ইউজার লগইন

প্যালাইডেসের গল্পটা

পৃথিবীর প্রতিটি ঘটনাকে যথাযথভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে গল্পে রূপ দেয়া যায়। আমার প্রিয় বন্ধু প্যালাইডেস আর ভেগার গল্পটা বহুদিন ধরেই লিখবো বলে ভাবছি। ওরা দু'জনই গ্রীসের কর্ফু দ্বীপের মানুষ। তবে ছেলেবেলায় ওদের কারো সাথে কারো কোথাও দেখা হয় নি। প্রায় অর্ধেক জীবন পাড়ি দিয়ে দু'জনের হয়েছিল ফ্রান্সে। যখন ওরা দু'জন জীবিকার সন্ধানে পাড়ি দিয়েছিল পরবাসে।

কিন্তু তার আগে দু'জনের একবার পরিচয় এবং ভাব-ভালবাসা হয়েছিল হালের সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে। তখন থেকেই আমি প্যালাইডেসকে চিনি। আমি তখন নতুন পরবাসী হয়েছি। ফ্রান্সের তুলুঝ শহরের প্রান্তে একটা ছোট্ট দুই রুমের অ্যাপার্টমেন্ট ভাগাভাগি ভাড়া নিয়ে থাকতাম আমরা। প্যালাইডেস আর আমি। যেভাবে আরও অসংখ্য প্রবাসী শিক্ষার্থীরা থাকে। দু'জনেই পড়াশোনা করতাম তখনও। ভেগা প্রবাসে আসার চেষ্টা করছিল সে সময়। প্যালাইডেসের কাছে তখন শুনতাম ভেগার কথা। দু'জনে টুকটুক করে স্বপ্ন বুনতো সে সময়। কিভাবে ওরা একে অপরের কাছে পৌঁছুবে। সে সময় বেশিদিন ওরা দু'জন একসাথে মিলেমিশে থাকতে পারে নি। ভেগার দ্বারা গ্রীস ছেড়ে ফ্রান্সে এসে পৌঁছানো সম্ভব হয় নি সেবার। প্যালাইডেসও পারছিল না অমন একটা দূরবর্তী স্বপ্নের হাতে নিজেকে সঁপে দিতে। আবার পারছিল না মেনে নিতেও। দিনের পর দিন প্যালাইডেসকে দেখেছিলাম আমি ভেগার জন্য মন খারাপ করে থাকতে। আমি বলতাম, তুমি তো চাইলে তোমার দ্বীপদেশে গিয়ে দেখে আসতে পারো ভেগাকে কিছুদিনের জন্যে। কিন্তু প্যালাইডেসের হাতে জমানো অর্থ কিংবা উদ্বৃত্ত সময় কিছুই ছিল না তখন। প্রতিদিন ভোর চারটায় উঠে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়তে দেখতাম তাকে। ফিরতো রাত আটটায়। এসে ঘন্টা দু'য়েকের ভেতর নেয়ে-খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তো ছেলেটা।

ওই দু'টি ঘন্টায় ওকে মাঝে মাঝে দেখতাম আমি। ছেলেটার মনে পাকাপাকিভাবে এক বিষণ্নতার ছায়া পড়ে গিয়েছিল ভেগার জন্য। একদিন একটা ছোট্ট কবিতা লিখে দেখিয়েছিল আমাকে।

"তারপর এক অনেকগুলো সন্ধ্যা একইসাথে নামার বেলায়
আমি ঠাঁয় দাঁড়িয়ে ছিলাম বহু হাজার মাইল দূরে কোনো কথা ছাড়াই।
হয়তো বাড়ি ফেরার পথে চকিতে আমায়ও খুঁজেছিলে তুমি মনে মনে
তারপর ভেবেছিলে, হায় অনুভূতি তুমি আসলে পথহারাই।"

