ইউজার লগইন

তারেক মাসুদের গানে শ্রেণি, রাজনীতি ও জেন্ডার চেতনা: একটি সূচনামূলক আলাপ

Tareque_Masud.JPG
এক.
এমন নয় যে, এ গানগুলো এর আগে শুনিনি। ঢের শুনেছি; একবার নয়, অসংখ্যবার। প্রথম শুনেছি মূলত: মুক্তির গান-এর মুক্তির পর। তারপর ছবিটি যতবার দেখেছি, ততবারই গানগুলো শোনা হয়েছে। দেখা হয়েছে। মুক্তির গান, মুক্তির কথা, নারীর কথা, মাটির ময়না, রানওয়ে, অন্তর্যাত্রা, নরসুন্দর-তারেক পরিচালিত প্রতিটি ছবি বারবার দেখা হয়েছে। এ দেখা-শোনার পুনরাবৃত্তের মধ্যেও যে বিষয়টি দীর্ঘসময় অনাবৃত হতে পারেনি, আমার নিজের কাছে, সম্ভবত আমার মতো আরও অনেকের কাছে, তাহলো- তারেক মাসুদের ছবির গানগুলোর বেশিরভাগই তাঁর নিজের লেখা। বলাবাহুল্য, তারেক আমাদের সময়ের অন্যতম সম্ভাবনাময়, এবং অবশ্যই একজন ভিন্নমাত্রার সৃজনশীল চলচ্চিত্র পরিচালক। তারেকের প্রধান পরিচয়- তিনি একজন ’শক্তিশালী চলচ্চিত্রকার’। এ পরিচয়ের আড়ালে প্রায় অনুচ্চারিত এবং অনাবিষ্কৃত থেকে গেছে ’গীতিকার’ তারেক মাসুদ। কিছুদিন আগে ’লেজার ভিশন’ থেকে, প্রধানত তারেকেরই জীবনসঙ্গী ক্যাথরিন মাসুদ-এর উদ্যোগে ’তারেক মাসুদের গান’ শিরোনামে একটি এ্যালবাম প্রকাশিত হয়েছে। এ এ্যালবামটি প্রকাশিত না হলে আমাদের চলচ্চিত্রাঙ্গানের এ প্রতিভাবান মানুষটির প্রতিভা নামক মূদ্রার অন্য একটি পিঠ হয়তো কখনো উল্টে-পাল্টে দেখার সুযোগ হতো না। আমার মতো অনেকের। কয়েকজনের সাথে আলাপচারিতায় যখন গীতিকার তারেক নিয়ে কথা বলেছি, যখন বলেছি যে, এ গানগুলোর অধিকাংশই তারেকেরই লেখা, তখন তাঁদের মুখ ও চোখের ভাষা পড়ে, তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া দেখে, আমার এ প্রাথমিক ধারণাটি আরও গাঢ় হয়েছে। অতএব তারেকের এ পরিচয়টি আমাদের কাছে তুলে ধরার জন্য ক্যথরিন মাসুদ এর প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা জানানো একটি সম্মিলিত দায় বলেই মনে করি। একই সাথে গীতিকার তারেককে স্মরণ করাও এ লেখার একটি উদ্দেশ্য। তবে তারেকের গানের সাহিত্যমান বা শিল্পমান বিচার এ লেখার উপলক্ষ নয়। আমার জন্য সেটি সম্ভবও নয়। আমি সাহিত্যবোদ্ধা নই; সাহিত্যের নিছক পাঠক বলে।

