নেপাল ভ্রমণের গল্প: শেষ পর্ব
নেপাল ভ্রমণের পর্ব দুই মূলত পোখরা শহরের অলিতে-গলিতে ঘুরঘুর করে বেড়ানো কেন্দ্রিক। দারুণ সব জায়গা দেখা, প্রকৃতির ভেতর হারিয়ে যাওয়া, আসল নেপালি খাবার উপভোগ করা- এই নিয়ে সাজানো।
যার কেন্দ্রে থাকা কিছু উপাদানের একটি ছিল খাবার। বিশেষভাবে নেপালিদের হাতে সাজানো থালি, যাতে ভাত আর পাঁপড়ের সঙ্গে থাকে পছন্দসই যেকোন রকমের উপাদান। যারা নিরামিশাষী তাদের জন্য ছয়-সাত রকমের নিরামিষের আয়োজন। যার ভেতর ডাল, পুঁইশাক, পালংশাক, উচ্ছেভাজা, ঝিঙ্গেভাজি, আলুর দম, লাউপাতার পাতুরি- ভেতরে ঝুরি করে ভাজা আলুর পুর ছিল প্রায় সবখানেই। মাংষাশীদের জন্য মুরগি কিংবা মহিষ এর কষা, কোথাও কোথাও মুরগীভাজাও ছিল। খাওয়ার পাশাপাশি চলেছে চর্মচক্ষু স্বার্থকায়নের কর্মযজ্ঞ। সুস্বাদু খাবার যেমন পেট ভরিয়েছে, নয়নাভিরাম দৃশ্য তেমন ভরিয়েছে মন। সর্বত্র হয় না দেহ-মনের অমন বিরল মিলন।
পোখরায় দিনের শুরুতে সাধারণত একদিকে থাকতো তাজা রুটি, মাখন, দুধ, আরেকদিকে থাকতো গরম লুচি, কালোজিরা দিয়ে রান্না লাউ কিংবা পেঁপের সবজি, মুরগির ঝোল, বুটের ডাল, খাসির কলিজা। সবশেষে ডেজার্ট হিসেবে পাঁকা পেঁপে, আনারস, কিউই আর তরমুজের সালাদ। তবে ওদের সবচেয়ে ভাল ছিল গাঢ়, জমাট দুধ চা-টা। নাস্তা শেষে যেটা আলাদা পরিবেশন করা হতো।
ভরপেট নাশতা শেষে অবধারিতভাবেই থাকতো দিনের ঠাসা কর্মসূচি। এর মধ্যে হাজির হয়ে যেতো মঙ্গল। আমাদের সারথি। মঙ্গলের একটি ছোট মারুতি সুজুকি ৮০০ সিসি গাড়ি রয়েছে। ঘন্টা, না দিন, না মাস- কি জানি একটা চুক্তিতে সেই গাড়িটি আমরা ভাড়া করেছিলাম। সেই থেকে মঙ্গল আমাদের নিয়ে সবখানে ঘুরে বেড়ায়। হোটেল থেকেই ঠিক করে দিয়েছিল ব্যাপারটা। মজার বিষয় ছিল মঙ্গল আমাদের যে রেটে ঘুরিয়ে নিয়ে বেড়িয়েছিল পুরো পোখরা শহরে, ওখানকার অ্যাপ কিংবা কোন ট্যাক্সিতে সেই রেট পাওয়া সম্ভব ছিল না। সাধারণত হোটেল থেকে ঠিক করে দেয়া গাড়িগুলোতে খরচ বেশি হয়। অথচ পোখরায় দেখলাম তার উল্টা।
যাহোক মঙ্গল আমাদের সবচেয়ে বড় যে উপকারটি করেছিল তা হলো একদিন সকালে ডেকে-ডুকে ঘুম থেকে উঠিয়ে নিয়ে গিয়ে অন্নপূর্ণা দেখানো। সত্যিকারের আশ্চর্য হতে হয়েছিল সেদিন প্রকৃতির অতোখানি কাছাকাছি যেতে পেরে। আসলে সকালের সূর্যকিরণ যেকোন বস্তুকেই সুন্দর করে তোলার ক্ষমতা রাখে। যা দেখলে মানুষের মুগ্ধতা আসবে স্বাভাবিকভাবেই। কিন্তু অন্নপূর্ণা যেন এক অপরবাস্তবের হাতছানি। দূরে দাঁড়িয়ে থাকা গ্যানডাল্ফ দ্য গ্রে।
