ইউজার লগইন

গল্প: শঙ্খচিলেরা যেভাবে বকাবকি করতো আমাদের

১.

বিকেলের মাঝামাঝি সময়ে লাল আর সবুজ রং দেখতে দেখতে মাথা খারাপ হয়ে যাবার মুহুর্তে একবার আকাশী নীল রং চোখে পড়েছিলো। বহুদিন পর প্রিয় রংয়ের শাড়ি চোখে পড়লো। আবারও সেই ছিপছিপে লম্বা মেয়েটি। উবায়েদ ভাইয়ের দোকানে যাকে দেখেছিলাম। আমি ভেবেছিলাম এবার ওর সাথে কয়েকটা কথা বলবো। অথচ ভিড় আমাদের দু'জনকে কাছাকাছি হতে দিলো না।

-নাম্ব সময়ের দিনলিপি, ১৭/১২/২০১৩ ইং

ছিপছিপে লম্বা সেই মেয়েটির সাথে পরে আমার আরও দেখা হয়েছিল। প্রথমে একবার দেখা হয়েছিল ২০১৬ সালের দিকে, কিন্তু অনলাইনে। ২০১৯-এ গিয়ে আমাদের দেখা হয় সামনাসামনি।

সেদিনও আকাশি রংয়ের শাড়ি ছিল তার পরনে। শাদা পাড় আর তাতে কমলা রংয়ের ফুলের নকশা। সেবার ড্যানডেলিয়ন আর হায়াসিন্থ ফুলের বাগানে প্রথম দেখা হয় আমাদের। তখন বেগুনি, শাদা, আকাশি ও কমলা রং ছড়িয়ে ছিল ভূমিতে, এবং ওপরে আকাশে ছিল আইসক্রীমের ভ্যানিলা। শরতের শেষ বিকেলে শাদা শাদা মেঘকে সামনে ঠেলে সূর্য্যিমামা পেছন থেকে আলো ফেলে যে রংয়ের বাহার সৃষ্টি করে- ঠিক তেমনি।

মুহূর্তের জন্য যখন আমি ধরে নিয়েছিলাম যে পথ হারিয়ে এক রুপকথার রাজ্যে চলে এসেছি- সেই সময় ছিপছিপে লম্বা মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলেছিল, অবশেষে তোমার দেখা পেলাম!

২.

তারপর ভালবাসতে-বাসতে হারিয়ে গিয়েছিলাম আমরা দিগন্ত রেখায়, কোনো এক সুদূর অজানায়। প্রথম দেখায় খুলে যাওয়া সেই রুপকথার রাজ্যের দুয়ার আমাদের শুধু এক নতুন জীবনই দেয় নি। দিয়েছিল এক নতুন পৃথিবীও।

একবার দক্ষিণের পানে কিসের খোঁজে যেন বেরিয়ে পড়া হয়েছিল। সে যাত্রায় আমরা প্রথমবারের মতো অনুভব করেছিলাম- নিজের ভেতর থেকে বেরিয়ে পৃথিবীটাকে দুচোখ ভরে দেখার ভেতর কি অপরিসীম তৃপ্তি লুকানো!

একেকটা দিন সূর্য্যিমামা জেগে ওঠার সাথে সাথে ঘুম ভেঙে যেতো আমাদের। পড়িমরি এক কাপ কফি নিয়ে ছাদের পানে ছুট লাগাতেই টের পেতে শুরু করতাম যে ততক্ষণে দেরি হয়ে গিয়েছে! কৃষ্ণ সাগরের শঙ্খচিলেরা আমাদেরও আগে পৌঁছে গেছে সপ্তাখানেকের জন্য ভাড়া নেয়া ওই বাড়িটার ছাদে। শুরু করে দিয়েছে তাদের দিনের কার্যাবলি নির্ধারণের বৈঠক।

