মৃতপ্রায় ছুটোছুটি
১.
ঠিক কতদিন পর মনিটরের সামনে বসলাম মনে করতে পারছি না। কীবোর্ডের প্রতিটা কী যেনো আমার কাছে অচেনা। টাইপ করতেও ভুলে গেলাম প্রথম কয়েক সেকেন্ডের জন্য। ধাতস্হ হলাম এই ছোট্ট ল্যাপটপ নামের যন্ত্রটার সামনে। ল্যাপটপটার স্টার্ট বাটনটায় প্রতিদিন একটা করে চাপ দেই। মনিটরের "ওয়েলকাম" লেখাটা আসবার আগেই নেশাগ্রস্হ হয়ে লুটিয়ে পড়ি। কাজ থেকে ছুটে এসে পেট ভরে বোতলের শেষ বিন্দুটা ঢেলে দিয়ে ল্যাপটপটা খুলে শুধু পুরোনো ছবি দেখতে ইচ্ছে করে। দেখা হয় না। সকালে এলার্মে ঘুম ভাঙ্গে, দেখি ল্যাপটপটাও ঘুমিয়ে থাকতো আমার সাথে। কিন্তু আজকে আমি পুরোদস্তুর নেশাহীন ফুরফুরে। নিজেকে মনে হলো আবদ্ধ নেশাময় বৃত্ত থেকে টেনে তুলি, পুরোনো ছবিগুলো দেখতে থাকি। প্রায় সারাটা দিন সব ছবি ভিডিওগুলো দেখলাম। সোনিয়ার হাসিমুখ, অন্তরঙ্গ মুহুর্ত সবকিছু। সোনিয়া বলেছিলো মুছে ফেলতে, মুছতে পারিনি। মুছবো কিনা বুঝতে পারছি না।
জীবনের অদ্ভুত সমীকরন মেলাবার মতো মেধাটা আমার নেই। ছোটবেলা থেকেই গড্ডালিকা প্রবাহের সাথে নিজেকে ভাসাতে চেষ্টা করেছি। যতক্ষন ভেসে চলতাম স্রোত বরাবর, নিজেকে সবচেয়ে সুখী মানুষ হতো। আশেপাশের মানুষগুলো সুখের ভেলায় আকন্ঠ ডুবে থাকতো। যখনি মনে হতো স্রোতের একটু বিপরীতে যাই, অন্য কিছু করি, বৃহৎ কিছু, সমস্যাটা বাধে তখনই। বৃহৎ কিছু হয়, তবে সেই "বৃহৎ" কিছুটা হলো একটা "বৃহৎ সমস্যা"! বুখারী শরীফের স হী হাদিস সমূহের মধ্যে একটি হলো "নিয়তই কর্মফল", যখন বৃহৎ সমস্যা আমার সামনে প্রকান্ড হয়ে দাড়ায় তখন মনে হয় আমার সহী নিয়তে কোথাও গন্ডগোল হয়েছে। সোনিয়া বিয়েতে রাজী হয়েছিলো। আমিও সবকিছু ঠিক করে ফেললাম। ক্রিমিনালভার্কেট অর্থাৎ সুইডীশ জেলখানা থেকে ২ সপ্তাহের ছুটি মন্জ্ঞুরী করলো। সোনিয়া রুমে আসলো, ১ সপ্তাহের মধ্যে পুরো ঘরে আলোময় হয়ে উঠলো। আমি কাজে যেতাম নিদ্রালু চোখে চুমু দিয়ে। এসে দেখতাম পুরো ঘর পরিপাটী আর টেবিল জুরে খাবারের পর খাবার। গ্রীল, কুছমুছ, লাজানিয়া, কাবাব আরও কত কি! ১ সপ্তাহ পর হঠাৎ একদিন ঘরে এসে দেখি সব এলোমেলো, সোনিয়ার হাতে প্যাথেড্রিনের সিরিন্জ্ঞ। হাসপাতালে না নিয়ে উপায় ছিলো না, মুখ দিয়ে ফেনা বের হচ্ছিলো। ভেবেছিলাম ওভারডোজ, হাসপাতালে শুধু একবার জ্ঞান এসেছিলো ৫ মিনিটের জন্য।
"আমি নিতে চাইনি। জোহান এসেছিলো, আমাকে বললো তোমাকে নাকি চোখে চোখে রাখছে। টাকা চাইলো অনেক। আমি সময় চাইলাম, ও বললো ও দেখে নেবে। আমি আর পারলাম না। কেন তুমি আমাকে ছেড়ে গেলে না?"
