ইউজার লগইন

মিথ্যার ফাঁদে সরলতার সফর [”চক্বর" ২য় কিস্তি]

মিথ্যার ফাঁদে সরলতার সফর

এক একটা বয়স থাকে তখন মানুষের ব্যতিক্রম কিছু করার ইচ্ছা থাকে। চুরি করে আঁচার খেলেও তখন মানুষ বিরাট ঘটনা ঘটাতে পেরেছে বলে নিজের পিঠ নিজেই চাপড়ে দেয়। ক্লাস টেনে উঠে যাওয়াটা স্কুল জীবনে মনে হয় সবচাইতে বড় প্রাপ্তি। নিজেকে কেমন বড় বড় লাগে। মনে হতে থাকে এবার আর অন্য কারো কথা নয় নিজের যা মন চায় তাই বুঝি করার এক্তিয়ার আমাদের হাতে এলো বলে!

মঙ্গলবার, ডিসেম্বর ২১, ১৯৯৩। আমাদের ক্লাস টেন ও শেষ। টেস্ট পরীক্ষা হয়ে গেছে। নতুন ফর্মেটে পরীক্ষর ফরম পূরণ হবে। এই ফরমের নাম ”ওএমআর”, গোল্লা পূরণ করে নাম লিখতে হয়। ভুল করার কোন সুযোগ নেই। তাই একটা ট্রেনিং ক্লাসের দিন ধার্য করা হয়েছে এই ২১.১২.৯৩ মঙ্গলবারে। আমরা ক্লাসের লিডার টাইপের জিনিস। আমাদের কি এসব ট্রেনিং ক্লাসে যাওয়া সাজে! তার উপর এইদিন আমাদের এক বান্ধবীর জন্মদিন। কাজে কাজেই আমরা প্ল্যান করলাম স্কুলের নাম করে ঠিকই বের হওয়া হবে। কিন্তু যাওয়া হবে অন্য কোথাও অন্য কোনখানে।

আমাদের তখন ৬জনের গ্রুপ। তার মাঝে দুজন ভীষণ আপত্তি জানালো, তারা যেতে চায় না। ভুজুং ভাজুং দিয়ে ঐ দুজনকে আমরা রাজি করে ফেললাম। ঢাকা শহরে এত এত বছর থাকি আমরা, কেউ স্মৃতিসৌধ দেখতে যাইনি। আমাদের অ্যডভেঞ্চারের জায়গা ঠিক হলো সাভার জতীয় স্মৃতিসৌধ। কথা মতো মীরপুর এক নম্বর বাসস্ট্যান্ডে একে একে সবাই জড়ো হলাম। দুটা বেবী ট্যাক্সিতে ৩জন ৩জন করে উঠলাম। মনের ভেতর শংকা তো আছেই, এই প্রথম বাসায় বড় মাপের কোন মিথ্যা বলা সবার। তবু নিয়ম ভাঙ্গার খুশি আমাদের মনে আনন্দের বুদবুদ জড়ো করেই চলেছে।

এক সময় পৌঁছে গেলাম স্মৃতিসৌধ এলাকায়। না এখনো গেট খোলেনি। কি আর করা যাবে! আমরা আশপাশের এলাকায় হাঁটাহাঁটি শুরু করলাম। এক মহিলা মাটির চুলাতে রান্না করছে। আমরা জোর করে তার সাথে ছবি তুললাম। সবাই আমাদের ঘুরে ঘুরে দেখছে। ছ’টা ১৫ বছর বয়সী মেয়ে সাথে কোন অভিভাবক ছাড়া ঘুরছে ব্যাপারটা খুব একটা সহজে মেনে নেয়ার ব্যাপার তখন ছিল না। হাঁটতে হাঁটতে খুব পানির পিপাসা পেল। এক বাসায় কলিং বেল চাপলাম আমরা নির্ভয়ে। আমাদেরকে হাসতে হাসতেই সেই বাসা থেকে পানি খেতে দিল।

