ইউজার লগইন

মাটির গন্ধ

না, আমি কোন গুরুগম্ভীর বিষয়ের অবতারনা করতে যাচ্ছি না । মনে মনে কত কথার জাল বুনে চলেছি অহরহ, সে সব কথা শুনবার, শুনাবার মত আমার কোন বন্ধু ছিল না এতদিন ! এখন “আমরা সবাই বন্ধু, আমাদের এই ‘আমরা বন্ধু’তে” । তাই এখানে সেই সব আবোল-তাবোল কথা বলতে ইচ্ছা করছে । আমার মনে হতে শুরু করেছে যে, এ আসরে মনের কথা অকপটে বলা যায়, এখানে আমার কথার নিবিষ্ট শ্রোতা আছে ।
আমার আজকের প্যাচাল ভাষা নিয়ে । আঞ্চলিক ভাষায় আমি বড্ড বেশী অনভ্যস্ত । আর তা যদি ইংরেজী (রোমান) অক্ষরে হয় তা হলে একেবারে ফেঁসে যাই । তাই ফেসবুক-বন্ধুদের অনুরোধ করেছিলাম শুদ্ধ (প্রমিত অর্থে) বাংলায় লিখবার । দারুন সমালোচিত হয়েছিলাম, একেবারে তুলোধুনা হবার মত অবস্থা । তারা আক্রমণাত্মক ভাষায় আমার প্রস্তাবের প্রতি অনাস্থা প্রকাশ করেছিল । আর জানিয়েছিল যে, আঞ্চলিক ভাষাও শুদ্ধ ভাষা, এ ভাষা ব্যবহার না করলে তা বিলুপ্ত হয়ে যাবে, ইত্যাদি । তাদের যুক্তির কাছে হার মানতে হয়েছিল । রণে ক্ষান্ত না দিয়ে আমার আর উপায় কি ? তবু একেবারে কি পিছিয়ে আসা যায় ? এবার ছুড়ে দিলাম একটা ভালবাসার কথা । লিখলাম, “বাংলা আমাদের প্রিয় ভাষা, এ ভাষাকে আমরা ভালবাসি, এর বর্ণমালাকেও আমরা ভালবাসি । এ ভালবাসা শুধু একটি মাসে সীমাবদ্ধ না রেখে সারা বছর ভালবাসতে শিখি । আসুন, আমরা সবাই বাংলা বর্ণমালা দিয়ে বাংলায় লিখি ।” এ আহ্বানে আর কোন বন্ধু সাড়া দিল না, কোন প্রতিক্রিয়াও কেউ জানালো না । শুধু আমার এক ছোট বোন আর এক শ্যালিকার কন্যা ‘পছন্দ’ করলো ।
এটি যেহেতু ‘ব্লগর ব্লগর’ তাই আদি আর অন্তে, কথায় আর কাজে মিল খুঁজতে যাওয়া অনুচিৎ হবে । এবার আর একটা প্যাঁচাল । আমার এক ভ্রাতুষ্পুত্র মাঝেমধ্যে কালেভদ্রে দু-চারটে আঞ্চলিক শব্দ বলে ইচ্ছাকৃতভাবে । আর এতে বৌমা খেঁপে উঠে ওর দিকে তাকায় চোখ গরম করে । বৌমার আশঙ্কা, তার যমজ পুত্রদ্বয় ঐ অশুদ্ধ (?) ভাষায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলে সেটা হবে বড়ই লজ্জ্বাকর । এদিকে ভাইপো আমাদের গ্রামের আঞ্চলিক ভাষা নিয়ে একখানা অভিধান একেবারে পুস্তকাকারে বের করে ফেলেছে । আর প্রকাশিত হয়েছে বাংলা একাডেমীর গ্রন্থমেলায় । প্রচার ও বিক্রয় অর্থাৎ কাটতি বাড়াবার লক্ষ্যে আমরা সদলবলে বইমেলায় যেয়ে হাজির হই । যে স্টলে ভিড় বেশী সেখানে ভিড় ঠেলে সামনে যেয়ে অথবা পিছন থেকে চিৎকার করে জানতে চাই অমুক লেখকের অমুক বইটা আছে কিনা । আমার ছোট ভাই (এম.এ., ঢা.বি.) চিৎকার করে বলে, “এই যে ভাই, শুনতি পাচ্চেন না, চেচি চেচি যে গলা ফাইটি গেল, এদিক ইট্টু কান দিতি পাচ্চেন না ?” বিক্রেতা এ ভাষার মাহাত্যে তার দিকে কান না দিয়ে কি আর পারে ? ঐ বইয়ের কাটতি এতে বেড়েছিল কিনা জানা নেই, তবে এ ভাষা সেদিন অনেকের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল । হঠাৎ একদিন প্রথম আলোর পুস্তক সমালোচনা পাতায় সে বইটার মলাটের ছবি দেখে একটু চমক লেগেছিল । আরও চমকেছিলাম সমালোচকের নাম ও তার বক্তব্যে । জনাব মোকাররম হোসেন অনেক গুণগান গেয়ে শেষে লিখেছেন কি জানেন ? তিনি নাকি এ বইয়ে মাটির গন্ধ পেয়েছেন । ৩০-৩৫ বছর আগে যে ভাষার সাথে সম্পর্ক প্রায় চুকে গিয়েছিল, সে ভাষার অভিধান আমাকেও বোধহয় একটু নস্টালজিক করে তুলেছে । প্যাচাল শেষ ।
বুজলেন কিচু, কিচু য্যাকন ঘটে না থাকে, ত্যাকন এ্যামন করি-ই গুলতানি মারতি হয় । একই সাতে বইর বিগ্যাপনও দি-ই দিলাম । আমার কতা কিন্তুক ফুরি-ই গি-ইচে । এ্যাকোন আপনাগের ক্যারাম নাগচে ? ক্যামন শুরু আর ক্যামনই বা তার শ্যাষ!