আমরা প্রথম দিনই তাদের দলের সদস্য হয়ে গিয়েছিলাম যদিও, তবে সকালের বৈঠকে আসতে দেরি হলে আমাদের দুজনকেই শঙ্খচিলদের বকা খেতে হতো। তারপর ঠিক হতো সেদিন আমরা দুজন কোথায় কোথায় যাবো, কে কে আমাদের সঙ্গে যাবে- এসব।

ওদের "সঙ্গে যাওয়া" অর্থ হলো, আমাদের বাহনের সাথে দুর কিংবা কাছ দিয়ে উড়ে উড়ে যাওয়া। অনেক ভাল উড়তে পারতো ওরা। বিশেষ করে আমরা যখন জাহাজে করে বসফরাস প্রণালী আর মারমারা সাগর হয়ে একেকটা প্রিন্স'স আইল্যান্ডে যেতাম সে সময় তাদের আনন্দ ছিল দেখার মতো। মারমারা সাগরের তীর হতে ১০ থেকে ২৩ কিলোমিটার দুরত্বের মধ্যে চারটি ছোট-বড় দ্বীপ নিয়ে প্রিন্স'স আইল্যান্ডস্ নামের দ্বীপপুঞ্জ গঠিত। ইস্তান্বুল শহরের জাহাজঘাট থেকে সবচেয়ে দুরের দ্বীপটিতে পৌঁছুতে বিভিন্ন গতির জলযান-ভেদে দুই থেকে আড়াই ঘন্টা লাগতো। দিনের প্রথম বেলায় একেকটা দ্বীপ ভ্রমণ করতে বের হতাম আমরা।

আমাদের বন্ধু কিংবা বলা ভাল দলের সদস্য শঙ্খচিলগুলোর জন্য সেটি ছিল দিনের সবচেয়ে বড় আনন্দের উপলক্ষ। জাহাজের পাশে পাশে ওড়ায় তাদের আগ্রহ ছিল অপরিসীম। জাহাজের অন্য যাত্রীরাও তাদের সে আনন্দে সামিল হয়ে যেতো মুহূর্তেই। আর আমরা তো ছিলামই। নানান ভঙ্গিতে শঙ্খচিলদের সাথে ছবি তোলায় ব্যস্ত, কিংবা বাতাসের পানে চুল মেলে দিয়ে পুরো বিশ্বব্রহ্মাণ্ড ঘুরে আসায় নিমজ্জিত, আর নাহয় একে অপরের চোখে ডুব দিয়ে নিশ্চয়তার সাগর অনুধাবনে মগ্ন- জাহাজভ্রমণের পুরোটা সময়।

দ্বীপে পৌঁছে আমাদের প্রিয় খেলা ছিল সাগরতীরে এমন কোনো একটা জায়গা খুঁজে বের করা, যেখানে দৃশ্যত কারো পায়ের ছাপ পড়ে নি দীর্ঘকাল। তারপর সেখানে বসে নির্জন প্রকৃতিকে দীর্ঘক্ষণ চুপচাপ অনুভব করা। আকাশের হালকা নীল রঙ সাগরের স্বচ্ছ পানিকে এক স্বর্গীয় রূপ দিয়ে রাখতো। সেই পানির ঢেউদের তীরে এসে আছড়ে পড়া দেখতে দেখতে আমাদের এক বেলা সময় এক মুহূর্তে কেটে যেতো। মাঝে মাঝে সেই ঘোর থেকে মাথা দুটি বের করে আশপাশে তাকাতে পারলে আমরা দেখতাম- সঙ্গী শঙ্খচিলেরা কাছেই চুপচাপ বসে আছে কেউ কেউ, আবার কেউ কেউ লাল কাঁকড়ার খোঁজে ছুটে বেড়াচ্ছে সাগরের তীরে।

তারপর এক সময় আমরা চলে আসতাম শহরে। পরের বেলায় আমাদের অভিসার চলতো শহরের অলি আর গলিতে। ইস্তান্বুলের এশীয় ও ইউরোপীয় দুটি অংশই হেঁটে হেঁটে চষে ফেলেছিলাম আমরা সেবার। মাত্র সাতদিনে!