এবার সময় হলো স্মৃতিসৌধ তে প্রবেশের। দেখলাম। সামনের পানিতে যে ছায়া পড়ে স্মৃতিসৌধের তা বারবার ঘুরে ঘুরে দেখলাম, প্রথম যখন কিন্ডারগার্টেনে ভর্তি হয়েছিলাম তখন সেই স্কুল থেকে আমি একবার এখানে এসেছিলাম আমার মনে পড়লো। আমি খুব আগ্রহ নিয়ে পানির রং দেখতে থাকলাম। কারণ আমার মনে হচ্ছিলো সেই শিশু বয়সে আমি এখানে সবুজ পানি দেখেছিলাম। আমাদের কাছে জায়গাটা খুব একটা ছোট মনে হলো না। কত রকমের ফুল! খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব দেখলাম। নির্মাণ শৈলী নিয়ে আমাদের বিস্ময়ের শেষ নেই। টিভিতে যা দেখি খবরের আগে সেটা একটা মিনিয়েচার ছাড়া আর কিছুই না। অনেক দর্শনার্থী দেখলাম জুতা নিয়ে একদম উপরে উঠে যাচ্ছে। আমরা সেটা করলাম না, জুতা খুলেই উঠলাম। বেলা বাড়ার সাথে সাথে শান্তির পরিবেশটা কেমন মিইয়ে যেতে থাকলো। ২-৪টা ছবি উঠানোর পর আমরা গাছের ছায়ায় গিয়ে বসলাম। দুপুরে কোথায় খাওয়া যায় এ নিয়ে আলোচনা শুরু হলো। কাছেই পর্যটনের রেস্টুরেন্ট আছে। আমরা ঠিক করলাম সেখানেই লাঞ্চ সারব।

পর্যটনের রেস্টুরেন্ট যে এমন গলা কাটা এবং ভয়ংকর রান্নার হবে তা আমাদের জানা থাকার কোনই কারণ নেই। আমরা ধরা খেলাম। শুধু বাসায় ফেরার ভাড়াটুকু বাঁচিয়ে কোনমতে বিল দিয়ে আমরা সম্মান হাতে নিয়ে বের হলাম। ও মা, সাভারে কিসের যেন মেলা হচ্ছে...মনের ভয় মনে চেপে মেলা দেখলাম খানিকণ। তারপর আবার বেবীট্যাক্সি দুটাতে ৬জন।

প্রথম ট্যাক্সির পেছন পেছন দ্বিতীয় ট্যাক্সি। কিছুক্ষণ পরে দেখি পেছনের ট্যাক্সি আর আসছে না। আমরা থামলাম, বাকী বান্ধবীদের কি হয়েছে বুঝতে। ২০মিনিট পর সেই ট্যাক্সি এলো আমাদের কাছে। জিজ্ঞেস করলাম কি হয়েছিলো - ওদের পুলিশ আটকেছিলো কারণ আজকেই ৩টা মেয়ে কোথা থেকে যেন পালিয়েছে, ওরাও ট্যাক্সিতে ৩জন থাকাতে সন্দেহবশত ওদের আটকেছে। আমাদের ভয়ের ষোল এর উপর দুই আঠারো কলা পূর্ণ হবার উপক্রম।

আল্লাহ আল্লাহ করতে করতে মীরপুর এক নম্বর বাসস্ট্যান্ডে তো পৌঁছলাম। বাসায় সবার জন্য দারুণ সারপ্রাইজ অপেক্ষা করছিলো সেটা কি আর আমরা জানি! এতবছরের স্কুল জীবনে যা হয়নি তাই ঘটেছে। স্কুল থেকে বাসায় সবার ফোন গিয়েছে। আমরা যে ফরম পূরণের অনুশীলন ক্লাসে যাইনি তা বাসায় জানাজানি হয়ে গিয়েছে এবং যারা অনুশীলন ক্লাসে অনুপস্থিত ছিল তাদেরকে ২২.১২.৯৩ তে ফরম পূরণ করতে দেয়া হবে না। অনুপস্থিত সবার ফরম পূরণ হবে ২৬.১২.৯৩ তে তাও হেড স্যার সফদার আলীর তত্ত্বাবধানে।

