ইউজার লগইন

মুদ্রারাক্ষস

রোজনামচায় বনফুল লিখেছিলেন, ‘শাসকেরা পাকে-প্রকারে বলেছেন-বারো টাকা কেজির তেল দিয়ে ভাল করে ভাজ/চোদ্দ টাকা কেজির মাছ/তারপর আমাদের জয়ধ্বনি দিয়ে দু’হাত তুলে নাচ।’ বনফুল এই রোজনামচা লিখেছিলেন ১৯৭৭ সালে, ২ ফেব্র“য়ারি। খুব বেশিদিন আগের কথা নয়। অথচ বারো টাকা কেজির তেলের কথা শুনলে মনে হয় এ যেন শায়েস্তা খাঁর আমলের কিছুদিন পরের কথা। শায়েস্তা খাঁর কথা যখন এসেই গেলো তখন টাকায় আট মন চালের কথাও এসে যায়। এখন তো এক টাকার নোটই যাদুঘরে চলে গেছে, সুতরাং এক টাকায় আট মণ চাল কেনার প্রশ্নই আসে না।
শায়েস্তা খাঁর আমলের সেই স্বর্গসম সময়ের কথা লিখে গেছেন ঐতিহাসিকেরা। অর্থনীতিবিদেরা হলে লিখতেন অন্যরকম। কারণ টাকায় আট মন পাওয়া যেতো ঠিকই, কিন্তু টাকাটাই যে পাওয়া যেতো না। এক টাকা উপার্জনের ক্ষমতাই বেশিরভাগ মানুষের ছিল না সেসময়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে ক্রয়ক্ষমতা, প্রকৃত আয়, দ্রব্যমূল্য বিষয়গুলো অনেক পুরোনো। এর অর্থনৈতিক নাম মূল্যস্ফীতি বা মুদ্রাস্ফীতি।
পুরোনো গল্পটাই আবার বলি। একটা সময় ছিল যখন মানুষ পকেট ভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে যেত আর ব্যাগ ভর্তি বাজার নিয়ে যেত বাসায়। এখন কিন্তু মানুষ ব্যাগ ভর্তি টাকা নিয়ে বাজারে যায় আর পকেট ভর্তি বাজার নিয়ে বাসায় ফেরে। তবে মূল্যস্ফীতির সেরা কৌতুকটির জন্ম সম্ভবত সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নে। সেটি হচ্ছে-প্রশ্ন: রুবল, ডলার ও পাউন্ডের পারস্পরিক বিনিময় হার কত? উত্তর: এক পাউন্ড রুবল=এক ডলার।
ইতিহাস বলে, সেই তৃতীয় শতাব্দীতেই রোমান সাম্রাজ্যে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতি দেখা দিয়েছিল। সম্ভবত সেটাই বিশ্বে প্রথম মূল্যস্ফীতির ঘটনা। চীনে বড় ধরনের মূল্যস্ফীতির ঘটনা ছিল চতুর্দশ শতাব্দীতে, মুদ্রার বদলে পেপার নোট চালু করার পর। আর ইউরোপসহ অন্যত্র উচ্চ মূল্যস্ফীতির অভিজ্ঞতা ষোড়শ শতাব্দীতে। এসময় মার্কিন ও ফরাসি বিপ্লবের সময় প্রচুর মুদ্রা ধ্বংস করা হয়েছিল। এরও পরিণতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি।
ভাল ছিল উনিশ শতকটি। মূল্যস্ফীতি তো ছিলই না, বরং ছিল উলটোটা। যাকে বলে ডিফ্লেশন। নেপোলিয়নের যুদ্ধের সেই ১৮১৫ সাল থেকে ১৯১৪ সালে প্রথম মহাযুদ্ধ শুরুর আগ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি তেমন ছিল না বললেই চলে। বরং ১৯১৪ সালের যে দামস্তর, তা ১৮১৫ সময়ের তুলনায় কমই ছিল। উনিশ শতকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি কেবল ছিল যুক্তরাষ্ট্রে, গৃহযুদ্ধের কারণে। কিন্তু যুদ্ধের পর পরই মূল্যস্ফীতির চাপ কমে গিয়েছিল।
বিংশ শতাব্দীকে বলা হয় সব কিছুই বেশি বেশির শতক। এসময় ধ্বংসাত্মক যুদ্ধ বেশি হয়েছে, আণবিক বোমা বানানো হয়েছে, আবিষ্কারের সংখ্যাও অনেক বেশি করেছে, সমাজতন্ত্রের উত্থান-পতনও এই শতকে। বিজ্ঞানের বিস্ময়কর অগ্রগতির শতকও এটি। বিংশ শতাব্দী একইসঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতিরও শতক। এই শতকে মানুষ জীবন যাপনের মান যেমন বেড়েছে, নিকৃষ্টতম মূল্যস্ফীতির চাপে মানুষের ভোগান্তিও বেড়েছে। একবিংশ শতাব্দীর শুরুটাও কিন্তু ভাল হয়নি। মনে হচ্ছে এই শতকটি জুড়েও মূল্যস্ফীতি থাকবে আলোচনার বড় বিষয়।