এটা না বললেও চলে যে, তারেক নির্মিত ছবিগুলোর প্রধান উপজীব্য হচ্ছে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। ৭১-এর মুক্তি ও স্বাধীনতা সংগ্রাম। খুব স্বাভাবিকভাবেই ছবির গানগুলোর কথায় ঘুরেফিরে এসেছে আমাদের মুক্তিসংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধের কথা। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, স্বদেশপ্রেম, জাতীয়তাবোধ-এ বিষয়গুলোই তারেকের গানে প্রবল হয়ে উঠবে, উঠেছে, এটাই স্বাভাবিক প্রত্যাশা। তারেকের গান শুনেন নি-এমন কাউকে জিজ্ঞেস করলেও অনায়াসে এমন উত্তরই আসবে। কিন্তু যে সরল ও প্রান্তজনের ভাষায় তারেক দেশপ্রেমকে তুলে ধরেছেন, ব্যবহার করেছেন লোকজ উপাদান, তার গানে, সেটা অবশ্যই আলাদাভাবে উল্লেখযোগ্য। তারেকের ছবি ও গানে স্বদেশপ্রেমের বিষয়টি যেহেতু সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠিত, সেটি নিয়ে এখানে আলাপ করাটা জরুরি বলে মনে করিনি। বরং তারেকের গানের বিষয়, বক্তব্য ও শব্দচয়নে কীভাবে বিশেষ শ্রেণীচেতনা, রাজনীতি-সচেতনতা এবং জেন্ডার সমতার প্রতি গভীর পক্ষপাত পষ্টাপষ্টিভাবে প্রকাশিত হয়েছে, তা খুঁজে দেখার একটা সীমিত চেষ্টা করা হয়েছে, এ লেখাটিতে। তারেক তাঁর গানে বৈশ্বিক সাম্রাজ্যবাদের অস্ত্রব্যবসার রাজনৈতিক অর্থনীতিকে খুব সহজভাবে ধরার চেষ্টা করেছেন। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-আদর্শের বিপ্রতীপ রাজনীতির যে বিকাশ ঘটেছে এবং ঘটছে, একটা নষ্টসময়জুড়ে, সুবিধাবাদিতার রাজনীতি ও রাজনীতিকদের কারণে, তাও তাঁর গানে উঠে এসেছে খুব স্পষ্টভাবে। ভাষা ও পরিবেশনার মুন্সিয়ানার কারণেই যা-যেকোন রাজনীতিসচেতন শ্রোতাকে অভিভূত করবে। শ্রোতাকে অনুভবের অন্যরকম একটা মাত্রায় নিয়ে যাবে। ইতিহাস পুনরালোচনার মধ্যদিয়ে আত্মসমালোচনার খোরাক ও উৎসাহ যোগাবে। ইতিহাসের গতিরেখায় বারবার চোখ ফেলতে শ্রোতা-পাঠক বাধ্য হবেন । একই সাথে গানগুলোও কানে ও মনে ভীষণ রকম আবেদন তৈরি করবে। অন্তত আমার মতো সাধারণ শ্রোতার ক্ষেত্রে সেটি ঘটেছে। আমার মনে হয়েছে, গীতিকার হিসেবে তারেকের বড় সফলতা এখানেই। উল্লেখ্য এ- লেখায় শুধু তারেক-রচিত গানগুলোকে বিবেচনায় নেয়া হয় নি; একই সাথে তারেকের ছবিতে ব্যবহৃত অন্য গীতিকার রচিত গানও বিবেচিত হয়েছে। কেননা, সে গানগুলোও তারেক নির্বাচন করেছেন তার রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক চেতনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে। উজ্জীবিত হয়ে। এটা তাঁর অনুপস্থিতিতেই খুব জোরালোভাবে অনুমান করা যায়। প্রকাশিত এ্যালবামে ক্যাথরিন মাসুদের ভূমিকা-কথন থেকে এটাও জেনেছি যে, কোনো কোনো গান যদিও তারেকের নিজের লেখা নয়; কিন্তু ঐসব গানের বিষয়, ভাষা ও শব্দ চয়নে তারেকের প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ প্রভাব ছিল। দু’একটি গান যৌথভাবে লিখেছেন। খুব সঙ্গত কারণে সে গানগুলোও আলোচনায় আনা জরুরি। তারেকের শ্রেণীচেতনা, রাজনীতি-সচেতনতা ও জেন্ডার সংবেদনশীলতার সামগ্রিকতাকে ধরতে পারার জন্য।

দুই.
জগৎবাসী। মুক্তির কথা-ছবির একটি গান। লেখা তারেকের। এ গানে তারেক সম্বোধন করেছেন সারা পৃথিবীর মানুষকে। আধেয় বিশ্লেষণে গানটিকে যদি দু’ভাগে ভাগ করি, তাহলে আমরা একাত্তরের বাংলাদেশ এবং একাত্তর-উত্তর বাংলাদেশ-দু’সময়কেই পেয়ে যাই। একই গানে। খুব বিশ্ময়ের সাথে লক্ষ করি যে, তারেক যুদ্ধ ও অস্ত্রের বৈশ্বিক রাজনৈতিক অর্থনীতি তুলে ধরেন মাত্র দু’টি লাইন দিয়ে। এবং এতটা সরল কিন্তু তীর্যকভাবে যে, তা একজন নিরক্ষর ব্যক্তির চোখেও স্পষ্টভাবে ধরা পড়বে। তারেক যখন বলেন- ’আমাদেরই টাকায় কেনা আমেরিকান গুলি/ পাঞ্জাবিরা চালায় দেখো উড়ায় মোদের খুলি’- তখন বৈশ্বিক অথনৈতিক ব্যবস্থার প্রান্তস্থিত রাষ্ট্র বাংলাদেশের একজন অতিসাধারণ শ্রোতারও বুঝতে কষ্ট হয় না যে, আমেরিকার মতো সাম্রাজ্যবাদী -পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলিই অস্ত্রব্যবসার সাথে যুক্ত। অস্ত্রউৎপাদনকারী এবং দুনিয়াজুড়ে বাণিজ্যিক অস্ত্রসরবরাহকারী। আর পাকিস্তান আমাদের বিরুদ্ধে যে অস্ত্রসামগ্রি চালিয়েছে, ১৯৭১ সালে, সেসব অস্ত্র কেনার অর্থের উৎসও বাংলাদেশ থেকে লুণ্ঠিত সম্পদ। এভাবে বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের অর্থনৈতিক শোষণ, নিপীড়ন, লুন্ঠনচিত্রও অনাবৃত হতে থাকে আমাদের সামনে, গানে গানে। বাড়তি কথা বলার দরকার হয় না। তারপর তারেক যখন বলেন, ’গাঁও পোড়ায়, ঘর পোড়ায়, পোড়ায় ঘরের চাল/ মীর জাফরের হাত ধরিয়া আসে রে দজ্জাল’- তখন সে ইতিহাসটাও আমাদের সামনে খাড়া হয়। শ্রোতারা আবারও মুখোমুখি হয় ইতিহাসের সত্যপাঠের। যে সত্যটা আমাদের মনে থাকা বিষয়গুলোকে আরও জোরালেভাবে মনে করিয়ে দেয়। আমাদের মনে পড়ে যায়- বিশাল বাংলাজুড়ে নয় মাসব্যাপী পাকবাহিনীর নিরবিচ্ছিন্ন যুদ্ধাপরাধের এ দেশীয় সহচরদের কথা। গোলাম আযম, নিজামী, মুজাহিদ, কাদের মোল্লা, মাওলানা মান্নান গংদের কথা। কিন্তু তারেক তাঁর বর্ণনা এখানেই শেষ করেন না। আরেক ধাপ এগিয়ে যান। রাজনৈতিক সুবিধাবাদনির্ভর রাজাকার-আলবদর পুনর্বাসন কার্যক্রমের প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার সমকালীন বাংলাদেশকেও তুলে আনেন। উপস্থাপন করেন সবার সামনে। খুবই জোরালোভাবে কিন্তু সরল ও ছোট্র কথায়। ’নিরস্ত্র আর নিরাপরাধ নারী-শিশু মারি/ বিচার ছাড়াই সেই খুনিরা বেড়ায় আজও ঘুরি/ মা ও বোনের ইজ্জত নিল একাত্তরে যারা/ দ্যাখো আবার ভোট কিনতে আসিয়াছে তারা। এভাবে দশকের পর দশক জুড়ে বিদ্যমান বিচারহীনতার রাজনৈতিক সংস্কৃতির চিত্রও পেয়ে যাই আমরা। যে বিচারহীনতার সংস্কৃতি বিকাশের প্রধান প্রভাবক হচ্ছে- ক্ষমতায় থাকা-না -থাকাকেন্দ্রিক আবর্তিত ভোটের রাজনীতি। যে রাজনীতির সুবিধাভোগী, সমঅনুপাতে না হলেও, প্রধান দু’টি দল তো অবশ্যই, অন্য দলগুলোও। বামেরা হয়তো তার মধ্যে পড়বে না। তবে ভোটে জেতার সম্ভাবনা তৈরি হলে মতাদর্শের বাইরে গিয়ে ’রাজনৈতিক জনমিতিরসূত্র’ দ্বারা তাদের কোনো কোনো দল আক্রান্ত হতো কি না, সে পরীক্ষা তাঁদের দিতে হয় নি। এখনও। রাজনৈতিক প্রেক্ষিতটা ভিন্ন বলে। কিন্তু ব্যক্তিপর্যায়ে অনেক বাম নেতাই (সাবেক) ভোটের রাজনীতিতে ’রাজনৈতিক জনমিতিক সূত্র’ দ্বারা যে আক্রান্ত হয়েছেন, ভোটে জেতার জন্য যে দলত্যাগ করেছেন, প্রায় শতভাগ বিপ্রতীপ আদর্শের দলে যোগ দিয়েছেন, সেটা তো শুধু ইতিহাস নয়; নিত্যঘটমান বর্তমানও। ভোটের রাজনৈতিক জনমিতি বিবেচনায় চলমান রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় রচিত হয় বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর করুণ ইতিহাস। অপ্রত্যশিত ইতিহাস। বাংলার দু:খের ইতিহাস। তারেক এ গানে বিশ্ববাসীকে আমাদের সে দু:খগুলি নিরিখের উদাত্ত আহবান জানান।