২১ তারিখ শুধু আমরা ৬জন নই, অনেক ছেলেও অনুপস্থিত ছিল। কারণ তখন সাফ গেমস চলছে এবং ২১ তারিখে মেয়েদের মীরপুরের সুইমিং পুলে প্রতিযোগীতা ছিল। সেই প্রতিযোগীতা বিনা টিকিটে দেখা যায়। আমাদের স্কুলের ছেলেরা বিনা টিকিটে সুইমিং কস্টিউম পরিহিতা নারীদের দেখতে দল বেঁধে গিয়েছিলো এবং ওরাও দল বেঁধে ধরা।

একদিনের একটা মিথ্যা বাসায় আমাদের সবার গ্রহণযোগ্যতা নামিয়ে আনলো একনিমিষেই। ২২,২৩,২৪,২৫ চারটা দিন আমাদের অপরাধবোধ না দিলো ঘুমাতে, খেতে, না পড়া লেখা করতে। ২৬ তারিখে স্মৃতিসৌধ মাথায় রেখে গেলাম ফরম ফিলাপে। ছেলেদের সারি করে পেটানো হচ্ছে। তারপরে আমাদের পালা। হঠাত আমরা সবাই থমকে গেলাম। কারণ পাপ্পু নামে আমাদের এক ক্লাসমেট ঢুকেছে রুমে এবং সে হেড স্যারের হাতে ধরা। আমাদের বোধবুদ্ধিহীন চেতনায় শুনতে পেলাম ”কিস্ কি এখন পশ্চাতদেশে খায় না কি?” সবাই হতভম্ব অবস্থা কাটিয়ে পাপ্পুর দিকে তাকালাম, সে পরে এসেছে একট জিন্স এবং সেই প্যান্টের পকেটের উপর লিখা ”কিস্ মি”। হেড স্যার হাত মুঠি করে পাপ্পুর সেই পকেটের উপর ঘুষি দিলেন এবং আবার বললেন এত শক্ত জায়গায় কিভাবে কিস্ করা যাবে!

হেড স্যারের পিটানো পর্ব এভাবেই শেষ হয়ে গেল। আমাদের কাছ পর্যন্ত বেত ঘুরে আর এলো না। আমরা এসএসসি পরীক্ষা দেবার যোগ্যতা অর্জন করলাম।

যারা প্রথম কিস্তি পড়তে আগ্রহী তাদের জন্যে লিংক
http://www.facebook.com/note.php?note_id=10150269753426682

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

লীনা দিলরুবা's picture


দারুণ! হেড স্যার এত ভয়ঙ্কর কাজ করছিল তুমি তারে ছাইড়া দিছলা?

যাই প্রথম পর্ব পড়ে আসি।

মেঘকন্যা's picture


মে বাচ্চা হুঁ ঐ সময়....

রাসেল আশরাফ's picture


কলেজে পড়তে একবার একটা নাটকে গ্রামবাসীর ভুমিকায় অভিনয় করেছিলাম।বাবা-মার ধারণা ছিলো সেই নাটকের জন্য নাকি ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হতে পারিনি।আপনাকে সেই ধরনের খোঁটা খেতে হয় নি দেখে ভালো লাগলো।

লেখা মজা লাগছে।কিন্তু কিছু টাইপো আছে যা চোখে লাগছে।

আর ফেসবুক লিঙ্কটা বোধহয় আমজনতার জন্য উন্মুক্ত না।এই কারণে দেখা যাচ্ছে না।

মেঘকন্যা's picture


বিজয়ে লিখে কনভার্ট করে আনতে হয়তো তখন বানান ভেঙ্গে যায়, একটু কষ্ট করে পড়ে নিন।ধন্যবাদ

