ইউজার লগইন

গল্প: একদিন সবকিছু গল্প হয়ে যায়

শেষ পর্যন্ত সে আমাকে তার বাসায় নিয়েই গেল। প্রথমে সে বলছিলো; ভয় নেই, মারবো না। সে সময় আমি ভয় পাওয়ার চেষ্টা করছিলাম। আমার মতো একটা ইনোসেন্ট ছেলেকে এভাবে জোরজবরদস্তি ব্যচেলর ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়ার আর কি অর্থ থাকতে পারে? জানতে চাচ্ছিলাম তার কাছেই। সে হাসিমুখে কেবলই বলছিলো, আরে কিছু না। আপনি আজকে নিয়ে দু’দিন আমাকে বাসা পর্যন্ত লিফট দিলেন। সৌজন্যের খাতিরেও তো আমার উচিত আপনাকে এক কাপ চা খাওয়ানো। আমি প্রবল বেগে মাথা নেড়ে নেড়ে দিনে-দুপুরে চা খাওয়ার ব্যপারে আপত্তি জানাচ্ছিলাম। ও সেটা কানেই তুলছিলো না। দিনে-দুপুরে সর্বত্র বসে চা খেতে পারবেন, শুধু আমার ফ্ল্যাটে গিয়ে চা খেতে বললেই আপত্তি?

হ্যাঁ তাইতো। আপনার ফ্ল্যাটে না গিয়ে বরং ক্যম্পাসে বসলে আরাম করে চা-চু সবই খাওয়া যেতো। ঘন্টা-দুইঘন্টা আড্ডাও দেয়া যেতো। কিন্তু ফ্ল্যাটবাড়ির ভরসা নেই বাবা। আ’ম নট এগ্রিড। আপনাকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দেবো। আপনি লক্ষী মেয়ের মতো গেট খুলে ঢুকে পড়বেন। কেমন?

তাও সে শুনলো না। ওর বাসার সামনে গিয়ে থামতেই জিজ্ঞেস করলো, আপনি সিগারেট খান? বললাম, খাই। বললো, বাহ্। বেশিক্ষণ লাগবে না। একটা চা আর একটা সিগারেট খাওয়া হলেই আপনাকে ছেড়ে দেবো। এটা বলেই সে দোকানের দিকে হাঁটা দিলো। আমি বেশ নিরুপায় হয়েই দাঁড়িয়ে রইলাম। একটা ব্যপারে আ হেল লট অভ আপত্তি জানিয়েও কোনো লাভ হচ্ছে না। কি আশ্চর্য!

দোকান থেকে ফিরে আমাকে বললো, কি ব্যপার? সাইকেলটা কোনো একদিকে পার্ক করেন। এটা নিয়ে তো আর সাততলায় ওঠা যাবে না। আমি বললাম, গেট তো বন্ধ। সে বললো, গেটের বাইরেই পার্ক করে তালা মেরে দেন। গেট খোলার জন্য দারোয়ান দরকার। ঐ ব্যাটাকে এখন কই খুঁজে পাবো? এই বাসার সব ফ্ল্যাটের বাসিন্দার কাছেই গেটের চাবি আছে। নিজেদের নিরাপত্তা নিজেরা দিই।

আমি আর বেশি কিছু না বলে উপযুক্ত একটা জায়গা খুঁজে সাইকেল পার্ক করলাম। ও দূরে দাঁড়িয়ে পুরো দৃশ্যটা ক্রূর চোখে দেখলো। মনে হলো, নিশ্চিত হতে চাচ্ছে আমি যেন পালিয়ে না যাই। কিন্তু আমি ঠিক ধরতে পারছিলাম না, কেন আমাকে চা খাওয়ানোর জন্য এই মেয়েটি ব্যস্ত হয়েছে। এমনও তো না যে, তার সঙ্গে আমার অনেকদিনের পরিচয়। আজসহ দুইদিন মোটে দেখা হলো। দুইটা কাজে। কাজ শেষে দ্বিতীয় দিনের মতো তাকে বাসায় নামিয়ে দিতে এসেছি। দুই দিনে টুকটাক পরিচয় বিনিময় হয়েছে। আজ কাজ শেষ হওয়ার আগেই তার মাথাব্যাথা শুরু হয়েছিলো। সে চলে যাচ্ছিলো। আমি দেখছিলাম, আসলেই তাকে অসুস্থ্য দেখাচ্ছে। কেন অসুস্থ্য জানতে চাইলে বললো, সকালে বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে এখানে আসতে হয়েছে। দিনটা ছিলো মেঘলা। আমি ভাবলাম; যেহেতু মেয়েটি অসুস্থ্যই, তাই একটা লিফট দিই।