পোস্টটি ৫ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

জ্যোতি's picture


এটা কোন অঞ্চলের ভাষা?আমার বাড়ি নরসিংদী। আমরা নিজেরা যখন একসাথে থাকি তখন আমাদের আঞ্জলিক ভাষায় মজা করে কথা বলি। আমার সাড়ে তিন বছরের ভাগ্নী রেগে গেলে আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে তার মাকে খেপাতে চায়।

নাজমুল হুদা's picture


একটু চেষ্টা করে দেখুন না, এটা কোন এলাকার ভাষা তা ধরতে পারেন কিনা । আমি ফাস করলে আপনারা বিশ্বাস করতে চাইবেন না ।

জ্যোতি's picture


আমি ঠিক জানি না। কুষ্টিয়া নাকি?

শাওন৩৫০৪'s picture


বুজিচ্চি না, কুনেলাকার বাষা?

অতিথি(সাজ্জাদ)'s picture


গোবিন্দগঞ্জ, রংপুর

মীর's picture


যশোর

তানবীরা's picture


আমার বাসায় আরো জোরদার কম্পিটিশান হয়। আমার মাতৃভাষা বাংলা আর আমার মেয়ের ডাচ। সে আমাকে শিখায় আমি তাকে। সে আমাকে ভেঙ্গায় আমি তাকে

নুশেরা's picture


প্রমিত ভাষারূপের মতো আঞ্চলিক ভাষা জানাটাও জরুরি, একটা জায়গা এবং তার মানুষকে বুঝতে চাইলে। ল্যায়া'ত জুত হাইছি (লেখা উপভোগ করলাম)। এলাকাটা চিনতে পারলাম না
Sad

রশীদা আফরোজ's picture


নুশেরা, ঠিক বলেছো। আমার একটা ঘটনা বলি। ফেনীর সোনাগাজীতে যে কলেজে পড়াতাম সেখানকার ৮৫% শিক্ষার্থী আসতো আশেপাশের গ্রাম থেকে। কিছুদিনের মধ্যেই মেয়েদের সাথে আমার একটা দারুণ সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল। কিন্তু শ্রেণীকক্ষে পাঠদান করার সময় টের পেতাম ওদের সাথে কোথায় যেন আমার একটা দূরত্ব থেকে যাচ্ছে। ওরা ঠিকঠাক রেসপন্স করেনা। তারপর ধরে ফেল্লাম সমস্যা কোথায়। ভাষার সমস্যা। আমাদের ভেতর যেসব শিক্ষক ক্লাসে প্রমিত উচ্চারণে না বলে আঞ্চলিক শুদ্ধভাষায় লেকচার দেন, তাদের ক্লাসে মেয়েরা খুব স্বাচ্ছন্দবোধ করে আর আমরা যারা তা করিনা তাদের ক্লাসে ওরা মনযোগী ভাব করে বসে থাকে কিন্তু ঠিক স্বাচ্ছন্দবোধ করেনা।