ময়নামতি, কোটবাড়ি, বার্ডস - বন্ধুসনে, প্রথম ভ্রমণে
by Afsana Kishwar Lochan on Sunday, August 28, 2011 at 1:20am

গুগলে সার্চ দিলে নিশ্চিত অনেক সুন্দর সুন্দর ছবি পাওয়া যাবে। সেগুলো দিয়ে মোটামুটি যা লিখতে চাই তার ফাঁকে ফাঁকে ছবির অভাবও পূরণ করা যাবে। এই কৃত্রিমতা করতে ইচ্ছে করছে না। গুগলে তো আমাদের সেইসব সময়ের চেহারা পাওয়া যাবে না। যখন আমাদের ক্যামেরা ছিল না, একটা কোডাক অটো ক্যামেরা যেন কার কাছ থেকে এনেছিলাম! তারপর কত বছর পর একটা ইয়াশিকা অটো ক্যামেরা কিনলমা, সেটা দিয়ে কত কত ছবি তুলেছি।

কোথায় কোথায় গিয়েছি হঠাত লিখার সাধ জেগেছে, জীবনের চক্রাকার ঘূর্ণনের সাথে এক একটা সময়ের যোগসূত্র কেমন যেন লাগে। গ্রাম নিয়ে মানুষের কত কত আদিখ্যেতা দেখি। আমার কাছে গ্রাম কোন মোহনীয় কিছু লাগল না কোনকালেই। আমি কোনভাবেই গ্রামে যেতে চাইনি সেই ছোট সময় থেকেই। টয়লেটের ঝামেলা, গোসলের ঝামেলা, গ্রামের সমবয়সী বাচ্চাদের পাকা পাকা কথা, ক্ষেতের মধ্যে পা দিলেই বিষ্ঠা পাওয়া, কাদা, এগুলো আমাকে টানেনি কখনো। কিন্তু প্রকৃতি ভালোবাসি। দলেবলে, একা, পরিবারের সাথে, বন্ধুদের সাথে প্রকৃতির কাছে ছুটে গিয়েছি বারবার। অনেককিছু মনে পড়ে, আবার স্মৃতি থেকে হারিয়েও যাচ্ছে।

২০১১ সালে কোথাও যেতে পারিনি প্রকৃতির আরেক আশীর্বাদের ফসলকে সহি সালামতে পৃথিবীর আলো দেখানোর অভিপ্রায়ে। নিজেকে মনে পড়ে অনেক পথে, অনেক জায়গার মানস ছবিতে- তাই এই ”চক্বর" ...

ময়নামতি, কোটবাড়ি, বার্ডস - বন্ধুসনে, প্রথম ভ্রমণে

এত্ত ভোরে উঠতে হবে বুঝতে পারিনি। আজকে বুধবার। এখন সকাল সাড়ে চারটা। আমাকে যে কোনভাবেই ছ’টার মধ্যে স্কুলে পৌঁছাতে হবে। আব্বু এতবছরে কোনদিন স্কুলে দিয়ে আসেনি। এখন এই কাস টেনে ১৯৯৩ সালে, আজকে যাবে আমার সাথে কারণ এত ভোরে বাস নাও পেতে পারি। আমার অবশ্য তেমন কষ্ট হচ্ছে না। আসলে সারারাত তেমন ঘুমাতেই পারিনি। এত বছর স্কুলে পড়েছি, এই প্রথম আমাদের স্কুল থেকে কোথাও বেড়াতে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা অনেক পরিকল্পনা করেছি। আমাদের বন্ধু লিমা একটা অটো ক্যামেরাও যোগাড় করেছে। আমার ছবি তুলতে পারব। আজকে স্কুলের পিকনিক। সাড়ে ছটায় বাস ছাড়বে। সুতরাং যেভাবেই হোক ছ’টার মধ্যে স্কুল পৌঁছাতে হবে।