তবে তারেক ইতিহাসের হতাশাজনক নিম্মাভিমুখিতার বিপরীতে উৎক্রমণের স্বপ্নটাও দেখেছেন। নিজে, এবং স্বপ্ন দেখিয়েছেনও, অন্যদের। তারেকের বিশ্বাস ছিল নতুন প্রজন্মকে ঘিরে। বাংলাদেশের বিরুদ্ধে পরিচালিত গণহত্যার বিপরীতে প্রতিষ্ঠিত বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে একদিন নতুন প্রজন্ম দাঁড়াবে, রাস্তায়, দেশজুড়ে, এ বিশ্বাসটা তারেকের মধ্যে ছিল। ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে যদি তারেক বেঁচে থাকতেন, তারেক যদি শাহবাগ দেখতেন, তারেক যদি সারা বাংলাদেশের শাহবাগ হয়ে ওঠা পর্যবেক্ষণ করতেন, আমি খুব বিশ্বাস করি যে, তিনি নিজে আবেগাপ্লুত তো হতেনই, আমরা হয়তো তরুন প্রজন্মের মুক্তিযুদ্ধকে ঘিরে দু’একটি কালাতীর্ণ চলচ্চিত্রও পেয়ে যেতাম। তাঁর হাত থেকে। কারণ যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিতে নতুন প্রজন্মের আহবান ও নেতৃত্বে, প্রায় সর্বশ্রেণী-বর্গের অংশগ্রহণে এ রকম একটি গণপ্রতিবাদ-প্রতিরোধের বর্ণনা তারেক আগেই চিত্রিত করেছেন। তাঁর প্রজন্ম ৭১- গানটিতে। তারেক যখন বলেন, ’প্রজন্ম আজ ফেটে পড়েছে প্রচন্ড প্রতিবাদে/ হত্যাকারীর হবে কি বিচার যুদ্ধাপরাধে?- আমার নিজের মনে হতে থাকে, তারেক মাসুদ গানটি যেন শাহবাগে বসেই লিখেছেন। ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি তারিখে। অথবা তার পরবর্তী কোনো একদিন। যদিও তারেক তখন আমাদের মাঝে নেই। শারীরিকভাবে। তারেক মাসুদ প্রজন্ম ৭১- গানটিতে শহীদ পরিবারের সদস্যদের পুঞ্জিভূত কষ্টগুলোকে প্রতিবাদের ভাষায় রূপান্তরিত করেছন। খুব স্বার্থকতার সাথে। যেমন, তোমার বুকে অনল জ্বলে, জ্বলে বিপুল চিতা/ নিখোঁজ ভাইয়ের খোঁজটা নিতে হারালো তোমার পিতা, কিংবা ’তোমার পিতা সারিয়ে তুলতে মুক্তিসেনার ক্ষত/ আলবদরের বেয়োনেটে হলো নিজে ক্ষত-বিক্ষত/ শ্যামলী মা বিচার চায়/ ক্লান্ত নিন্দাবাদে, অথবা তোমার বাবার বুকে সাহস, হাতে কলম ছিল/ জাহিদ-শাহীন দুই সহোদর তাই তো লিখে চলো/ শহীদ স্মৃতি ফিরে আসে/ তোমাদের সংবাদে

