এক বোকা নানার বোকামী -২
(দুই)
নানা তার ফেসবুকে ‘I am Areeb’ শিরোনামে একটি এ্যালবাম তৈরী করল । সেখানে আরীবের হয়ে নানা লিখল –“আমার নাম আরীব । এ নামটি রেখেছে আমার লিজি নানি । বাবা আমার নাম রেখেছে অদ্বয় । ১৯ জুলাই আমার বয়স দেড় বছর পূর্ণ হবে । মানুষের মত সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আমার আছে । আমি এখনও বসতে পারি না । হাটতে পারি না । আমার হাত দুটো দিয়ে আমি কিছু ধরতে পারি না । প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বাতাস থেকে নিতে পারি না বলে সব সময় আমার শ্বাস কষ্ট । আমার মেরুদন্ড শক্ত হয়নি, তাই ঘাড় ও পিঠ সোজা রাখতে পারি না । খাবার প্রায়ই শ্বাসনালীতে চলে যায় বলে খেতে আমার কষ্ট হয় । পানিও খেতে পারিনা ঠিক মত । আমার ডান পায়ের পাতা কেমন যেন, আমি হয়তো হাটা শিখতে পারব না । আমি সব শব্দ শুনতে পাই, সকলের কথাও শুনি, কিন্তু আমি তো কথা বলতে পারিনা । আর জানো, আমি এত বড় হয়ে গেলাম, আলো কি তা বুঝতে পারলাম না । আমার দুটো সুন্দর চোখ আছে, তা আমার কোন কাজে লাগেনা । আমি কিছুই দেখতে পাইনা । তোমরাও কি সবাই আমার মত ? আমি যেমন তোমাদের দেখতে পাইনা, তেমনই তোমরাও কি আমাকে দেখতে পাওনা ? তা'হলে আমাকে তোমাদের মত করে দাও না কেন ? মানুষের অসাধ্য নাকি কিছুই নাই ! আমি তো কোন অন্যায় করিনি, তা'হলে আমাকে কেন এত কষ্ট পেতে হচ্ছে । বিধাতারও কি সাধ্য নাই আমাকে তোমাদের মত করে দেবার ? আমি তোমাদের দেখতে চাই. তোমাদের মত হতে চাই, আমি একটা সাধারণ ও স্বাভাবিক ছেলে হতে চাই । তোমরা কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো ?”
ফেসবুকে আরীবের আকুলতা ও আকাঙ্খা পড়ে অষ্ট্রেলিয়া থেকে নানার এক ভাগ্নীজামাই (ডাক্তার) ফোন করল ।আরীবের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র মেইল করে পাঠালে কিছু করা যাবে বলে আশা দিল । খুলনার তৃষ্ঞা ও কৃষ্ঞা, যাদের কেউ কোথাও নাই, তাদের আধুনিক চিকিৎসা জুটল, অথচ আরীবকে এ পৃথিবীর অবহেলা সইতে হচ্ছে । তারা অস্ট্রেলিয়াতে উপভোগ করছে তাদের শৈশব, সেখানেই তারা মানুষ হবে । আরীবের জন্য এমন ব্যাবস্থাও করা যেতে পারে বলে সে জানালো । বোকা নানা আশায় বুক বাঁধে । সব ডকুমেন্টস পাঠায় তার ভাগ্নীজামাইয়ের কাছে । আর পাঠায় একটা মেইল --
“স্নেহভাজন স্বপন,
তোমরা ভাল আছো আশা করি । আমি ঠিক জানি না তবে আমার মনে হয় আগেও এ সব ডকুমেন্টস্ পাঠানো হয়েছে । ডাক্তারী বিদ্যা তো জানা নেই, তবু যেগুলো কাজে লাগতে পারে বলে মনে হলো সেগুলো পাঠালাম । এ ছাড়া তেমন আর কিছু নেইও। তোমাকে আবারও আমি বলছি যে, আরীব যে সব অসম্পূর্ণতা নিয়ে এসেছে তা পূরণ করার ক্ষমতা এ পৃথিবীর কোন ডাক্তারের আছে বলে আমি মনে করিনা । আমার ধারণা ওর চোখ, হাত, পা, ফুসফুস, মেরুদন্ড, মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যে সব লক্কড় মাল-মসলা দিয়ে তৈরী তা বদল বা মেরামত