ভালো মানুষ
১৯৭০ সাল । ফেব্রুয়ারি বা মার্চ মাস । অনেকদিন পরে দেশে সাধারণ নির্বাচন নিয়ে জোরেসোরে আলোচনা চলছে । কে কোন দলকে বা কেমন প্রার্থীকে ভোট দেবে সর্বত্রই সে আলাপ জোরদার হচ্ছে ক্রমশ । নির্বাচন নিয়ে জল্পনা-কল্পনার ধরাবাঁধা নিয়ম নেই । সাধারণ নির্বাচনের ওয়াদা ইয়াহিয়া খানের ধাপ্পাবাজী কিনা তা নিয়েও নানান কথাবার্তা হচ্ছে । লেখাপড়ার পাট চুকিয়ে গ্রামের বাড়ীতে বেকার জীবন কাটাচ্ছি । লেখাপড়ার চাপ নেই, চিন্তাও নেই । বাড়ীতে খাই, আর সারাদিন বাইরে বাইরে টোটো কোম্পানির ম্যানেজারী করে বেড়াই ।
আমাদের বাড়ীর পাশেই বাজার । সপ্তাহে দুই দিন হাট বসে । আশপাশে ৫-৭ মাইলের মধ্যে এমন বাজার নেই, আর এত বড় হাটও বসেনা । হাটের দিন বাজারের ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী অত্যন্ত ব্যাস্ত দিন কাটায় । যে দিনগুলোতে হাটের হৈহল্লা থাকেনা, সে সব দিনে বসে আড্ডা । নানান ধরণের আড্ডা । তাস বা ক্যারমের আসরও থাকে । তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় আড্ডা বসে বাজারের মাঝখানে বিশাল কদম গাছের নিচে ছোট্ট একটা টং দোকানের সামনে রাখা বাশেঁর মাচায় । এ দোকানটিতে চা, পান, বিড়ি, সিগারেট হচ্ছে প্রধান পণ্য । এ ছাড়া ছেলেমেয়েদের সস্তা খেলনা, টুকটাক মনোহারী সামগ্রী পাওয়া যায় । তবে এ দোকানের প্রধান আকর্ষণ হচ্ছেন দোকানী নিজে । তার রসালো আলোচনা ও মন্তব্য যে কোন আড্ডাকে প্রাণবন্ত করে তোলে । দোকানীকে গ্রাম সম্পর্কে মামা বলে ডাকি, আর মামা বলেই তার অনেক মন্তব্য শুনেও না শুনবার ভান করতে হয় । তবে তিনি কখনোই এমন কোন অশ্লীলতা করেননা যাতে কানে আঙ্গুল দিতে হয়।
এমনই এক আড্ডার আসর বসেছে ঐ মামার দোকানে । সেদিনের আলোচ্য বিষয়ে ঘুরেফিরে বারবার আসছে নির্বচন । নানান জনে নানান মত ব্যক্ত করছে । দোকানী মামা ব্যাস্ত তার দোকানদারী নিয়ে । মাঝেমধ্যে দু’একটা ফোড়ন কাটা ছাড়া আলোচনায় অংশগ্রহণ করে দীর্ঘ বক্তব্য দেবার অবসর নেই তার । আলোচনার বিষয়বস্তু সাধারণ নির্বাচন, স্বাভাবিক ভাবেই কিছুটা গুরুগম্ভীর ভাব চলে এসেছে । এরই মধ্যে বেশ বয়স্ক একজন তার মতামত প্রকাশ করতে যেয়ে বলে বসলেন, “ভোট তো জীবনে অনেকবারই দিয়েছি, কেউ তো তেমন কিছুই করতে পারেনা, আমাদের ভাগ্যের তো কোন উন্নতি হয়না । তাই এবার ভাল মানুষ দেখে ভোট দেব । হুজুররা (জামাত) মানুষ ভাল। এবার তাদের যে ভোটে দাঁড়াবে তাকে ভোটটা দেব ।” জামাতের অনুকুলে ভোট দেবার কথায় কেউ সায় দিলনা, বরং আপত্তির অস্ফুট গুজ্ঞণ, কিন্তু কেউ যুৎসই কোন জবাব দেবার আগেই মুখ খুললেন দোকানী মামা । মামা বললেন, “বেশ ভালই কথা বলেছেন, হুজুররা মানুষ ভাল ! তবে ভাই, তারা যদি মানুষ ভালই হবে, তা’হলে তাদের ছেলেপুলে হয় কেমন করে ?” গূঢ়ার্থ অনুধাবন করে সবাই হো হো করে হেসে উঠল । কোন সিদ্ধান্ত ছাড়াই আড্ডা ভেঙে গেল । আমরা মাত্র কয়েকজন সেখানে ছিলাম, যারা হুজুর না হয়েও তখনও পর্যন্ত ছিলাম ‘ভালো মানুষ’ ।