দেখেশুনে ভেবেছিলাম ছেলেটা বোধহয় আর কখনোই ভুলতে পারবে না মেয়েটিকে। কিন্তু মেয়েটির কোনো খবর আমার জানার উপায় ছিল না। সেভাবেই চলছিল আমাদের দু'জনের ব্যাচেলর জীবন। আমরা দু'জন তারও প্রায় দু'বছর পর পর্যন্ত এক ফ্ল্যাটে ছিলাম। তারপর আমাকে কাজের খাতিরে চলে যেতে হয় ফ্রান্সের উত্তরের ছোট্ট ছবির মতো সাজানো লিল্ শহরে। আর প্যালাইডেস চলে যায় প্যারিসে। তারপরও আমাদের যোগাযোগ ছিল। প্রায় প্রতি সপ্তাহে কথা হতো। শুনতাম ছেলেটা মাঝে মাঝে ভেগার কথা বলতো। মাঝে মাঝে বলতো অন্যদের কথা। একবার সে অন্য একটা মেয়ের কথা বলেছিল। নতুন পরিচয় হয়েছিল প্যারিসে মেয়েটির সাথে প্যালাইডেসের। ওরই ল্যাটিন আমেরিকন এক সহকর্মী ছিল মেয়েটি। মেয়েটির মাঝে নাকি ও খুব বেশি ভেগাকে খোঁজার চেষ্টা করতো। সে কারণে ওদের খুব বেশিদিন এক সাথে থাকা হয় নি। আমি বলেছিলাম, এবার তাহলে তোমার আমও গেল, ছালও গেল। সহকর্মীর সাথে সম্পর্কে জড়ানোর এই এক সমস্যা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ও কাজের সম্পর্ক- দু'টোই নষ্ট হয়ে যায়। আমার কথা শুনে প্যালাইডেস হেসেছিল। বলেছিল সেটা জানতাম, কিন্তু আমার চেষ্টাটা করা দরকার ছিল। ভেগাকে ভুলতে পারছি না মীর। কি করবো বলো?

গল্পের যে অংশটা আমার জানার বাইরে সেটা হচ্ছে, ভেগার দিকটা। তখনো ওর সাথে আমার পরিচয় হয় নি। যা কিছু জানি, সবই প্যালাইডেসের মাধ্যমে শোনা। ভেগা পরে নিজে নিজে চেষ্টা করে গেছে প্যালাইডেস যে শহরে থাকে সেখানে পৌঁছাবার। সেসব চেষ্টার ফল হিসেবেই, বছর তিনেকের মাথায়, যখন প্যালাইডেস প্যারিসে মোটামুটি থিতু হয়ে এসেছে তখন ভেগা দক্ষিণ ফ্রান্সের শহর স্ট্রাসবুর্গে একটা ব্যাচেলর ডিগ্রির অ্যাডমিশন নিয়ে চলে আসতে সফল হয়। সে সময় ওদের দু'জনের মধ্যে আবার যোগাযোগও হয়। প্যালাইডেস বন্ধুদের মধ্যে প্রথমে আমাকেই কথাটা জানিয়েছিল। সে প্রায় সব কথাই প্রথমে আমাকে বলতো। সে কারণেই ওদের দ্বিতীয়বারের সম্পর্কের ব্যাপারে প্রায় সবকিছুই আমার জানা ছিল।

প্যালাইডেস আর ভেগার শহর দু'টির মধ্যে দুরত্ব ছিল পাঁচশত কিলোমিটারের মতো। প্রায়ই শুনতাম সপ্তাহান্তে একে অপরকে দেখার জন্য ছুটছে ওরা। কখনো ভেগা স্ট্রাসবুর্গ থেকে প্যারিসে, কখনো প্যালাইডেস প্যারিস থেকে স্ট্রাসবুর্গে। আমি জানতাম দু'টো শহরই ছবির মতো সুন্দর। আর দু'জন মানুষ ভালবেসে পাশাপাশি থাকতে পারলে সময়ও কেটে যায় নভোযানের গতিতে। প্রথম তিনটা মাস আমাকে শুধু শুনতে হয়েছে, ওরা দু'জন কে কার কাছে কখন কিভাবে গেল কিংবা আসলো এবং তারপর তারা পুরো উইকেন্ডজুড়ে কি করলো- সেসব কথা। ওদের দু'জনকে মিলেমিশে থাকতে দেখে সত্যি ভাল লাগছিল আমার। ভেগার সাহায্যে প্যালাইডেস চাকুরীর পাশাপাশি প্যারিসে ছোট্ট একটা ব্যাবসাও শুরু করে দিয়েছিল। ভেগাই ওকে ব্যাবসার ওয়েবসাইটের জন্য সুন্দর সুন্দর ডিজিটাল ছবি তৈরি করে দিয়েছিল। ওরা দু'জন মিলে দ্রুতই প্যারিসে একটা সংসার শুরু করার পরিকল্পনা করছিল।

