নেপাল ভ্রমণের গল্প: পর্ব ১
ত্রিভুবন বিমানবন্দরটি নেহায়েত ছোট্ট একটি বিমানবন্দর হলেও মানুষের আনাগোনা কম ছিল না। এক রোববার ভরদুপুরে ময়ুরপঙ্খী নামের উড়োজাহাজে করে বিমানবন্দরটিতে নামতেই আশপাশে প্রচুর মানুষের কোলাহল দেখে থমকে গিয়েছিলাম খানিকক্ষণের জন্য। ঠিক জায়গায় পৌছেঁছি তো? এতো দেশের মতোই অবস্থা চারিদিকে। মানুষের মাথা আর মানুষের মাথা চারিদিকে। ভুল ভাঙতে অবশ্য খুব বেশি সময় লাগে নি। বিমানবন্দরের ছিমছাম, গোছানো বন্দোবস্তের কারণে খুব অল্প সময়ের ভেতরেই আমাদের সব নিয়মতান্ত্রিক কর্মকাণ্ড সম্পন্ন হয়ে গেল। এক মাসের পর্যটক-ভিসা হাতে নিয়ে পথে নামলাম প্রতিবেশ দেশ নেপাল খানিকটা ঘুরে-ফিরে দেখার উদ্দেশ্যে।
বিমানবন্দর থেকে হোটেল খুব বেশি দুরের পথ ছিল না। তবে প্রথমবার দেশটিতে যাওয়া হচ্ছে বিধায় হোটেলের তত্ত্বাবধানে আয়োজিত ট্যাক্সি সুবিধা গ্রহণ করে খানিকটা আক্কেল সেলামি গুণেছিলাম মনে আছে। ফেরার দিনে হোটেল থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত আসতে লেগেছিল চারশত নেপালী রুপি। আর সেই প্রথমদিন বিমানবন্দর থেকে হোটেলে যেতে লেগেছিল ১৬০০। একই রকমের আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল পোখারা শহরে নামার সঙ্গে সঙ্গেও। পথ সম্পর্কে ধারণা না থাকার কারণে মাত্র এক-দেড়শো' মিটার রাস্তা পাড়ি দিতে ট্যাক্সিওয়ালাকে চারশত রুপি দিতে হয়েছিল। এই দুইটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া নেপালের করার মতো কোন সমালোচনা নেই। অদ্ভুত শান্তির দেশ। মানুষের মাঝে এখনও আমাদের দেশের আশি কিংবা নব্বুইয়ের দশকের মতো সহানুভূতিশীল মনোভাব কাজ করছে। মাঝে মাঝে অবাক হয়ে ভেবেছি এরা কি প্রযুক্তির উন্নতির ছোঁয়া ঠিকমতো পায় নি? এখনও স্বার্থপর আর চূড়ান্ত আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠতে পারলো না কেন দেশটির মানুষেরা? কি সমস্যা?
যাক সেসব কথা থাক। আমাদের হোটেলটির অবস্থান ছিল কাঠমুণ্ডুর থামেল এলাকায়। কাঠমুণ্ডু উপত্যকা ছোট ছোট চারটি অঞ্চলে বিভক্ত। স্থানীয়রা যাদের শহর বলে ডাকেন। তেমনি একটি শহর থামেল। এই এলাকাটি বিখ্যাত পর্যটকদের বিপুল আনাগোনার জন্য। পুরান ঢাকার মতো অসংখ্য ছোট ছোট গলি আর সেই গলিগুলোতে রয়েছে অগণিত তিন ও চার তারকা হোটেল। আরও রয়েছে কাপড়, সুভ্যেনির, স্থানীয়দের হাতে বানানো নানান জিনিস আর সুরা-সাকির দোকান। সারাদিন ভিড় লেগে রয়েছে সেই রাস্তাগুলোয়। তবে জ্যাম নেই। আমি পুরান ঢাকার সঙ্গে তুলনা করে দেখলাম, শুধুমাত্র জ্যাম আর রাস্তার ধারের ফেলে রাখার ময়লার স্তুপের অভাব থামেলকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছে। দেশ-বিদেশ থেকে পর্যটকেরা তাই এই শহরটাতে বেড়াতে আসছেন প্রতিনিয়ত। হয়তো ভেতরে আরো নানাবিধ ব্যাপার রয়েছে। যেমন, চোর, ছিনতাইকারী, ঠকবাজ, বখাটে এসবের দেখাও পেলাম না কোথাও। সবাই যার যার নিজের কাজে ব্যস্ত। এরা বুঝতে পেরেছে যে অন্যায় না করে বরং সঠিক পথে থাকলেই বেশি ভাল। তাতেই বেশি উপার্জন। আর দিনশেষে পাওয়া যায় দুরের পাহাড় থেকে ভেসে আসা সজীব মুক্ত বাতাসে প্রাণভরে শ্বাস নেয়ার পূর্ণাঙ্গ অধিকার। আমাদের দেশ হয়তো প্রযুক্তিতে এগিয়ে কিন্তু মানসিকতায় পিছিয়ে যোজন যোজন।
এসব একবার ভেবে-টেবে ঠিক করলাম আর তুলনা করবো না। বরং ঘুরতে এসেছি সেটাই করি। হোটেলে চেক-ইনের পর রুমে গিয়ে টেনে খুললাম ব্যালকনির দরজা। সঙ্গিনীর সঙ্গ খানিক মন কষাকষির দরুন তিনি খুব বেশি সাড়া দিচ্ছিলেন না আমার কোন কথায়। আমিও তাকে একটু নিজের মতো করে থাকার ব্যাবস্থা করে দিতে চলে গেলাম ব্যালকনিতে।
চোখের সামনে যেন সিটি অফ গড সিনেমার দৃশ্য ভেসে উঠলো। আশপাশের সব বাড়ির চাল, একটা আরেকটার সঙ্গে লাগানো। দক্ষিণ আমেরিকায় মঞ্চস্থ যেকোন সিনেমায় এসব বাড়ির চালের ওপর একটা দৌড়াদৌড়ির দৃশ্য থাকবেই। যতদূর চোখ যায় ততদূরই এমন। আর তারপরে দিগন্তের প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে আছে বিশালায়তনের সবুজ পাহাড়। তাদের শরীরের ওপর চলছে মেঘেদের দৃষ্টিকটু ঢলাঢলি। যেমন প্রথম প্রেমের জোয়ারে ভেসে যাওয়া কিশোর-কিশোরী ঢলাঢলি করতে চায় দেশের বোটানিক্যাল গার্ডেনগুলোতে, ঠিক তেমনই। পাহাড় আর মেঘের সেই মিলনমেলায় বোটানিক্যাল গার্ডেনগুলোর বখাটেদের মতো বাধ সাধছিল পাহাড়চূড়ার প্রাসাদগুলো। নেপালে এই এক জিনিস প্রায় সর্বত্রই চোখে পড়েছিল। পাহাড়ের চূড়াগুলোতে প্রায়শই একটা করে প্রাসাদ, কিংবা মন্দির, কিংবা বৌদ্ধদের স্টুপা (এক ধরনের প্যাগোডা) - আছেই। পরবর্তী দিনগুলোতে আমরা কিছু পাহাড়চূড়া ঘুরে দেখেছি, ওই জায়গাগুলোই পর্যটকদের আকর্ষনের কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্বাসী বা অনুসারীরা যায় মোক্ষলাভের আশায়, আর যাদের মোক্ষলাভের লোভ নেই তারা যায় প্রকৃতির স্বহস্তে সাজিয়ে রাখা সৌন্দর্য্যের ডালি উপভোগ করতে। আমরা বোধহয় দ্বিতীয় ক্যাটেগরিতে পড়েছিলাম।
