ইউজার লগইন

এক বোকা নানার বোকামী -১

এক নানা আর নানি সরকারি চাকরি হতে অবসর পাবার পরে স্বপ্ন দেখেছিল অনেক । নানা চাকরি সূত্রে চার-পাঁচটি দেশ দেখবার সুযোগ পেয়েছিল । তার ইচ্ছা ছিল অবসর জীবনে অন্ততঃ সে দেশগুলোতে স্ত্রীকে নিয়ে যাবে । আর্থিক অপ্রতুলতাহেতু তা সম্ভব না হওয়ায় দু’জনে সিদ্ধান্ত নিল, আগে নিজের দেশটা ঘুরে দেখতে হবে । দেশের সব অঞ্চল, বিখ্যাত সব ঐতিহাসিক স্থান, দর্শণীয় স্থাপনাসমূহ দেখার স্বপ্ন বাস্তবতার আলো দেখতে পাবার আগেই কেমন কেমন করে যেন সব স্বপ্ন হারিয়ে গেল ।

তাদের কন্যার কোল আলো করে মেয়ের পরে ছেলে এল । কি সুন্দর যে দেখতে ! নানা ও নানি নাতিকে দেখতে গেল, নাতির নাকে দেখল অক্সিজেনের টিউব লাগানো । সে টিউব লাগানো থাকলো তিন মাসেরও অধিককাল । মুখ দিয়ে খাবার খেতে পারেনা বলে টিউব ফিডিং-এর জন্য আরেকটা টিউব নাকে । হাসপাতাল থেকে বাসায় আনা হলো অক্সিজেন সিলিন্ডারসহ । তার তাকানো এতই স্বাভাবিক যে, সে যে চোখে দেখেনা তা বুঝতে তাদের সময় লেগে গেল প্রায় চারমাস । নিয়ে গেল ডাক্তারের কাছে, “চোখে তো কোন অসুবিধা নেই” ডাক্তারের অভিমত । সিটি স্ক্যান দেখে ডাক্তার কোন মন্তব্যই করলেন না । কিছুই নাকি করার নাই । নয় মাস বয়সের সময় নিউমোনিয়ায় ধরলো তাকে । নানা তাকে নিয়ে দিনদশেক হাসপাতালে কাটালো । যে হাসপাতালে বা ডাক্তারের কাছে নিয়ে যায়, সেখানেই শুনতে হয়. “বাচ্চার মা কোথায়?” শেষে অতিষ্ট হয়ে নানা নিজেকে ওর মা বলে দাবী করলো । বড় বড় চোখ করে প্রশ্নকর্তা অবাক হয়ে তাকায় তার দিকে । ‘পেটে ধরলেই মা হয়না, যে মায়ের মত বাচ্চাকে আগলে রাখতে পারে সেই-ই তো আসলে মা’ – বক্তব্য তাদের উদ্দেশ্যে ।

নানা-নানির বিদেশ ভ্রমণ তো গেছে, স্বদেশ ভ্রমণের আশাও ফুটো বেলুনের মত চুপসে গেল ।কন্যা আক্রান্ত হলো ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য নানান জটিলতায় । সে চাকরি ছেড়ে দিতে বাধ্য হল । নাতির দেখাশুনার দায়িত্ব এড়াতে পারেনা নানা । জটিল কিছু রোগে নানি আক্রান্ত । তাঁর নিজের যত্নই সে ঠিক মত নিতে পারে না । তবুও মেয়ের কষ্ট লাঘবের প্রচেষ্টায় নাতিকে নিয়ে এল তারা খুলনায় নিজেদের কাছে । একটানা আট মাস নাতিকে লালনপালন করা কালে দু’বার তাকে খুলনা শিশু হাসপাতালে ভর্তি করতে হল । প্রথমবার নয়দিন ও পরেরবার দশদিন হাসপাতালে রাখবার পরে তারা এককভাবে নাতিকে রাখবার সাহস ও উদ্যম হারিয়ে ফেলল । আবার তাকে তার বাবা-মায়ের কাছে ঢাকায় নিয়ে গেল । ঢাকায় যাবার পরপরই আবারও ঢাকা শিশু হাসপাতাল তাকে হাতছানি দিল । এবার প্রথমে ছয়দিন এবং পরেরবার পাঁচদিন হাসপাতালে - তার সাথে নানাকেই থাকতে হল ।

