স্বর্নালী দ্বীনতা
১.
বৃষ্টির ফোটায় ডানা ভারী হয়ে গেলো পাখি মাটিতে নেমে আসে। ক্লান্ত হয়ে এবেলা বৃষ্টিতে ভিজেই ফেলে। একটু জিড়িয়ে আবারও উড়াল দেয়, যদি একটা আশ্রয় খুজে পাওয়া যায়। পাখিরা নাকি আগে ভাগে বুঝতে পারে কখন ঝড় হবে, বৃষ্টিরা ভেজাবে জনপদ। তবু পাখি দু'একটা ঠিক ধরতে পারে না, অসহায় হয়ে পড়ে নিজের বোকামীর কাছে। হতে পারে মনটা একটু আনমনা ছিলো অথবা বিক্ষিপ্ত।
কালচে পাথুরে মাটির দেশের মানুষগুলোর নাকি মন বলতে কিছু নেই। বাইরে এত সুন্দর বৃষ্টি হচ্ছে তাতে কেউ দু'হাত মেলে দাড়াচ্ছে না, আকাশে মুখ তুলে চোখ বন্ধ করে বৃষ্টির গান শুনছে। সবাই দৌড়ে আশ্রয় খুজছে, নতুবা ভারী ডানায় মাটিতে আছড়ে পড়বে। যান্ত্রিকতা না যতটা আবেগ কেড়ে নেয় তার চেয়ে বেশি মনকে ধ্বংস করে অর্থনীতি। যদি অর্থনীতি ভালো হয়, মন খুলে মনের মানুষকে ভালোবাসা যায়, সিক্ত হ্রদয়ে পৃথিবীর রূপ দেখতে বোহেমিয়ান হয়ে প্রকৃতির মাঝে সঁপে দেয়া যায়। হায়রে অর্থনীতি! এই অর্থনীতির মারপ্যাচে প্রধানমন্ত্রিকে ৬ মাসের মধ্যে যেচে পদত্যাগ করতে হয়। এত অনুরোধ সত্বেও পুরো সরকার পথে নামে। যদিও জন গনের তাতে কিছু যায় আসে না। এত সুন্দর বৃষ্টি অথবা রুপালী মায়ার পূর্নিমাকে পেছনে ফেলে এরা ছুটতে থাকে কাজের পিছে। কাজের কাছে ভালোবাসা, মায়া, মোহ, রূপ সব যেন তুচ্ছ।
কাঁচের বিশাল এক খাঁচার মত অরলান্ডা এয়ার পোর্ট। শুধু অপেক্ষা কখন মাইমুনা তার লাগেজ খুজতে ইমিগ্রেশন পেরোবে!
২.
একটা সংসারে কি কি লাগবে এটার সঠিক কোনো মান নির্ধারিত করা নেই। তাই বলা যায় এরা চাহিদারও শেষ নেই। ধরা যাক ঝাড়ু চারটা আর ঘর মোছার মপ্পা ৬ টা দেখেও মন ভরে না অথচ ধনিয়া আর জিরা মশল্লা কেন রাঁধুনি না প্রান না কিনে ইন্ডিয়ার টিআরএস মশল্লা কেনা হলো অথবা এক কেজি কাঁচা মরিচ কেনার পর কেন তাতে ঝাল নেই, এটা নিয়ে গাল ফুলিয়ে বসে থাকা। অথবা এই সময়ে প্রায় সবকিছুতে এলার্জী থাকা সত্বেওগরুর পুরো ৫ কেজি গোস্ত ভিজিয়ে দেয়া আর সেটা নিয়ে পরে ঝগড়া হওয়া কেন তাকে আগেই বলা হলো না।
তবে এটা সত্যি মেয়েদের অন্তঃসত্বা হওয়া ব্যাপারটা যে কত বিশাল একটা ব্যাপার সেটা আগে ধারনা ছিলো না। পাশের বাড়ির ডায়ানা সেগুলো এসে খুব সুন্দর ইংলিশে বুঝিয়ে দিলো। ডায়ানা চলে যাওয়ার পর:
: এই মেয়েটার সাথেও শুয়েছো?
: (কোনো উত্তর নেই)
: কতবার শুয়েছো?
: (জানালা দিয়ে দেখার চেষ্টা করছি পাশের বিল্ডিং এর ছাদে কি টুইটি বসে আছে?)
: এরকম বুক খোলা সাদা ডাইনীদের বুকের দিকে এখনো তাকাবা?
: আমি তো ওখানে দেখছি না। হঠাৎ....চো----খ----প----ড়ে----
: থাক আর বলতে হবে না। বাসা ভর্তি ডাইপার এনেছো কেন? বাচ্চার আরও দু মাস, এখন ডাইপার ফিডার দিয়ে কি করবো?
: এডভান্স কিনে ফেলেছি যাতে ডেলিভারীর সাথে সাথেই কাজে লাগাতে পারি।
: ইসসস.....মেয়েদের কাপড়.....
মুখ দিয়ে যা বলতে থাকলো মনে হলো ধরনী দ্বীধা হও, আমি সেঁটে যাই। তবু মিটিমিটি হাসছি। মাইমুনা আসার আগে একদিন রাতে মাকে ফোন দিলাম।
: ঘুমাও নাই?
: ঘুমাবো কেন? ঘড়ি নাই? বেলা বাজে সকাল ১০ টা।
: ওহহহ....আমি ভেবেছিলাম ঢাকাতেও ৫ টা বাজে।
: তুই বলে আবারও গেলা শুরু করেছিস?