করা কারো পক্ষে সম্ভব না । অথচ ওকে এ অবস্থায় কোন ক্রমেই ত্যাগ করা যায় না । এমন একটা জীবন্ত জড়বস্তুকে অনির্দিষ্টকাল যথাযথ যত্ন ও সেবা দেওয়াও কারো পক্ষে সম্ভব নয় । এত সময় কারো নেই - আমার সময় আছে কিন্তু শরীর ও মনে এ কাজ করবার মত প্রয়োজনীয় ও যথেষ্ট শক্তি নেই । এক বা একাধিক সাংসারিক জীবন অচল করে দেবার জন্য এমন জড়বস্তু একটিই যথেষ্ট । তাই কোন সংসারে রেখে নয়, কোন উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে সংগঠিত কোন প্রতিষ্ঠান যদি দায়িত্ব নিয়ে ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতো তা হলে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারতাম । দেশে হবে না, বিদেশ একমাত্র ভরসা । আমি চাই, সর্বান্তকরণে চাই আরীব দ্রুত সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে উঠুক, আর যদি তা না হয় তবে ওর কষ্ট থেকে ও নিবৃত্তি পেয়ে শান্ত হয়ে যাক । ওর কষ্ট আমি আর সইতে পারি না । দ্রুত আমাকে কিছু জানাবে আশা করি ।
তোমরা ভাল থেকো । -শুভাকাঙ্খী মেজোমামা ।”
অস্ট্রেলিয়া আরীবকে গ্রহণ করবে এমন একটু ক্ষীণ আশা নানার মনে জেগেছিল । কিন্তু ভাগ্নীজামাইয়ের ফির্তি বারতা তাকে হতাশার অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দিল । এবার নানা তার ভাগ্নীজামাইকে লিখলঃ
“স্নেহের স্বপন, তোমার পাঠানো বার্তার প্রথম বাক্যটি পড়ে আশান্বিত হয়ে উঠেছিলাম । সবটুকু পড়া শেষ হলে হতাশায় মনটা ছেয়ে গেল । আরীবের জন্য এ পৃথিবী কি শুধু দুঃখই বরাদ্দ করে রেখেছে ? কি প্রয়োজন ছিল ওর এ দুনিয়ায় আসবার ? কেন সে আর দশটা শিশুর মত স্বাভাবিক হল না ? ওকে কষ্ট দিয়ে বিধাতা (যদি আদৌ থাকে) কোন্ আনন্দের সন্ধান পাচ্ছে ? মহাশক্তিধর তার নিষ্ঠুর শক্তির নমুনা দেখিয়ে কোন সুখে সুখী হচ্ছে ? আমি জানতাম, আরীবের কষ্ট কমবেনা, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শুধু কষ্টই করবে । তার কষ্ট কমাবার ভার নেবার মত কেউই নেই ।
ভাল থেকো । -মামা “
(তিন)
নানার কাছে তার ছোট বোন ই-মেইলে একটা ইংরেজী কবিতা পাঠালো একদিন । যেখানে প্রেমিক তার প্রেমিকাকে খুশী করবার জন্য তার সব কিছু বিলিয়ে দিয়ে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল । অন্ধ প্রেমিক তার অন্ধত্বের কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়ে জগৎবাসীদের জন্য দিয়েছিল পরামর্শ, উপদেশ । আরীবের নানা ঐ কবিতা পড়ে নিজের মত করে তার ভাবানুবাদ করেছিল ।
“আমি নিজেকে নিয়ে অনেক ভেবেছি -
ভাবনার তো নেই শেষ.
এখন আমার সব ভাবনা আরীবকে নিয়ে -
আমার চোখ, আমার বাকশক্তি
আমার খাদ্য গ্রহণের ক্ষমতা
আমার সকল সাহচর্য
আমার মর্ত্য, আমার স্বর্গ
আমার কর্মস্পৃহা ও কর্মক্ষমতা
আমার চলৎশক্তি, আমার সকল হাসি আনন্দ
আমি দিতে চাই আরীবকে ।
এমন কেউ কি আছে, আছে কি এমন কোন শক্তি
যে পারে আমার কাছ থেকে এগুলো ছিনিয়ে নিয়ে আরীবকে দিতে ?