কিন্তু সাইকেলে ওঠা ইস্তক সে আমাকে চা খাওয়াবে বলে বলে মাথায় জ্যাম লাগিয়ে দিয়েছে। যদিও আবছামতো মনে পড়ছে, এর আগের দিন শুনেছিলাম, এখানে ওরা বন্ধুরা মিলে একটা ফ্ল্যাট নিয়ে থাকে। এটা মনে পড়াতে আমার সংকোচ বেড়ে গেলো।

সাততলা পর্যন্ত উঠতে উঠতে হাপসে গেলাম। বাপস্। মেয়ের ফিটনেস্ প্রশংসার দাবি রাখে। কেমন তরতর করে উঠে গেল। উঠে চাবি দিয়ে দরজা খুলে ঢুকে গেল। এবং কোনো নিঃশ্বাস ফেললো না। আমি অবশ্য দু’একটা বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে বাকীগুলো চেপে গেলাম। ইদানীং শরীরের যত্ন নেয়া হচ্ছে না একদম। যে কারণে মোটে সাততলা বাইতে হাঁফ ধরে গেছে।

ঘরে প্রথমে একটা ছোট ড্রয়িংস্পেস। সেখানে একটা বড় কুশন পাতা। সামনে একটা টিভি ঝোলানো। এছাড়া আর কিছু নেই, শুধু একটা দরজা লাগোয়া শ্যূ-স্ট্যান্ড ছাড়া। স্যন্ডেল খুলে ওটার ভেতর গলিয়ে দিলাম। মেয়েটি আমাকে বললো, চলেন আমার রুমে গিয়ে বসবেন। এখানে আমি আর রীনাদি’ থাকি। তিনি এখন অফিসে। রুমে আমি ঢুকতেই সে প্রচুর লজ্জা-টজ্জা পেলো বলে মনে হলো। বিছানার ওপর ব্যপকভাবে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ছিলো বিভিন্ন বই-খাতাপত্র-কাপড়-হেডফোন এবং আরও কি কি যেন জিনিস। ও দ্রুতহাতে সেসব সরাতে সরাতে কৈফিয়ত দাখিল করলো, আসলে ঘুম থেকে উঠে সোজা কাজে চলে গিয়েছিলাম তো, যে কারণে এসব এভাবেই থেকে গেছে।

যদিও আমি মিলিয়ে দেখছিলাম, মেয়েটির ঘর আমার ঘরের চেয়ে তুলনামূলক গোছানো এবং অনেক কম মেসি। সেটা তাকে বললাম। শুনে খানিকটা আশ্বস্ত হলো। সে আমাকে বসতে বলে নিজে রান্নাঘরের দিকে গেলো। সিগারেটের প্যাকেটটা আমার হাতে দিতে কেন যেন একটু সংকুচিত বোধ করছিলো। তাকে সংকোচের হাত থেকে রেহাই দেয়ার জন্যই তাড়াতাড়ি হাত বাড়িয়ে প্যাকেটটা নিলাম। শাদা ফিল্টারের সিগারেট। এটা খাই না। লেডিস লেডিস লাগে।