রাজনীতিকে সবচেয়ে প্রভাবিত করে অর্থনীতির যে সূচকটি, সেটি এই মূল্যস্ফীতি। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ২০০৫ সালে একটি গবেষণা রিপোর্ট প্রকাশ করে বলেছে, রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার সঙ্গে উচ্চ মূল্যস্ফীতির গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ১০০টি দেশের ১৯৬০ থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত সময়ে উপাত্ত পর্যালোচনা করে আইএমএফ বলেছে, রাজনৈতিক অস্থি’তিশীলতা উচ্চ মূল্যস্ফীতি ডেকে নিয়ে আসে। আর যেসব দেশে অর্থনৈতিক স্বাধীনতা বেশি ও গণতন্ত্র আছে, সেসব দেশে মূল্যস্ফীতির চাপ কম থাকে। আবার রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে মূল্যস্ফীতির চাপ শিল্পোন্নত দেশগুলোর তুলনায় উন্নয়নশীল দেশে বেশি প্রভাব ফেলে।
রুডিগার ডরনবুশ জার্মানির একজন প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ। তিনি একটি গবেষণায় দেখিয়েছেন, বিশ্বব্যাপী সরকারগুলোর শাসনামলে অর্থনৈতিক বিষয়ে দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীরাই মন্ত্রীসভার রদবদলের শিকার হন সবচেয়ে বেশি এবং তাদের মন্ত্রিত্বের মেয়াদকালের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হারের নেতিবাচক সম্পর্ক রয়েছে।
মূল্যস্ফীতিকে বলা হয় অর্থনীতির নীরব ঘাতক। নিত্য পণ্যের দাম বাড়ায় মানুষকে বাড়তি অর্থ ব্যয় করতে হয়, সেই অর্থকে বলা হয় এক ধরনের বাধ্যতামূলক কর। এতে ক্রয় ক্ষমতা কমে যায় বিশেষ করে সীমিত আয়ের মানুষদের। হিসেবটা পরিষ্কার। আগে যে পণ্য কিনতে ১০০ টাকা ব্যয় করতে হতো, মূল্যস্ফীতির হার ১০ শতাংশ হলে সেই একই পণ্য কিনতে হবে ১১০ টাকায়। কিন্তু ওই বাড়তি ১০ টাকা আয় না বাড়লে কি হবে? ১০ টাকার পণ্য কম কিনতে হবে। মূল্যস্ফীতিতে এমনটাই ঘটে। প্রকৃত আয় কমে, ভোগও কমে যায়। মূল্যস্ফীতির বিরূপ প্রভাবের জন্য কেউ কেউ সেই নাটকের নামটি ধার করে একে মুদ্রারাক্ষসও বলেছেন।
স্বাধীনতার পর থেকেই কিন্তু বাংলাদেশে মুদ্রারাক্ষসের প্রবল প্রতাপ। ইতিহাস বলে, বাংলাদেশেও বিভিন্ন সময় সরকার অজনপ্রিয় হয়েছে এই উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণেই। ঠিক স্বাধীনতার পরে প্রথম বঙ্গবন্ধু সরকারের কথা এ ক্ষেত্রে যেমন বলা যায়, তেমনি সর্বশেষ সামরিক বাহিনী সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারও অজনপ্রিয় হয়েছিল বাজারের আগুনের কারণেই। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে এখনও ভোটে নামতে হয় রাজনৈতিক দলগুলোকে।
তখন যুদ্ধ চলছে। মুজিবনগর সরকার সরকারি কর্মকর্তাদের সর্বোচ্চ বেতন নির্ধারণ করে দিয়েছিল ৫শ টাকা। স্বাধীন বাংলাদেশেও এই সমতাবাদ নিয়ে যাওয়ার সুপারিশ করেছিল মুজিবনগর সরকারের প্লানিং সেল। সেই সেলের সদস্য অধ্যাপক আনিসুর রহমানের সুপারিশ ছিল সর্বোচ্চ বেতন ৭৫০ টাকা। তবে স্বাধীন দেশে এই বেতন খানিকটা বাড়িয়ে এক হাজার টাকা করা হয়েছিল। সে সময়ে দুই পাকিস্তানের বৈষম্য ছিল অর্থনীতির সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। স্বাধীন দেশের মানুষের মধ্যে বৈষম্য থাকবে না-এই ধারণা থেকেই সরকারী কর্মকর্তাদের বেতন কমানো হয়েছিল।