তবে প্রথমদিনে নয় এসব সৌন্দর্য উপভোগের জন্য প্রস্তুত হতে আমাদের সময় লেগেছিল খানিকটা। আর ঘুরতে গেলেও পাশাপাশি অফিসের কাজ করতে হচ্ছিল বিধায় সময়ের গন্ডি একটু সংকুচিতও ছিল আমাদের প্রথম থেকেই। করোনা মহামারী বিশ্বকে যা কিছু নতুন বিষয়ের সঙ্গে পরিচিত করিয়েছে তার একটি তো অবশ্যই বাসা থেকে কাজ করার সুযোগ। মানুষের পক্ষে হয়তো কখনোই এটা পুরোপুরি বিশ্বাস করা সম্ভব হতো না যে, একদম অফিসে না গিয়ে বাসা থেকেও অফিসের সব কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করা যায়- যদি সদিচ্ছা থাকে। উন্নত বিশ্বের অনেকেই এখন এ সুযোগ লুফে নিয়েছে। বিশেষ করে সেসব কোম্পানিগুলো, যাদের কাছে অফিসের কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন করাটা গুরুত্বপূর্ণ। কোথায় বসে সেটা করা হচ্ছে, তা নয়। আর এতে করে কোম্পানিগুলোর উপরি পাওনা, কর্মচারীদের বাড়তি সন্তুষ্টি। পরিবারের সঙ্গে সারাদিন থেকেও অফিস করা গেলে আর কি চাই মানুষের? জার্মানিও করোনা মহামারী থেকে এ শিক্ষা নিতে ভুল করে নি। তাই অনেক অফিসেই এখন পুরোপুরি বাসা থেকে কাজ করার সুবিধা দেয়া হচ্ছে কর্মচারীদের। এ ধরনের কাজগুলোয় বেতনের কোন বৈষম্য নেই। অবশ্য যেকোন রকম কাজেই বেতনের বৈষম্য করার সুযোগ জার্মান আইনেই রহিত করা আছে। তবে এ ধরনের কাজের বাজারে প্রতিদ্বন্দিতা তুলনামূলক বেশি। তাই কোম্পানিগুলোও খুব যাচাই-বাছাই করে লোক নিয়োগ দেয়ার চেষ্টা করে এ ধরনের কাজের ক্ষেত্রে।
সুযোগটা আমার জন্য ভালো ছিল। দেখে-শুনে একটা কোম্পানিতে ডিজিটাল মার্কেটিং ম্যানেজার হিসেবে বাসা থেকে কাজ করার সুবিধাসম্বলিত চাকুরি নিয়ে সোজা দেশে চলে এলাম। দশটা বছর বিদেশ-বিভুইয়ে পরিবার থেকে দুরে থাকার জন্যই কি না কে জানে, ভেতরে একটা আকুলতা সৃষ্টি হয়েছিল। তার ওপর এক থেকে দুইজনে পরিণত হওয়ায়, আকুলতাটা পরিবর্তিত হয়ে যায় প্রয়োজনে। বাসা থেকে কাজ করার সুযোগটা তাই বিলাসিতা নয়, জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছিল জীবনে।
আলোর নিচে অন্ধকারের মতো, এ সুযোগেরও কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। প্রায়শই চাকুরীগুলো হাতছাড়াও হয়ে যায় কর্তৃপক্ষ কিংবা কর্মচারীর খামখেয়ালীপনার জন্যে। তেমন ঘটনা যে আমার সঙ্গেও ঘটে নি, তা নয়। তবে সামলে নিতে পেরেছিলাম ভাগ্যক্রমে। সেসব ঘটনা অন্য কোথাও বলবো। আজ ফিরে আসি নেপালভ্রমণের গল্পে।
নেপালের সঙ্গে জার্মানির সময়ের পার্থক্য চার ঘন্টা ১৫ মিনিটের। জার্মানিতে যখন সকাল আটটা, তখন নেপালে বেলা ১২ টা ১৫। সে সময়ই শুরু হতো আমার কাজ। সোমবার থেকে শুক্রবার। শনি আর রবিবার ছুটি। অফিস যেদিন থাকে সেদিন সোয়া ১২টা থেকে সোয়া পাঁচটা পর্যন্ত আর কোনকিছু করার সুযোগ থাকে না। তাই ঘোরাঘুরির পরিকল্পনাগুলোকে সাজাতে হতো ওই সময়ের বাইরে। সকালে উঠে খানিকক্ষণ আশেপাশে কোথাও থেকে ঘুরে এসে কাজ করতে