আজকাল খারাপ হতে জানা খুব জরুরি
এরফুর্টের পথেঘাটে যত পুরোনো দালানকোঠা, বাড়িঘর, গীর্জা কিংবা পানশালা ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, তা দুই-তিন বছরে দেখে শেষ করা সম্ভব নয়। দেখার গতি যদি আমার মতো হয়। পুরোনো বলতে, বাড়িঘর বা প্রতিটি স্থাপনাতেই, খুঁজলে সেটা কত সালে বানানো হয়েছিল তা বের করা যায়। সাধারণত গেটের ওপরেই লেখা থাকে। নাহলে ভেতরে কোথাও। কোন সালই চোখে পড়ে নি এ পর্যন্ত ১৮শ বা ১৯শ শতকের। সবচেয়ে নিকটবর্তী সময়কালটি ১৭শ শতকের। এছাড়া বেশিরভাগ দালানকোঠারই নির্মাণকাল ১৬শ, ১৫শ, ১৪শ শতকের ঘরে। এরচেয়ে পুরোনোও আছে।
বলছিলাম দেখার গতি যদি আমার মতো হয়, তাহলে দুই বা তিন বছরেও দেখে শেষ করা সম্ভব না। কারণ আমি কোথাও কোনকিছু দেখতে গেলে, ওই সাল বের করতেই দুই ঘন্টা খরচ করে ফেলি।
সেদিন শহরের আকাশছোঁয়া ক্যাথেড্রাল-টার সামনে গিয়ে বসে বসে গুণছিলাম- কতগুলো সিঁড়ি বেয়ে সেখানে উঠতে হয়। বসে ছিলাম সামনের সুবিশাল খোলা চত্বরটায় উদ্দেশ্যহীনভাবে। ঘন্টার পর ঘন্টা। সূর্যের আলো যতক্ষণ শরীরে পড়ছিল, ততক্ষণ খুব আনন্দ হচ্ছিল। তারপর এক সময় পশ্চিমদিককে ধূসর রঙে রাঙিয়ে সে সূর্যটা ডুবে গেল। ঠান্ডাটা তখন এমন জেঁকে ধরলো, যেন এই সূর্যের প্রস্থানের জন্যই অপেক্ষা করছিল কনকনে ঠান্ডা বাতাসের ঝাঁপি।
মালাকাইটের ঝাঁপি বইটা কে কে পড়েছেন? আমার শিশুকালে পড়া সেরা বইয়ের একটা। রাশিয়ান রূপকথার গল্প। মস্তিষ্কটা এখনও বোধহয় সেই রূপকথার গল্পেই আটকে আছে। আজ বিশ্ব কত এগিয়ে গেছে। মানুষ নিজের স্বার্থকে মহান হিসেবে পুজো করার উপায় শিখে গেছে। বিবেক নামক আবর্জনা বিসর্জন দিয়ে সবাই শুধু নিজের স্বার্থ উদ্ধার, নিজের ভাললাগাকে প্রাধান্য দেয়া, আর নিজে যা চায় সেটাকেই অগ্রাধিকার দেয়ায় ব্যস্ত। আর আমি আজও পড়ে আছি রূপকথার বইয়ে লেখা কবিতা আর গল্প নিয়ে। মানুষ আমাকে মুখের ওপর যদি বলেও দেয়, আমি খারাপ তাই তোমার সঙ্গে অন্যায় করলাম, পারলে কিছু করে দেখাও- আমি অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকি।
এই সব সমস্যার শুরু বোধহয় ওই মালাকাইটের ঝাপি বই থেকে। একজনকে একবার বলেছিলাম, ছেলেবেলায় একবার অজ্ঞান পার্টির খপ্পরে পড়েছিলাম। তারা অজ্ঞান করার ওষুধে যেসব মেডিসিন মিশিয়েছিল, সেগুলো ভুগিয়েছে অনেক। তারপর থেকে বেশি রাগ উঠলে সেটাকে নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হয়। যেকোন আবেগই, বেশি বেড়ে গেলে সেটাকে নিয়ন্ত্রণে সমস্যা। তবে আমার চিন্তা-ভাবনা, ব্যাক্তিত্ব গড়ে ওঠার পেছনে এই ঘটনার তেমন কোন ভূমিকা নেই। এ ঘটনার আগে আমি কথায় কথায় রেগে উঠতাম। যাকে খুশি তাকে চিল্লাচিল্লি, হুমকি-ধামকি দিয়ে বসতাম। এমনকি হাতও চলতো খুব কথায় কথায়। এ ঘটনার পর যেহেতু চিল্লাচিল্লি, হুমকি-ধামকি, মারামারি নিয়ন্ত্রণ করতে সমস্যা হয়, তাই সেসব আর করি না। রাগ ওঠাটা আগের মতোই আছে। কিন্তু রাগের প্রকাশ ভিন্নরকম হয়ে গেছে। পরিবর্তন বলতে অতোটুকুই।
তবে বাংলাদেশের জীবনধারণের রীতিনীতিতে যে আমূল পরিবর্তনটা আমি মিস্ করেছি, সেটা করার পেছনে বড় ভূমিকা রয়েছে আমার জার্মান জীবনের। দেশে যখন আসলে মানবতা, বিবেক, পড়াশোনা, আত্মত্যাগ ইত্যাদির মতো বিষয়গুলো ঝেড়ে ফেলা হয়েছে, গেল ১০-১৫ বছরে, সেসময়টার বেশিরভাগই আমি এমন এক দেশে ছিলাম, যেখানে এগুলো নিয়ম করে চর্চা করা হয়। তাই দুই দেশের জীবনাচরণে, অভ্যাসে, চিন্তাভাবনায়, কর্মপন্থায় "ভয়াবহ রকমের ভিন্নতা" আমাকে ভীষণ ভোগায়।
আসলে বাংলাদেশের মানুষের এখনকার জীবন এত বেশি পাল্টে গেছে যে, মালাকাইটের ঝাঁপি সম্ভবত প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ফেলেছে একেবারেই। আজকাল খারাপ হতে জানা খুব জরুরি। তাহলেই ভাল থাকা সম্ভব, আর কোনভাবেই না। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে, এরফুর্ট শহরটা এমন যে, এখানে মালাকাইটের ঝাঁপি বইটার কথাই মনে পড়ে শুধু। যে কারণে বুঝেও অনেক সময় যে কাজটা করা উচিত, সেটা করা যায় না। মানবমন বড়ই বিচিত্র।
---





মন্তব্য করুন