আরীবের সব কষ্ট দূর করে , সেগুলোকে আমার করে দিক না কেউ ।
অন্ধ হয়ে যাওয়া ঐ প্রেমিকের মত
আমি কারো জন্য কোন উপদেশ, কোন পরামর্শ দেব না ।
আমাকে তোমরা বিশ্বাস করতে পারো অন্তত এ ব্যাপারে ।”
(চার)
প্রথম আলোর ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’ । এক শনিবারে এশিয়ার নোবেল প্রাইজ বলে পরিচিত পুরস্কারে পুরস্কৃত এ এইচ এম নোমান খানকে নিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনী রচিত হলো । বোকা নানা এখানেও আশার আলোর সন্ধানে এগিয়ে গেল । সে চিঠি পাঠালো প্রথম আলোয় ।
“আজ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে আরীবের বয়স ১ বছর ৮ মাস পূর্ণ হলো ।এই দীর্ঘ সময় সে বিছানায় শুয়ে কাটিয়েছে, কখনও বা কারো কোলে ।এতগুলো দিন চলে গেল এখন পর্যন্ত সে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে শিখলো না । দু’হাত বাড়িয়ে সে কোলে উঠবার আবদার করতে পারে না, তার হাতে যে সে শক্তি নাই । তার মেরুদন্ড আর ঘাড় শক্ত হয়নি এখনও, আর তাই সে বসতে পারে না । শোয়া অবস্থায় পা স্বাভাবিক, কিন্তু সে পা এখন পর্যন্ত দাঁড়াবার উপযুক্ত হয়নি । এ বয়সে তার চারবার নিউমোনিয়া হয়েও সে বেঁচে আছে । গত দু’মাস যাবৎ নাকের ভিতর ঢুকানো নল দিয়ে তাকে খাওয়ানো হচ্ছে । মুখ দিয়ে খাবার দিলে তার কিছুটা শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে ঢুকে যায়। জন্ম থেকেই শ্বাস কষ্ট, এখন কিছুটা ভাল । আরীবের মাথাটা ছোট, কিন্তু সে বোকা নয় - তার আচরণ থেকে তা ধারণা করা যায় । এ পৃথিবীর অক্সিজেন, খাদ্য সে ভোগ করতে পারছে না । তার জীবন চির অন্ধকারে আচ্ছন্ন – তার সুন্দর দু’টো চোখে এ পৃথিবীর আলো দেখবার সৌভাগ্য নিয়ে আসেনি সে ।
এমন একটা জীবন্ত জড়বস্তুকে কি প্রতিবন্ধী বলা যায় ? এর কি বেঁচে থাকবার কোন প্রয়োজন আছে ? আছে কি একে বাঁচিয়ে রাখবার কোন ব্যবস্থা ? এ এইচ এম নোমান খান এ ধরণের একটা জড় পদার্থ সম্পর্কে কিছু ভাবতে পারেন কি ? এটিকে বাঁচিয়ে রেখে পৃথিবীর কল্যাণে লাগাবার ক্ষমতা বা আগ্রহ কি তাঁর আছে ? বিধাতার নিষ্ঠুরতা আরীবকে জন্ম থেকেই কষ্ট দিয়ে চলেছে । আর কত কষ্ট তাকে পেতে হবে ? এ প্রশ্নের উত্তর কি কারো জানা আছে ?”
নানার জানা ছিল এর কোন উত্তর সে পাবেনা । তবুও নানা উত্তরের প্রতীক্ষায় থাকে ।
চলবে....