যাক্ সিগারেট নিয়ে মেয়েটিকে খেপানোর মধ্যে আর গেলাম না। শাদা ফিল্টারই একটা বের করে ঠোঁটে তুললাম। মাঝে-মধ্যে বিপাকে পড়লে যেখানে বিড়িও খাই, সেখানে তো শাদা ফিল্টার তো সামান্য ব্যপার। জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে ঝুম বৃষ্টি নামতে দেখে মনটা ভালো হয়ে গেল।

আমার হাতে প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে সে গিয়ে রান্নাঘরে খুটখাট শুরু করেছে। আমার নিশ্চই এখানে বসে না থেকে, তার কাছে যাওয়া উচিত। সমস্যা হলো আমি এর আগে এমন পরিস্থিতিতে একবারও পড়ি নি। একটা ফ্ল্যাটে একা একটি মেয়ের সঙ্গে একা একা ঢোকা। যে কারণে কোন কাজটা উচিত আর কোনটা যে অনুচিত, তা ঠিকমতো বুঝতে পারছিলাম না। কোনো একটা মুভিতে নিশ্চই এ দৃশ্যটা আছে। কিন্তু সেদিনও বিধি ছিলেন আর দশটা দিনের মতোই আমার বামে, যে কারণে কোন মুভিতে কি দেখেছিলাম সেটা কোনোভাবেই মনে করতে পারলাম না।

ওর ঘর থেকে বের হলে প্রথমে পড়বে একটা ছোট্ট ডাইনিং টেবিল। ঠিক রান্নাঘরের সামনে। সেখানে গিয়ে আসন গ্রহণ করলাম। এবং জানতে চাইলাম, ক্যান আই হেল্প? যদিও আমি জানি চা বানাতে বিশেষ কোনো হেল্প লাগে না। এ সময় মেয়েটির সঙ্গে আমার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তুমুল একটা আলোচনা বেঁধে গেলো। রান্ডম অনেক ধারণাই দেখলাম আমাদের দু’জনের মিলছে না। আমি খুবই শক্তভাবে সেগুলোর বিরোধীতা করছিলাম। ও-ও নিজের দাবির পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলছিলো।

আর মাঝে মাঝেই রান্নাঘরের দরজা দিয়ে আমার দৃষ্টিসীমার ভেতরে চলে আসছিলো। আবার যখন চুলার দিকে চলে যাচ্ছিলো, আমি ওকে দেখতে পাচ্ছিলাম না। দেখতে পেলাম বাইরে পড়ে থাকা ওড়নাটা রান্নাঘরে কাজ করার সময় খুলে রেখেছে। পরেও সে আর ওটা গলায় জড়ায় নি। সম্ভবত তাহলেই ওড়না সংশ্লিষ্ট বিষয়-আশয়কে বেশি গুরুত্ব দেয়া হবে বলে ভেবে থাকতে পারে। এ ব্যপারটাতে আমার সঙ্গে মেয়েটির মিল পেলাম বলে মনে হলো।

এছাড়া অন্যান্য আলোচনার বিষয়গুলোতে অমিল আবিস্কার চলছিলো পুরোদমে। ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট গরম হয়ে উঠলো, ইউপিডিএফ আর জেএসএস নিয়ে দু’জনের মধ্যে একটা বাউন্ডারি লাইন তৈরী হয়ে গেলে। আমি কোনোমতেই জেএসএস’র কার্যকলাপ সমর্থন করতে পারি না। বিশেষত সরকারের আশ্বাসে তাদের জওয়ানদের অস্ত্র সমর্পণের বিষয়টি। কেননা আমার প্রথম থেকেই ধারণা ছিলো, সরকার চায় পাহাড়ে অশান্তি জিইয়ে রাখতে। যেটা জেএসএস’কে মূলত তাদের যোদ্ধা উইং যেটা অর্থাৎ শান্তিবাহিনী, সেটাকে বশীভূত না করে আসলে সম্ভব ছিলো না। আশির দশক থেকেই জেএসএস ধীরে ধীরে সব স্বতন্ত্র পাহাড়ী জাতির মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছিলো। নব্বুইএ এ জনপ্রিয়তা এত বেড়ে যায় যে, তখন ওদেরকে শান্তিচুক্তির ভ্রান্তিতে ফেলে নখদন্তহীন না করে ফেললে; সরকারের একটি বিশেষ বাহিনীর অস্ত্র, মাদক ও অন্যান্য স্মাগলিংএর ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটতে পারতো। যে কারণে একটি নামকাওয়াস্তে চুক্তির মাধ্যমে ওদেরকে বেকায়দায় ফেলে দেয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