মেয়েরা আর ছেলেরা কাস টেনের একই জায়গায় একই সাথে যেতে পারবে না। যদিও একই টাইমে বাস ছাড়বে। যাক্, আমি সময়মতো এসে পৌঁছেছি। বান্ধবীরা সবাই ঠিকঠাক এলো কি না এখন এটা দেখাই আমার বড় কাজ। আমাদের মনিপুর স্কুলের দুঃখ রাস্তা আর মাঠ না থাকা। মাঝে মাঝেই মনে হয় চীনের হোয়াংহো নদীর দুঃখ দূর হলেও মনিপুর স্কুলের দুঃখ বুঝি ঘুচবার নয়! একটা মানুষ আধ ইঞ্চি জায়গা ছাড়ে না, না রাস্তা চওড়া হয় না আমাদেরযাতায়াতের কোন সুরাহা হয়। পিকনিকের বাস স্কুল পর্যন্ত আসতে পারেনি। আমাদের সবাইকে হেঁটে মীরপুর দু নম্বর থানার সামনে যেতে হবে, সেখানে বাস রাখা আছে। স্যার ম্যাডামরা ব্যস্ত হয়ে ছোটাছুটি করছেন। আমাদেরকে গুণে গুণে বাসে উঠাচ্ছেন। বাসে উঠতে উঠতে কে যেন গেইটের কাছ থেকে চাপা গলায় বলে উঠলো - আজকের দিনেও স্কুল ড্রেস পরতে হবে, উফ্!

বাস ছাড়তে ছাড়তে সকাল সাড়ে আটটা। আমরা যে কয়জন ঘনিষ্ঠ সবাই একই বাসে উঠেছি। পোশাক নিয়ে আমাদের কোন মাথাব্যথা নেই। যেতে পারছি এই না কত! কত কাঠ খড় পোড়তে হয়েছে। তাও আবার ঢাকার বাইরে দিনে গিয়ে দিনে ফিরে আসা এ কি কম কথা! খুব ছোটবেলায় একবার কুমিল্লার ময়নামতি, কোর্টবাড়ি, বার্ডস এ গিয়েছিলাম, আমার স্মৃতিতে এখন সবই ঝাপসা।

শেষ পর্যন্ত বাস ছাড়লো...আমাদের বাসে দেখা যায় মাইকও আছে। কি মজা! এক বাস আরেক বাসকে অতিক্রম করলেই আমরা সবাই একসাথে হই হই করে উঠলাম। এর মধ্যে জমিয়ে “আন্তাকসারি” খেলা শুরু হয়ে গেছে। ঢাকা শহর আস্তে আস্তে পেছনে পড়ছে। আমাদের বাসের সবাই স্যারের কাছে নাশতা বিলি করার আব্দার জানালো। আজকে স্যাররাও একটু ভিন্ন মেজাজে আছেন, হাতে নম্বর দেয়া বেত নেই, দিনের শুরুতেই আমাকে বা আমার বান্ধবী শর্মিলাকে উত্তম মধ্যম দেননি।

সেই কোন ভোরে উঠেছি, অত ভোরে কি আর নাশতা খাওয়া যায়। সবাই কলা কেকই অনেক আগ্রহ নিয়ে খেলাম। এই যে, এই যে ঢাকার গেট শেষ হচ্ছে কাঁচপুর চলে এসেছি। ঐ যে ছেলেদের বাস, ওরা আগে যাবে বার্ডসে, আমরা থাকব তখন ময়নামতি-কোর্টবাড়ি। কি যে এক সিস্টেম একই স্কুলের মর্নিং শিফট আর ডে শিফট আমরা কিন্তু কেউ কাউকে এত বছরেও চিনি না। আর তো চেনার প্রশ্নও উঠে না। আসছে বছরে এসএসসি দিয়ে কে কোথায় চলে যাব কে জানে!

