ইউজার লগইন

নাগরিক প্রেসনোট-৫: এগুলোর কোনটাই মৃত্যু নয়, রাষ্ট্র ও কর্পোরেটদের হাতে সংঘটিত খুন!

খুন-হত্যাগুলোকে অনায়ানে মৃত্যু বলে চালিয়ে দিয়ে শাসকগোষ্ঠীর দায়মুক্তির প্রাতিষ্ঠানিক রেওয়াজ পাকাপোক্ত হয়েছে। ধীরে ধীরে, অনেক দিন থেকে, ঐতিহাসিকভাবেই। দিন দিন এ রেওয়াজটা দানবীয় চর্চায় রূপ নিচ্ছে। এ দানবীয় কর্মে রাজনৈতিক শাসকগোষ্ঠীর সাথে যুক্ত হয়েছে কর্পোরেট বেনিয়া এবং তাদেরই পরিচালিত, তাদের কাছে নতজানু গণমাধ্যম। সংবাদপত্র, বেতার- টেলিভিশন। এদের ক্ষমতাকেন্দ্রীক নিরবিচ্ছিন্ন সংগমে হৃষ্টপুষ্ট হয়ে উঠছে শাসন-শোষণের অভিধান। দিনযাপনের শব্দমালায় যুক্ত হয়েছে কত বিচিত্র সব শব্দ।  ক্রসফায়ার, এনকাউন্টার, ক্লীনহার্ট, আরো কতো কী। যে দরিদ্র কৃষক কোন দিন বিদ্যালয়ে যাবার সুযোগ পাননি, সরকারি জরিপে যাকে নিরক্ষর, পড়ালেখা না জানা হিসেবে তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, বাংলা বর্ণমালার সাথেও যার পরিচয় ঘটেনি, কাঠামোগত দারিদ্রের কারণে, সে দরিদ্র নিরক্ষর কৃষকও ক্রসফায়ারের প্রায়োগিক অর্থ বুঝে। কিন্তু এ বুঝাবুঝি তার মনে কোন ক্ষত তৈরি করে না। তাকে আতংকগ্রস্থ করে না। তাকে পীড়িতও করে না। বিনাবিচারে মানুষের খুন হয়ে পড়ে থাকায় তাকে আবেগতাড়িত করে না। বরং  রাষ্ট্র ও অনুগত গনমাধ্যম কর্তৃক নিত্য মগজ ধোলইয়ের ধারাবাহিকতায় কেউ কেউ, বলা যায় বেশির ভাগ, এর সমর্থকও হয়ে উঠে। কারণ তথ্য অভিগম্যতার সীমিত পরিসরে সে কেবল মূদ্রার একটি পিঠই স্পর্শ করতে পারে। অপর পিঠ অধরাই থেকে যায়। তথ্য-উপাত্তকে অধরা করে রাখাটাও শাসকের অনিবার্য চরিত্র, শোষণের অনিবার্য হাতিয়ার।  
এইতো সেদিন বিকেল বেলা  খোদ রাজধানীর অভিজাত এলাকা গুলশান-১ এ যে দু’জন নাগরিকের জীবনাবসনকে ঝড়েমৃত্যু বলে গণমাধ্যমগুলো প্রচার করেছে, সে দু’টি তাজা প্রাণের অস্বাভাবিকভাবে হঠাৎ ঝরে যাওয়াকে আমি স্রেফ হত্যা বলেই মনে করি। খাবারের দোকানের ১৫ বছর বয়সের টগবগে কর্মী সাইফুল, যে ঝড় ও বৃষ্টি উপভোগ করতেই ঘরের বাইরে এসেছিল অথবা অজ্ঞাতনামা গাড়ির চালক, যে গাড়িতেই নিরাপদে বসে অনিরাপদ হয়েছিল, যার আর ফিরে যাওয়া হয়নি, কখনও হবে না তার প্রিয় জনের কাছে, এ দু’জনই মূলত: খুন হয়েছে রাষ্ট্রের দায়িত্বহীনতায়। সিটি করপোরেশনের ক্রমাগত দায়িত্বে অবহেলায়। সর্বপোরী দানব কর্পোরেট এর বিজ্ঞাপন পরিবেশনে দানবীয় বিলবোর্ডের হামলায়। বিবেক খেকো বিজ্ঞাপন পরিবেশনের পদ্ধতির কাছে যেখানে পরাজিত হয়েছে যাবতীয় নিয়ম এবং হাজার হাজার পথচারীর সম্ভাব্য ঝুকি, জীবন-মৃত্যূ বিবেচনা।
শুধু ঢাকা নয়, প্রতিটি শহরের প্রতিটি রাস্তার আকাশ ঢাকা পড়েছে বিশাল বিশাল আকারের এ সব দানবীয় বিলবোর্ডের কাছে। বিলবোর্ডগুলোই হয়ে উঠেছে নগরীর বিকল্প আকাশ। কিন্তু এগুলো এতটাই নাজুক যে, মাত্র ঘন্টায় ২৬-৫৬ কিলোমিটার গতিবেগে বয়ে যাওয়া ঝড়েই ভেঙ্গে পড়েছে। খুন করেছে তরতাজা দু’টি জীবন। কর্পোরেটদের দানবীয় বিলবোর্ডের হামলায় মানুষ খুন করা অথবা হাত-পা-অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ কেড়ে নেয়ার ঘটনা এ প্রথম নয়। এর আগেও হয়েছে। ২০০৭ সালেও ঢাকা বিমানবন্দরের সামনে একই রকম ঘটনা ঘটেছে। একই বছর প্রগতি সরণিতেও বিলবোর্ডের নিচে চাপা পড়ে একজন শ্রমিক জীবন হারিয়েছেন। কিছুই হয়নি, না রাষ্ট্রের, না কর্পোরেটদের। ঢাকায় এ সব বিলবিবোর্ডের অনুমোদনকারী সংস্থা সিটি করপোরেশন। সিটি করপোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা যদি দায়িত্বশীল হতেন, দায়িত্ব পালন করতেন, মানুষের ভেতরে অনুভূত চাহিদা তৈরি করে মুনাফা তৈরির প্রতিযোগিতা যদি না থাকতো কর্পোরেট চরিত্রে, অথবা রাষ্ট্র যদি এ প্রতিযোগিতা নিয়ন্ত্রণে ভূমিকা নিত, তবে এ খুনগুলো এড়ানো যেত। সুতরাং এ সব জীবননাশের সংবাদ যখন ঝড়ে মৃত্যু বলে পরিবেশিত হয় তখন তাকে রাষ্ট্র ও কর্পোরেটের দায়মুক্তির প্রক্রিয়া বলেই মনে হয়। এবং এর বড় প্রমাণ যে বিলবোর্ডের নিচে পড়ে এ মানুষগুলো জীবন হারিয়েছে  বিভিন্ন সংবাদপত্র কর্তৃক সে কোম্পানীর নাম না ছাপানো। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখেও প্রধান কয়েকটি পত্রিকার একটিতেও সংশ্লিষ্ট কোম্পানীর নাম উদ্ধার করা যায় নি। বিজ্ঞাপন প্রাপ্তির সম্ভাবনার কাছে সৎ সাংবাদিকতার পরাজয় ঘটেছে ঠিক এভাবে।    
ঠিকাদার কোম্পানীর অতি মুনাফাবাদিতা আর দায়িত্বহীতার কারণে এখানে ওভারব্রিজ ঙেঙে পড়ে মানুষের মাথায়। নির্মানাধীন দালান ভেঙে পড়ে মানুষ খুন হয়। কিন্তু ঠিকাদার কোম্পানীর কিছুই হয় না। ট্রাফিক আইন প্রয়োগ না হতে হতে গাড়ির চালকরা বেপরোয়া হয়ে উঠে। প্রায় প্রতিদিন রাস্তায় মানুষ পিষে চলে যায়। মায়ের হাত ধরে থাকা অবুঝ শিশুর মাথা ও মগজ সব কিছু থেতলে দেয়। রাস্তায় ছিটকে পড়ে থাকে শিশুর লাশ। তাতেও কিছু হয় না। বরং তখনও দূরে দাঁড়িয়ে উপরি কামাইয়ের শিকার খোঁজে পেশাদার ট্রাফিক দল। এতসব খুনের মিছিল রাষ্ট্রের কাছে, শাসকের কাছে, শোসকের কাছে এগুলোকে কেবল মৃত্যু বলেই বিবেচিত হয়। কখনো ঝড়ে মৃত্যৃ। কখনও বাসচাপায় মৃত্যু। কখনও এনকাউন্টারে অথবা ক্রসফায়ারে মৃত্যু। শাসকশ্রেণীর দায়মুক্তির প্রক্রিয়া হিসেবে। বন্ধ কর এ দায়মুক্তির পথ। ঠিক এখনই।    