আমার এ যুক্তি সে মানতে রাজি ছিলো না। ওর কথা ছিলো পাহাড়ে অশান্তির মূল কারণ সেখানে বাঙালি সেটেলারদের ঢুকিয়ে দেয়া। ওরা পাহাড়িদের সঙ্গে নিয়মিত গোলমাল করছে। গ্রাম জ্বালিয়ে দিচ্ছে। অশান্তি তৈরী করছে। ওদেরকে মদদ দিচ্ছে একটি বিশেষ বাহিনী। আর ইউপিডিএফ নামে একটি দিকভ্রষ্ট দল সবকিছুকে ক্রমাগত গুবলেট বানিয়ে চলেছে। ১৯০০ সালের বৃটিশ আইন প্রবর্তনের পর থেকে ইতিহাস বিবেচনা করলে এ কথার পক্ষে জোরালো প্রমাণ পাওয়া যায়। আমি কোনোমতেই সেটেলাররা সব সমস্যার মূল- এ যুক্তি মানতে রাজি হই না। তবে মেয়েটি যে আসলেই পড়ুয়া, তার প্রমাণ পাচ্ছিলাম ওর ঘটাঘট বিভিন্ন সন-তারিখের তুবড়ি ছোটানো দেখে। ট্রাইবাল ইতিহাস গুলে খেয়েছে বলা যায়।

এক পর্যায়ে সাহিত্য বিষয়ক আলোচনায় চলে আসলাম দু’জনে। বিশাল মগের চা শেষ হয়ে এলো দ্রুত। কিন্তু সেদিকে আমাদের খেয়াল রইলো না। সৈয়দ শামসুল হক আর শামসুর রাহমানকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছিলো। দেখা গেল, আমি হক সাহেবের ভক্ত আর সে শামসুর রাহমানকে ভালবাসে। কিছু কিছু মেয়ে এই বুড়োর মধ্যে কি পায় আমি বুঝি না। দু’জনে বেশ কিছুক্ষণ নিজের নিজের কবির পক্ষে লড়াই করলাম। আরেকবার হাড়ে হাড়ে টের পেলাম শামসুর রাহমানের সঙ্গে কবিতা দিয়ে পারা কঠিন। তবে আলোচনা শুধু দু’জনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকলো না। এক পর্যায়ে হেলাল হাফিজ আর আসাদ চৌধুরীকে নিয়ে ঝগড়া শুরু হলো। হেলাল হাফিজের অধিকাংশ বিখ্যাত কবিতা ওর মুখস্ত ছিলো। চুম্বক লাইনগুলো ঠিকঠাক আবৃত্তি করে শুনিয়ে দিচ্ছিলো।

আর শেষ কবিতাটা দিয়েছিলাম আমি; থাকুক তোমার একটা স্মৃতি থাকুক, একলা থাকার খুব দুপুরে একটা ঘুঘু ডাকুক। রুদ্র মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এসে পরিবেশটা খানিক ভারী করে দিলেন। তাকে নিয়ে মেয়েটির মধ্যেও চাপা দুঃখ আছে, বুঝতে পারলাম। এরপর অবধারিতভাবে চলে এলো তসলিমা প্রসঙ্গ। বাল্যকালে কিভাবে এ মহিলার প্রেমে পড়েছিলাম সেটা নিয়ে আলোচনা হলো। সেই আলোচনা এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার ইচ্ছে ছিলো হুমায়ুন আজাদ স্যারের নারী পর্যন্ত। একবার সেখানে চলে আসতে পারলেই বইটির পৃষ্ঠাকে পৃষ্ঠা ধরে রেফারেন্স দিয়ে দিয়ে দিনের পুরো আলোচনাটাই আমার করে নিতে পারতাম। কিন্তু আলোচনাকে সেখানে নিয়ে আসা গেল না। হঠাৎ মেয়েটির ঠোঁটের একটি অসামান্য ভাঁজ আমাকে হিপানোটাইজ করে নিজের দিকে টেনে নিলো। অনেকক্ষণ ধরে অমিল পেতে পেতে এই একটা ভয়ংকর বেসিক জায়গায় ওর সঙ্গে মিল আবিস্কার করে চমৎকৃত হলাম। জিনিসটা এতক্ষণ কেন চোখে পড়ে নি, তা ভেবে খানিকটা আশ্চর্যান্বিতও হলাম।