১০

নাজমুল হুদা's picture


"ল্যায়া'ত জুত হাইছি (লেখা উপভোগ করলাম)" উপভোগ করলাম ।

১১

রশীদা আফরোজ's picture


উত্তরবঙ্গ। দিনাজপুর হতে পারে।

১২

নাজমুল হুদা's picture


জয়িতা ও মীর কাছাকাছি পৌছেঁছেন । কুস্টিয়া ও যশোরের মাঝামাঝি । চুয়াডাঙ্গার এক প্রত্যন্ত গ্রাম ও তার আশপাশে একেবারে মাটির মানুষেরা এখনও এ ভাষার চর্চা রেখেছেন । আমরা ঘনিষ্টজনেরা, বন্ধুবান্ধব, ভাইবোন নিজেদের মধ্যে কথাবার্তায়ও এ ভাষা আর বলতে পারি না । উম্মে মুসলিমা প্রথম আলোতে গল্প লেখেন, সে সব গল্পের চরিত্রদের কারো কারো মুখে এ ভাষায় সংলাপ থাকে । সালাহউদ্দিন লাভলু এবং মাসুম রেজা টিভি নাটকে এ ভাষায় সংলাপ দেন, কিন্তু উচ্চারণ ও প্রক্ষেপন ঠিক যুৎসই হয় না, কেমন যেন কৃত্রিমতায় ভরা থাকে । শুজা আহমাদের "চলো বেড়িয়ে আসি" নামের প্রকাশনায় এ ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে ।

১৩

রাসেল আশরাফ's picture


হা হা হা হা।সত্যি আমি কিন্তু ধরতে পেরেছিলাম এটা চুয়াডাঙ্গার ভাষা।আমার জন্মস্থান কুষ্টিয়া।আর আমার ভার্সিটিতে চুয়াডাঙ্গার অনেক বন্ধু ছিলো।এই ক্যারাম নিয়ে একজনরে যে কত ক্ষাপায়ছি।

১৪

সাহাদাত উদরাজী's picture


প্রতি ৫০ মাইল পর নাকি ভাষা পরিবর্তন হয়ে যায়! বহু বছর আগে একবার ছাতকের এ গ্রামে গিয়েছিলাম, ভাষা বুঝতে অনেক কষ্ট হয়েছিল।

১৫

নাজমুল হুদা's picture


প্রতি ৫০ মাইল পর ভাষা পরিবর্তিত হওয়ার বিষয়ে জানা নাই । এর চেয়ে অনেক কম দূরত্বে বাচনভঙ্গী ও উচ্চারণে পার্থক্য লক্ষ্য করেছি, এমনকি চার-পাঁচ মাইল দূরত্বেও ।

১৬

মাইনুল এইচ সিরাজী's picture


ফেসবুকে নাজমুল ভাইয়ের সঙ্গে আমারও বিতর্ক হয়েছিল। আমি ছিলাম আঞ্চলিক ভাষার পক্ষে। যোগ দিয়েছিলেন রেজা য়ারিফ। প্রথম আলোতে এ নিয়ে একবার বিতর্ক করেছিলাম মোস্তফা সরয়ার ফারুকীর সঙ্গে। আমি ছিলাম প্রমিত বাংলার পক্ষে।
ফারুকীর জগাখিঁচুড়ি ভাষাকে নয়, আঞ্চলিক ভাষাকে বাঁচানো দরকার-ভাষার মৃত্যু কোনো সুখের কথা নয়। ওটা জানাও দরকার-মাটির গন্ধ পাওয়ার জন্য। তবে সব শিক্ষিত মানুষের উচিত প্রমিত বাংলা চর্চা করা।

১৭

নাজমুল হুদা's picture


আপনিও ছিলেন সে দলে ? সমঝোতা হলো এখন ।'আঞ্চলিক ভাষাকে বাঁচানো দরকার-ভাষার মৃত্যু কোনো সুখের কথা নয়। ওটা জানাও দরকার-মাটির গন্ধ পাওয়ার জন্য। তবে সব শিক্ষিত মানুষের উচিত প্রমিত বাংলা চর্চা করা।' আপনার এ অভিমতের সাথে আমি একশ' ভাগ একমত ।

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নাজমুল হুদা's picture

নিজের সম্পর্কে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় এমএস.সি । বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা এবং অবশেষে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান । উপসচিব পদ হতে অবসরে গমন । পড়তে ভাল লাগে, আর ভাল লাগে যারা লেখে তাদের । লিখবার জন্য নয়, লেখকদের সান্নিধ্য পাবার জন্য "আমরা বন্ধু"তে আসা।