শিশু লালনপালনের সাধারন কিছু ধারনা ছাড়া নানার আর কোন সম্বল নাই । তার এমন কোন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা বা প্রশিক্ষণ নেই, যা এমন একটা অস্বাভাবিক শিশুর দৈনন্দিন দেখাশুনার বা জরুরী অবস্থা মুকাবিলায় সহায়ক হতে পারে । বাচ্চাটির বয়স যখন পাঁচমাস এগারো দিন, তখন হঠাৎ শ্বাস বন্ধ হয়ে মুখ-হাত-পা কৃষ্ঞবর্ণ হয়ে যায়, কুঁকড়ে সে হয়ে যায় একটা পেঁচানো চিংড়িমাছের মত । কোন ডাক্তার নাই, ডাক্তারের কাছে নেবার সময় নাই, কি করতে হবে এমন কোন চিকিৎসা জানা নাই, এমনই এক অবস্থার সম্মুখীন হতে হয় নানা-নানিকে । সম্পূর্ণ নিজের বুদ্ধিমত তার মৃত্যুকে আটকে দেয় নানা । এমনই করে পরবর্তীতে আরো অন্তত দশবার তার মৃত্যুকে প্রতিহত করতে হয়েছে । নানা তাকে বারবার বাঁচিয়ে তোলে, আর তার কষ্টকে দীর্ঘায়িত করে । নানা তাকে একটা সুস্থ জীবন দিতে ব্যর্থ – কিন্তু তাকে বাঁচিয়ে রেঁখে তার এ নষ্ট ও কষ্টকর জীবনকে আরো কষ্টকর করে তুলেছে বারবার ।

সকালে ঘুম থেকে উঠবার পর থেকে রাতে ঘুমাতে যাবার আগে পর্যন্ত নানাকেই নাতির সব কিছু করতে হয় । একজন সার্বক্ষণিক অশিক্ষিত আয়া, নানি, বাচ্চার মা ও সাত-আট বছর বয়সের বোন কিছুটা সহযোগিতা না করলে নানা এতদিনে হয়তো পাগল হয়ে যেত । নাতিকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন করা, তেল মাখানো, গোসল করানো, খাবার ও ওষুধ খাওয়ানো, নেবুলাইজার দেওয়া, নখ কাটা, চুল ছাটা, প্রস্রাব-পায়খানা করানো ইত্যাদি প্রায় প্রতিটা কাজে নানার ছোঁয়াচ থাকতেই হয় । এ বয়সে এসব করতে নানার কষ্ট হয় । তবু্ও করে এই ভেবে যে, তাতে ওর কষ্ট যদি একটু কমে ! নাতিটার কষ্ট কমানোই এখন নানার একমাত্র লক্ষ্য । নিজে এত চেষ্টা করেও তার কষ্ট দূর করতে না পেরে নানা হাসপাতালে ডাক্তারদের হাত ধরে অশ্রুসজল হয়ে উঠেছে বারবার, তাদের অনুরোধ করেছে একটু ভুল চিকিৎসা করবার, যাতে করে নাতিটা সব কষ্ট থেকে দ্রুত অব্যাহতি পায় । ডাক্তারদের নানা নিশ্চয়তা দিয়েছে এমন ভুল চিকিৎসা দেবার জন্য কোন ভাংচুর হবে না, কোন ডাক্তারকে কেউ কোন কটু বাক্য পর্যন্ত বলবে না । কেউ নানার অনুরোধ রাখেনি । বৃদ্ধের কান্নাদৃশ্য দেখতে মোটেই সুশ্রী নয় জেনেও তাকে কোলে নিয়ে নানা একা নয়নজলে ভাসে ।

