ছোটগল্প : অযৌক্তিক অসহজ
বাজে কথা। খুব বাজে কথা। একটা মেয়ে তোকে ভালোবাসবে আর তুই তাকে প্রতিদিন ঘুরাবি, এটা খুবই বাজে কথা।
-না দোস্ত। নওরীণ আসলে আমাকে ওইভাবে ভালোবাসে তা বলা যাবে না। কিন্তু নওরীণকে আমি দেখসি, ওর মধ্যে একটা ব্যপার আছে। ধর অনেকদিন না দেখা হলে নওরীণ নিজেই দেখা করার একটা সুযোগ বের করে। আসে এবং আমাকে গভীরভাবে খেয়াল করতে থাকে। যেন আমি কেমন আছি, কি করছি, কি ভাবছি সব সে অনুমানেই বের করে ফেলবে। ওর চোখে আমি এক ধরনের গবেষণা চালানোর লক্ষণ খুঁজে পাই। সে আমাকে নিয়ে কি যেন একটা গবেষণা করছে। আমি জাস্ট এই জন্য ট্রাই করি ওকে সময় কম দেবার। কিন্তু ওর আছে বিপুল পরিমাণ এনার্জি। যতই ঘুরাই ততই ঘুরে-ফিরে ঠিক সামনে এসে হাজির হয়। আর কথা বলতে থাকে ক্রমাগত। বিষয়টাকে তুই কি বলবি দোস্ত?
বিষয়টা ভয়ংকর। সূপর্ণখা টাইপ মেয়ে। চুপচাপ কেটে পড়। এ ধরনের মেয়ের আশপাশে যাওয়াও বিপজ্জনক। প্রেমিকা হিসেবে অজেয় কিন্তু আঁচড়ানোর সময় আঁচড়ে কলিজায় দাগ ফেলে দিয়ে আসবে। সময় থাকতে পালা।
বলে জলন্ত বাঁশিটা আমার দিকে এগিয়ে দিলো মিজ। পিওর দেশাল গাঁজা। ৩০ হাজার টাকা কেজি। পার্কে প্রতিদিন একটা ডিলার এসে সাপ্লাই দিয়ে যায়। সর্বনিম্ন ৭৫০ টাকা দিয়ে ২৫ গ্রাম মাল নিতে হয়। এরচে' কম মাল বেচে না। এক বাঁশি দেশাল সমান তিন বাঁশি কাওরান বাজার। মাঝে মাঝে কাওরান বাজারের মাল আরো বাজে পড়ে। তখনকার রেশিও হচ্ছে এক ইস্টু পাঁচ।
আমাদের হাইপটা ছিলো চমৎকার। দু'জন মিলে এক বাঁশি দেশাল টেনে বসে বসে বিড়ি খাচ্ছিলাম। সারাদিন ও সারাসন্ধ্যার অফিস শেষে এটুকুই আমাদের বিনোদনের ব্যবস্থা। তারপর ফিরে যাই যার যার ডেরায়। আবার নিষ্পেষণের ঘানিতে নিজেকে একবার তুলে দেয়ার প্রস্তুতি নিতে। সামান্য ঘুম, সামান্য গোসল, ঠান্ডাপানি- এগুলোই কেবল সম্বল। ঘুমানোর সময় আমার প্রতিদিনই কিছুটা ঠান্ডা লাগে। তাই কাঁথাটা শরীরের ওপর টেনে নিই। নিয়ে বালিশের নরম আরামের মধ্যে নিজের গালটাকে, কান আর মাথাটাকে জমা দিয়ে হারিয়ে যাই। দুম করে চলে যাই পৃথিবীর সমান্তরালে চলমান আরেকটা জগতে। সেটা এই কঠিন বাস্তব মহানাগরিক জীবনের চেয়ে অনেক আরামের। সেখানে আমাকে শুধু আরামে ঘুমুতে হয়। আর কিছু করতে হয় না। সেদিন রাতে মিজকে বিদায় দিয়ে ঘরে ফিরেও তাই করলাম।