সেদিন যখন সূর্যের আলো অন্নপূর্ণা-৩ নামক সাড়ে সাত হাজার মিটারের বেশি উচুঁ চূড়াটার এক পাশ থেকে পড়তে শুরু করলো, সে সময় উড়ন্ত মেঘগুলোও সরে গিয়ে আমাদের জায়গা করে দিয়েছিল। একটি সময় থামিয়ে দেয়ার মতো দৃশ্য। ধীরে পুরো চূড়াটাই আলোয় ভরে উঠলো। হাতে হাত রেখে দু'জন দৃশ্যটা দেখলাম চুপচাপ। আশপাশে আরো মানুষের হল্লা ছিল। কিন্তু আমাদের কাছে সে শব্দগুলো দুরের কোলাহলের মতো অস্পষ্টভাবে এসে প্রবেশ করতে পারছিল কেবল।
মুহূর্তটা এক সময় শেষ হয়ে গেল। মেঘ এসে ঢেকে দিলো আমাদের দৃষ্টিসীমা। সেখানকার মেঘের খেলা বর্ণনা করেও এক বেলা কাটিয়ে দেয়া যায়। একেকটা জায়গায় মাটি থেকে টর্নেডো ঝড়ের মতো ঘূর্ণিপাক খেয়ে শাদা মেঘ আকাশে উঠে গেছে। আমরা অন্নপূর্ণা দেখার জন্য উঠেছিলাম একটা ভিউ পয়েন্টে। ভোর চারটে-তে রওনা দিয়ে, সেখানে পৌঁছেছিলাম পাঁচটায়। মঙ্গলের গাড়িতে করে হোটেল থেকে ভিউ পয়েন্ট-এর মূল সড়ক। তারপর পাহাড়ি পথে বেশ কিছুটা হাঁটা। হাঁটা বলতে উপরের দিকে ওঠা। তবে খুব বেশি কষ্টের কিছু না।
আমাদের উঠতে উঠতে চারদিকে আলো ফুটে গিয়েছিল। সেই আলোয় নিচের পোখরা উপত্যকা, ফিভা লেক, সবুজ বনানী- সবকিছুর গা থেকে বের হয়ে আসছিল শাদা মেঘ। নিচে থেকে ঘুরতে ঘুরতে উপরে উঠে মিশে যাচ্ছিল, আকাশে ভাসতে থাকা বড় মেঘগুলোর সঙ্গে। দৃশ্যগুলো ক্যামেরাবন্দী করে রাখার জন্য আমাদের তর সইছিল না। তবে একটু পর পর একেকটা দৃশ্য দেখে ক্যামেরাবাজির কথা ভুলে যাওয়ার ব্যাপারটাও ঘটছিল খুব।
এমন ধরনের সকাল মানুষের জীবনে খুব বেশি আসে না কথাটা বলা হয়তো ভুল হবে না। এমনকি যারা ওই এলাকায় বাস করে, তাদের জীবনেও এমন হয় না। হয়তো বছরের সবদিন বা অনেকগুলো দিন ভাল আবহাওয়ায় অন্নপূর্ণা পর্বতমালার কোন একটা শৃঙ্গ বা একাধিক শৃঙ্গের ওপর দিনের প্রথম সূর্যকিরণ পড়া দেখে ঘুম ভাঙে তাদের, কিন্তু তারপরও আমাদের সেই সকালটির মতো সকাল, সবসময় মেলে না।
আরেকবার দেখতে গিয়েছিলাম শিবমন্দির। পাহাড়ের ওপর শিবের বিশাল মূর্তি। আট-দশ'তলা ভবনসমান উঁচু তো হবেই। হতে পারে তারও বেশি। শিবের উল্টোপাশে রয়েছে শিবের স্ত্রী, পার্বতী। তার মূর্তি অবস্থিত উল্টোপাশের আরেকটি পাহাড়ে। একই রকম বড়। সেখানে গিয়ে থালি খেয়েছিলাম স্থানীয় কিছু শাক-সবজি দিয়ে। আমাদের ঢেঁকিশাকের মতো শাক ছিল, পুঁইশাকের বিঁচির মতো কোন একটা বিঁচির তরকারিও ছিল, ডাঁটাশাকের ঝোল, লতি ভাজি আর কালোজিরে ভর্তা। সঙ্গে কলমি শাক আর ডালও ছিল। তবে শেষ পাতের সে ডাল পর্যন্ত আমি যেতেই পারি নি। তার আগেই উদরসমেত কণ্ঠনালীও খাদ্যে পরিপূর্ণ হয়ে পড়েছিল। মনের ভেতর অন্তত তাই মনে হচ্ছিল। খাবারগুলো আসলেই অতোখানি সুস্বাদু ছিল।