ভাল্লাগলো। নাজমুল ভাইকে বিশেষ ধইন্যা।
আপনাকে সবিশেষ .....
ভালো মানুষ হবে না কথাটা ?
মজার গল্প।
ভালো হলেই ভাল হয় । দেখি ঠিক করতে পারি কিনা ?
মজারু
মজার। কিন্তু ৭০ সালে কী জামাত ছিল?
ছিল। না হলে ৭১ এ রাজাকারী করছে কেমনে।
দারুন কৈছেন বস। চাঙ্গা হৈছেন নাকী ?

খোঁচা দিলেন নাকি দাদাভাই?
আপেল খাইছিলেন ?
আপেল তো শখত মামায় খায়। আপনে কী খান, ডিম?
একটা গুরু-গম্ভীর গল্প ফেঁদেছি, আর এর মধ্যেও আপেল নিয়ে পেচ্ছাপেচ্ছি লাগিয়ে দিলেন ? আবার ডিমও, কেন ?
হ্যা, জামাতে ইসলামী পাকিস্তান না কি যেন নাম ছিল । ইসলামী ছাত্র সংঘ ছিল, সংঘ পরে শিবির হয় । বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডে এদের অবদানই সবচাইতে বেশী ।
এক্কেবারে অট্টহাস্য !
মজা পাইলাম।

মজা পেয়েছেন জানতে পেরে ধন্য হলাম ।
আপনের ভালো মানুষ আর শখতমামার ভদ্রলোক
এই "ভদ্রলোক"কে খুঁজে পাচ্ছিনা । ঠিকানা প্লিজ !
আফসুস। কোনোটাই হইতে পারলাম না।
আহা রে! মাছুম মানুষদেরও এই হাল !
চুপচাপ পড়ে গেলাম।
উদরাজী, শুধু চুপচাপ পড়ে গেলাম – না ,একটু কইলামও-
৭০ এর রস এখনো রসালোই আছে, নাজমুল ভাই। আপনার দোকানি মামার সুত্রমতে আপনিও ভালমানুষ এক কাতারে পড়েন না।
এতদিনে কি আর রস আছেরে ভাই, জ্বালে জ্বালে গুড় হয়ে গেছে কবেই ।
তখন অর্থাৎ সেই সময়ে 'ভালমানুষ' ছিলাম । অতীতের উপরেই তো বর্তমান ও ভবিষ্যৎ গড়ে ওঠে ।
হে আল্লাহ.. এইসব 'ভালোমানুষ'দের খ্প্পর থেকে তুমি দেশ ও জাতিকে রক্ষা কর।
তাইলে তো দেখি পুলাপান এর বাপ-মা'রা খারাপ। আরো বেশি খারাপ হুজুর রা!
হাহাম (হাসতে হাসতে মরি)!
শুধু এ দেশেই নয়, সব দেশেই, এমন কি আরব দেশেও কত্ত মানুষ যে খারাপ ! খারাপ মানুষরা না থাকলে মনুষ্য জাতির বিলোপ ঘটতো যে । তবে অনেক হুজুরই আছেন, যারা শাব্দিক অর্থেই খারাপ ।
মন্তব্য করুন