পরদিন সকাল এগারোটায় আমার বাসায় এসে কলিং বেল টিপলো নওরীণ। আমি ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে ওকে দেখে চমকে গেলাম। একটা মর্নিং সানের সঙ্গে যে একটি সূপর্ণখা টাইপ মেয়েকেও আমার ঘুম থেকে উঠে দেখতে হবে, এটা আমার আগের দিন রাতে মোটেও জানা ছিলো না। নওরীণ সে বিষয়টাকে খুব বেশি গুরুত্ব দিলো বলে মনে হলো না। দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকলো। ঢুকে আমার বিছানায় গিয়ে বসে পা দুলাতে দুলাতে আমাকে পর্যবেক্ষণ করা শুরু করে দিলো।
একটা নতুন সোফা কিনেছিলাম। ইয়া বিশাল তবে দুই সিটের। সেটা খুব ভালো একটা আরাম উৎপাদক যন্ত্র। বসলে এত সুন্দর করে সে মানুষকে নিজের ভেতরে নিয়ে নেয় যে কোথাও কোনোরকম অসুবিধা থাকে না। এমনকি তার সৌন্দর্য্য পর্যবেক্ষণে নিয়োজিত চোখেরাও কাছাকাছি মাত্রার আরাম পায়। আর শুলে সেটা এমনভাবে মানুষকে ভাসিয়ে রাখে যে মেঘের ওপর শুয়ে শুয়ে ভাসার মতো একটা অনুভূতি তৈরি হয়। এটাই বলা চলে আমার ঘরের একমাত্র বিলাস সামগ্রী। ইচ্ছা ছিলো ইজিচেয়ার কেনার। পছন্দসই ইজিচেয়ার না পেয়ে কেনা হয়েছে এই সোফা। এছাড়া দশ বাই বারো ফিটের একঘরের জীবনটা আমার জীর্ণই বলা যায়।
কিন্তু মেয়েটি সেই সোফাতে বসলো না। বসলো গিয়ে খাটের ওপর। আসলে খাট না বলে ওটাকে চৌকি বলাই ভালো। ইন ফ্যাক্ট ওটা চৌকিই। খালি একটু বেশি মজবুত করে বানানো চৌকির চেয়ে- এই হলো তফাৎ। পাশিগুলো শক্ত কাঠের। সেটার ওপর বিছিয়ে রাখা ম্যাট্রেসটিকে এখন আর ম্যাট্রেস বলা যাবে না অবশ্য। বাঁশির আগুনের ছোবড়া সরবরাহ করতে গিয়ে ওটা নিজের শরীরের অস্তি-মজ্জাগুলোও বিসর্জন দিয়ে ফেলেছে। চাদরটা কুচকে একদিক থেকে উঠে এসেছে। এটা ঘটেছে মূলত আমার জন্য। ঘুমের মধ্যে কিভাবে যে চাদরটা যেকোন একদিক থেকে কুচকে উঠে আসে- সেটা আমি আজো বের করতে পারলাম না। নওরীণ সেই কুচকানো চাদরের ওপরেই বসে চুপচাপ পা দোলাতে লাগলো। আমি গিয়ে বাথরুমে ঢুকলাম। দাঁত ব্রাশ করতে। যদিও এখানে একটা ব্যপার আছে।
নওরীণ কেবলই আমার বন্ধু এবং ওকে নিয়ে আমার মনোজগতে কি ধরনের ভাবনাদি চলে, সেটা মিজের সঙ্গে আমার আগের রাতের আলোচনা থেকেই বোঝা যায়। তারপরেও দাঁত ব্রাশ করার সময় একবার আমার হঠাৎ করে ইচ্ছে করলো, ব্রাশ না করে সকালের বাসি মুখে মেয়েটিকে গিয়ে একটা গভীর চুমু দিয়ে আসতে। অনেকটা ক্ষণ সময় লাগিয়ে দিতে হবে দিতে হবে চুমুটা। কিন্তু সেটা লিটারেলি সম্ভব না। কারণ মেয়েটির সঙ্গে আমার তেমন কোনো সম্পর্ক নেই। এটা ভেবে খানিকটা খারাপ লাগলো। দিনের শুরু দিককার একটা ইচ্ছা অপূর্ণ রয়ে যাওয়াটা হয়তো সারাদিন আমাকে তাড়িয়ে বেড়াবে। ভাবতে ভাবতেই অন্য সব কাজ শেষ করে বাইরে বেরিয়ে পড়লাম দু'জনে।