সেবার এত বেশি হাঁটা হয়েছিল যে, আমাদের দুই জনের ওজন প্রায় দশ কিলো কমে গিয়েছিল। আমার ওজন পাঁচ কিলো মতো কমে শরীরের মেদবহুল কাঠামোটা একটু আটোসাঁটো হয়েছিল। আর ছিপছিপে লম্বা মেয়েটি ওজন কমিয়ে যেন আরও লম্বা ও মায়াবতী হয়ে উঠেছিল। সেসময় সন্ধ্যার আলোতে বসফরাসের পাড়ে ওর পাশে বসলে আমার মনে হতো, মেঘের ওপারের রাজ্যে যেন কেউ এক অসম্ভব আনন্দের সুর ধরেছে তানপুরায়। সেই সুর ভাসতে ভাসতে অনেক দূর থেকে এসে পৌছাঁচ্ছে আমাদের কানে। মনে হতো সে সুর যেন অনন্তকাল ধরে বাজতেই থাকবে।

৩.

ঝপ্ করে এক গ্লাস পানি চোখে মুখে প্রবল বেগে ছিটিয়ে পড়তেই পড়িমরি লাফ দিয়ে উঠে বসি আমি বিছানায়। পরনে নাইকির একটি বক্সার ছাড়া আর কিছু না থাকায়, কম্বলের ভেতরেও শরীরে হিম ঠান্ডা একটা ভাব ওপর-নিচ করে নেয় কয়েকবার। কয়েক মুহূর্ত সময় নিয়ে ধাতস্থ হয়ে দেখি, কোথায় ইস্তান্বুল, কোথায় কি!

নিজের ঘরে বেলা ১০ টা পর্যন্ত পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছি- রোববার তাই। আমার অফিস শনি আর রোববার ছুটি। কিন্তু বাড়ির কর্ত্রীর তাতে কি আসে যায়? ঘর মোছা, গোছগাছ, ঝাঁট দেয়া এবং আর যা কিছু জরুরি মেইনটেইনেন্স রয়েছে- সেসব তো রোববারের জন্যই তোলা। যাতে সে কাজগুলোতে আমার খানিকটা সাহায্য পায়। যদিও আমার সাহায্য স্বল্প সময়ের মধ্যেই অন্য একটা দিকে ধাবিত হওয়া শুরু করে কিন্তু সে কথা থাক।

শঙ্খচিলেরা যেভাবে বকাবকি করতো আমাদের সকালের বৈঠকে হাজির হতে দেরি হলে, তেমনি কিছুক্ষণ ছিপছিপে মেয়েটি বেলা করে ঘুমুনোর জন্য আমায় বকাবকি করে প্রতি রোববার সকালে।

ভালই লাগে। মনে হয় যা কিছু চেয়েছিলাম কিংবা যা কিছু পেয়েছি এবং সামনে যা কিছু হতে যাচ্ছে- সবকিছুরই একটা কারণ রয়েছে। সব ঘটনাই একটি সুতায় গাঁথা। এবং সেই সুতাটিই বুনে যাচ্ছে আমার জীবনের গল্প।

যেভাবে আমি চাইছি এবং চেষ্টা করছি- প্রায় সেভাবেই।

---

পোস্টটি ১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

মীর's picture

নিজের সম্পর্কে

স্বাগতম। আমার নাম মীর রাকীব-উন-নবী। জীবিকার তাগিদে পরবাসী। মাঝে মাঝে টুকটাক গল্প-কবিতা-আত্মজীবনী ইত্যাদি লিখি। সেসব প্রধানত এই ব্লগেই প্রকাশ করে থাকি। এই ব্লগে আমার সব লেখার কপিরাইট আমার নিজেরই। অনুগ্রহ করে সূ্ত্র উল্লেখ না করে লেখাগুলো কেউ ব্যবহার করবেন না। যেকোন যোগাযোগের জন্য ই-মেইল করুন: bd.mir13@gmail.com.
ধন্যবাদ। হ্যাপি রিডিং!