তিন মাস পর একদিন প্যালাইডেস আমাকে জানায়, ও নাকি ভাল নেই। জানতে চেয়েছিলাম কেন? সে অদ্ভুত একটা উত্তর দিয়েছিল। শুনে আমার খটকাও লাগে আবার খারাপও লাগে। সেদিন প্যালাইডেস আমাকে যা বলেছিল, তা হুবহু তুলে দেয়ার চেষ্টা করি।

"মীর, আমার কেন যেন মন খারাপ। একটা ঘটনা ঘটেছে। যেটা মানতে আমার একটু কষ্ট হচ্ছে, আবার না মেনেও পারছি না। কেমন যেন একটা মিশ্র অনুভূতি।"

-কেন কি হয়েছে?

"ঘটনাটা ভেগাকে নিয়ে। ওর সাথে আমার খুব সুন্দর একটা সম্পর্ক হয়েছে। যে জন্য আমি যারপরনাই খুশি। এটা অনেকটা স্বপ্নের সত্যি হওয়ার মতো বিষয়। কিন্তু ইদানীং একটা ব্যাপার ঘটছে যেটা আমার মন কেন যে মানতে পারছে না!"

-আরে বাবা এত ভূমিকা না করে ঘটনাটা কি সেটাই বলো না।

"ঘটনাটা সামান্যই। ভেগা ইদানীং প্রায়ই আমাদের দুরত্বের অজুহাত দিয়ে দেখা করতে আসার ব্যাপারে গড়িমসি করছে। ওর শহরের পাশেই একটা বন্ধু রয়েছে। সে এক সপ্তাহে আমার কাছে আসতে চাইলে, পরের সপ্তাহে সেই বন্ধুর কাছে গিয়ে থাকতে চায়। ওই বন্ধুর কাছ থেকে নাকি অনেক নতুন নতুন জিনিস শেখার সুযোগ সে পায়। যেগুলো ওর জন্য জরুরি। তাই আজ নিয়ে দু'বার হলো সে আমার কাছে না এসে ওই বন্ধুর বাসায় গিয়ে থেকেছে।"

-আরে তাতে সমস্যা কি? বন্ধুর কাছ থেকে নতুন জিনিস শেখা যদি জরুরি হয়, তা শিখবে না?

"তা শিখবে ঠিক আছে। কিন্তু তা বলে সপ্তাহান্তে গিয়ে সেই বন্ধুর বাসায় থেকেই তা শিখতে হবে? আর কোনোভাবে কি শেখার এই কাজটা করা যেতো না? সপ্তাহান্তগুলোতো আমরা নিজেদের জন্য তুলে রাখবো বলে ভাবছিলাম। আর তাছাড়া ও একলা একটা ছেলের বাসায় এভাবে নিয়মিত গিয়ে উইকেন্ড কাটাচ্ছে, আমার দেখতেও খুব একটা ভাল লাগছে না। মনের কোথায় যেন খচখচ করছে, জানো?"

-হুম বুঝতে পারছি। তুমি ওর সাথে কথা বলে দেখো। হয়তো সব ঠিক হয়ে যাবে।

উল্লিখিত বিষয়ে এরপর আমাদের বেশ ক'দিন আর কথা হয় নি। কয়েক সপ্তাহ পরে প্যালাইডেস আবার সেই কথাটা তুললো। তবে এবার সে একটু উত্তেজিত ছিল বুঝতে পারছিলাম। সে আমাকে বলেছিল-

"মীর, আমি ভেগার সাথে কথা বলেছিলাম ব্যাপারটা নিয়ে। ও খানিকটা দোনোমোনো করে আমার কথা মেনে নিয়েছিল। বলেছিল আমি না চাইলে সে ওর বন্ধুর কাছে উইকেন্ড কাটাতে যাবে না। কিন্তু গত সপ্তাহে আমি এক রাতে ওকে ফোন করে শুনি, ও চলে গেছে ওর বন্ধুর কাছে। আমাকে বললো, আজ রাতে খুব ক্লান্ত। ট্রেনে করে পাশের নিজের শহরে ফিরতে নাকি কষ্ট হবে। তাই রাতটা সে বন্ধুর কাছে থাকবে। আমি শুনে খুব রাগারাগি করেছি। এখন আমার নিজেকে অপরাধী অপরাধী মনে হচ্ছে।"