রিকশায় করে যাচ্ছিলাম প্রেসক্লাবের দিকে। দু'জনেরই ওখানে এ্যাসাইনমেন্ট। তবে দু'জনের দুইটা। একই এ্যাসাইনমেন্ট না। ওর পাশে বসে থাকার সময় আমি কোনো এক আজব কারণে সন্তপর্ণে থাকি। এটা আমি নিজে বুঝে নিজে খানিকটা নিজের ওপর বিরক্তও হই। কিন্তু অন্তর্গত সংকোচটা এত স্বতঃস্ফূর্ত যে আমি চাইলেও সেটা ঝেড়ে ফেলতে পারি না। এটা নির্দেশ করে আমিও মেয়েটির ব্যপারে খুব আগ্রহী। মানসিক ও শারীরিক- দুই ভাবেই মেয়েটি আমাকে আকর্ষণ করে। আমি তার দ্বারা আকর্ষিত হই।
ওর পাশে বসে, ওর গাএর গন্ধের কারণে আমি আর অন্য কোনোদিকে কনসেনট্রেট করতে পারছিলাম না। তাই একসময় আলোচনা করা বাদ দিয়ে ওর ঘাড়ের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা শুরু করলাম। তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় সম্মোহিত হয়ে পড়া শুরু করি। আমার কেবলই মনে হচ্ছিলো তখনই ওর ওই অনন্য অঙ্গটিকে ঠোঁট দিয়ে শক্ত করে আকড়ে ধরতে হবে, ধরতেই হবে আমার আর কোনো উপায় নেই; আর ঠিক তখনই মিজের কথাগুলো মনে পড়ে গেলো। সূপর্ণখা টাইপ মেয়ে। পালা পালা।
চট করে ঘোর থেকে বের হয়ে আসলাম। চোখ দু'টো বারকয়েক বড় আর ছোট করে করে, স্বাভাবিক পৃথিবীর প্রোগ্রামটা মাথায় সেট করে নিলাম। সেখানে নওরীণ তখনো বক বক করেই চলেছে। কি ধরনের বিষয় নিয়ে যে ওর অতো কথা, তা বোঝার সুযোগ আমি কখনোই পেতাম না। বলা ভালো, ওর মানসিক ও শারীরিক উপস্থিতি আমাকে সে সুযোগ দিতো না। আমি কেবলি ওর ভেতরে ডুবে যেতাম। ওর পাশে আমি যে আর আমার নিয়মিত আমি থাকতাম না, সেটা বিলক্ষণ বুঝতাম। আর সেটা থেকে মুক্ত থাকার জন্যই সবসময় ওকে দেখলে পালিয়ে বেড়াবার চেষ্টা করতাম। কিন্তু চেষ্টাগুলো খুব কম সময়ই সফল হতো। বিশেষ করে যে মেয়েটি সকালে আমাকে বাসায় গিয়ে ঘুম থেকে ডেকে তুলে আনার ক্ষমতা রাখে, তাকে এড়ানোটা সহজ ব্যপার ছিলো না।
---





কি হইল! শুরু হইতে না হইতেই শেষ?!
ইন্টারেস্টিং লাগতেছিল। বর্ণনাভঙ্গি ইজুয়াল না, একটু অন্যরকম।
ভাংচুর করতেছেন নাকি নিজের লেখালেখি নিয়া?
ভাঙচুর কিনা জানি না। লেখার মতো কিছু না থাকলেও মাঝে মাঝে এমনিই কিছু একটা লিখতে মন চায়। সেইরকম মনে হওয়া থেকে বাইর হওয়া একটা পোস্ট। আপনের ইন্টারেস্টিং লাগসে জাইনা খুশি হইসি। আমারও আপনের নতুন কবিতাটা ইন্টারেস্টিং লাগছে বাউন্ডুলে। আপনের কবিতায় সাবলীলতা আসতেছে।
থ্যাঙ্কুস!