১৯৭৫ সালের ২ মে বিশ্বব্যাংক একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে জানায়, সরকারি শীর্ষ কর্মকর্তাদের বেতন কমানোর ফলে তাদের প্রকৃত আয় অনেক কমে যায়, কমে যায় দক্ষতা এবং উদ্যমেও প্রচণ্ড ঘাটতি দেখা দেয়। অর্থাৎ এর ফল একদমই ভাল হয়নি। ১৯৬৯-৭০ অর্থবছরে এখানে মাথাপিছু আয় ছিল ৯০ ডলার। স্বাধীনতার ১৮ মাস পরে সেই আয় ২০ শতাংশ কমে গিয়েছিল। এর পরের দুই বছর অবশ্য আয় বাড়লেও তা ৬৯-৭০ সময়ের পর্যায়ে কিন্তু পৌঁছায়নি।
১৯৭২ সালে অর্থনীতিতে অনেক সমস্যা ছিল। তবে সাধারণ মানুষকে বেশি ক্ষতি করেছিল মূল্যস্ফীতি। ১৯৭২ সালে মূল্যস্ফীতির হার ছিল ৫২ শতাংশ, ১৯৭৩ সালে ৩৩ শতাংশ এবং ১৯৭৪ সালে প্রথম ৬ মাসে ২১ শতাংশ, এর পর আরও বৃদ্ধি পায়। ১৯৭৪ এর শেষের দিকে মূল্যস্ফীতি ছিল ৮০ শতাংশ। ১৯৭৫ সালের ২ মে বিশ্বব্যাংক বাংলাদেশের অর্থনীতির উপর যে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছিল তা বলা ছিল, এর আগের তিন বছরে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৫০ শতাংশ। এতে আয়ের ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য তৈরি করেছিল। একটা হিসেব দেওয়া যেতে পারে। ১৯৭২ সালের জানুয়ারিতে দেশে এক মণ মধ্যম মানের চালের দর ছিল প্রায় ৪৯ টাকা ৬০ পয়সা। সেই চাল ১৯৭৫ সালের জানুয়ারিতে বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ৩৩০ টাকায়। এখানে মূল্যস্ফীতির সবচেয়ে বড় নির্ধারক এই চালের দামই।
উ”চ মূল্যস্ফীতি ও দুর্ভিক্ষের কারণে বঙ্গবন্ধু সরকার যথেষ্ট অজনপ্রিয় হয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের পর পাকাপোক্তভাবে ক্ষমতায় বসেন মেজর জেনারেল জিয়াউর রহমান। ১৯৭৬ সালের ২৬ জুন বাজেট বক্তৃতার প্রায় শুরুতেই তিনি উল্লেখ করেছিলেন মূল্যস্ফীতির কথা। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত উপদেষ্টা হিসাবে সেনাপ্রধান ও উপ-প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক হিসেবে দেওয়া বাজেটে জিয়াউর রহমান বলেছিলেন, ‘অভাবনীয় মুদ্রাস্ফীতি, যা আমাদের জনসাধারণের বিদ্যমান নিম্ন জীবনযাত্রার মানকে মারাÍক ভাবে ঝাঁঝরা করে দিচ্ছিল, তা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে আনা হয়েছে।’
এরপরের বছরগুলোতেও যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ছিল তা বলা যাবে না। ফলে ওই মেয়াদের বিএনপি সরকারের শেষ বাজেট (১৯৮১-৮২) বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমান বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, ‘অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারণ করার সময় মূল্যস্ফীতি প্রশাসনের লক্ষ্যের দিকে সর্বদা নজর রাখতে হবে। কারণ অনিয়ন্ত্রিত মূল্যস্ফীতি অর্থনৈতিক উন্নতি এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রধান শত্রু।’