পোখরার দিনগুলো কেটে গিয়েছিল গ্রামদেশের সন্ধ্যার মতো কয়েক লহমাতেই। অতি দ্রুত। ঠিকমতো সবকিছু বুঝে ওঠার আগেই একদিন জানতে পারলাম আমাদের যাওয়ার সময় হয়ে গিয়েছি। ঘরের সামনে ফিভা লেকে ঠিকমতো নৌকায় চড়ে ভাসতেও পারলাম না একদিন। যদিও একবার ডিঙি নৌকায় চড়া হয়েছিল। সাতাঁর না জানা থাকায় চিকন ডিঙি নৌকাকে ঠিক ভরসা করতে পারছিলাম না। সঙ্গিনী অনেক আশ্বাস দেয়ার চেষ্টা করলেও, শক্ত হয়ে নৌকা ধরে বসে থেকেছিলাম শুধু। আমার জন্য আসলে হাত-পা ছড়িয়ে, আকাশের চিলের মতো ডানা মেলে দীর্ঘক্ষণ, নিশ্চিন্ত মনে ভাসার মতো সুযোগ থাকে যেসব নৌ-যানে, সেগুলো সর্বোত্তম। প্লাস্টিকের প্যাডেল বোট বা বড় নৌ-যানের ছাদে এমন সুযোগ মেলে।
তবে শক্ত হয়ে বসেও ফিভা লেকের গহীনের নির্ঝর নৈঃশব্দ উপলব্ধি করতে খুব বেশি সমস্যা হয় নি। আসলে নৌকায় চড়ে পাহাড়ের দিকে খানিক এগিয়ে গেলেই সেটা টের পাওয়া যায়। পাহাড়ের গাছগুলোই সবার আগের হাতছানি দিয়ে ডাকে। তাদের আঁধার জমিয়ে রাখা সবুজের দিকে নৌকার মুখ ঘুরিয়ে বার কয়েক বৈঠা বাইলেই, শুনতে পাওয়া যায় পাখির ডাক ভেসে আসছে সেখান থেকে। দেখা যায় কোন একটা গাছের ডাল ঝুঁকে এসে ছুঁয়েছে লেকের জলের ঢেউ। দেখলেই মনে হয়ে আরো কাছে চলে যাই, ছুঁয়ে আসি ওই ডালটাকে লেকের জলের মতো। একদিন যদি আসলে সময় নিয়ে প্যাডেল বোটে করে ঘুরে বেড়ানো যেতো, তাহলে অকথ্য আনন্দ হতো।
সেসবের সুযোগ হলো না। ফেরার পথে আবার কাঠমান্ডু হয়ে ত্রিভুবন এয়ারপোর্ট। এর ভেতর ঘটলো থামেল ডিস্ট্রিক্ট-টার সঙ্গে একটা শেষ ওয়ান-নাইট-স্ট্যান্ড! তাড়িয়ে উপভোগ করলাম থামেলের শরীরের প্রতিটি কোণা, প্রতিটি ইঞ্চি। শেষ অভিজ্ঞতা হিসেবে নিয়ে গেলাম কিছু স্মৃতি, সঙ্গে জমিয়ে রাখার জন্য।
তারপর ত্রিভুবন পেরিয়ে হযরত শাহজালালের বন্দরে ভিড়েছিল বিমান কোন এক ভীড়ের দুপুরে। তারপর পেরিয়ে গেছে অনেকগুলো দিন ও রাত। ভালবাসা জমেছে ক্ষীরের মতো নেপাল আর পোখরার জন্য। কোন একদিন ঘুরতে ঘুরতে আবারও হাজির হয়ে যেতে পারি, ঠিক নাই কোন।
---





মন্তব্য করুন