দু'দিন কোমাতে ছিলো। আর ফিরে আসেনি।পুলিশ জোহানকে খুজে বের করে, ৪ দিনের মাথায় মামলার রায় দিয়ে মালমো ক্রিমিনালভার্কেটে পাঠিয়ে দেয় আগামী ২ বছরের জন্য। এই ৪ দিনে আমি ব্যাস্ত ছিলাম সোনিয়ার অন্ত্যেঃস্টিক্রিয়ায়। সবকিছু দম বন্ধ লাগছিলো। ভাবলাম দেশে চলে আসলে কেমন হয়?
২.
এপ্রিলের ১০ তারিখ। এয়ারপোর্ট থেকে বেরুতেই সারা শরীর ভিজে গেলো প্রায় ১ মিনিটেই। এত দ্রুত ঘামে ভিজিনি কখনো। হাতে কোনো ব্যাগ ছিলো না, এমনকি হ্যান্ড ব্যাগও না। বেশ কিছুক্ষন হাটতে থাকলাম রাস্তা বরাবর। মনে পরে যখন প্রথম প্রথম ঢাকায় চাকুরীর জন্য এভাবে হেটে বেড়াতাম তখন ফার্মগেট থেকে মহাখালী হেটেই চলে গিয়েছিলাম। মহাখালী পৌছে একটা একুয়া মিনারেলের বোতল কিনতাম। অর্ধেক গলায় ঢেলে বাকীটা মাথায়। তারপর আবারও গুলশান ১ বরাবর হাটা ধরতাম। ইন্টারভিউ যখন শুরু হতো তার ঠিক ৪ ঘন্টা আগে রওনা হতাম। সময় মতোই পৌছানো যেতো। পুরো ঢাকা শহর যখন লোকাল বাসের গুপচী কুঠুরীগুলোতে তপ্ত দাবদাহের নীচে সিদ্ধ হতো জীবন্ত, তখন এভাবেই বাউন্ডুলে হয়ে হেটে বেড়াতাম। উদ্ভ্রান্তের মতো একের পর এক ইন্টারভিউ দিতাম, ইন্টারভিউ দিয়ে টিউশনি করাতে ছুটে যেতাম ঢাকার এ কোনা থেকে ও কোনো।
নাহ, হাটতে পারলাম না। সামনে দাড়িয়ে থাকা সিএনজিকে ডেকে উঠে পড়লাম। বাসার গন্তব্য যত এগুচ্ছে তত বুকের ভেতর ধুকধুক বাড়ছে। হঠাৎ মনে হলো কেন ঢাকা আসলাম? কি করবো এখানে এসে?
বাড়িতে কলিং বেল টিপ দিলাম। একবার, দু'বার, তিনবার, বার বার। কোনো সাড়া শব্দ নেই। মোবাইলটা বের করে যেই কল দেবো ওমনি দেখলাম সুইডেনের থ্রে অপারেটরের সাথে বাংলালিংক লেখা। নিশ্চয়ই এখন বিল ওঠার পালা। কি ভেবে দরজায় টোকা দিলাম, অমনি দরজা খুলে গেলো। দেখি সামনে মা দাড়িয়ে। মা আমাকে দেখে চোখ বড় বড় করে ফেললো। অমনি মুখটা খুলে কিছু বলবে আমি মাকে জড়িয়ে ধরে হাউ মাউ করে চিৎকার করতে লাগলাম।
৩.
প্রায় ২ সপ্তাহ কেটে গেলো। বাসায় কারেন্ট থাকে না। শুধু মশা আর বাবা মা। বাড়ির বাইরে বেরুতে পারি না, শুনেছি মহল্লার পরিবেশ সুবিধার না। আমি ভেবে ছিলাম আমার বিরুদ্ধে যে হত্যামামলা আছে সেটা আর জীবিত নেই। বাসার সামনে যদিও পুলিশ নেই, কিন্তু প্রথম যেদিন মহল্লার দোকানে দাড়িয়ে কেনাকাটা করতে লাগলাম তখন কিছু ছেলে পেলে ঘিরে ধরলো।
: ভাই কি এই এলাকায় নতুন আসছেন?
: হুমম।
: কি নাম ভাইয়ের?
: শফিক।
: কোন বাসায় উঠছেন?
: সোবহান সাহেবের দু তলায়।
: আরে ঐ বাসার আন্কেলরে তো চিনি। খুবই ভালো মানুষ। শুনছি উনার ছেলে নাকি বিদেশ থাকে। আপনি কি সেই?