বাস এখন জোরেই ছুটছে। দাউদকান্দি আর মেঘনা, আগে কুমিল্লা যেতে এই দুটো ফেরি পড়তো। এখন মেঘনা ব্রীজ হয়ে গেছে। আমার গ্রামের বাড়ি ঐদিকে হওয়াতে আমি সবাইকে একটু আধটু জ্ঞান দিতে থাকলাম। তানির আনা ওয়াকম্যানে মিতালী মূখার্জী আর তপন চৌধুরীর গাওয়া যেটুকু সময় তুমি থাকো কাছে শুনতে শুনতে আমি গোলমালটা কি নিয়ে লাগলো সেটা মিস্ করলাম। কান থেকে হেডফোন নামানোর পর আসল ঘটনা বুঝলাম। জানালার পাশে বসা এক সহপাঠীর মুখমন্ডল রাস্তা দিয়ে যাওয়া এক রিকশা ভ্যানের চালক ইচ্ছে করে ছুঁয়ে দিয়ে হাসতে হাসতে চলে গেছে। আমাদের বাসটা ব্রীজে উাবার আগে একটা লাইনে দাঁড়ানো, স্থির অবস্থায় - তার যারপরনাই সুযোগ ভ্যানচালক নিয়ে গেল। আমরা আমাদের ঐ ফ্রেন্ডকে হাসি তামাশায় ভুলাতে চেষ্টা করলাম। কারণ এই মুহূর্তে বাস থামিয়ে কিছু করার উপায় নেই। আর এগুলো এখন আমাদের গা সওয়া - নারী মানে সবার বিনোদনের উপকরণ আমরা এই বয়সেই এটা খুব ভালো বুঝে গেছি।

আমরা বারোটার সময় অবশেষে ময়নামতি পৌঁছালাম। লিমা এই ফাঁকে আমাদের গ্র“পটার ছবি তোলার কাজ আস্তে আস্তে এগিয়ে নিচ্ছে। আমরা অবশ্য ৬জনে চাঁদা তুলে এক্সট্রা ফিল্মও নিয়ে এসেছি। মাবরুকা, শর্মিলা, জেরীন, ঝুমা, আমি কাছাকাছি এসে দাঁড়াই। আমাদের এতবছরের স্কুল জীবনে প্রথম কোথাও একসাথে ছবি তোলা হচ্ছে, লিমাকেও বলি দাঁড়াতে। পুরোট ঘুওে দেখবার আগেই, ময়নামতির ইতিহাস জানবার আগেই লুতফর রহমান স্যার, আতিক স্যার আমাদের সবাইকে তাড়া দেন, আবার লাইন এবার খাওয়া দেয়া হবে। টুসি কানের কাছে মুখ এনে বলে, ’দোস্ত এতবার ম্যাডামদের জিজ্ঞেস করলাম কোথায় ফ্রেশ হওয়া যায় কছিুই বলে না। এভাবে কি খাবার খাওয়া যাবে!’ কি বলব! সেই কাক উঠবার আগে বাথরুমে গিয়েছি এখন দুপুর সাড়ে বারোটা, সবার অবস্থা কমবেশি একই। এ ব্যাপারে স্যার ম্যাডামদের কোন উচ্চবাচ্য নেই।

আমাদের মূর্র্তিমান আতংক বড়আপা (অ্যাসিস্ট্যান্ট হেড মিস্ট্রেস) কেমন জানি বুলেটের গতিতে আমাদের খাবারের লাইনের দিকে ছুটে আসছেন। আমি আর শর্মিলা প্রমাদ গুণি। কারণ স্যার ম্যাডামদের ছোটাছুটি মানেই কারণে অকারণে একবার আমাদের দুজনের মার খাওয়া। না আল্লাহ মেহেরবান, খুব চাপা গলায় বললেও আমরা ঠিকই শুনি আতিক স্যার আর বড় আপার আলাপ, সামনের বাস থেকে একটা মেয়ে উধাও, তার ছেলে বন্ধু না কি পেছন পেছন মাইক্রো নিয়ে এসেছিলো, খাবার বিতরণের সুযোগে সেই মেয়ে হাওয়া। আমরা নিমেষেই বুঝে যাই এ সি সেকশনের কোন মেয়ের কাজ। আমাদের রীতিমতো আনন্দে দাঁত বের হয়ে যাওয়ার অবস্থা বড় আপার চেহারা দেখে। মনে মনে বলি, খুব ভালো হয়েছে, খুবই সুন্দর হয়েছে।