প্যালাইডেসের কথা শুনে আমার খারাপ লাগছিল। ওর জায়গায় আমি থাকলে কি করতাম তাই ভাবছিলাম সে সময়। সেজন্য বলেছিলাম, তুমি বরং দ্যাখো ওর ওই বন্ধুর সাথে পরিচিত হয়ে। হয়তো ওর বন্ধুর সাথে পরিচিত হলে তোমার মনের খারাপ লাগা কেটে যাবে।

প্যালাইডেস আমার কথা শুনে ভেগার বন্ধুর সাথে কয়েক সপ্তাহের মাঝেই পরিচিত হয়েছিল। আমাকে বলেছিল, ভেগা আর তার বন্ধু একে অপরের সাথে দেখা করার জন্য যতোটা আকুল, সেটা দেখে নাকি ওর ভাল লাগে নি। ভেগাকে ওর বন্ধু প্যালাইডেসের সামনেই পরে কোনো সপ্তাহে ওর বাসায় থাকার আমন্ত্রণ জানাচ্ছিল কেননা তাতে করে নাকি বন্ধুটা ভেগাকে তার কর্মস্থলের মানুষদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে পারবে। এই পরিচয়টা নাকি খুবই জরুরি এবং এটা শুধুমাত্র রাতেই সম্ভব। শুনে প্যালাইডেসের ভাল লাগে নি।

আমি বলেছিলাম, এমন হতেই পারে বন্ধু। তুমি শুধু শুধু অনেক কিছু ভেবো না। আমাদের জীবনটা প্রায় সময়ই এমন। উঁচু-নিচু, বন্ধুর। চেষ্টা করে দ্যাখো সবকিছুকে ইতিবাচকভাবে নেয়ার। ভেগাতো তোমার জন্যই ফ্রান্সে এসেছে, তাই না? ওতো অন্য কোনো দেশেও যেতে পারতো।

আমার কথায় প্যালাইডেস সেদিন সায় দিয়েছিল। বলেছিল, হয়তো বা। দেখা যাক কি হয়।

এরপর আমি প্রায়শই শুনতাম ভেগার সাথে প্যালাইডেসের অনেক বিষয়েই অমিল দেখা দিচ্ছে। ভেগা বাইরে বাইরে তার বন্ধুর সাথে যোগাযোগ করবে না বললেও, তাদের মধ্যে যোগাযোগ ছিল। সে ওই বন্ধুর সাথে দিনের বেলা কোনো ছুতো পেলেই দেখা করার চেষ্টা করতো। একবার প্যালাইডেস আমাকে বললো, ভেগাকে তার শহরের বাইরে একটা জায়গায় দু'তিনবার কাজের জন্য যেতে হয়েছিল। সেখান থেকে তার বন্ধুর শহরটা কাছে। ওই জায়গায় গিয়েই ভেগা সেই বন্ধুর সাথে দেখা করার চেষ্টা করেছে। আমি শুনে বলেছিলাম, তুমি কি দু'জন মানুষকে বন্ধুত্বের সম্পর্কটাও রাখতে দিতে চাও না। প্যালাইডেস বলেছিল, ওদের বন্ধুত্বটা খুব অদ্ভুত জানো। ছেলেটার নিজ দেশে একটা গার্লফ্রেন্ড আছে। তারপরও সে সবসময় ভেগাকে সপ্তাহান্তে নিজের কাছে নিয়ে রাখতে চায়। ভেগাও কেন যেন ওই গার্লফ্রেন্ডটাকে কোনভাবেই সহ্য করতে পারে না। বিষয়টা সে এমনকি আমার কাছেও গোপন করে না। আমার কাছে ভেগা তার ওই বন্ধুর গার্লফ্রেন্ডটাকে 'লেঞ্জুর' বলে সম্বোধন করে।

আমি এইসব কথা শুনে হাসতাম। প্যালাইডেস আমার ভাল বন্ধু। ওর মনের ভেতরটা আমার অজানা ছিল না। তারপরও মস্করা করে বলতাম, হিংসায় খুব জ্বলছো বুঝি?