তিন.
একলক্ষ সাতচল্লিশ হাজার বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত বাংলাদেশ নামক ভূখন্ডের অতীত ও বর্তমান ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধ সম্ভবত একমাত্র ঘটনা, যখন গণমানুষ- অনেক পথ, অনেক মত, নানা পেশা, নানা শ্রেণী, ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ, জাতি নির্বিশেষে বিপুলতার সর্বোচ্চ মাত্রা নিয়ে এক রেখায় দাঁড়িয়েছিল। কোটি কোটি চোখে ঝিলিক মেরেছিল এক অভিন্ন স্বপ্ন। স্বাধীনতার স্বপ্ন। সমষ্টিগত মুক্তি আর মর্যাদার লড়াই-এর কাছে নগণ্য হয়ে উঠেছিল ব্যক্তিস্বার্থ আর বেঁচে থাকার ব্যক্তিগত আকাঙ্খা। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর বাংলাদেশে আমরা সে সমষ্টিগত স্বপ্নের পরিচর্যা করতে পারিনি। স্বপ্নটাকে বাঁচিয়ে রাখতে পারিনি। সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক প্রক্রিয়ায় আমরা বিভাজিত হয়ে পড়ি নানা মেরুতে; শ্রেণীর প্রশ্নে, বর্ণের প্রশ্নে, জাতি ও জাতীয়তার প্রশ্নে, ধর্মসহ আরো নানা মাত্রিকতায়। কিন্তু তারেক বিশ্বাস করতেন, বিভাজনে নয়; ঐক্যে, বিদ্বেষে নয়; ভালবাসায়। যে ঐক্য ও ভালবাসা উনিশশো একাত্তরে ছিল, ঘরেঘরে, দেশজুড়ে- সে ঐক্য ও ভলোবাসা-ই পারবে সমুদয় বিপাকের যবনিকা টানতে। তাই তারেক দেশব্যাপী বন্যাদুর্দশাগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়াবার আহবান জানান। বিপুল ভালবাসা নিয়ে। আবার একই সাথে মনেও করিয়ে দেন যে, এটা আসল লড়াই নয়; মূল লড়াইটা বাঁচামরার, শাসকের সঙ্গে শোষিতের। অনুন্নয়নের বিরুদ্ধে উন্নয়নের। সমষ্টির ঐক্য ছাড়া এ বাঁচামরার লড়াইয়ে জেতা সম্ভব নয়। তাই তারেক বলেন, ’পানির খেলা শেষ হইলে আসল লড়াই হবে/ বাঁচা-মরার সে লড়াইয়ে আগাই আসো সবে/ যদি পারি সাপের সাথে এক চালে ঠাঁই লইতে/ আমরা কেন পারবো না ভাই দল ভুলে এক হইতে/ ৭১ এর মতো একত্রে/ সকল বিপাক যাব নাশিয়া/ একটুখানি ভালোবাসিয়া (দু:খীর পাশে দাঁড়াও)’।

তারেকের আস্থা ছিল মানুষ ও মানবিকতার রাজনীতিতে। দু:খজনক হলেও সত্য যে, মানুষ, মানুষের আকাঙ্খা, তাদের স্বপ্ন- বাংলাদেশের সমকালীন রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারেনি। গণমানুষের বদলে, গণমানুষের স্বপ্ন ও আকাঙ্খার জায়গায়, ব্যক্তিস্বার্থ বা নেতাস্বার্থই প্রতিস্থাপিত হয়েছে। রাজনৈতিক নেতৃত তাদের সমর্থক-কর্মীদের ভুলপথে চালিত করেছেন এবং করছেন। ফলাফল হিসেবে নিরন্তর রক্তারক্তি আর খুনোখুনির সংস্কৃতি তৈরি হয়েছে রাজনীতির পরিসরে। রাজনীতি ছিনতাই হয়ে গেছে এবং ছিনতাই হচ্ছে প্রকৃত নীতিবান, ত্যাগী রাজনীতিকদের কাছ থেকে। অপরদিকে দেশে-দেশে বিভাজিত বিশ্বও জীবন জাগানোর বদলে জীবনবিনাশী অস্ত্রের খেলায় মেতে আছে। তারেক নিজ দেশে যেমন একটি পরিশীলিত রাজনীতি দেখতে চাইতেন, তেমনি দেশে দেশে বিভাজিত সীমান্তেও যুদ্ধের বদলে, অস্ত্রের বদলে শান্তির সুবাতাস বইবে- এ স্বপ্নই দেখেছেন। তার প্রমাণ পাই আমরা মুক্তির কথা চলচ্চিত্রে পেছনের দিন যায় শিরোনামের গানে। তারেক আপন মাতৃভূমি আর বিশ্বে শান্তির পায়রা ওড়াবার স্বপ্ন বুনেন এভাবে - ’ আর নয় রক্ত¯œান/সহযোদ্ধার খুনে/ আর নয় প্রাণপাত/ নেতাদের কথা শুনে/ খুনসুটি আর/ খুনোখুনি ছেড়ে/ একাত্তুরের মতো যাই সব মিলে/ পেছনের দিন/ যাই পিছে ফেলে -- / পরমাণু বোমা নয়/ চাই পরমায়ু পেতে/ যুদ্ধের মাঠে নয়/ খেলবার মাঠে যাব জিতে/ সীমান্ত রেখা দেব পাহারা/ শান্তির মোমবাতি জে¦লে/ পেছনের দিন যাই পিছে ফেলে/ চলো চলো।