এর পরের নয় বছর দুর্নীতিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার বছর। এ সময়ে মূল্যস্ফীতিও ছিল অনিয়ন্ত্রিত। উঠা-নামার মধ্যেই ছিল। শেষ দিকে এসে বিশ্বব্যাংকের নানা নজরদারির মধ্যে ছিল অর্থনীতি। আর্থিক খাত নিয়ে চলছিল সংস্কার কর্মসূচী। মূল্য সংযোজন কর বা ভ্যাট ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ চলছিল। এর মধ্যেই এরশাদ সরকারের পতন ঘটে।
এরপরের পুরো এক দশকেরও বেশি সময় ধরে মূল্যস্ফীতির চাপ তেমনটি সইতে হয়নি। বিশেষ করে ১৯৯১ থেকে ২০০৩ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি ছিল ৫ শতাংশের মধ্যেই। এসময় আন্তর্জাতিক বাজারেও চালের দাম ছিল কম। ফলে পর পর দুই সরকারকে খাদ্যমূল্য নিয়ে খুব বেশি অসন্তোষের মুখে পড়তে হয়নি। দেশের মানুষ দীর্ঘদিন পর অব্যাহত মূল্যস্ফীতির চাপ বুঝতে পারেনি। তবে পরিস্থিতি পালটাতে থাকে ২০০৪ সাল থেকে। ২০০১ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকার যখন ক্ষমতা নেয় সে সময় গড় মূল্যস্ফীতি ছিল মাত্র ১ দশমিক ৯৪ শতাংশ। আর ২০০৬ সালের অক্টোবরে ক্ষমতা ছেড়ে দেওয়ার সময় তারা মূল্যস্ফীতি রেখে যায় ৬ দশমিক ৯৮ শতাংশ। এর পরের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরে মূল্যস্ফীতি কোনোক্রমেই নিয়ন্ত্রণে ছিল না। ওই দুই বছরে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ৮ দশমিক ৫৫ শতাংশ।
সরকার গঠন করার পর ২০০৯ সালের শুরুতে মূল্যস্ফীতির হার কিন্তু‘ কমে আসছিল। কিন্তু তা ধরে রাখা যায়নি। এক বছর পরিস্তিতি মোটামুটি শান্ত থাকার পর আর কখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে ছিল না মূল্যস্ফীতি। বর্তমান সরকারের সময়ে গড় মূল্যস্ফীতি ৮ দশমিক ৪৮ শতাংশ। যদিও আওয়ামী লীগের নির্বাচনি ইশতিহারের ইশতাহারের প্রথম অগ্রাধিকারই ছিল দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ।
অর্থনীতিবিদদের নিয়ে একটা সুবিধা আছে। তারা সব সময় অন্য হাতে কিছু একটা রেখে দেন। ‘অন দ্য আদার হ্যান্ড’ বলতে অর্থনীতিবিদদের সব সময় একটা অন্য হাত থাকে। এবার সেই অন্য হাতে গল্প। মূল্যস্ফীতিকে যতই গালাগালি করি না কেন, এই মূল্যস্ফীতি একেবারে কমে যাওয়াটাও কিন্তু অর্থনীতির জন্য ভাল লক্ষ্মণ নয়। বলা যায়, উচ্চ মূল্যস্ফীতি খারাপ, কিন্তু ‘অন দ্য আদার হ্যান্ড’ প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য
কিছুটা মূল্যস্ফীতি থাকা কিন্তু ভাল। কারণ এতে উৎপাদন বাড়ে, উৎপাদকরা উৎপাদন বাড়াতে উৎসাহী হন।
কত শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি থাকা ভাল তা নিয়ে যদিও মতভেদ আছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) অবশ্য মনে করে, উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সাধারণত মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশ ছাড়িয়ে গেলে সেটাই বিপজ্জনক। কেননা তা প্রবৃদ্ধি কমিয়ে দেয় এবং দরিদ্রদের ক্ষতিগ্রস্ত করে। আবার ভারতে গবেষণা করে বলা হয়েছে, তাদের জন্য ৪ থেকে ৫ শতাংশ পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি থাকাটা ভাল। এর বেশি হলে দীর্ঘমেয়াদে প্রবৃদ্ধির উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। গবেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশেও এই হার ৪ থেকে ৫ শতাংশ। এ ক্ষেত্রে মজার কাজটি করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি যখন কোনো ভাবেই সাড়ে ৭ শতাংশের নীচে নামানো সম্ভব হচ্ছিল না তখন বাংলাদেশ ব্যাংক নতুন এক তত্ত্ব নিয়ে হাজির হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণা পত্রে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে সহনীয় মূল্যস্ফীতির হার হবে এখন ৭ থেকে ৮ শতাংশ। অর্থাৎ এই পর্যন্ত মূল্যস্ফীতি থাকাটা অর্থনীতির জন্য খারাপ নয়, বরং ভাল। যদিও অর্থনীতিবিদরা বাংলাদেশ ব্যাংকের এই গবেষণা মানছেন না। কারণ, ভারতে সহনীয় মাত্রার মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ হলে বাংলাদেশে তা কোনো ভাবেই এর বেশি হতে পারে না। কাগজে কলমের গবেষণার কি সাধ্য মুদ্রারাক্ষসকে রোখার।
আগেই বলা হয়েছে, রাজনীতিকে সবচেয়ে বিপাকে ফেলা অর্থনীতির সূচকটি হচ্ছে মূল্যস্ফীতি। উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কষ্ট বাড়ে সাধারণ মানুষের। তাহলে মূল্যস্ফীতি কি পুরোটাই ক্ষতি? উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে কিন্তু সরকারের লাভও আছে। বাজারে দ্রব্যমূল্য বাড়লে সম্ভবত সবচেয়ে খুশি হয় জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর। রাজস্ব আদায় বাড়াতে উচ্চ মূল্যস্ফীতিকে অবশ্যই রাজস্ব বান্ধব বলা যায়।
১৯৭৯ সালের বিশ্বব্যাংক রিপোর্ট থেকেই এর স্বীকৃতি পাওয়া যাবে। ওই বছরের মার্চে অর্থনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্বব্যাংক বলেছিল, ওই বছরে রাজস্ব আদায় বাজেট লক্ষ্যমাত্রাকেও ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এর কারণ ছিল দুটি। একটি হচ্ছে, আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আমদানি বৃদ্ধি। এর একটা সাম্প্রতিক প্রমাণও আছে। অনেকেই রাজস্ব আদায় বাড়ানোর জন্য সামরিক বাহিনী সমর্থিত বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকারকে কৃতিত্ব দেয়। অথচ দেখা যাচ্ছে উচ্চ মূল্যস্ফীতি সে সময়ের রাজস্ব আদায় বৃদ্ধির একটি বড় কারণ। ওই সময়ে খাদ্যপণ্য আমদানি বেড়েছিল। জ্বালানি আমদানিও বাড়ে। আবার দ্রব্যমূল্য বেশি থাকায় ভ্যাট আদায় বেড়েছিল সবচেয়ে বেশি। কারণ ভ্যাট আদায় হয় পরিমাণের উপর নয়, মূল্যের উপর। সুতরাং বলা যায়, মূল্যস্ফীতি বাড়লে আর কেউ না হোক, এনবিআরের মুখে একটু হাসি আসবেই।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) মাত্রই হিসেব দিয়ে বলেছে, বিদায়ি ২০১২-১৩ অর্থবছরে মূল্যস্ফীতির হার ছিল মাত্র ৭ দশমিক ৭ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে সাড়ে ৭ শতাংশ। সরকার এই সাফল্যে খুশি। তাহলে সেই গল্পটি বলি। তার জ্বর ১০৫ ডিগ্রি। অনেক চেষ্টা করেও জ্বর নামছে না। অতি কষ্টে জ্বর কমল। থার্মোমিটারে দেখা গেল জ্বর এখন ১০৩ ডিগ্রি। অর্থাৎ রোগ ভাল হয়নি, তাপ সামান্য কমেছে মাত্র। দেশের মূল্যস্ফীতি এখন এরকমই। এতে খুশি হওয়ার নেই। মুদ্রারাক্ষস বহাল তবিয়তেই আছে।
তথ্যসূত্র:
১. বৈষয়িক অনতিবৈষয়িক: শ্যামল চক্রবর্তী, সপ্তর্ষি প্রকাশন
২. অপহৃত বাংলাদেশ: মো: আনিসুর রহমান, ইউপিএল
৩. বাংলাদেশ: জাতি গঠনকালে এক অর্থনীতিবিদের কিছু কথা: নুরুল ইসলাম, ইউপিএল
৪. বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন প্রতিবেদন