লেখতে থাকেন মনে যা চায়, এমনে লেখতে পারার মজাই আলাদা।
সূপর্ণখা মানে কি?
আর লেখাটাতে কোন কনক্লুশন টাইপ চিন্তা করারও স্কোপ পেলাম না, আমার বুঝতে পারার ভুল বোধকরি।
মিয়া, পার্ট করেন নাদানদের কিছু চিন্তা করার সুযোগ দেন!
হিহি
না আপুমণি, পার্ট করার কোনো সুযোগ নাই। আজকাল যা মন চায় লিখি, কোনো পরিকল্পনা করি না। তাই এটা সম্পর্কে আমার মাথাতেও কনক্লুশন টাইপ কোনো চিন্তা আসতেছে না, আপনার মতোই অবস্থা 
বিশ্বপ্রেমিক ভাইয়ের আগমন/ শুভেচ্ছা, স্বাগতম।
ওই বেটি শুধু ওইটাই চোখে পড়লো? আর লেখাটায় যে অনেকগুলো চুম্বক আছে সেগুলা দেখলি না?
ঐ পিচ্চি বেশি চিল্লাফাল্লা করিস না, থাবড় খাইবি।
হাহহা, গুড শট!
ঠিকাসে, পিচ্চি আর চিল্লাফাল্লা করবে না। পিচ্চি থাবড়ে ভয় পায়।
কেমন আছেন?
লেখাটা জমে উঠেছিল, হঠাতই শেষ হয়ে গেল ! পর্ব লিখে ফেলেন
নিভৃতদা' ভালো আছি। আপনি কেমন আছেন? লেখা ভালো লেগেছে? তাহলে তো খুবই খুশির কথা।
গল্পটাতো সহজ, শিরোনাম অসহজ হইলো কেন?
নীড়দা'!!!!
গল্প-শিরোনাম যা হয় হোক, ব্যপার না; অসহজ যে কেন লিখেছিলাম তা আর মনে নেই। সেসব বাদ। এখন বলেন, আপনে কেমন আছেন? অনেক অনেক দিন আপনি আমার কোনো খোঁজ-খবর নেন না। দিনকাল কেমন যায়?
রাতে ঘুমানোর আগে পড়ছিলাম মোবাইলে সব সময়ের মতোই ভালো। তয় টাইটেল টা জব্বর পাইছেন বিশ্বপ্রেমিক!~
একদম ঠিক। জব্বর টাইটেল। শব্দটার অর্থ মনে হয় লুইচ্চা। আপনার কি মনে হয়?
'সূপর্ণখা টাইপ মেয়ে। পালা পালা।'
নাটক করছেন? ভালবাসেন, বোজেন না? গাজা সারেন।আর্তবিশ্বাস রাখুন।
ভাই, গল্প টা কি সত্য?
আসলেই। ভালোবাসা বুঝলাম না। সবই কোপাল।
হ্যাঁ ভাই, ঘটনা সেন্ট-পারসেন্ট সত্য। নাহলে আর বলছি কি!
সে যাক্, গাঁজা ছাড়বো? আচ্ছা ছাড়বো। আত্মবিশ্বাসও রাখবো। সব কথা মানা হবে, কেমন?
শ্বাশত স্বপন, আপনাকে অনেকানেক ধন্যবাদ এবং অসংখ্য অগণিত স্বাগতম
গল্পটা পড়ে যা বলব ভাবলাম...শর্মির কমেন্ট পড়ে ওর কমেন্টই বেশী ভালো পাইলাম।
আহা, জেনে আমি বড় খুশি হলাম। আর আপনাকে পেয়ে খুব সুখী হলাম।
কিরামাছেন আপামণি? কতকাল দেখি না। আগে কত খোঁজ-খবর রাখতেন, এখন আর তাও রাখেন না
সহজভাবে শুরু হয়ে সহজভাবে শেষ। মাঝখানে বেশ জমে উঠেছিল। শুভেচ্ছা।
থ্যাংকস্ বস্
মন্তব্য করুন