গল্প: চাঁদের আলোয় গ্রাফিতির নিচে দেখা রক্তলাল চুলের ওই গথিক মেয়েটি (পর্ব - ২)
গাড়ি ছাড়ার পর আমরা দু'জনে যে খুব বেশি বাক্যালাপ করছিলাম, ব্যাপারটা ঠিক তা নয়। দু'জন বরং পাশাপাশি বসে নির্জনতাটাই উপভোগ করছিলাম বেশি। ক্লাসিক একটা "জার্মান গ্লুমি" সন্ধ্যা ছিল সেটা। আমার একটা জ্যাকেট রয়েছে সেই সন্ধ্যার রংয়ের।
সেদিন অবশ্য পরনে সে জ্যাকেটটা ছিল না। তারপরও হঠাৎ সেই কথাটাই বলে উঠলাম মেয়েটির উদ্দেশ্যে, জানো আমার একটা জ্যাকেট রয়েছে যার রং ঠিক ওই আকাশটার মতো। মেয়েটা আমার দিকে ঘুরে তাকালো, গাড়ি চালাতে চালাতেই। তারপর সামনের দিকে মনোযোগ দিল আবার। সবশেষে বললো, রংটা সুন্দর কিন্তু খুব মন খারাপ করানো, তাই না?
টেল মি অ্যাবাউট ইট! কত শত সন্ধ্যা আমার এই রং দেখতে দেখতে কেটেছে, তার ইয়ত্তা নেই কোন। মেয়েটি কি জানে সেটা? যখন ইলমিনাউ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তাম তখন সময় কাটানোর এক অন্যতম মাধ্যম ছিল রং দেখা। আকাশের গায়ে যে কত রকম রং ধরতে পারে তার কোন হিসাব রাখা সম্ভব ছিল না একেবারেই। সূর্যাস্তের সময় এক অপার্থিব পরিবেশের দেখা মেলে আকাশে তাকালে। একাকী কোন নির্জন পরিবেশে সে আকাশের সঙ্গে দেখা হলে, মনটা ভারী হয়ে আসতে বাধ্য। আর ইলমিনাউ ছিলই একাকী থাকার এক অতুলনীয় শহর। শহরের সবাই যেন সেখানে সবার মাঝখানেও একা।
আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের গন্ডি পেরিয়ে একটু হেঁটে গিয়ে ঢুকে পড়তাম বনের ভেতর। গ্রেট থুরিনজিয়ান বনভূমি শহরটাকে ঘিরে রেখেছে চারপাশ থেকেই। শুধু খানিকটা হাঁটার ইচ্ছা। বনের ভেতর কোন এক পাহাড় কিংবা টিলার চূড়ায় উঠে সূর্যাস্ত দেখতে বসে গেলেই হলো। সূর্যাস্ত তো যেন সূর্যাস্ত নয়, কোন শিল্পী পাগলপারা রংতুলি চালানো হালকা নীল ক্যানভাসের ওপরে। কোনদিন গাঢ় কমলা, কোনদিন টকটকে গোলাপি, কোনদিন একাধিক রংয়ের বাহার; সূর্যালোক যত হালকা হয়, রং তত তীব্র হতে থাকে। হতে হতে এক সময় আধাঁরের বুকে মিলিয়ে যায়। একটা-দুইটা করে ফুটে উঠতে শুরু করে তারা। বনের ভেতর পাহাড়ের ওপর হওয়ায় তারকামণ্ডলীদেরও দুয়ারে এসে দেখা দিতে দেরি হয় না একবিন্দু। আমার শুধু মোহগ্রস্তের মতো চেয়ে চেয়ে সেসব দৃশ্যকে অবলোকন করা। চোখে কোন ক্যামেরা নেই, মস্তিষ্কে কোন হার্ডড্রাইভ নেই; দৃশ্যগুলোর কোনটিকেই ধারণ করে রাখার কিংবা পরে রিওয়াইন্ড করে দেখার কোন উপায় নেই; একমাত্র উপায় একবারেই যতোটা সম্ভব দৃশ্যগুলো দেখে নেয়া।
মিসিসিপি'কে এত কথা একসঙ্গে বলার কোন উপায় জানা ছিল না বলে কথাগুলো শুধু নিজের মাথার ভেতর এসেই ঘুরে চলে গেল। শুধু বলতে পারলাম, একদম ঠিক বলেছো, খুব মন খারাপ করানো রং।
এই দুইটি কথাই হয়েছিল প্রথম দিন মিসিসিপির সঙ্গে আমার। তারপর এক সময় পৌঁছে গিয়েছিলাম বাড়ির দোরগোড়ায়। গ্যারেজে গাড়ি রেখে একসাথেই লিফটে উঠেছিলাম আমরা। বিদায়বেলা বলেছিলাম, ধন্যবাদ বিদেশিনী। হাসিমুখে জানিয়েছিল, আনন্দ নাকি তার!
এরপর আমাদের বাড়ির বাইরে মাঝে মাঝে যখন দেখা হতো, দু'একটা কথা হতো। বেশিরভাগই আবহাওয়া সংক্রান্ত। আমি মনে মনে ভাবতাম, কোনদিন যদি ওর সঙ্গে কোথাও সময় নিয়ে বসে শরতের আকাশের রং নিয়ে কথা বলতে পারতাম! কিন্তু দেখতাম না কোথাও তেমন সম্ভাবনা। একদিন বাড়ির বাইরে বরফের ভেতর দাঁড়িয়ে ধূম্রশলাকায় শেষটান দিয়ে ফেলেছি, এমন সময় ওকে দেখলাম আপাদমস্তক লম্বা একটা কোট আর কালো একটা হ্যাট পড়ে হেঁটে হেঁটে আসছে। জানতে চাইলাম, এই ঠান্ডায় গাড়ি কোথায়? হেঁটে-চলে বেড়াচ্ছো কেন?
সে জানালো, বরফের ভেতর হাঁটতে নাকি তার ভাল লাগে। শুনে মনে মনে পুলকিত হলাম। নিজে থেকেই ওর সঙ্গে হাঁটা শুরু করলাম। চারিদিকে দশ ইঞ্চি পুরু বরফ জমে আছে। গাছের পাতা আর ডালে ধরে আছে মুঠো মুঠো বরফ। একটু বাতাস লাগলেই ঝুরঝুর করে ঝরে পড়ছে। পায়ে চলার পথটুকু যদিও পরিস্কার। আশপাশের বাসিন্দারা নিজেদের বাড়ির সামনের অংশটুকু নিজ দায়িত্ব সবসময় পরিস্কার রাখে। তাই সেখানে শুধু বরফ নেই। এছাড়া বাড়ির বেড়া, গাড়ি, ঝোপঝাড় সব ঢাকা বরফে। মূল সড়কটা, যেখানে গাড়ি চলে সেখানেও বরফ। তবে গাড়ির চাকার চাপে সেগুলো পিষে চ্যাপ্টা হয়েছে কিছুটা। গাড়িতে শীতকালীন টায়ার না থাকলে পিছলে যাবে নিশ্চিত। মিউনিসিপ্যালিটির গাড়ি তখনও আসে নি।
---





মন্তব্য করুন