তবে সে আমাকে আক্ষরিক অর্থেই নিজের দিকে টেনে নিলো, বিষয়টা এমন নয়। আমি নিজের জায়গাতেই বসে রইলাম। সে'ও নিজের জায়গায় বসে রইলো। কিন্তু যেন চারিদিক নিশ্চুপ হয়ে গেল। শুধু যেন অনেক দূর থেকে মেয়েটির গলার আওয়াজ ভেসে আসছিলো আমার কানে। এতক্ষণ ওর নিচের ঠোঁটের মাঝ বরাবর যে স্পষ্ট রেখাটি দীপ্যমান ছিলো, কোনো এক জাদুমন্ত্রবলে সেটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। বেশ কিছুক্ষণ একদৃষ্টিতে সেই ভাঁজটি পর্যবেক্ষণ করলাম।

মেয়েটিও বোধহয় ঐ একই কথা ভাবছিলো একই সময়ে। ও আমার চোখে চোখ রেখেই কথা বলছিলো, কিন্তু ওকে আমি ঠিকই ভেতরে ভেতরে লজ্জা পেতে দেখতে পাচ্ছিলাম। যেটা সে প্রাণপনে লুকোনোর চেষ্টা করছিলো। সে সময় ওর দুই গালে একটা অসামান্য অরেঞ্জ একটু একটু করে ধরে আসছিলো। আর টিকালো নাকটা ফুলে ফুলে উঠছিলো বারবার।

আমি চলৎশক্তিহীন হয়ে নিজের চেয়ারে বসে বসে পুরো বিষয়টা দেখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারছিলাম না। কোনো এক অদৃশ্য শক্তির বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে স্থির হয়ে গেছি। মেয়েটি সেটা বুঝতে পারছিলো বলে মনে হচ্ছিলো না। বুঝতে পারলে সে উঠে এসে আমাকে স্থিতাবস্থা থেকে মুক্ত করার চেষ্টা চালাতো। উদাসী ভঙ্গিতে বসে গল্প করে যেতে পারতো না।

ইন দ্য মীন টাইম, নিজেকে ফিরে পাবার যুদ্ধে লড়তে থাকা আমি চেষ্টা চালালাম আস্তে আস্তে স্বাভাবিক হবার। প্রাথমিকভাবে দু’হাতকে সক্রিয় করে তোলার চেষ্টা করলাম। হাতের আঙুলগুলোয় এক ধরনের জড়তা এসে ভর করেছিলো। টেবিলের ওপর ভদ্রস্থ সজ্জায় সজ্জিত নিজের দু’টো হাতের দিকে বিস্ফোরিতভাবে তাকিয়ে থাকলাম। ওরা আমার কথা শুনছে না। মেয়েটির হাত দু’টো আলগোছে ফেলে রাখা ছিলো টেবিলের ওপরেই। আমার খুব বেশিরকম নাগালের মধ্যে। যে কারণে আমি যখন ওর হাত স্পর্শ করলাম তখন নিজেই আগে কাঁপলাম। পরে ও কাঁপলো। বুঝতে পারি নি, ওর হাত দু’টো আমার এত বেশি নাগালের মধ্যে ছিলো।