শুনে প্যালাইডেসও হাসতো। বলতো, আসলেই বন্ধু। বুঝতে পারছি হিংসা করা ঠিক হচ্ছে না। তারপরেও মানুষের মনতো, সবসময় নিজেকে সামলাতে পারছি না।

ওভাবেই কেটেছিল বেশ ক'টি সপ্তাহ। ভেগা নাকি আসলেই তার বন্ধুর সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দিয়েছিল। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তারা যোগাযোগ করতো না। কিন্তু প্যালাইডেসের কাছে থেকে জানতে পারছিলাম, ভেগা অমন আরও অনেক মানুষের সাথে বন্ধুত্ব চলছিল। ভেগা নিজেই বলতো, এটাই তার স্বভাব। সে কাউকে 'না' বলতে পারে না। কেউ হেসে কথা বলতে আসলে, সেও তার সাথে যতক্ষণ তার দরকার কথা বলতে থাকে। সেটা প্যালাইডেসের কাছে দৃষ্টিকটু হলেও, ভেগা তা করতেই থাকে। আমি প্যালাইডেসের কাছেই কথাগুলো শুনেছিলাম। ও বলেছিল-

"মীর, আমার মনে হয় কি, ভেগা আসলে আমাকে পেয়ে পরিতৃপ্ত না। ওর আরও চাই। আর উল্টো দিকে আমি ওকে পেয়ে এত পরিতৃপ্ত যে আমার অন্য কারো কথা মনেই পড়ে না। কি করি বলোতো?"

-মনে পড়ে না বলছো কি? এই তো দেখি আমার কথা তোমার এখনো আগের মতোই মনে পড়ে!

"হ্যাঁ, কিন্তু তাও তো আমি শুধু ভেগার কথাই তোমাকে বলি। এই একটা জায়গা আমার না থাকলে, আমি আসলে কিভাবে নিজের সাথে যুঝবো বলো?"

-তা ঠিক, বলো তোমার ভেগার কথা। সমস্যা নেই।

"ভেগা আজকাল খুব অন্যরকম হয়ে গেছে। আমাদের সেই যে একসাথে সংসার শুরুর পরিকল্পনা ছিল, সেটা এখন আপাতত আর হচ্ছে না জানো? ভেগা তার শহরে একটা চাকুরী পেয়েছে। ওর পক্ষে আর আমার কাছে আসা সম্ভব না। অন্তত সেই চাকুরীর চুক্তি শেষ না হওয়া পর্যন্ত। ওর অফিস ওকে চুক্তি পরে আবার নিতে চায়। ভেগা হয়তো চায় না। কিন্তু সেসব এখন ভবিষ্যতে অনির্দিষ্টতার হাতে চলে গেছে পুরোপুরি।"

-তোমাদের সমস্যাটা কি জানো? তোমরা দু'জনই বোধহয় একে অপরের কাছে এমন কিছু খুঁজছো, যেটার কোনো অস্তিত্ব নেই। তুমি ভেগাকে যেভাবে চাও, সেভাবে পাচ্ছো না আবার ভেগা তোমাকে যেভাবে চায়, সেভাবে পাচ্ছে না। এমন কি? নাকি তুমি ভেগাকে তার এগিয়ে যাবার পথে সমর্থন জোগাতে সাহস পাচ্ছো না?

"না মীর, ভেগার পথে বাঁধা হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে আমার নেই। কিন্তু আমাদের দু'জনের পথের এক হওয়ার আশাও খুব ক্ষীণ জানো? খুবই অনিশ্চিত। সেটা যখনই আমি বুঝতে পারি, তখনই আমার আর কিছু ভাল লাগে না। খুব বেশি একজনের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়লে যা হয় আরকি। কোন অনিশ্চয়তাকেই স্থান দিতে ইচ্ছে হয় না। অথচ পৃথিবীর চারিদিক মূলত অনিশ্চয়তাতেই ভর্তি।"

-তাহলে তো বুঝতেই পারছো বন্ধু। কঠিনেরে তুমি ভালবাসিয়াছো তাই, কঠিনেতেই সাধিবে নিজেরে- তোমার আর কোনো উপায় নাই।