বসতাম। তারপর বিকেলে কাজ শেষে আবার বের হতাম। কখনো পায়ে হেটে, কখনো ট্যাক্সিতে করে ঘুরেফিরে দেখতাম পাহাড়ঘেরা নেপালের অবারিত সৌন্দর্য্য। চোখ জুড়িয়ে ক্লান্ত হয়ে আসতো কিন্তু প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের কোন সীমা-পরিসীমা মিলতো না। ঘন সবুজ পাহাড়, ঝর্ণা, ছোট-বড় মন্দির, প্যাগোডা, প্রাচীন ভারতীয় স্থাপত্যকলা, রসনাবিলাসী খাদ্যায়োজন- কোনকিছুরই যেন শেষ নেই।
আর খরচ? বাংলাদেশের অর্ধেক বললে হয়তো একটু বাড়াবাড়ি হয়। তবে কাছাকাছি বলাই যায়। এমনিতেই নেপালী রুপির দাম বাংলাদেশি টাকার চেয়ে কম। ১০০ টাকায় প্রায় ১১০ রুপি মেলে। তার ওপরে রয়েছে জিনিসপত্রে চোখে পড়ার মতো কম দাম। কাঠমুণ্ডুর মতো পর্যটকপ্রধান রাজধানীতে এক বেলা ভরপেট খেতে খরচ হয়েছে ৫০০ নেপালী রুপি মাত্র। যা বাংলাদেশের কোন জাতের হোটেলে অচিন্ত্যনীয়। আর পোখারাতে গিয়ে দেখেছি খাবার কিংবা অন্য সবকিছুর মূল্য আরও কম। প্রথম দু-একদিনের ভেতর নিজেদের ভেতরকার সংকটের মেঘ কেটে যাওয়ার পর, আমরা দু'জনও ওই দূর পাহাড়ের গায়ে ঢলাঢলিরত মেঘেদের মতোই চঞ্চল হয়ে উঠেছিলাম। যা করছিলাম সবই ভাল লাগছিল। থামেলের রঙিন সন্ধ্যাগুলো আমাদের কাঁচভাঙ্গা হাসির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠেছিল।
আর মোবাইলের এই যুগে কে না চায় প্রিয়জনের সঙ্গে প্রতিটি মুহূর্তকে চিত্রবন্দি করে রাখতে? আমরাও তার ব্যাতিক্রম ছিলাম না। সঙ্গিনী অনেকগুলো দৃষ্টিনন্দন জামা নিয়ে গিয়েছিলেন সঙ্গে করে। একেক বেলায় একেক জামায় ফটোসেশন, রেস্তোরায় বসে গ্লাসের টুংটাং আর ছোট ছোট কৌতুকে হাসতে হাসতে আমাদের সময়গুলো পেরিয়ে আলোর গতিতে। মুঠোবন্ধি করে ধরতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছিলাম সাগরের বালুর মতো হাত গলে সব বেরিয়ে যাচ্ছে। ধরার চেষ্টা বাদ দিয়ে তাই হৃদয় দিয় উপভোগ করেছিলাম শুধু। কাঠমুণ্ডুতে দু'টো দিন। শুধুই পথে পথে হাঁটা, আর নিজেদের নিয়ে ব্যাস্ত থাকা। সে এক অদ্ভুত সময়। ভাষায় বর্ণনা করা সম্ভব না।
তার এক রাতে নগরীর ভাট-ভাটেনি এলাকা থেকে এক ট্যূরিস্ট বাসে চেপে রওনা হয়েছিলাম আমরা পোখারার উদ্দেশ্যে। অন্নপূর্ণা পর্বতমালার পাদদেশে অবস্থিত ছোট্ট একটা শহর। লেক আর পাহাড় যেখানে মিলেমিশে হয়েছে একাকার। মানুষের মন আর মাটিও যেন সেখানে একইভাবে মিশে যায়। কামিনী রায়ের সেই বিখ্যাত কবিতার মতো,
"আপনারে লয়ে বিব্রত রহিতে
আসে নাই কেহ অবনী 'পরে,
সকলের তরে সকলে আমরা
প্রত্যেকে মোরা পরের তরে।"
নিজেকে যেন নতুন করে খুঁজে পেয়েছিলাম সেবার পোখারা গিয়ে।
---





মন্তব্য করুন