ওর তুলতুলে নরম একটা হাত, সেটা ডান বা বাম হতে পারে; আমার কোন হাতটি এগিয়ে গিয়েছিলো, নির্ভর করছে তার উপর। আমার যদি ডানহাত হয়ে থাকে, তাহলে ওর বাম হাত হওয়ার কথা। কারণ আমাদের অবস্থান পুরো মুখোমুখি না হলেও প্রায় মুখোমুখি ছিলো। কিন্তু কোন হাত দিয়ে ওকে ধরেছি, সেটা ভাববার মতো ভারসাম্য তখন আমার মনের ছিলো না। কোনোকিছুতে নিজস্ব নিয়ন্ত্রণ না থাকা কাকে বলে সেটা হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছিলাম। আশপাশে কি হচ্ছে সব বুঝতে পারছিলাম। কিন্তু কিছু করতে বা কোনোকিছুকে বাঁধা দিতে পারছিলাম না। আমার হাতের তালুতে ওর হাতটি ঘামে ভিজে উঠলো। এ সময় মেয়েটি আনমনে কোথায় যেন তাকিয়ে ছিলো। আর মেয়েটির যে হাত ঘামার মতো ভীষন সুইট একটি সমস্যা আছে, সেটি আমি প্রথমবারের বুঝতে পেরেছিলাম।

এক সময় আমার চারটে আঙুলের ফাঁক খুঁজে নিলো ওর চারটে আঙুল। ওরা নিজেদেরকে একটা সুকঠিন বন্ধনে আবদ্ধ করে নিলো। জানতে পারি নি; সে না আমি, কে কার দিকে এগিয়ে গিয়েছিলাম। হঠাৎ এক সময় নিজেদেরকে নিজেদের শূন্য মিলিমিটার দূরে আবিস্কার করে আর চমকাই নি। কারণ তখন আমরা কেউই পৃথিবীর এ স্বর্গমঞ্চে ছিলাম না। শুধু যখন মেয়েটি ওর ঠান্ডা আঙ্গুলের মাথা দিয়ে আমার গাল আর ঠোঁটে আলতো করে ছুঁয়ে দিল, তখন মনে পড়ে গেল সেদিন সকালে মাক-থ্রী’টা কাজে লাগিয়েছিলাম।

খুবই দুষ্ট প্রকৃতির মেয়ে ছিলো সে। এখন আমার উত্তমার্ধ। এখনো মাঝে মাঝে দুপুরবেলা ওর মাথাটা নষ্ট হয়ে যায়। তখন আমার মাথা নষ্ট না করা পর্যন্ত সে শান্তি পায় না।


---

(শিরোনামের জন্য কৃতজ্ঞচিত্তে কথাসাহিত্যিক মাহমুদুল হকের নাম স্মরণ করছি। আর ধন্যবাদ লীনা আপুকেও। গল্পটা ১ তারিখের বার্থ ডে বয় প্রিয় রায়হান ভাইকে উৎসর্গিত। মনে রাখতে হবে, আমাদের চারপাশের সবকিছুই একদিন গল্প হয়ে যায়। রায়হান ভাইএর জন্মদিন মাত্রই গত হয়েছে। সেটাও একদিন গল্প হয়ে যাবে। শুধু বেঁচে থাকবে এই অসামান্য সময়ের স্মৃতিগুলো। আমরা একসময় এই ব্লগে একসঙ্গে ব্লগাতাম।)

পোস্টটি ১৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

তানবীরা's picture


শুভ জন্মদিন মেজর Smile

অসম্ভব ভালো পোষ্ট লিখছো মীর Laughing out loud
যাই এখন পড়ি গিয়ে Big smile

লীনা দিলরুবা's picture


মাহমুদুল হকের অসামান্য উপলব্ধি আমাদের মনোজগতে কী দারুণ নাড়া দিয়ে গেল, আমাদের অনেকের অনুভূতিতে ঝুলে থাকলো বাক্যটি, নিছক একটি কথা হয়ে নয়, গভীর একটি জীবনবোধ হয়ে!