কি খেলাম কেন খেলাম কেউই তেমন বুঝলাম না, এখন কোর্টবাড়ি যেতে হবে। আমাদের এক রোল ফিল্ম শেষ। কিন্তু লিমা ফিল্ম খুলতে পারছে না। হুজুর স্যার বিজ্ঞের মতো এগিয়ে এলেন এবং কোন কিছু বুঝবার আগেই ক্যামেরার যেখানে ফিল্ম থাকে সেই ঢাকনা খুলে ফেললেন। আমাদের এতক্ষণ তোলা সব ছবি জ্বলে গেল নিমেষেই। স্যারের গুষ্টি উদ্ধার করতে করতে আমরা নতুন ফিল্ম লোড করলাম। মনটা আসলেই খারাপ হয়ে গেল। ব্যাটা মগা, যা জানিস না সেটা নিয়ে এই ভাব করার কোন দরকার ছিল! কোর্টবাড়ি নেমে দাঁড়ানোর আগেই আবার বাসে উঠে বসে পড়তে হলো। বার্ডস এ যাবে।

বার্ডস এ এসে আমাদের মন ভালো হয়ে গেল। ওমা, লিমা দেখি প্রায় কাঁদো কাঁদো-ধার করে আনা ক্যামেরার কাভার খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না, হুজুর স্যার কোর্টবাড়িতে পকেটে রেখেছিলেন পাঞ্জাবীর এখন আর দিতে পারছেন না। আহাম্মকটার দাঁড়ি টেনে ছিঁড়ে ফেলতে পারতাম! ’দোস্ত, স্টেডিয়াম থেকে কিনে আনব আমরা, মন খারাপ করিস না, আর ক্যামেরা কারও হাতে দিস না।’ এ বলে আমি লিমাকে সান্ত্বণা দিলাম। বার্ডসে প্রচুর গাছ। আমাদেরকে বরই খাবার অনুমতি দেয়া হলো। সবাই এতক্ষণে একটু ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসতে পারলাম। তাড়া কম বুঝলাম। এখানকার দারোয়ান আংকেল জানালেন একটু আগে আমাদের স্কুলের ছেলে সহপাঠীরা এ জায়গা থেকে গিয়েছে, তারা সুইমিং পুলেও নেমেছিলো, আমরা নামতে চাই কি না। আমরা আফসোসের হাসি দিয়ে বললাম আমরা তো আর কোন কাপড় আনিনি। এর মাঝে শর্মিলা বরই পাড়তে গিয়ে হাত কেটে ফেলেছে। ওর জন্য এটা তেমন কোন ব্যাপার না, ও আরেকহাতে পাতা দিয়ে আঙ্গুল চেপে দাঁড়িয়ে আরেক বান্ধবীর হাতে বরই খেয়ে যাচ্ছে কিছুই হয়নি এমন ভঙ্গীমা করে।

এবার ফেরার পালা। বিকেল হয়ে গেছে। শরীরের যাবতীয় অনুভূতি হারিয়ে গেছে। শুধু নির্দেশ পালন করছি। কিছুদূর যেতেই আমাদের বাসটার চাকা পাংচার। টায়ার চেঞ্জ হলো। স্কুলে গিয়ে নামলাম রাত ন’টায়। সবার গার্ডিয়ান এসে বসে আছে যার যার মেয়েকে বাসায় নিয়ে যাবার জন্যে। জীবনে প্রথমবারের মতো স্কুল থেকে বাসে বা রিকশায় না এসে আব্বুর সাথে বেবী ট্যাক্সিতে বাসায় ফিরলাম যখন তখন রাত পৌনে দশটা।

