্রতিদিনই এই লোকটা এমন করে তাকিয়ে থাকে। ওর এই চাহনি দেখে বুকের ভিতর যেন কেঁপে ওঠে প্রভার। কয়েকদিন আগেও গিয়াস ঐ ঘরের বাইরে এসে পিছন থেকে ওকে ডাকছিল, ও কোনদিকে না তাকিয়ে জোরে হেঁটে চলে এসেছিল। অনেকটা নিঃশব্দে নিচের দিকে তাকিয়ে হেঁটে চলে কোটাখালী ব্রিজের দিকে। হঠাৎ পিছন থেকে ডাক শুনতে পেয়ে তাকিয়ে দেখে গিয়াস আজও ক্লাবঘর থেকে বের হয়ে ওর দিকে এগিয়ে আসছে। ভয়টা যেন আরও জাপটে ধরে ওকে, না থেমে আরও জোরে পা ফেলে এগিয়ে চলে। ও চেষ্টা করে দ্রুত হাঁটার জন্য কিন্তু সময়টা যেন স্থির হয়ে আছে, এই অল্প পথটুকুকে মনে হচ্ছে যোজন যোজন দূর। পিছনে গিয়াসের গলাটা আরও চড়া হচ্ছে। চারিদিকে তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে ভয়ের মাত্রা ধীরে ধীরে চরমে পৌছায়, ওর ভিতর থেকে কে যেন বলে, -প্রভা পালা! বাঁচতে হলে পালা!
প্রভা প্রাণপণে দৌড়াতে থাকে কোটাখালী ব্রিজের দিকে। মনে মনে বলে, এইতো আর একটু পথ! হঠাৎ পিছন থেকে গিয়াসের শক্ত হাত ওর কব্জি চেপে ধরলে থমকে দাঁড়ায় ও।
-এই, তোরে না খাড়াইতে কইলাম? গিয়াস বলে
-ক্যান, আমার লগে আপনের কি কাম?
-তোর লগে কতা আছে।
-আমার লগে আপনের কি কতা?
-এইহানে কওয়া যাইবো না, ঐদিকে ল। ক্লাবঘরের দিকে দেখিয়ে বলে গিয়াস
-হাত ছাড়েন, ব্যথা লাগতাছে।
গিয়াস হাত ছেড়ে দিয়ে সামনে এসে প্রভার পথ আগলে দাঁড়ায়।
-পথ ছাড়েন, আমারে যাইবার দেন।
-যাইবার দিমু, আগে আমার লগে ল
-ক্যান, আমি আপনের লগে যামু ক্যান?
গিয়াস প্রভার পথ আগলে দাঁড়িয়ে থাকলে ও কেঁদে ওঠে বলে, আমি আপনের কি করছি?
-কইছি না ঐদিকে ল, কতা শ্যাষ অইলেই চইলা যাবি
-না, আমি কোনহানে যামুনা
একসময় গিয়াস ওর হাত ধরে টানাটানি শুরু করে, ও চিৎকার করতে থাকে। হঠাৎ ব্রিজের দিকে চোখ পড়তেই দেখতে পায় তারাপদ ঘোষ ব্রিজের ঢাল থেকে নেমে এইদিকেই আসছে। প্রভা আরও জোরে চিৎকার করে তাঁকে ডাকতে থাকে। সেদিকে দৃষ্টি পড়তেই ওর হাত ছেড়ে ঘুরে হাটখোলার দিকে হাঁটা দেয় গিয়াস। যাবার সময় বলে- আইজক্যা বাইচা গেলি, একদিন তোরে দেইখ্যা নিমু।
প্রভার পা দু’টো যেন আটকে গেছে মাটির সাথে। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারাপদ কাছে এসে জিজ্ঞেস করে,
-কি অইছিলরে? ঐ বদমাইশটা তোর লগে এমন করতাছিল ক্যান? কি কয় ও?
-আমারে জোর কইরা ঐ ক্লাবঘরে নিতে চাইছিল। আপনে না আইলে যে আইজ কি অইতো!