ইত্তেফাকের ঈদ সংখ্যায় অর্থনীতি নিয়ে এই লেখাটি লিখেছিলাম

পোস্টটি ১৬ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


ইত্তেফাকেই পড়লাম কিছু দিন আগে পড়ে সেই লেখককে এই খুদে বার্তাও পাঠিয়ে দিয়েছি! লেখকের জন্য শুভকামনা!

টুটুল's picture


এত কিছু মনে রাখেন ক্যাম্নে? Smile

নিভৃত স্বপ্নচারী's picture


দারুণ, তথ্যবহুল পোষ্ট।
আবার পড়তে হবে।

জ্যোতি's picture


আমি তো শরমে জিগাই না, আজ আমিও জিগাই এত কিছু মনে রাখেন কেম্নে?
অআপনি না লিখলে এত কঠিন বিষয় কি আর পড়তাম! কত কি অজানা! এই যেমন-এক পাউন্ড রুবল=এক ডলার। Smile

রায়েহাত শুভ's picture


এক পাউন্ড রুবল=এক ডলার

কবি এইখানে কোন রুবল এর কথা বলেছেন Tongue

জ্যোতি's picture


চোক্ষে দেকতাছেন না!!!!!

শওকত মাসুম's picture


তাইলে তুমিই কও রুবল কয় পাউন্ড?

জ্যোতি's picture


মাইর গুল্লি

মীর's picture


সহজ ভাষায় দারুণ করে একটা কঠিন বিষয় তুলে এনেছেন মাসুম ভাই। আপনি কোনো একটা ইউনিভার্সিটিতে জয়েন করেন। ছেলে-পিলের খুব উপকার হবে।

১০

সামছা আকিদা জাহান's picture


খুব কঠিন জিনিস। এখন কঠিন কিছু পড়লে নিচে নামতে নামতে উপরের অংশ ভুলে যাই।:)

১১

তানবীরা's picture


অতিরিকত মূল্যস্ফীতি আর কালোটাকার ঘনিষঠতার ব্যাপারে জানতে চাই

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

শওকত মাসুম's picture

নিজের সম্পর্কে

লেখালেখি ছাড়া এই জীবনে আর কিছুই শিখি নাই।