এখানে যে প্রসঙ্গটি উল্লেখ করা দরকার, তা হলো, তারেক দল ভুলতে বলেছেন, পেছনের দিন ফেলে মিলতে বলেছেন, পরস্পরের সাথে, কিন্তু তাঁর এ ’ভুলে যাওয়া ও মিলে যাবার’ ডাকে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী অপশক্তিকে তিনি অন্তর্ভুক্ত করেননি। তারেক যদি তাদের অন্তর্ভুক্ত করতেন, তাহলে স্বাধীনতার চল্লিশ বছর পর ’স্বাধীনতার পক্ষ-বিপক্ষ কেন্দ্রিক বিভাজন ও সীমারেখা টানা উন্নয়নের রাজনীতির অন্তরায়’-এ রকম ডিসকোর্স উৎপাদনকারী ও পরিবেশকদের পক্ষেই তারেকের গান উচ্চারিত হতো। না, তারেক সেটা হতে দেন নি। এ বিষয়ে সচেতন থেকেছেন এবং তাদের সম্পর্কে নিজের অবস্থান স্পষ্ট করেছেন প্রজন্ম ৭১ গানটিতেই। শুধু স্পষ্ট নয়, ভোটের রাজনীতিতে তাদের পুনর্বাসন প্রক্রিয়ার প্রতিও ইংগিত করেছেন খুব তীক্ষভাবে। যদিও এ পুনর্বাসন প্রক্রিয়ায় সক্রিয় সহায়ক শক্তি-অপশক্তিগুলির নাম উচ্চারণ করেননি, সরাসরি, সম্ভবত সে গল্পটা সমাকালীন মানুষের কাছে অজানা নয় বলে।

চার.
মুক্তিযুদ্ধ একই ভৌগলিক সীমারেখার অধিবাসী সব শ্রেণী, লিঙ্গ, বর্ণ, ধর্ম ও জাতির প্রতিনিধিত্ব ও অংশগ্রহণে সংগঠিত হয়েছিল। রাজাকার-আলবদর-আলশামস-এ যোগদানকারী সংখ্যালঘুদের বাদদিলে প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে অংশ নিয়েছিল গোটা জাতি। কিন্তু এ লড়াইয়ের একজন নেতা তো ছিলেন। এবং এ ক্ষেত্রে বঙ্গবন্ধুর নামটি উচ্চারণের অপেক্ষাও রাখে না। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে একটি জনগোষ্ঠীর মুক্তিসংগ্রামে অংশগ্রহণের সামগ্রিকতাকে তুলে ধরেছেন ডাক দিয়াছেন শ্যাখ শিরোনামের গানটিতে। গানটির ভাষাও লক্ষ্য করার মতো। একেবারে গ্রামীণ মানুষের প্রাত্যহিক দিনযাপনের সাদাসিদে মুখের ভাষা। ’ডাক দিয়াছেন শ্যাখ রে ভাই, ডাক দিয়াছেন শ্যাখ/ শ্যাখ সাবের ডাক শুনিয়া সবাই হইলাম এক/ যার যা আছে তাই নিয়া শত্রুরে দেই ঠ্যাক (ডাক দিয়াছেন শেখ, ছবি- মুক্তির কথা)’। তারেক বর্ণিত এ-’সবাই’ এর মধ্যে সব শ্রেণী, বিত্ত, লিঙ্গ, বর্ণ, ধর্ম ও জাতি (নৃগোষ্ঠী) অন্তর্ভুক্ত। একটি জনগোষ্ঠীর গভীর অঙ্গীকার, অকূতভয় অংশগ্রহণ আর দ্বিধাহীন ত্যাগ একটি সংগঠিত, প্রশিক্ষিত, শক্তিশালী বাহিনীকেও নাস্তানাবুদ করে দেয়ার বাস্তবস্বপ্ন নির্মাণ করে এগিয়ে যেতে পারে, জয়ের জন্য, সে দৃশ্যটাও তারেক চিত্রিত করেন, এ একই গানে। এভাবে- ’ যে হাতে আজ বাজাই বাঁশি সারিন্দা একতারা/ সেই হাতে আজ ধরলাম বাঁশ, ঢাল, বল্লম. খাড়া/ মীর জাফর আর বেহায়া খান করবো খতম ব্যাক/ ডাক দিয়াছেন শ্যাখ’ অথবা ’চাষার কাঁচি, বোনের বটি, জাইলার ট্যাটাখান/ রুখবে এবার খানের পোলা, কামান, মেশিনগান/ হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ নাই ভেদাভেদ/ ডাক দিয়াছেন শ্যাখ’। তারেকের গান শুনে আমাদের আরও একবার স্মরণে আসে যে, মুক্তিযুদ্ধপূর্বকালে যেগুলি ছিল আমাদের জন্য উৎপাদনের উপায় ও উপকরণ, সেগুলিই হয়ে ওঠে পাকিস্তানি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই এর উপায়-উকরণ-এ। যেন জীবনযুদ্ধে, জীবিকার তাগিদে ব্যবহৃত হাতিয়ার সংশ্লিষ্ঠ অভিজ্ঞতাই যুদ্ধ-পুঁজিতে রূপান্তরিত হয়। জেগে ওঠা, বেঁচে থাকা ও ঘুরে দাঁড়ানোর নতুন লড়াই-এ। বিশেষজ্ঞ জ্ঞানের বিপরীতে যাপিতজীবন থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতার ব্যবহারিক মূল্যটাও তারেক চিত্রিত করে ফেলেন ওপরের সরল বর্ননায়। সে বর্ণনাটা কোন চিত্রকল্প নয়, পরাবাস্তব নয়; একেবারে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে সংগঠিত, গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত অগণিত বাস্তব ঘটনাসমষ্টিরই অংশ।