-দেশটা শিয়াল আর শকুণে ভইরা গ্যাছে, যা বাড়ি যা। একলা এইপথে আর আইস না।
প্রভা আর দেরী না করে দ্রুত হাঁটতে থাকে বাড়ির পথে। নিজেকে রক্ষা করার একটা তাগিদ অনুভব করে, তাই এটুকু বোঝে এদের থেকে দূরে থাকতে হবে। মনে মনে ঠিক করে, এবার মাকে না বলে আর পারা যাবে না। মায়ের কথা ভবতে ভাবতে বাকি পথটুকু পার হয়ে বাড়ি পৌঁছে প্রভা।
আজ তিনদিন ধরে জ্বরে শয্যাশায়ী মমিন। কালরাতে জ্বরের ঘোরে সারারাত প্রলাপ বকেছে। দুশ্চিন্তায় নির্ঘুম কেটেছে পারুলের, মাথায় পানি আর জলপট্টি দেয়ার পর শেষরাতের দিকে কমে এসেছে কিছুটা। ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে টের পায়নি। ছোট ছেলেটার কান্না শুনে ঘুম ভেঙ্গে যায়। উঠে বসতেই দেখে রতন কাঁদতে কাঁদতে ঘরে ঢুকছে। পারুল জিজ্ঞেস করতেই ও বলে, রাজু মামায় আমগো ছোড ঘরের ধানের বস্তা ধরে টানাটানি করতেছিল, আমি বারণ করতেই আমারে গলা ধাক্কা দিয়া ফালাইয়া দিল। পারুল বাহিরে নেমে কোথাও রাজুকে দেখতে না পেয়ে পেয়ারা বেগমকে জানিয়ে আসে তার নিজের ছেলেমেয়ে সামলে রাখতে। পেয়ারা বেগমও একচোট নিতে ছাড়ে না, তবে বেশী কথা বাড়ায় না। বিভার মত ওকে কিছু বলে দমিয়ে রাখা যে সম্ভব না তা বেশ ভালভাবেই জানে সে। তাই ওকে বেশি ঘাঁটাতে যায়না।
মমিনের ঘুম ভেঙ্গে গেলে ক্লান্তদেহে উঠে বসে, কয়েকদিনের জ্বরে বেশ দুর্বল হয়ে পরেছে। পারু ভেজা কাপড় দিয়ে গা মুছিয়ে দিতে দিতে দেখে ছেলেমেয়ে নিয়ে শেফালি বাড়ির সদর দরজা দিয়ে প্রবেশ করছে। পারু মনে মনে ভাবে মফিজ মিয়ার তিন ছেলেমেয়ের মধ্যে একমাত্র এই শেফালিই বাবা-মার মত হয়নি। কিন্তু ওর কপালেই বেশী দুঃখ। শেফালিকে দেখে পেয়ারা বেগম উঠান ঝাড়ু দেয়া রেখে ওদের দিকে এগিয়ে যায়।
-কি অইলো? পনরদিন যাইতে না যাইতে আবার আইসা হাজির অইছস? শেফালির উদ্দেশ্যে বলে পেয়ারা বেগম
-বিয়া দেবার সময় দেইখা দেওনাই, এহন তো ভুগতে অইবই, শেফালি উত্তর দেয়।
-এইবার আবার কি দাবী লইয়া আইছস?
-এইহানে খাড়াইয়াই কইতে অইবো না ঘরে যাইতে দিবা?
পেয়ারা বেগম গজগজ করতে করতে ঘরে ঢুকে যায়। পারু ওর ঘর থেকেই শুনতে পায় পেয়ারা বেগমের গলা, সেই একই কথার পুনরাবৃত্তি। “তিনডা পোলা মাইয়া আমার হাড্ডি মাংস জ্বালাইয়া খাইল”। একপোলা জুয়া খেইলা টাকা উড়াইবো, আরেকজন হেই পথেই আটতাছে আর উনি কয়দিন পর পরই বাপের গোলাত্তন ধন সম্পদ উদ্ধারের জন্য হাজির হন! পারু মনে মনে হসে, পেয়ারা বেগমের কন্ঠে এই কথাগুলো দিনের মধ্যে বেশ কয়েকবারই শোনা হয় ওর।
সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে শেফালির মুখে জামাইয়ের নতুন বায়নার কথা শুনে মেজাজ চরমে উঠে যায় মফিজ মিয়ার। সে মেয়েকে বলে,
-কয়েকমাস আগেই তো দোকান দেবার লইগা টাকা দিলাম, এরে মধ্যে আবার টাকা?
-দোকানে লস খাইছে, এহন হ্যায় গাড়ি কিনবো, বলে ওঠে শেফালি।
-লাট সাবের ব্যাটা গাড়ি কিনব না কি করব হেইডা কি আমার দ্যাখতে অইব?’ আমি এহন কিছুই দিমুনা, হ্যারে আমার লগে দ্যাহা করতে কইস- মেয়ের উদ্দেশ্যে বলে মফিজ মিয়া।
বিয়ের পর থেকে এই কয়েক বছরে কম দেয়া হয়নি ওদের। এর আগেও দু’বার ওদের যৌতুকের দাবী মিটানো হয়েছে। ভাল ঘর দেখে মেয়েটার বিয়ে দিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু মেয়েটা সুখী হয়নি। আজ এটা, কাল এটা করে, টাকা পয়সাও কম দেয়নি কিন্তু যৌতুকের লোভ যেন আর মেটেনা ওর শ্বশুরপক্ষের। এবার একটা বোঝাপড়া করেই ছাড়বে। সে ঠিক করে জামাই না আসা পর্যন্ত সেফালিকে আর শশুরবাড়ি পাঠাবে না।
চলবে.....
আগের কিছু পর্বঃ
• ধূসর গোধূলিঃ আলোর নীচের অন্ধকার...
• ধূসর গোধূলিঃ মৌমাছি
• ধূসর গোধূলিঃ চেনা পথের গল্প...
• ধূসর গোধূলিঃ হারানো দিনের ডাক...
• ধূসর গোধূলিঃ দুরন্তপনা
• ধূসর গোধূলিঃ মায়া
• ধূসর গোধূলিঃ কোটাখালীর বাঁকে
• ধূসর গোধূলিঃ কাকতাড়ুয়া
• ধূসর গোধূলিঃ পূর্বকথন
• ধূসর গোধূলিঃ স্বপ্ন ডানায় চড়ে
ব্লগে পূর্বে প্রকাশিত "ধূসর গোধূলি" গল্পে যদিও বিভা-প্রভার শেষ পরিণতি দেখানো হয়েছে, কিন্তু মূল লেখায় এই চরিত্র দু’টির ব্যপ্তি আরও বেশী। ঘটনার ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্য এই চরিত্র দু’টির উপস্থিতি আবারও দেখানো হল। 





অসাধারণ
ধন্যবাদ আপনাকে। ব্লগটা কেমন ঘুমাচ্ছে!
মন্তব্য করুন