ইউজার লগইন

আমাদের দিনবদলের গল্প-দুই

আরেকটা দিন বদলের ঘটনা ঘটেছে। বলা যায় দিনবদলের প্রতিযোগিতা। এবং অবশ্যই অশুভ। সে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণকারী অথবা সম্ভাব্য সুবিধাভূগী না হওয়ার পরও তার ছোঁয়া লেগেছে আমার, আমার প্রতিবেশীদের জীবনে। মানে আমাদেরও দিন বদল ঘটেছে। কিছুটা।
৬ এপ্রিল অফিসে যাইনি। শরীর খারাপ ছিল বলে। বাসায় অপেক্ষা করছি সংবাদপত্রের জন্য। অফিসে যাবার আগেই সংবাদপত্রের পাতায় একটু চোখ বুলিয়ে নেয়ার অভ্যাস। বলা যায় বিশ্ববিদ্যালয় হলে থাকতেই এটি প্রতি দিনের অবশ্যম্ভাবী কাজের অংশে পরিণত হয়েছে। আর বদল হয়নি। কিন্তু ৬ এপ্রিল সকাল দশটা বাজার পরও যখন সংবাদপত্রের দেখা নেই, সদা হাসিখুশী মুখের কিশোর ছেলেটির কোন হদিস নেই, যে কয়েক বছর ধরে আমাদের সংবাদপত্র দিয়ে যায়, রোজ রোজ, খুব সকালে, তার অপ্রত্যাশিত বিলম্ব দেখে নিচে নামি। জানতে পারি, আমরা একা নই, প্রতিবেশিদের বাসায়ও সংবাদপত্র আসেনি। কিছুক্ষণ আগে রাস্তায় অনেকগুলো সংবাদপত্র পোড়ানো হয়েছে সে সংবাদও কানে আসে। মনে মনে ভাবি, হয়তো কোন বিশেষ পত্রিকা কোন বিশেষ কারো সম্পর্কে সংবাদ ছেপেছে। সেজন্য তার লোকজন হয়তো পত্রিকা পোড়াচ্ছে। একটু পর শুনি, বিষেষ কোন পত্রিকা নয়, সব পত্রিকা মানে গোটা পত্রিকার বান্ডিলই পোড়ানো হয়েছে। তার মানে কি সব পত্রিকাই ঐ বিশেষ সংবাদটি ছেপেছে? সরকারী দল অথবা বিরুধী দলের কোন ক্ষমতাবান নেতা সম্পর্কে সংবাদ? না, ওসব কিছুই না। বান্ডিল ধরে সংবাদপত্র পোড়ানোর কারণ, বিশাল এলাকা জুড়ে সংবাদপত্র বিক্রির মাধ্যমে বিদ্যমান বাণিজ্য সম্ভাবনাকে কব্জা করা। নিজ দখলে রাখা। মানে অন্যকে সরিয়ে নিজেদের দিনবদলের প্রচেষ্টা। বৈধভাবে নয়, গায়ের জোরে, রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রয়োগে। আর ক্ষমতার প্রয়োগ হয়েছে এলাকায় ছাত্র লীগ-যুব লীগ কর্মী হিসেবে পরিচিতদের সমর্থনে, প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণে। এর ফলাফল আমার, আমাদের নিজেদেরও দিনবদল। এখন আর সকাল সকাল সে কিশোর ছেলেটি দরজায় কড়া নাড়ে না। একগাল হাসি হেসে ফেলে যায় না একগুচ্ছা তাজা সংবাদ। বরং নিজেই সংবাদ শিরোনাম হওয়ার আশংকায় লুকিয়ে থাকে। চুপিসারে আসে। সুযোগ পেলে। অনেক বেলা করে। আমাদেরও পত্রিকা পড়তে হয় হয় অফিসে না হয় অফিস থেকে ফিরে রাতে। আমাদের দিন বদল হয়ে তাজ সংবাদের বদলে এসেছে বাসি সংবাদ। জানি না, এ বাসি সংবাদ নিয়ে আমাদের আর কতদিন দিন যাপন করতে হয়।
আমাদের চলমান বাসি সংবাদ পড়ার জীবন থেকে সকালের তাজা সংবাদ এর সাবেক জীবনে ফিরে যাবার সম্ভাব্য দু’টি পথ দেখা যাচ্ছে। প্রথমটি হচ্ছে পুলিশের 'রাজনৈতিক পুলিশ' এর কথিত খোলস উপড়ে ফেলে মেরুদন্ডসম্পন্ন দায়িত্ববান পুলিশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হওয়া এবং যারা প্রকাশ্যে দিনের বেলায় রাস্তায় দাাঁড়িয়ে, পত্রিকা কেড়ে নিয়ে পুড়িয়ে দিয়েছে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া। তাদের কোন দলের রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে না দেখে অপরাধী হিসেবে বিবেচনা করা। একই সাথে যারা এতদিন ধরে সংবাদপত্র বিক্রির ব্যবসা করছে তাদের নির্বিঘœ জীবিকা নির্বাহের নিশ্চয়তা বিধান করা। কিন্তু এ সম্ভবনা খুবই কম। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হয়ে পুলিশের স্বাধীন ভূমিকা পালন যে এখন পর্যন্ত সম্ভব হচ্ছে না সেটি বলার অপেক্ষা রাখে না। দ্বিতীয় পথটি হচ্ছে ছাত্র লীগ-যুব লীগের যে ক্ষুদ্র গ্র“পটি নিজস্ব দিনবদলের প্রক্রিয়া হিসেবে পত্রিকা বিক্রির বাণিজ্য কব্জায় রাখতে ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, তাদের অবৈধ ক্ষমতার কাছে, রাজনৈতিক পেশীশক্তির কাছে প্রতিপক্ষের নতি শিকার। নিজস্ব ব্যবসা গুটিয়ে ফিরে যাওয়া। এ ফিরে যাওয়ার ঘটনাটি ঘটলে এতদিন ধরে যিনি পত্রিকা বিক্রির ব্যবসা করছেন তার পুঁজির কী হবে জানি না। তবে সারাক্ষণ হাসিখুশী থাকা কিশোরটি, যে প্রতিদিন আমাদের পত্রিকা দিয়ে যায়, যে মুখটি অনেক দিন ধরে আমাদের প্রিয় মুখে পরিণত হয়েছে, সে কিশোরটির দিনবদল ঘটবে। নেতিবাচক গতিশীলতায়। জীবিকার ছোট্র সুযোগটিও তার হাতছাড়া হবে। যে কিশোরটি এখন পত্রিকা নিয়ে এ বাসা থেকে ও বাসায় ঘুরার কথা নয়, যার থাকার কথা বিদ্যালয়ে, পড়ার টেবিলে, যার থাকার কথা বাবা-মায়ের ভালবাসার বন্ধনে, শুধু রাষ্ট্র ও রাজনীতির ব্যর্থতার জন্য, অন্যয্য আর্থ-সামাজিক কাঠামোর হাতে ক্রমাগত জন্ম নেয়া দারিদ্রের কবলে বাধ্য হয়ে কেবল বেঁচে থাকার লড়াই-সংগ্রামে ব্যস্ত থাকা কিশোটির সে সংগ্রামের পথটিও বন্ধ হয়ে যাবে। আমি জানি না, সারা মাস তার কত পথ হাটতে হয়। কত দালানের কত তলা সিঁড়ি বাইতে হয় আর নামতে হয়। মাস শেষে যে বেতন পায় তা দিয়ে কতজনের সংসার চালাতে হয়? এতসব প্রশ্নের উত্তর না জেনেও বলা যায় সদা হাস্যোজ্জল এ কিশোরটির জীবন অনেক নাজুক। সে নাজুকতায় হয়তো যোগ হতে যাচ্ছে একটি বাড়তি মাত্রা। একটি ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর দিনবদলের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে। দু:খজনক হচ্ছে এ গুটিকয় অপরাধী তাদের অপরাধ সংঘটিত করছে সরকারি দলের পরিচয়ে, প্রশাসন ও পুলিশের নাকের ডগায়, প্রচ্ছন্ন সহযোগিতায়, কখনও কখনও সরকারি পৃষ্ঠপোষকতায়। এ ক্ষুদ্র গোষ্ঠীর দিনবদলের গল্পটা যদি থামানো না যায়, সংখ্যাগরিষ্ঠের প্রত্যাশিত দিনবদল যদি সূচনা না করা যায়, তাহলে এ সংখ্যালগিষ্ঠের পাপের দায় এবং ফলাফল প্রধানত ক্ষমতাসীন দলকেই বইতে হবে। রাষ্ট্র যে চিরস্থায়ী বন্দবস্ত নেয়া যায় না, তার প্রমাণ পেয়েছে সাবেক জোট সরকার। এসব প্রমাণ ইতিহাসের চাকা বারবার হাজির করে। আর ইতিহাসের চাকা সচল হতে কতক্ষণ? বড় জোর আরেকটি নির্বাচন! যদি সে সত্যটা উপলব্দী করেই স্থানীয় ছাত্র লীগ-যুব লীগ এ রকম দিন বদলে নেমে পড়ে, আর আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব এগুলো বন্ধে ব্যর্থতার খুঁটি একটার পর একটা খাড়া করতে থাকে, তাহলে অপ্রিয় কথাটা বলতেই হয় যে সময় তার নিয়মেই জবাব দিবে। আর আমরাও দিনবদলের প্রক্রিয়ায় হয়তো আরেকটু নিচে নামবো। আমাদের অবস্থা আরেকটু খারাপ হবে। এ রকম খারাপের দিকে ধাবিত হওয়াই হয়তো আমাদের দিনবদল।