গল্প অসাধারণ লেগেছে।

আমাদের প্রিয় বন্ধুরা, আমাদের বিচরণক্ষেত্র এবি কোনদিন গল্প না হোক। চিরবাস্তবতা হোক।

রায়হান ভাইকে, আবারো শুভজন্মদিন।

হাসান রায়হান's picture


আজকের বাস্তবতা কাল গল্প হয়ে যায়। কোনো কিছুই চিরন্তন না। এইটাই দুনিয়ার নিয়ম।

সাঈদ's picture


মীর এর লেখা গুলো কে বইয়ের পাতায় দেখতে চাই ।

একজন মায়াবতী's picture


Smile

লেখা গুলো কে বইয়ের পাতায় দেখতে চাই

হাসান রায়হান's picture


তিন্দিন পর! মানিনা মানবোনা

শাপলা's picture


প্রথমে রায়হান ভাইকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা রইল, তিন দিন পরেই রইল।

তারপর রইল মীরকে শুভেচ্ছা। যত তোমার লেখা পড়ি, তত অবাক হই। সত্যি সব কিছু একদিন গল্প হয়ে যায়।

মেসবাহ য়াযাদ's picture


আমাদের প্রিয় বন্ধুরা, আমাদের বিচরণক্ষেত্র এবি কোনদিন গল্প না হোক। চিরবাস্তবতা হোক।

কেনো জানি আজকাল আশংকা হচ্ছে Sad

মীরের লেখা মীরের মতই রহস্যময় Wink

আমারে নিয়া কেউ কোনোদিন এরকম লিখবেনা, আফসুস Tongue

লীনা দিলরুবা's picture


আমারে নিয়া কেউ কোনোদিন এরকম লিখবেনা

আমাদের দাদাভাইরে নিয়ে লিখতে কতলোক লাইন দিয়া দাঁড়ায় আছে সে কি তা জানে Wink

আশা রেখো মনে দুর্দিনে কভু নিরাশ হয়োনা ভাই, কোন দিন কভু পোহাবে না হায় তেমন রাত্রি নাই Big smile

১০

হাসান রায়হান's picture


সবাইকে অনেক ধন্যবাদ। মীররে কৃতজ্ঞতা।

১১

ভাস্কর's picture


ঋহানের জন্মদিন চাইরদিন পর পালন করা হইছে, মীরতো সেই তুলনায় কম সময় নিছে @ রায়হান ভাই...

১২

মাহবুব সুমন's picture


আরেক্টুর জন্য বেড ছিন মিছ Love

১৩

ফিরোজ শাহরিয়ার's picture


লেখাটা দারুন হইছে। রায়হান ভাইকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা, আগামীবারের জন্য অগ্রিম।

১৪

রাসেল আশরাফ's picture


অফট পিকঃ ইদানীং ইচ্ছাকৃত ভাবে মীরের পোস্টে কমেন্ট করি না। এটাও করতাম না।কেন জানি এই পোস্টটা পড়ে সেই সায়ান-তিতলীর কথা মনে হলো। সেটা কি আবার শুরু করা যায়? একজন নগন্য পাঠকের অনুরোধ। বিবেচনা করলে খুশি হতাম।

১৫

দিপক দেব's picture


ভালো হয়েছে মীর। গল্পটা মুখে শোনার সময়ও ভালো লেগেছিল।

১৬

আরিশ ময়ূখ রিশাদ's picture


অদ্ভুত লেখা।
অনেকদিন পর এসেই আপনার গল্প পড়লাম।

১৭

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


শুভ জন্মদিন, রায়হান ভাই..

@মীর ভাই,
সহজ সুন্দর সাবলীল একটা গল্প।
লেখনী খুব খুব ভাল লাগলো।

ভাল থাকুন।।

১৮

লিজা's picture


Smile

১৯

এস এম শাহাদাত হোসেন's picture


সমৃদ্ধ লেখা, খুব ভালো লাগলো।

২০

এস এম শাহাদাত হোসেন's picture


সমৃদ্ধ লেখা, খুব ভালো লাগলো।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!