নানা অবসর সময়ে ছড়া লেখেঃ
আরীবকে নিয়ে আমি আর কত ভাববো,
কত দিনে তাকে আমি ভাল হতে দেখবো ।
শুয়ে শুয়ে কত আর দিবা নিশি কাটাবে,
কি করে সে জীবনের আঁধারকে হটাবে ।
হাত দু’টি দিয়ে সে জড়িয়ে যে ধরে না,
সুন্দর চোখ দু’টো দেখতে যে পারে না ।
পরশ কি, আলো কি বুঝতে সে পারে না,
মুখে তার আজ অবধি কোন কথা সরে না ।
পিঠ ঘাড় সোজা করে বসতে সে পারে না,
পা দু’খানি আছে, যা কোন কাজ করে না ।
সজীব এ জড়পিন্ড পৃথিবীর বোঝা সে,
খেয়ালী প্রকৃতির বেখেয়ালে ভাসিছে ।
তবুও তাকে নিয়ে আশা করা মিছে যে,
এ কথা কেমন করে বিশ্বাস করি যে ।

নানা মাঝেমাঝে দু’চার লাইন ডাইরী লেখে । যেমনঃ
আজ ১৯-০১-২০১০ আরীবের এক বছর পূর্ণ হলো । গতকাল চপল আর টিয়া এসেছে । ঝংকার কেক এনেছে । কাজল এনেছে বেলুন আর মোমবাতি । ঝরনা এসেছে মেহরাবকে নিয়ে । টিয়া আর মেহরাব বেলুন ফুলাচ্ছে । আরীব এখন ঘুমাচ্ছে । এক বছরের আরীব কিছুই বোঝেনা । তার চোখ, দু’টো হাত আর পা অচল । ছোট্ট একটা মাথা নিয়ে তার বয়স বাড়ছে আর সব শিশুদের মতই ।এখন পর্যন্ত সে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে শেখেনি । ঝংকারের আনা কেকে লেখা Happy birthday to Areeb । কি সুখের, কি শুভ তা কেমন করে কে নিরূপন করবে ?

নানা তার ফেসবুকে আরীবের হয়ে লেখে, “আমার নানা সব সময় বলে আমি ভাল হয়ে যাব । আমার পা দিয়ে হাটতে পারবো, হাত দিযে ধরতে ও সব কিছু ছুঁতে পারবো, আমার পিঠ ও ঘাড় শক্ত হবে - আমি সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারবো । আমাকে আর চামচে করে খাওয়াতে হবে না, নিজেই হাত দিয়ে খেতে পারবো । নানার হাত ধরে বাজারে যাব, আমি আলো আর আঁধার কি তা বুঝতে পারবো - সব কিছু দেখতে পাবো । নানার কথা কি মিথ্যা হতে পারে ?” এ লেখা পড়ে কেউ কেউ জানতে চান পুরো বিষয় ।
চলবে………

পোস্টটি ৪ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

জ্যোতি's picture


আহারে। আহা।বুকের ভেতরটা মুচড়ে উঠে।

টুটুল's picture


আল্লাহ একটু রহমত করো Sad

শওকত মাসুম's picture


কি বলবো!

সাহাদাত উদরাজী's picture


ভাষাহীন।

ঈশান মাহমুদ's picture


এক জীবনে মানুষকে কতরকম যুদ্ধইনা করতে হয়, একেমন জীবন যুদ্ধ ! হে বিধাতা ! আমাদেরকে শক্তি দাও ,সাহস দাও.....।

তানবীরা's picture


---------------------------

মাইনুল এইচ সিরাজী's picture


বলার নেই

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

নাজমুল হুদা's picture

নিজের সম্পর্কে

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রাণিবিদ্যায় এমএস.সি । বিভিন্ন কলেজে অধ্যাপনা এবং অবশেষে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান । উপসচিব পদ হতে অবসরে গমন । পড়তে ভাল লাগে, আর ভাল লাগে যারা লেখে তাদের । লিখবার জন্য নয়, লেখকদের সান্নিধ্য পাবার জন্য "আমরা বন্ধু"তে আসা।