পাঁচ.
সববর্গের অংশগ্রহণে সংঘটিত একটি যুদ্ধের বিজয়-উত্তর ফলাফল কার ঘরে উঠবে, তার বন্টন চরিত্রটা কী হবে, এটি অনেকখানি নির্ভর করে যুদ্ধউত্তর সৃষ্ট রাষ্ট্র ও সমাজকাঠামো এবং এর শ্রেণী চরিত্রের ওপর। এটা ঠিক যে, মুক্তিযুদ্ধে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষ অংশগ্রহণকারীদের একটা বড় অংশ শ্রেণীহীন সমাজ ও রাষ্ট্র কাঠামোর স্বপ্ন দেখেছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের মূলচেতনায় আর্থনীতিক ও সাংস্কৃতিক শোষণ-নিপীড়ন থেকে মুক্তির আকাঙ্খাও ছিল। সবার না হলেও অনেকের মনে। কিন্তু মুক্তিযুদ্ধ সর্বার্থে শ্রেণীসংগ্রাম হিসেবে পরিচালিত হয়নি। যদিও এ লড়াই পাকিস্তানি উপনিবেশিক শোষণের সমাপ্তি ঘটিয়েছিল। ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশের চুড়ান্ত বিজয় ঘোষণার মধ্য দিয়ে। কিন্তু বাংলাদেশ ভূখন্ডের অভ্যন্তরীণ শ্রেণীবিভাজিত সমাজ কাঠামোটা তো আগের মতোই থেকে গেল। সে সময় সমাজতন্ত্রকে রাষ্ট্রের একটি মৌলিক আদর্শ হিসেবে গ্রহণ করা হলেও, একটি শ্রেণীহীন সমাজ বিনির্মাণের জন্য পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থায়, সমাজের অভ্যন্তরে, যে ধারাবাহিক ভাঙ্গা-গড়ার চর্চা দরকার ছিল, ক্ষমতার ভেতরে ও বাইরে থাকা রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সেটা করতে চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছেন। কেউ ইচ্ছে করে। আবার কেউ কেউ অভিজ্ঞতা ও সুযোগের অভাবে। ফলে বাংলাদেশ, এমন কি, পুঁজিবাদী কাঠামোনির্ভর তথাকথিত কল্যাণরাষ্ট্রের চরিত্রও ধারণ করতে পারে নি। এ সফল না-হওয়া এবং সফল হতে না-চাওয়ার প্রত্যক্ষ অভিঘাত হচ্ছে- মুক্তিযদ্ধের সুফল সমবন্টন না হয়ে ওপর তলার মানুষ দ্বারা দখল হয়ে যাওয়া। সুবিধাভোগের অবারিত পরিসর ধনীদের জন্য উন্মুক্ত রেখে অসুবিধা ভোগের দৃশ্যমান-অদৃশ্যমান পরিসরে দরিদ্র মানুষকে বন্দী করে ফেলা। এতে সংখ্যালঘিষ্ঠ ধনীক শ্রেণীর বিপরীতে গোটা বাংলাদেশের ভাগ্যে জুটে যাবজ্জীবন দারিদ্র্যের কারাগার। মুক্তিযুদ্ধ-উত্তর শ্রেণী বিভাজিত বাংলাদেশের রাজনৈতিক অর্থনীতির এ চিত্রটা আঁকেন তারেক তার যুদ্ধের ফসল নামক গানে। এ গানেও তারেক সুরটা ব্যবহার করেন লোকজ, ভাষা-মাটি ও মানুষের, শব্দগুলো সহজ-সরল এবং খুবই তীর্যক ও বিদ্রোপাত্বক। তারেক যখন বলেন- ’ও মন কান্দে রে চোখের পানি ঝরে/ গরিব লোকের যুদ্ধের ফসল উঠল ধনীর ঘরে/ ও মন কান্দে রে / হইছেনি ভাই দ্যাশটা স্বাধীন কেবলি গান গাইয়া/ যুদ্ধ করল চাষার ছাওয়াল, মরল চাষির মাইয়া/ যাদের ত্যাগে দ্যাশটা স্বাধীন তারাই ভাতে মরে/ ও মন কান্দে রে ’ অথবা ’গরিব মানুষ দ্যাশ হারাইল ছাড়ল ভিটামাটি/ পাছে সাবে চাকরি হারায় ছাড়ল নারে বাটি/ সেই সাবেরাই বিরাট নেতা দালানকোঠা গড়ে (যুদ্ধের ফসল, মুক্তির কথা চলচ্চিত্র)’ তখন দর্শক- শ্রোতার চোখের সামনে ভেসে ওঠে এমন এক সমকালীন বাংলাদেশ, যেটি অপ্রত্যাশিত কিন্তু অবাস্তব নয়।