(দুই)
নানা তার ফেসবুকে ‘I am Areeb’ শিরোনামে একটি এ্যালবাম তৈরী করল । সেখানে আরীবের হয়ে নানা লিখল –“আমার নাম আরীব । এ নামটি রেখেছে আমার লিজি নানি । বাবা আমার নাম রেখেছে অদ্বয় । ১৯ জুলাই আমার বয়স দেড় বছর পূর্ণ হবে । মানুষের মত সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গ আমার আছে । আমি এখনও বসতে পারি না । হাটতে পারি না । আমার হাত দুটো দিয়ে আমি কিছু ধরতে পারি না । প্রয়োজনীয় অক্সিজেন বাতাস থেকে নিতে পারি না বলে সব সময় আমার শ্বাস কষ্ট । আমার মেরুদন্ড শক্ত হয়নি, তাই ঘাড় ও পিঠ সোজা রাখতে পারি না । খাবার প্রায়ই শ্বাসনালীতে চলে যায় বলে খেতে আমার কষ্ট হয় । পানিও খেতে পারিনা ঠিক মত । আমার ডান পায়ের পাতা কেমন যেন, আমি হয়তো হাটা শিখতে পারব না । আমি সব শব্দ শুনতে পাই, সকলের কথাও শুনি, কিন্তু আমি তো কথা বলতে পারিনা । আর জানো, আমি এত বড় হয়ে গেলাম, আলো কি তা বুঝতে পারলাম না । আমার দুটো সুন্দর চোখ আছে, তা আমার কোন কাজে লাগেনা । আমি কিছুই দেখতে পাইনা । তোমরাও কি সবাই আমার মত ? আমি যেমন তোমাদের দেখতে পাইনা, তেমনই তোমরাও কি আমাকে দেখতে পাওনা ? তা'হলে আমাকে তোমাদের মত করে দাও না কেন ? মানুষের অসাধ্য নাকি কিছুই নাই ! আমি তো কোন অন্যায় করিনি, তা'হলে আমাকে কেন এত কষ্ট পেতে হচ্ছে । বিধাতারও কি সাধ্য নাই আমাকে তোমাদের মত করে দেবার ? আমি তোমাদের দেখতে চাই. তোমাদের মত হতে চাই, আমি একটা সাধারণ ও স্বাভাবিক ছেলে হতে চাই । তোমরা কি আমার কথা শুনতে পাচ্ছো ?”
ফেসবুকে আরীবের আকুলতা ও আকাঙ্খা পড়ে অষ্ট্রেলিয়া থেকে নানার এক ভাগ্নীজামাই (ডাক্তার) ফোন করল ।আরীবের চিকিৎসা সংক্রান্ত কাগজপত্র মেইল করে পাঠালে কিছু করা যাবে বলে আশা দিল । খুলনার তৃষ্ঞা ও কৃষ্ঞা, যাদের কেউ কোথাও নাই, তাদের আধুনিক চিকিৎসা জুটল, অথচ আরীবকে এ পৃথিবীর অবহেলা সইতে হচ্ছে । তারা অস্ট্রেলিয়াতে উপভোগ করছে তাদের শৈশব, সেখানেই তারা মানুষ হবে । আরীবের জন্য এমন ব্যাবস্থাও করা যেতে পারে বলে সে জানালো । বোকা নানা আশায় বুক বাঁধে । সব ডকুমেন্টস পাঠায় তার ভাগ্নীজামাইয়ের কাছে । আর পাঠায় একটা মেইল --
“স্নেহভাজন স্বপন,
তোমরা ভাল আছো আশা করি । আমি ঠিক জানি না তবে আমার মনে হয় আগেও এ সব ডকুমেন্টস্ পাঠানো হয়েছে । ডাক্তারী বিদ্যা তো জানা নেই, তবু যেগুলো কাজে লাগতে পারে বলে মনে হলো সেগুলো পাঠালাম । এ ছাড়া তেমন আর কিছু নেইও। তোমাকে আবারও আমি বলছি যে, আরীব যে সব অসম্পূর্ণতা নিয়ে এসেছে তা পূরণ করার ক্ষমতা এ পৃথিবীর কোন ডাক্তারের আছে বলে আমি মনে করিনা । আমার ধারণা ওর চোখ, হাত, পা, ফুসফুস, মেরুদন্ড, মস্তিষ্ক এবং অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ যে সব লক্কড় মাল-মসলা দিয়ে তৈরী তা বদল বা মেরামত করা কারো পক্ষে