আষাঢ়ে
(ক) রহমত মাষ্টার
আষাঢ় মাস। দুদিনের টানা বৃষ্টি সব কিছুকেই যেন থমকে দিয়েছে।
রহমত মাষ্টারের মেজাজ খিচড়ে আছে ভীষন অসময়ে ঘুম ভাঙার জন্য। রাত প্রায় ৩ টা। ঘুম ভাঙার কারন যে পেটে মোচড় তা আর বুঝতে বাকী নাই তার। বাইরে ভীষন বৃষ্টি। গ্রামের এই এককোনে তার টিনের ঘরখানায় সে একা থাকে। বউটা মেয়েটাকে নিয়ে গেছে বাপের বাড়ী, বেড়াতে। টিনের চালে বৃষ্টির টিপ টিপ শব্দ তাকে আবারও সন্ত্রস্ত করে তুললো। পেটের মোচড় নিবৃত করতে চাইলে তাকে ঘর থেকে অন্তত ১০০ গজ হেটে ঝোপ আর বিশাল বাঁশ ঝাড় এড়িযে পুকুরের পাড় ঘেঁষে বাস্তু ভিটার শেষ সিমানায় ছোট ঘরটাতে যেতে হবে। চেষ্টার কোন ত্রুটি রাখছে না সে যেন কোনভাবেই হোক সকাল পর্যন্ত চেপে রাখা যায়। অন্য স্মৃতি কিছু এদিক সেদিক হাতরে ভুলে যেতে চাইছে ব্যাথাতুর মোচড়টাকে। কিন্তু খুব একটা সুবিধা হচ্ছে না। ঘুরে ফিরে ঘরের খুব কাছে সুন্দর একটা ছোট ঘর নির্মান ও তা ব্যবহারে সুখের কথাই বার বার ভেসে উঠছে।
প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক সে। বাচ্চাদের পড়ানোটা যতটা না তার পেশা তার থেকেও বেশী তার শখ। আধো আধো বুলিতে বাচ্চারা তার সাথে সুর মলিয়ে যখন একের ঘরের নামতা বা ছড়া বলে প্রায় সময়ই তার চোখে পানি এসে যায়। কখনো সখনো বাচ্চারা তার গায়ে হুমড়ি খেয়ে পরলেও সে কড়া চোখে তাকাতে যেয়েও হেসে ফেলে। বাচ্চারাও সে সুযোগ নিতে ছাড়ে না। প্রায়ই দেখা যায় আজমত খাঁর ছেলেটা তার ঘাড়ে সওয়ার হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। রহমত ও আজমত খাঁর ছেলে হেসে কুটি কুটি। কেন? তার রহস্য ভেদ করা যায়নি কখনো। অভাবের এই সংসারও তার সরলতাকে মলীন করতে পারেনি এতটুকু। এমনকি পাওয়া- না পাওয়া নিয়ে কখনোই আফসোস ছিল না তার। কিন্তু এখন এই বৃষ্টির রাতে খুব কাছাকাছি ছোট ঘরের প্রয়োজনীয়তা বোধ হচ্ছে ঠিকই।
না আর পারা যাবে না- বলে হুড়মুড় করে উঠে দাড়ালো রহমত।
টর্চ হাতে লুঙির গিঁট আকড়ে ধরে দরজার ছিটকিনি খুলেই দৌড় লাগালো অন্ধকার ফুড়ে। ভিজে চুপসে পৌছালো গন্তব্যে। নিরাপদেই সেরে নিল সব। স্বস্তির মাত্রা এমন ছিল যে একচোট হেসেও ফেললো সে শব্দ করে। ভিজতে ভিজতেই ফিরতি পথ ধরলো সে। খুব বেশীদূর এগোয়নি, ঠিক পুকুরের কাছে যেখানটায় জমাট বাঁশঝাড় পথ আটকে আছে, সেখানটায় ফোঁপানো কান্নার শব্দ শুনে থমকে দাড়ালো রহমত। এত রাতে কান্নার শব্দ তাকে বেদনার্ত করে তুললো। এমন ঝড় জলের দিনে কার বাচ্চা হারিয়ে গেল? এগিয়ে গেল সে। টর্চ এর আলো ফেলায় সহসাই চোখে পরলো ৪-৫ বছরের এক ছেলে বাঁশ ঝাড়ের নীচে বসে বৃষ্টিতে ভিজছে, থর থর করে কেঁপে উঠছে ক্ষণে ক্ষণে। দৌড়ে গেল রহমত। এই কেরে তুই, নাম কি? তোর বাপের নাম কি? বাড়ী কোথায় রে? এত সব প্রশ্ন একসাথে করে ফেললো সে। কিছুই বললো না ছেলেটা। কাঁপতে লাগলো ভীষনভাবে। রহমত এগিযে গিয়ে টেনে তুললো ছেলেটাকে। স্বভাবমতই তুলে নিল ঘাড়ে। তারপর ভিজতে ভিজতেই ঘরে নিয়ে এল ছেলেটাকে। ভাবলো সকাল হোক- কার ছেলে পরে দেখা যাবে। ঘরের ছিটকিনি আটকিয়ে চৌকিতে বসিয়ে দ্রুত মুছে দিল ছেলেটার গা মাথা। বললো, বসে থাক্, আমি কাপড় পাল্টে আসি, তারপর তোর খাওয়ার ব্যবস্থা করছি। পাশের ঘরে যেয়ে, ভিজে কাপড় পাল্টে দ্রুতই ফিরে আসলো রহমত। ফিরে এসে ছেলেটাকে না দেখে, হাক দিল, কীরে কই গেলি ? খুজতে লাগলো এদিক সেদিক, চৌকির নীচে। আবার বেরিয়ে গেল কীনা, ভেবে দরজার দিকে এগিয়ে গেল রহমত। ছিটকিটি লাগানোই আছে। তাছাড়া এত উপরে ছিটকিনি নাগাল পাওয়ার কথা নয় ছেলেটার। এই প্রথম ভয় পেল রহমত। সময় গড়ানোর সাথে সাথে জাকিয়ে বসলো তার ভয়। বামন কাহীনি সে অনেক শুনেছে ছোট বেলায়্ দাদীর কাছে। রাত বিরোতে পথিককে বিভ্রান্ত করে সেই সব বামন। কিন্তু নিজে কখনো দেখেনি। কিছুক্ষণের মধ্যেই প্রচন্ড কাপুনি দিয়ে জ্বর আসলো তার। জ্ঞান হারালো রহমত।
সকালে অনেক বেলা অবধি রহমতের সাড়া না পেয়ে প্রতিবেশীরা তার ঘরের দরজা ভেঙে বের করলো রহমতকে। প্রচন্ড জ্বরের ঘোরে প্রলাপ বকছে, কিরে কই গেলি ? তুই কার পোলা? এত রাতে এখানে কেমনে আসলি?
এর দুদিন পরেই রহমত পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেল ।
পুনশ্চ: রহমতের কবর হল তার বাড়ীর উল্টোদিকে স্কুলের পাশে পুকুর পাড় ঘেঁষে।কোন এক ঝড়- বৃষ্টির দিনে অনেকেই আবিষ্কার করলো আজমত খাঁর ছেলেটা গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে ওই কবরের দিকে।





ভাল লাগলো, বিশেষ করে শেষটুকু!
বেশ।
ভালো!
দারুন।
পুনশ্চ: দেয়ার জন্য গল্পের আবেদন কমে গিয়েছে।
মন্তব্য করুন