একটি শ্রেণীবিভাজিত সমাজে শ্রেণীর ভেতরেও শ্রেণী থাকে, উপ- শ্রেণী থাকে, কেন্দ্রের কেন্দ্র থাকে, আবার প্রান্তেরও প্রান্ত থাকে। শোষণ-নিপীড়নের প্রশ্নে একটা ভৌগলিক বিভাজনও তৈরি হয়, একই রাষ্ট্র কাঠামোর ভেতরে। এ প্রক্রিয়ায় গ্রামগুলো হয়ে যায় প্রান্তিক, আর শহর থাকে কেন্দ্রে। শহরপক্ষপাতপূর্ণ নীতি ও উন্নয়ন কৌশলের কারণে শহর গ্রামকে শোষণ করেই বিকশিত হয়। সুযোগ-সুবিধার মালিকানাটা ভোগ করে শহুরে ’বাবু’রা। তারেক সুবিধাভোগী সেইসব শহুরে বাবুদের দিকে প্রশ্ন ছুঁড়েন এ ভাবে- ’শহর থাইকা ধাওয়া খাইয়া গ্রামে যখন গ্যালা/ গরিব মানুষ আশ্রয় দিল করল যতœ ম্যালা/ সেই কথা কি বাবু সাহেব মনে তোমার পড়ে/ ও মন কান্দে রে’। এখানে তারেক শুধু শহুরে স্বার্থপরতা ও শ্রেণীশোষণকে কটাক্ষ করেন না, একই সাথে গ্রামীণ সহজ-সরল নি:স্বার্থ উষ্ণ আতিথেয়তার পরিচয়ও তুলে ধরেন। যা বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবনের সবচেয়ে বড় সামাজিক পুঁজি।
এ গানটির রচনাকালে স্বাধীনতা সংগ্রামে প্রধান নেতৃত্বদানকারী দল-আওয়ামী লীগ রাষ্ট্র ক্ষমতায়। শেখ হাসিনার নেতেৃত্বে। দীর্ঘ একুশ বছর পর। আওয়ামী লীগের এ ক্ষমতায় ফিরে আসার ক্ষেত্রে নিশ্চিতভাবে সবচেয়ে বড় অবদান রেখেছে শতশত ত্যাগী নেতাকর্মীরা। কিন্তু ক্ষমতারোহন-উত্তর সুযোগসন্ধানীদের দৌরাত্বে ত্যাগী নেতাকর্মীরাই প্রান্তিক হয়ে পড়েন। ত্যাগী কর্মীদের এ প্রান্তিকীকরণের ছবিটাও এঁকে ফেলেন তারেক, এভাবে- ’নেতা-মন্ত্রী-এমপি-আমলা বড় অফিসার/ ত্যাগী কর্মী পাত্তা পায় না কেন আপনার? সুযোগপন্থী হুজুগ খোঁজে মুজিব কোর্টের জোরে/ ও মন কান্দেরে’।

মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্বের দাবি নিয়েও একটা রাজনীতি আছে। এ দাবির প্রশ্নটা শুধু অর্থনৈতিক শ্রেণী দ্বারা নয়; রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষমতা দ্বারাও মিমাংসিত হয়েছে এবং হচ্ছে। এ মিমাংসা-প্রক্রিয়ায় যথারীতি শ্রেণী, রাজনৈতিক ক্ষমতা ও বুদ্ধিবৃত্তির বিচারে যারা প্রান্তে ছিল, ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান হিসেবে, কৃতিত্বটা তাদের কপালে জোটে নি। কৃতিত্ব বন্টনের সামরিকায়ন হয়েছে বলেও অভিযোগ-অনুযোগ আছে। আছে স্বাধীনতা উত্তর পদক-পদন্নোতি প্রাপ্তির রাজনীতি; আছে এর রাজনৈতিক অর্থনীতি। কিন্তু এ রাজনীতিতে শ্রেণীসংগ্রাম নেই; আছে শ্রেণীদ্বন্ধ। এ দ্বন্ধে যারা মুখোমুখি তারা একই শ্রেণীর। পরিচিত ভদ্রলোক হিসেবে। কথিত ভদ্রলোকদের মধ্যে মুক্তিযুদ্ধের কৃতিত্ব ছিনতাই আর পদক নিয়ে কাড়াকাড়ির চিত্রটাও তারেকের গানে বাদ যায় না। উঠে আসে খুবই স্পষ্টভাবে। ’মুক্তিযুদ্ধের মালিকানা লইয়া কাড়াকাড়ি/ যুদ্ধ করছে বুদ্ধিজীবী নাকি মিলিটারী?/ বাদবাকিরা তাইলে কি ভাই বইসা ছিলাম ঘরে?/ ও মন কান্দেরে/ পদক আর পদোন্নতি লইয়া রেষারেষি/ কার হাতে ভাই ছিল রে মাইক/ কার অবদান বেশি/ এইসব লইয়া যুদ্ধ কইরা ভদ্দ লোকরা মরে/ ও মন কান্দেরে’।