পোস্টটি ১১ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আবদুর রাজ্জাক শিপন's picture


ভাবনা জাগানীয়া

প্রথম লাইনে একটা শব্দ 'অনায়ানে' এটা বোধহয় অনায়াসে হবে ।

মুনীর উদ্দীন শামীম's picture


পড়বার জন্য ধন্যবাদ...........
আপনি ঠিক ধরেছেন। ওটা 'অনায়াসে' হবে। বানান ভুলটা চোখে পড়েছে। কিন্তু এডিট করতে সব গোলমাল হয়ে যাচ্ছে।

মাহবুব সুমন's picture


সাধারন মানুষের জীবনের কোনো মূল্য নাই। যদি বিলবোর্ডে চাপায় কোনো অভিজাত শ্রেনীর আদম মারা যেতো তবে শহীদ খেতাবের সাথে সাথে সরকার রাস্ট্রীয় শোক দিবস ঘোষনা করলেই করতে পারতো !

মুনীর উদ্দীন শামীম's picture


একদম ঠিক বলেছেন.....................
এটাই এখন নিয়মে পরিণম হয়েছে.....

তানবীরা's picture


মাহবুব সুমনের মন্তব্যে ঝাজা

জ্বিনের বাদশা's picture


মর্মান্তিক!
বিলবোর্ডের বিজ্ঞাপনের টাকা যে পায় তারই দায় ওটাকে নিরাপদ রাখা। কিন্তু এসব বলেই বা আর কি হয়?

মুনীর উদ্দীন শামীম's picture


ধন্যবাদ..................
অবশ্যই এ দায় ঐ বিলবোর্ড কোম্পানীর। কিন্তু একই সাথে সিটি করপোরেশনও তার দায় এড়াতে পারে না। একটি রেগুলেটরী এবং সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে। তাছাড়া বিজ্ঞাপনের জন্য বিলবোর্ডের জন্য সিটি করপোরেশনও টাকা নেয়। রাষ্ট্রও তার দায় এড়াতে পারে না।

মুকুল's picture


মুনীর উদ্দীন শামীম's picture


Thanks..................

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

সাম্প্রতিক মন্তব্য

munirshamim'র সাম্প্রতিক লেখা