সেদিন আমার করা প্যারোডিটা প্যালাইডেস কিভাবে নিয়েছিল জিজ্ঞেস করা হয় নি। কেননা তারপর সে আমায় আর কোনো উত্তর সেই দিন লিখেনি। শুধু সেই দিন বলি কেন, তারপর প্রায় মাসখানেক ছেলেটা আমাকে কোনো 'নক' দেয় নি। তারপর যেদিন কথা হয়েছিল, সেদিন শুনেছিলাম শেষ পর্যন্ত ভেগা আর প্যালাইডেস নিজেদের লড়াইটার পক্ষে আর দাঁড়ানোর সাহস পায় নি। দু'জনের কেউই পারে নি একজনের জন্য আরেকজনের স্বপ্নটা ছেড়ে দিতে। দু'টো ভিন্ন ভিন্ন স্বপ্ন আর অসংখ্য মনের অমিল বুকের ভেতর পুরে নিয়ে আলাদা হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছিল ওরা দুইজনই।

২.

গল্পটা এখানেই শেষ করা যায়। দু'জন মানুষের জগতের নিয়মে একে-অপরের কাছাকাছি আসার, এবং তারপর আবার দূরে সরে যাওয়ার বিষাদমাখা একটা স্বাভাবিক পরিণতি। কিন্তু সেটাকে গল্প বলা যায় কি?

ভেগার সাথে দ্বিতীয়বার বিচ্ছেদ হয়ে যাবার পর বহুদিন আমার সাথেও প্যালাইডেস খুব একটা কথা-বার্তা বলে নি। আমি বুঝতে পারছিলাম বেচারার মন খারাপ ছিল। আমি একবার জানতে চেয়েছিলাম, তুমি যে এত মন খারাপ করে আছো, ভেগাও নিশ্চই তোমার কথা ভেবে এভাবেই কষ্ট পাচ্ছে। কেন সব কিছু পাশে সরিয়ে রেখে আবার ওর সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করে দেখছো না তুমি? শুনে প্যালাইডেস বলেছিল,

"শেষবার যখন আমি ওর সাথে দেখা করতে যাই, তখন বুঝেছিলাম আমাকে ছাড়াই বরং ওর জীবনটা বেশি ভাল চলবে। ওর কাজ আর পড়াশোনার ওপর আমি আসলে বাড়তি একটা বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছিলাম। আমাকে সময় দিয়ে ওই দুই দিকে মনোযোগ দেয়া ওর পক্ষে কঠিন হয়ে দাঁড়াচ্ছিল। সেবার সে আমাকে ওর ক্যাম্পাসে নিয়ে গিয়েছিল। আমি ছিলাম বলে একটা ক্লাসে যেতে পারে নি। যদিও সে বিষয়টা নিয়ে আমায় কিছু বলে নি, কিন্তু আমি বুঝতে পারছিলাম কাজটা করে সে খুশি হয় নি। সেদিন আমরা যখন একসাথে ফিরছিলাম, আমার পাশেই বসেছিল সে কিন্তু সারাটা পথ একটা কথাও বলে নি। চোখবন্ধ করে বসে ছিল সে চুপচাপ বাসের শেষ সারির সিটে। জানতে চেয়েছিল, বাসায় গিয়ে কিছু খাবো কিনা আমরা। আমি বলেছিলাম, ক্ষিদে নেই। শুনে এমনভাবে শ্রাগ করেছিল ভেগা, যে আমার মনে হচ্ছিল বাস থেকে লাফ দিয়ে মরে যেতে। আমার জন্য ওর স্বাভাবিক জীবনটাই মার খেয়ে যাচ্ছিল প্রতিনিয়ত। যে স্বাধীনতার আশায় দেশ ছেড়েছিল, তার কোনকিছুই ছিল না তার জীবনে। তারই প্রতিফলন ধীরে ধীরে প্রকট হয়ে প্রকাশ পাচ্ছিল ওর সব কথায়, কাজে-কর্মে। যে মেয়েকে খাওয়ানোর জন্য এককালে সাধনা করতে হয়েছিল আমাকে, সে মেয়ে আমার ক্ষিদে নেই শুনে হতাশায় শ্রাগ করে ঘুমিয়ে পড়েছিল আমারই পাশে। আমি তাই আর চাই না মীর, ওর জীবনে ফিরে গিয়ে ওর যন্ত্রণা তৈরি করতে।"