: হুমম।
: ভাই, একটা কথা আছিলো। আপনে দেশ ছাড়ছিলেন কেন?
: দেশ কি ছাড়তে মানা?
: না সেইডা হইবো কেন? আসছেন যখন দেখা সাক্ষাৎ হইবো আবার।
শেষের কথাগুলো বুকে বাজতে লাগলো বারবার। হতে পারে এরা কিছুই জানে না, জানার কথাও না। এই নিয়ে প্রায় ৫ বার বাসা পরিবর্তন করা হয়েছে, অনেক জল গড়িয়েছে এই বুড়িগঙ্গা দিয়ে, এখনও কি আগের খড়কুটো আগের জায়গায় থাকে?
বাসায় এসে কিছু বলিনি। মা সারাদিন রান্না বান্নায় ব্যাস্ত। বাবা এক পা খোড়াতে খোড়াতে বাজারে যায়, দুর্মূল্যের বাজারে ব্যাগ ভর্তি করে বাজার আনে। বাসায় এসে নিজেই বলতে থাকে,"হাসিনার বাবা খাওয়াইছে ৮০ টাকার লবন, এখন ও খাওয়াচ্ছে ১২০ টাকার টমেটো, ৩০০ টাকার মুরগী।"
একদিন মাকে বলেই বসলাম,"আজকে আমি রাঁধবো?"
: তুই রাঁধবি মানে?
: বারে....ওখানে তো আমিই রাধি।
: ওখানে কি হারাম জিনিস রাধিস আর কি খাস, আমার এখনো এতো দুর্দিন হয়নি। তুই রান্নাঘরের সামনে আসবি না।
: ওকে মুরগী কাটছি, দেখো।
এই বলে রান্না ঘরে গেলাম, একটা বড় চাকু নিয়ে মুরগী নিজের মতো কাটতে থাকলাম। মা জায়নামাজ থেকে উঠেই চোখ বড় বড় করে দেখতে লাগলো। পেছনে বাবা। মা শুরু করলো,"দেখো দেখো, করে কি? ঐ অজাত কুজাতের মতো দেশে গিয়ে কিভাবে মুরগী কাটছে। দেখো মুরগীর পা কাটছে না, যেনো ঝাড়ু মারতেছে। হায় আল্লাহ! আজকে না খেয়েই থাকতে হবে!"
বাবা ধমক দিয়ে বললো,"চুপ থাকতো! ও পুরুষ মানুষ, ওর মতোই কাটবে। বাবা, একটু সাবধানে কাটো, আঙ্গুলে যেনো চাকু না লাগে।"
বাবার কথা শেষ হবার আগেই আমার মুরগী সাইজ। পানি দিয়ে বেশ কয়েকবার ধুলাম। এদিকে একটা কড়াই চড়ালাম গ্যাসের চুলায়।
: একি? মুরগী ধোয়া শেষ? ছিঃ ছিঃ এইটা হারাম। বাবা, আরেকটু ভালো করে ধুয়ে নাও। রক্ত হারাম।
: মা....মুরগীতে আর রক্ত নেই। চিপড়ানোর পর আর যা থাকে ওটা আরেকবার ধুয়ে নিলেই হবে।
এদিকে কড়াই গরম হয়ে গেছে। তেল ঢেলে পেয়াজ কাটতে লাগলাম চাকু দিয়ে। মা শুরু করলেন এবার বকা। কান ধরে বললেন,"তোমার এসব কিছু চলবে না। সুইডেনের রান্না সুইডেনে রাধো, আমি যতদিন বেচে আছি, আমার ছেলে আমার মতো থাকবি।"
বাবা অবস্হা বেগতিক দেখে মাকে ধরে নিয়ে গেলেন। পুরো ঘর যেনো কুরুক্ষেত্র। আধা ঘন্টায় আমার রান্না শেষ। এদিকে মা চুপচাপ মুখ কালো করে বসে আছে। বাবা আমার রান্না দেখছে আর তরকারির ওপর থাকা ঝোল চামচে নিয়ে বার বার লবন টেস্ট করছে। প্রথম বার চামচ থেকে ঝোল উঠিয়ে বললো,"ঝালটা ঠিক আছে, হলুদ একটু কম হইছে। তবে আদাটার স্বাদ পাচ্ছি। আচ্ছা এবার লবনটা চেক করি। (আরেকবার চামচে একটু ঝোল উঠিয়ে ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করলেন, তারপর সুড়ুৎ করে টান দিয়ে চোখটা বন্ধ করলেন) লবনটা কম কিন্তু সমস্যা নাই। লবনটা আরো মেলবে। আরেকটু এখনি দেয়া যায়। একটু দাড়া, আমি একটা বাটিতে করি তোর মাকে দিয়ে আসি। দেখি কি বলে?"