***প্রথম পর্ব। সমস্যা এটা প্রকাশিত জিনিস কি এখানে দেয়া যাবে?? জানি না।

মেঘকন্যা's picture


At BARDS.jpg

তানবীরা's picture


Big smile Big smile Big smile

তাড়াহুড়ার বানান ভুলে আমারেও ক্রশ করবা ইনশাল্লাহ Laughing out loud

মেঘকন্যা's picture


বানান ভুল আমি ক্বচিত করি। বললাম তো লিখা কনভাটর্ করে আনতে হয় তাই এত ভুল, আসলে ভেঙ্গে যায় শব্দ।
পড়ার জন্য ধন্যবাদ

হাসান রায়হান's picture


দারুনস।
ময়নামতিতে আমিও একবার পিকনিকে গেছিলাম। তখন কলেজে পড়ি। যাইতে যাইতে মনে হয় বিকাল হয়ে গেছিলো ফেরির ঝামেলায়। রান্না, খাইতে সন্ধা। ফিরতে রাত।

মেঘকন্যা's picture


তাড়াহুড়োয় আমরা তেমনভাবে কিছু দেখতেই পারিনি:(

১০

রশীদা আফরোজ's picture


ময়নামতিতে গেছি ১৯৮৮ সালে পরিবারের সাথে, ১৯৯৩ তে স্কুল থেকে, তারপর কর্মজীবনে কলেজ থেকে ছাত্রীদের নিয়ে, বিবাহিত জীবনে স্বামীর জন্মদিনে...

১১

মেঘকন্যা's picture


তাহলে সফলতার সাথে আপনার স্মৃতি উস্কে দিলাম না কি বলেন! Wink

১২

আহমাদ আলী's picture


ফ্যান্টাস্টিক! পড়ে ভালো লাগলো।
এমন ঘটনা আমার জীবনেও আছে। ঢাকা সদরঘাট থেকে লঞ্চে চেপে একেবারে চাঁদপুর।বাবা মারা গেছেন অনেক আগে, মায়ের আদরে বড় হয়েছি, তাই বকাঝকা ছাড়া তেমন শাসনে পড়তে হয়নি। মা অবশ্য ছুরি-চাকু নিয়ে বসেছিলেন। বোবার শত্রু নেই বলে কথা। চোখ বন্ধ করে শুয়ে থাকা।

১৩

মেঘকন্যা's picture


এই ঘোরাফেরা নিয়ে কি যে জ্বালানো আব্বু আম্মুকে জ্বালিয়েছি, লিখতে গিয়ে এখন বুঝি...

১৪

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


দুর্দান্ত।।

১৫

মেঘকন্যা's picture


হুমম ধন্যবাদ

১৬

একজন মায়াবতী's picture


খুব ভালো লাগলো। আরও চক্কর দেন Smile

১৭

মেঘকন্যা's picture


এটা সিরিজ আকারে লিখার ইচ্ছা আছে, আল্লাহ যদি তৌফিক দেন তাহলে আরো চক্বর এর কাহিনী জানবেন Wink

১৮

আইরিন সুলতানা's picture


সেই রকম চক্কর দেখি! সেই সময়ের দস্যিপনা, দুরন্তপনা থেকে অপরাধবোধ .।তারপর আজকের স্মৃতিচারণ ...এই চক্করও বেশ!

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মেঘকন্যা's picture

নিজের সম্পর্কে

ব্লগিং করছি 2005/2006 থেকে। এখানে এসে দেখলাম কেউ আগে থেকেই আমার "মেঘ" নিকটা নিয়ে নিয়েছে, যা আমি এত বছর ব্যবহার করছি।
ভালোবাসা লেখালেখি।নিয়মিত লিখতে চাই। জীবনের কোন একসময় শুধুই লেখক হিসেবে স্বীকৃত দাবী করব Smile এই আশায় বেঁচে থাকি...