কথাটা শুনে মনে হয়েছিল, প্যালাইডেস পারছিল না নিজের সব দুর্ভাবনা আর অনিশ্চয়তার দুশ্চিন্তা সরিয়ে ভেগা যেভাবে চলাফেরা করে, সেটাকে আপন করে নিতে। ভেগা পারছিল না প্যালাইডেসকে নিয়ে ওর মতো করে নিজের পরিকল্পনাগুলো সাজাতে। একে অপরকে ভালবেসে যাচ্ছিল হয়তো বা, অন্তত প্যালাইডেসকে চিনি বলে ওর দিকটা আমি নিশ্চিত করতে পারি; কিন্তু ভালবাসা ছাড়া আর কিছুই ছিল না তাদের একে অপরের জন্য লড়াই চালিয়ে নিয়ে যাবার।

সবশেষে আজ বেশ ক'বছর পরে প্যালাইডেস আর ভেগা দু'জনেই সুখী হয়েছে। নিজেদের স্বপ্নগুলোর প্রায় সবই হাতের মুঠোয় পুরেছে। শুধু দু'জনের একসাথে জীবন সাজানোর স্বপ্নটা পূরণ হয় নি।

৩.

গল্পের শেষটা এখানেই। মানুষের জীবন কারও জন্যই থেমে থাকে না। মাঝে মাঝে ধাক্কা খায়। কিন্তু তারপর মানুষ আবার সামনে এগিয়ে যাবার জন্য উঠে দাঁড়ায়। প্রথমে কষ্ট পায়। প্যালাইডেসকে আমি কষ্ট পেতে দেখেছি। মধ্যবয়সী পুরুষদের ওভাবে কষ্ট পেতে দেখলে সবসময় ভালও লাগে না। কিন্তু আমার সবচে' প্রিয় বন্ধু বলে কখনো ওকে কথাটা বলি নি। বরং কষ্টটাকে যখন ও অনুধাবন করেছে, তখন চুপ করে থেকেছি। কষ্টটা যাতে শেষ পর্যন্ত পেতে পারে, সেজন্য কোনো স্বান্তনা দিই নি। আমি দেখেছি, ওই কষ্টটা পাওয়া শেষ করার পূর্ব পর্যন্ত প্যালাইডেস অন্য কিছুতে মনোযোগ দিতে পারে নি। একবার আমার কাছে এসেছিল সে। লিল্ শহরে। দু'টো সপ্তাহ কাজ থেকে ছুটি নিয়ে। প্রায় প্রতিদিন ঘরের মধ্যে পুরোটা সময় কাটিয়েছিল ছেলেটা। শুধু যখন আমি আশেপাশে থাকতাম, তখন কয়েকটা কথা বলতো।

ভেগা ঠিক সে সময় কি করেছিল, তা আমার দ্বারা জানা সম্ভব হয় নি। পরে বহু পরে জেনেছিলাম, ভেগা তার সেই বন্ধুকে নিয়েই জীবন সাজিয়েছে। যে বন্ধুর কাছে একবার প্যালাইডেসকে না বলে সে চলে গিয়েছিল। সেই রাতে প্যালাইডেস খবরটা শুনে থাকতে না পেরে আমাকে ফোন করে অনেক অনুযোগ করেছিল। কিন্তু তারপরও সে ভেগাকে ভালবাসা বন্ধ করতে পারে নি। যদি সে সময়ই সে নিজের ভেতর ভেগার প্রতি ক্রমবর্ধমান ভালবাসার ওপর একটা লাগাম পড়াতে পারতো, তাহলে হয়তো অন্য কিছু হতো। কেননা ভেগা শেষ পর্যন্ত প্যালাইডেসের সাথে না বরং তার ওই বন্ধুর সাথেই থিতু হয়েছিল। এটা প্যালাইডেস যাতে বুঝতে পারে, মহাকাল সেই চেষ্টাতেই তাদের ভেতর সমস্যাগুলোর জোগান দিচ্ছিল। কিংবা অন্য কথায় মহাকাল প্যালাইডেসকে বিষয়টা বুঝতে সাহায্য করছিল। কিন্তু প্যালাইডেস সময় থাকতে বিষয়টা বুঝতে পারে নি। যখন পেরেছিল, তখন অনেক দেরি হয়ে গিয়েছিল।

প্যালাইডেস আর ভেগার গল্পটা চিরকাল বিষাদমাখাই রয়ে গেল।

---

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

টুটুল's picture


Sad

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!