সম্ভব না । অথচ ওকে এ অবস্থায় কোন ক্রমেই ত্যাগ করা যায় না । এমন একটা জীবন্ত জড়বস্তুকে অনির্দিষ্টকাল যথাযথ যত্ন ও সেবা দেওয়াও কারো পক্ষে সম্ভব নয় । এত সময় কারো নেই - আমার সময় আছে কিন্তু শরীর ও মনে এ কাজ করবার মত প্রয়োজনীয় ও যথেষ্ট শক্তি নেই । এক বা একাধিক সাংসারিক জীবন অচল করে দেবার জন্য এমন জড়বস্তু একটিই যথেষ্ট । তাই কোন সংসারে রেখে নয়, কোন উপযুক্ত প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গের সমন্বয়ে সংগঠিত কোন প্রতিষ্ঠান যদি দায়িত্ব নিয়ে ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করতো তা হলে আমি স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারতাম । দেশে হবে না, বিদেশ একমাত্র ভরসা । আমি চাই, সর্বান্তকরণে চাই আরীব দ্রুত সুস্থ-স্বাভাবিক হয়ে উঠুক, আর যদি তা না হয় তবে ওর কষ্ট থেকে ও নিবৃত্তি পেয়ে শান্ত হয়ে যাক । ওর কষ্ট আমি আর সইতে পারি না । দ্রুত আমাকে কিছু জানাবে আশা করি ।
তোমরা ভাল থেকো । -শুভাকাঙ্খী মেজোমামা ।”
অস্ট্রেলিয়া আরীবকে গ্রহণ করবে এমন একটু ক্ষীণ আশা নানার মনে জেগেছিল । কিন্তু ভাগ্নীজামাইয়ের ফির্তি বারতা তাকে হতাশার অন্ধকারে ছুড়ে ফেলে দিল । এবার নানা তার ভাগ্নীজামাইকে লিখলঃ
“স্নেহের স্বপন, তোমার পাঠানো বার্তার প্রথম বাক্যটি পড়ে আশান্বিত হয়ে উঠেছিলাম । সবটুকু পড়া শেষ হলে হতাশায় মনটা ছেয়ে গেল । আরীবের জন্য এ পৃথিবী কি শুধু দুঃখই বরাদ্দ করে রেখেছে ? কি প্রয়োজন ছিল ওর এ দুনিয়ায় আসবার ? কেন সে আর দশটা শিশুর মত স্বাভাবিক হল না ? ওকে কষ্ট দিয়ে বিধাতা (যদি আদৌ থাকে) কোন্ আনন্দের সন্ধান পাচ্ছে ? মহাশক্তিধর তার নিষ্ঠুর শক্তির নমুনা দেখিয়ে কোন সুখে সুখী হচ্ছে ? আমি জানতাম, আরীবের কষ্ট কমবেনা, সে তার জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত শুধু কষ্টই করবে । তার কষ্ট কমাবার ভার নেবার মত কেউই নেই ।
ভাল থেকো । -মামা “
(তিন)
নানার কাছে তার ছোট বোন ই-মেইলে একটা ইংরেজী কবিতা পাঠালো একদিন । যেখানে প্রেমিক তার প্রেমিকাকে খুশী করবার জন্য তার সব কিছু বিলিয়ে দিয়ে অন্ধ হয়ে গিয়েছিল । অন্ধ প্রেমিক তার অন্ধত্বের কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়ে জগৎবাসীদের জন্য দিয়েছিল পরামর্শ, উপদেশ । আরীবের নানা ঐ কবিতা পড়ে নিজের মত করে তার ভাবানুবাদ করেছিল ।
“আমি নিজেকে নিয়ে অনেক ভেবেছি -
ভাবনার তো নেই শেষ.
এখন আমার সব ভাবনা আরীবকে নিয়ে -
আমার চোখ, আমার বাকশক্তি
আমার খাদ্য গ্রহণের ক্ষমতা
আমার সকল সাহচর্য
আমার মর্ত্য, আমার স্বর্গ
আমার কর্মস্পৃহা ও কর্মক্ষমতা
আমার চলৎশক্তি, আমার সকল হাসি আনন্দ
আমি দিতে চাই আরীবকে ।
এমন কেউ কি আছে, আছে কি এমন কোন শক্তি
যে পারে আমার কাছ থেকে এগুলো ছিনিয়ে নিয়ে আরীবকে দিতে ?