: মনে হয় না সে মুখে দিবে। গাল ফুলিয়ে খালেদা জিয়া হয়ে আছে।
: আরে ধ্যুৎ! সে তাজ্জুব বনে গেছে।
এই বলে তরকারীতে লবন ছিটিয়ে নিয়ে গেলো বাটিতে করে। আমিও গেলাম পিছে পিছে। মা হাতে তছবি নিয়ে বসে ছিলেন। আমাদের আসতে দেখে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।বাবা মা এর সামনে তরকারীর বাটিটা রেখে বললেন
: এই মহিলা, একটু টেস্ট করো। খারাপ হয় নাই।
মা ঘুরে বাটিটার দিকে তাকালেন,"ইস...তেলে চপ চপ করছে। মরিচ মনে হয় সব দিয়ে ফেলছে।"
চামচে একটু ঝোল নিয়ে ফুঁ দিলেন আস্তে করে, তারপর বিড় বিড় করে "বিসমিল্লাহ" পড়ে চুমুক দিলেন। ভ্রূ কুচকে মুখ নাড়তে থাকলেন। এর পর আরেক চামচ....."ভাত রাধো নাই? তরকারী খাবো কি দিয়ে? রান্নাঘর থেকে একটা দিনও ছুটি পেলাম না!"
আমি মুখ ভর্তি হাসি দিয়ে বললাম,"থাক আর উঠতে হবে না। আমি খিচুড়ি এখনি চড়িয়ে আসতেছি!"
আমি রান্নাঘরে যেতে যেতে শুনলাম,"মুরগীটা কসানোর সময় জালটা কমায়া একটু বেশী করে কসানোর সময় লবনটা দিলে গোস্তের ভেতরে ঢুকে যায়। বাকী সব ঠিক আছে!"
সেদিন আমরা খুব মজা করে খেলাম, খাওয়া শেষে মা বলে উঠলো," যখন সব মা তার ছেলের বৌ এর হাতের রান্না খায় তখন আমি খাই আমার ছেলের হাতের রান্না, এই দুঃখটাই আমার গেলো না।"
কান্নাটা নিঃশব্দে কাঁদলেও হাহাকারটা ছিলো গগনবিদারী। তার দু'দিন পর সুইডেনে ব্যাক করি আমি।





কোনও এক দিনে আমাকে একজন মানুষ বলেছিল- জীবন ঘটনাবহুল হওয়াই কাম্য। লেখাটার ভিতরে একটা চেপে রাখা বিষাদ আছে। ভালো থাকুন।
ধন্যবাদ! আপনিও ভালো থাকুন!
পারিবারিক খুনসুঁটিটা ভাল লাগছে তবে গল্পটা এত বিষাদে ভরা কেন?
জীবনের এই রহস্য সমাধান আমার দ্বারা সম্ভব নয়
আপনার দেখা পেয়ে ভাল লাগলো। চিনতিত ছিলাম কোথায় হারালেন ---- খুব ভাল হলো দেশে ঘুরে এলেন, সুনদর কিছু সময় কাটিয়ে এলেন
আমাকে নিয়ে চিন্তিত থাকে এটাও একটা চিন্তার বিষয়। বেচে আছি এটাই হলো এখন একটা বিরক্তিকর ব্যাপার ইদানিং
দেশে ওয়েলকাম। দিন ভালো যাক। আপনার লেখায় যে বিষাদের ছায়া থাকে তাতে বারবার মুগ্ধ হই!
ধন্যবাদ। বেশ কিছু দিন ধরে উদ্ভ্রান্তের মতো দিনাতিপাত করছি। আপনার লেখাগুলোও পড়া হয় নি, তবে প্রতিটা লাইনে লাইনে আপনি যে মুগ্ধতার সওদাগরী করেন সেটা কিন্তু অবশ্যই বলা দরকার!
দিন ভালো যাক, মন ভালো থাক।
আর ডুপ দিয়েন না।মিস ইউ..
ডুবে যাওয়া মানুষকে টেনে তোলা সম্ভব না। যে ডুবতে চায় তাকে ডুবতেই দেয়া উচিত।
ধন্যবাদ!
মন্তব্য করুন