পোস্টটি ৭ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

কাঁকন's picture


"আর আমরাও দিনবদলের প্রক্রিয়ায় হয়তো আরেকটু নিচে নামবো। আমাদের অবস্থা আরেকটু খারাপ হবে। এ রকম খারাপের দিকে ধাবিত হওয়াই হয়তো আমাদের দিনবদল।"

শওকত মাসুম's picture


"আর আমরাও দিনবদলের প্রক্রিয়ায় হয়তো আরেকটু নিচে নামবো। আমাদের অবস্থা আরেকটু খারাপ হবে। এ রকম খারাপের দিকে ধাবিত হওয়াই হয়তো আমাদের দিনবদল।"

ভাঙ্গা পেন্সিল's picture


আমার একটা জেনারেল অবজার্ভেশনঃ আওয়ামী আমলে সন্ত্রাস বাড়ে, বিএনপি আমলে বাড়ে দুর্নীতি! উই আর লুকিং ফর দ্য লেস এভিল

মুকুল's picture


নজরুল ইসলাম's picture


প্যারা করে দিলে সুবিধা হতো। পড়তে অসুবিধা হচ্ছে।

তানবীরা's picture


আর আমরাও দিনবদলের প্রক্রিয়ায় হয়তো আরেকটু নিচে নামবো। আমাদের অবস্থা আরেকটু খারাপ হবে। এ রকম খারাপের দিকে ধাবিত হওয়াই হয়তো আমাদের দিনবদল
আগে তাইতো মুরুব্বীরা বলতো যায় দিন ভালো যায় আসে দিন খারাপ। আবার সেটাও বুঝি না, যেদিন আসে সেদিনইতো আবার যায়। লাগতাহে সারা উলটা পুলটা

টুটুল's picture


আর আমরাও দিনবদলের প্রক্রিয়ায় হয়তো আরেকটু নিচে নামবো। আমাদের অবস্থা আরেকটু খারাপ হবে। এ রকম খারাপের দিকে ধাবিত হওয়াই হয়তো আমাদের দিনবদল

Sad

মুনীর উদ্দীন শামীম's picture


পড়বার জন্য এবং মন্তব্যের জন্য সবাইকে ধন্যবাদ এবং কৃতজ্ঞতা..

মুকুল's picture


অনেকদিন লেখা নাই আপনার। ব্যস্ততা কাটলে লিখতে থাকুন নিয়মিত। Smile

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

সাম্প্রতিক মন্তব্য