ছয়.
একটি প্রবল পুরুষতান্ত্রিক সমাজ কাঠামোয় ইতিহাসও লেখা হয়, সাধারণভাবে, পুরুষকর্তৃক, পুরুষের চোখে, এবং পুরুষের জন্য। নাটক, চলচ্চিত্র, গল্প-উপন্যাস, ভাস্কর্যসহ প্রকাশ-প্রচারের অন্যান্য যেসব শিল্পমাধ্যম আছে, সেসব ক্ষেত্রেও মোটাদাগে একই সূত্র সক্রিয় এবং অনুসৃত। ফলে মুক্তিযুদ্ধে নারীর অবদান তুলনামূলক বিচারে থেকে যায় অগ্রন্থিত, অপ্রকাশিত। যেটুকু উঠে আসে, কারো কারো হাত দিয়ে, খুব ব্যতিক্রম ছাড়া, তার বেশিরভাগই ’বীরাঙ্গানা’ ’সেবাদানকারী’ ’অপেক্ষামান মা, স্ত্রী, প্রেমিকা, বোন’ এর ধারণায়নে সীমাবদ্ধ। এটাই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস বয়ানের মূলধারা। দীর্ঘকালব্যাপী চলমান এ পুরুষতান্ত্রিক ধারাকে তারেক খুবই বলিষ্ঠভাবে চ্যালেঞ্জ করেন তার নারীর কথা চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত একটি গানে। গানটি তারেকের নিজের লেখা নয়। তবে ধারণা করি, গানটির রচনায়, মূলবক্তব্য বিন্যাসে তারেকের ভূমিকা ছিল। কারণ গানটি তারেকের ছবির জন্যই রচিত। শাহ আলম দেওয়ান এর লেখা এ গানটিতে যে প্রশ্নটা খুব জোরালোভাবে উত্থাপিত হয়, তা হলো- ’ওরে কেহ কয় না, নারীর কথা, ওরে কেহ কয় না নারীর কথা/ সবাই গায় পুরুষের গান/ মুক্তিযুদ্ধে নারীসমাজ রাখে নাই কি অবদান?’। তারেক রচিত ’ডাক দিয়াছেন শ্যাখ’ গানেও নারীপুরুষের সমতার বিষয়টি উচ্চরিত হতে দেখি। যখন তারেক বলেন, ’হিন্দু-মুসলিম, নারী-পুরুষ নাই ভেদাভেদ/ ডাক দিয়াছেন শ্যাখ’। অথবা ’যুদ্ধের ফসল’ গানে যখন আমরা দেখি, তারেক বলছেন, ’যুদ্ধ করল চাষার ছাওয়াল, মরল চাষির মাইয়া.. / কেউ হারাইল বাপ-ভাই, কেউ হারাইল মা, কেউ হারাইল চোখ-হাত, কেউ হারাইল পা’ তখন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের পুরুষালি বয়ান বিনির্মিত হতে থাকে, নারী-পুরুষের সম্মিলিত লড়াইয়ের এক অনবদ্য গল্প হিসেবে। গল্পটা পরিবেশিত হয় সাধারণের ভাষ্যে। সরল ভঙ্গিমায়। যা শ্রোতার শুধু কানকে আলোড়িত করে না, ভাবনাকেও ধাক্কা দেয়, আন্দোলিত করে। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানা-বোঝার এক নতুন সামাজিকায়ন।
তারেকের আরেকটি গান আছে শিশুদের নিয়ে। বাঁচতে দাও শিরোনামে। এ গানে তারেক শিশুদের দারিদ্র্য, গৃহহীনতা, চিকিৎসাহীনতা, শিশুশ্রম, পড়ালেখার সুযোগ-এ বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন। লক্ষ করার বিষয় হচ্ছে, গানটি সুবিধাবঞ্চিত সকল শিশুদের জন্য হলেও মেয়েশিশুদের নিয়ে তারেক চারটি লাইন আলাদাভাবে যুক্ত করেছেন। তাদের বাল্যবিয়ের প্রসঙ্গ টেনেছেন। যা তারেকের জেন্ডার সংবেদনশীলতার প্রশ্নে সজাগ থাকার পরিচায়ক।

তারেক শিশুদের জন্য বাঁচতে চাওয়ার গান বানিয়েছেন। শিশুদের জন্য একটি শিশুবান্ধব পৃথিবীর স্বপ্ন দেখেছেন। তিনি বেঁচে থাকলে তার এ স্বপ্নটা নিশ্চই আরও দীর্ঘতর হতো। আরো বিস্তৃত হতো। আরো স্বপ্নীল হতো। সে স্বপ্ন পূরণে তারেক নিশ্চই আরও গান লিখতেন। ছবি বানাতেন। হয়তো নানা সামাজিক উদ্যোগও গ্রহণ করতেন। অন্য অনেকের সাথে। কিন্তু আমাদের দুর্ভাগ্য যে, তার আগেই তিনি চলে গেলেন। তাঁকে চলে যেতে হলো। সড়ক নিরাপত্তাব্যবস্থাজনিত সুশাসন-দারিদ্র্যের হাতে। সড়ক দুর্ঘটনার নামে প্রতিদিন খুন হয়ে যাওয়া পরিচিত-অপরিচিত অসংখ্য মুখের মিছিলে। আর আমরা যারা বেঁচে আছি, এখনও, একই রকম অস্বাভাবিকমৃত্যুর মিছিলে যুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে, যেকোন সময়, তারা শোকগাঁথা লিখছি। লিখবো, হয়তো বেঁচে থাকা পর্যন্ত। কিন্তু নাগরিক করের টাকায় পরিচালিত সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান এবং এর বেতনভোগী রাজকর্মচারীরা কোনো দিনই জবাবদিহি করবেন না। জবাবদিহি তাদের করতে হবে না। কারণ ’অদ্ভুত উটের পিঠে’ সওয়ার হয়েই থাকতে হবে আমাদের। যতদিন না রাষ্ট্র ও সমাজে সুশাসন নিশ্চিত হয়; রাষ্ট্র ও সমাজ শ্রেণীহীন সমাজের পথে এগোয়। সমতাভিত্তিক একটি ন্যায্যসমাজ প্রতিষ্ঠিত হয়। তারেকের গানে যে স্বপ্নের কথা বারবার উচ্চারিত হয়েছে।
নোট: এ লেখাটি প্রথম ছোটকাগজ প্রতিকথায় প্রকাশিত হয়েছিল। তারেক মাসুদের প্রয়াণ দিবস উপলক্ষ্যে বিনীত নিবেদন
ছবি: ইন্টারনেট

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

আরাফাত শান্ত's picture


বিনম্র শ্রদ্ধা!
খুব ভালো হইছে লেখাটা!

টুটুল's picture


গুণী মানুষ আমরা রাখতে পারি না Sad

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

সাম্প্রতিক মন্তব্য

munirshamim'র সাম্প্রতিক লেখা