: কি যে বল! এসব ছুয়েও দেখি না।
: (ওপাশ থেকে কান্নার শব্দ) তোর বাবা বেচে থাকলে তাকেও কাঁদাতি। তুই এরকম হইলি কেন? সবই আমার কপাল। পোলা একটা পেটে ধরলাম কিন্তু নিজ হাতে খাওয়াইতে পারলাম না।
: কান্নাকাটি থামাও প্লিজ। মাইমুনার কথা বলো।
: তুই কি মনে করিস আমি তোর জন্য কাঁদি? মাইমুনার এই অবস্হায় তোর কাছে যাচ্ছে এয়ার পোর্টে কি হবে সেটা তো চিন্তাই করতে পারি না। আর তোর মতো হারামী আমার পেটে থেকে কেমনে বেরুলো। মেয়েটা কালও কানলো, বললো এখনও তুই নাকি নষ্টা মেয়েদের পেছনে ঘুরে বেরাস?
: মা, তোমার মাথা ছুয়ে বলছি....
: খবরদার মিথ্যুক! মাইমুনার যদি কিছু হয় তাহলে মরা মুখ দেখবি আমার। তোর বাবার কাছে কি জবাব দেবো?
আসলেই কোনো জবাব ছিলো না। মা বলতো সে যখন পেটে ধরেছিলো আমায় তখন তার কষ্ট হয়েছিলো খুব বেশি। একটু হাটা চলা করলেই আমি নাকি পেটে লাথী দিতাম। মা নাকি তখন প্রচন্ড ব্যাথায় কাপুনি দিয়ে বসে পড়তো মাটিতে। বাবা যখন বাসায় ফিরতেন তার পা মালিশ করে দিতেন। মাথায় পট্টি দিতেন। বিছানার জাজিম ডাবল করে দিতেন। ভাবতে অবাক লাগে বাবার মতো একজন গম্ভীর মানুষ এরকম করেছিলো? মা এর নাকি যা খেতো তাই বমি করে দিতো, যা খুব পছন্দের আমি পেটে আসার পর তা পাল্টে গেলো। রুচিতে আমূল পরিবর্তন হলো। এলার্জী, শরীর ব্যাথা আরও কত কি! মাইমুনারও একই কাহিনী।
ঝগড়া করতে করতে হঠাৎ করে চোখ বন্ধ করে কোমড়ে হাত দিয়ে মাটিতে বসে পড়লো। আমি দৌড়ে ওকে ধরলাম। ধরে নিয়ে বিছানায় শোয়ালাম। ওর পায়ের কাছে বসলাম। চোখটা টলমল, কেন যেনো মনে হচ্ছে বাবার আত্মা আমাকে ভর করছে। আমি যেন দেখতে পাচ্ছি, আমার মা এভাবেই শুয়ে ছিলো, আর বাবা ঠিক এখানেই বসে পা টিপে দিচ্ছে।
মাইমুনা ব্যাথায় কোকাচ্ছিলো, ওর পা ধরতেই হুট করে উঠে বসলো,"আরে করে কি পাগল? পা ধরছো কেন? মাফ চাইছো কিসের জন্য?"
আমি হা হা হা করে হেসে ফেললাম। আমার হাসি যেন আমি নিজেই আটকাতে পারছি না। মাইমুনা কিছুক্ষন হতভম্ব হয়ে দেখলো, তারপর সেও হেসে দিলো। আমি হাসি থামিয়ে বললাম,"আরে আমি তোমার পা টিপে দিতে চাচ্ছিলাম!"
মাইমুনা হাসি থামিয়ে বললো,"আশ্চর্য্য! ব্যাথা আমার পেটের নীচে থেকে পুরো কোমড়ে আর উনি আমার পা টিপবে। আমি কি বাতের রোগী?"
: আমি কিভাবে জানবো? আমার কি বাপ হওয়ার অভিজ্ঞতা আছে?
কথাটা বলেই ধাক্কা খেলাম। মনের কোনে ধামাচাপা দেয়া একটা পুরোনো ছবি মনে পড়লো: সোনিয়া। তখন সোনিয়া জেলে ছিলো, ৩ মাস ছিলো বয়স ওর পেটে।
জীবনের হিসাবটা একটু অদ্ভুত, সে প্রতি পড়তে পড়তে বুঝিয়ে দেয় দিন শেষে সেই ক্ষমতাবান আর আমরা তার কাছে নিতান্ত নাদান। আমাদের জীবন থেকে যা চলে যায় তা ফিরে আসে কিন্তু অদ্ভুত রুপে। ভালো হলে আরও ভালো আর যদি মন্দ হয় তাহলে ধ্বংস ফিরিয়ে দেয়। জীবনের এই চক্র এক জীবদ্দশায় আমরা ভাংতে পারি না, হয়তো নতুন একটা জীবন পেলে চেষ্টা করে দেখা যেত পারে। কিন্তু সেই সুযোগ তো আর আসে না।
ছোটবেলায় শুনতাম ভূত প্রেত, দুষ্ট আত্মা, কখনো চোখে পড়েনি। মাঝে মাঝে মনে হয় ভূত হয়েও যদি প্রিয়জনের আশে পাশে কিছু দিন থাকা যায়, যদি তাদের সাথে কোনোভাবে ভয় দেখিয়েও যোগাযোগ করা যায়, মন্দ কি তাতে!





মাঝে মাঝে মনে হয় ভূত হয়েও যদি প্রিয়জনের আশে পাশে কিছু দিন থাকা যায়, যদি তাদের সাথে কোনোভাবে ভয় দেখিয়েও যোগাযোগ করা যায়, মন্দ কি তাতে!

ধন্যবাদ
বিষাদ ছোঁয়া লেখা ভালো লাগলো। দিন ভালো যাক, ভালবাসায়।
ধন্যবাদ
মন্তব্য করুন