আরীবের সব কষ্ট দূর করে , সেগুলোকে আমার করে দিক না কেউ ।
অন্ধ হয়ে যাওয়া ঐ প্রেমিকের মত
আমি কারো জন্য কোন উপদেশ, কোন পরামর্শ দেব না ।
আমাকে তোমরা বিশ্বাস করতে পারো অন্তত এ ব্যাপারে ।”
(চার)
প্রথম আলোর ক্রোড়পত্র ‘ছুটির দিনে’ । এক শনিবারে এশিয়ার নোবেল প্রাইজ বলে পরিচিত পুরস্কারে পুরস্কৃত এ এইচ এম নোমান খানকে নিয়ে প্রচ্ছদ কাহিনী রচিত হলো । বোকা নানা এখানেও আশার আলোর সন্ধানে এগিয়ে গেল । সে চিঠি পাঠালো প্রথম আলোয় ।
“আজ ১৯ সেপ্টেম্বর ২০১০ তারিখে আরীবের বয়স ১ বছর ৮ মাস পূর্ণ হলো ।এই দীর্ঘ সময় সে বিছানায় শুয়ে কাটিয়েছে, কখনও বা কারো কোলে ।এতগুলো দিন চলে গেল এখন পর্যন্ত সে একটা শব্দও উচ্চারণ করতে শিখলো না । দু’হাত বাড়িয়ে সে কোলে উঠবার আবদার করতে পারে না, তার হাতে যে সে শক্তি নাই । তার মেরুদন্ড আর ঘাড় শক্ত হয়নি এখনও, আর তাই সে বসতে পারে না । শোয়া অবস্থায় পা স্বাভাবিক, কিন্তু সে পা এখন পর্যন্ত দাঁড়াবার উপযুক্ত হয়নি । এ বয়সে তার চারবার নিউমোনিয়া হয়েও সে বেঁচে আছে । গত দু’মাস যাবৎ নাকের ভিতর ঢুকানো নল দিয়ে তাকে খাওয়ানো হচ্ছে । মুখ দিয়ে খাবার দিলে তার কিছুটা শ্বাসনালী দিয়ে ফুসফুসে ঢুকে যায়। জন্ম থেকেই শ্বাস কষ্ট, এখন কিছুটা ভাল । আরীবের মাথাটা ছোট, কিন্তু সে বোকা নয় - তার আচরণ থেকে তা ধারণা করা যায় । এ পৃথিবীর অক্সিজেন, খাদ্য সে ভোগ করতে পারছে না । তার জীবন চির অন্ধকারে আচ্ছন্ন – তার সুন্দর দু’টো চোখে এ পৃথিবীর আলো দেখবার সৌভাগ্য নিয়ে আসেনি সে ।
এমন একটা জীবন্ত জড়বস্তুকে কি প্রতিবন্ধী বলা যায় ? এর কি বেঁচে থাকবার কোন প্রয়োজন আছে ? আছে কি একে বাঁচিয়ে রাখবার কোন ব্যবস্থা ? এ এইচ এম নোমান খান এ ধরণের একটা জড় পদার্থ সম্পর্কে কিছু ভাবতে পারেন কি ? এটিকে বাঁচিয়ে রেখে পৃথিবীর কল্যাণে লাগাবার ক্ষমতা বা আগ্রহ কি তাঁর আছে ? বিধাতার নিষ্ঠুরতা আরীবকে জন্ম থেকেই কষ্ট দিয়ে চলেছে । আর কত কষ্ট তাকে পেতে হবে ? এ প্রশ্নের উত্তর কি কারো জানা আছে ?”
নানার জানা ছিল এর কোন উত্তর সে পাবেনা । তবুও নানা উত্তরের প্রতীক্ষায় থাকে ।
চলবে....





তারপর?
তার আর পর নেই, নেই কোন ঠিকানা .................
আগের অংশও পড়ে এলাম। আরীবের জন্য কষ্ট হচ্ছে। কিন্তু বুঝতে পারছি না এর কতটুকু সত্য আর কতটুকু কল্পনা। ট্যাগ আছে ব্লগরব্লগর।
সব মিলিয়ে বর্ণনার ধরন খুব ভালো লেগেছে।
সত্য ঘটনার ট্যাগ কী দিলে ঠিক হত ? একটুও কল্পনা নেই, বরং সত্য সবটুকু লিখবার ব্যার্থতার দায় লেখকের ।
কি কষ্ট! কিছুই বলার নেই। সুষ্টিকর্তা ভালো কিছু করুক।
ধন্যবাদ হুদা ভাই, এর শেষ টা জানতে চাই। কি হল আবীরের। এখন সে কোথায়?
আরীব আছে তার মতই । তবে তার শেষটাতো ভাই এখনও আমার জানা নাই । ঈদের আনন্দের মাঝে নানার এ বোকামী বড্ড বেমানান । তবুও বোকামীর আরো ফিরিস্তি দেওয়া হল ।
বিপদে আপনার মন শান্ত থাকুক এই কামনা
কঁাদছি
কান্না বড্ড বেশী ছোঁয়াচে । দ্রুত সকলকে আক্রান্ত করে । আমাকেও ।
মন্তব্য করুন