ইউজার লগইন

পংকিল মুখবন্ধ

চোখের ঘষাকাঁচে তাকিয়ে থাকা বৃদ্ধলোকটা খুব কাছ থেকে ফুলের রংটা বোঝার চেষ্টা করছে। ভ্রু কুঁচকে ডানে বায়ে কাঁত হয়ে বোঝার চেষ্টা করছে ফুলটা কি হতে পারে! পাশের পিংক কালারের ফ্রক পড়া মেয়েটির সেখানে মনোযোগ নেই। সে ছুটে চলেছে উড়ে যাওয়া প্রজাপতির ধরতে। বুড়োটা রণেভঙ্গ দিয়ে তাকিয়ে দেখে আশেপাশে নেই মেয়েটি। উদ্ভ্রান্তের মতো "সামারা" "সামারা" বলে ডাকতে শুরু করলো। তার এলোমেলো হাটা দেখে আশেপাশের বোরখা ঢাকা এক সোমালীয়ান মহিলা এগিয়ে এলো। মেয়েটির নাম জেনে সেও ডাকতে শুরু করলো। আস্তে আস্তে পার্কের সবার মুখেই এক নাম। কিছুক্ষন পর পুলিশ এলো, মেয়েটিকে খুজে বের করলো। মেয়েটিকে জড়িয়ে ধরে বৃদ্ধ লোকটি পাগলের মতো কাঁদছে। তার পাশে দাড়িয়ে আছে অফিস ফেরত মা বাবা। তারাও দাড়িয়ে দাড়িয়ে কাদছে। মেয়েটি অপরাধীর মতো মুখ করে কি যেনো বলছে। তাতে কারো ভ্রুক্ষেপ নেই।

এরকম দু'চারটা মাঝে মাঝেই চোখে পড়ে। পার্কটা অপয়া। এত সুন্দর পার্কটা, ছবির মতো দেখতে। বসন্ত যাই যাই করছে, গাছের কুড়িগুলো খিলখিলিয়ে বড় হচ্ছে। চারিদিকে সবুজের ছোয়া লেগেছে। পার্কটা যেনো ষোড়শীর রূপ ফিরে পাচ্ছে। তবু পার্কটা অপয়া। প্রতি সপ্তাহেই কেউ না কেউ হারায়, তাকে ফিরেও পাওয়া যায়। সমস্যাটা হলো শিশুরা হারিয়ে যাওয়া। আগে পুলিশের গাড়ী গোটা তল্লাটে দেখা যেতো না। এখন ছুটির দিন পুলিশের গাড়ি, উংদমভার্ডের লোকজন ঘুরাঘুরি করে। তবুও শিশুরা হারিয়ে যাচ্ছে। পুলিশের গাড়ি দেখে সবাই যেনো ভয় না পায় সেজন্য পুলিশ সদস্যরা গল্প জুড়ে দেয়, বৃদ্ধ-বৃদ্ধাদের এটা ওটা এগিয়ে দেয়। তবুও পার্কটা অপয়া, এতকিছুর পরও শুধু শিশুরাই পথ হারায়।

একদিন দু'দিন না, টানা দু সপ্তাহ পার্কের আনাচে কানাচে ঘুরলাম। পার্কটা বিশাল বড়, দুটো পাহাড়,বিশাল পাইন আর ম্যাপলের জঙ্গল তার পাশে বিস্তীর্ন সবুজ মাঠ, ওপাশেই শিশুদের বিশাল স্কুল। স্কুলের সাথে ছোটো একটা পার্ক, শিশুদের দোলনা, স্লিপ খাওয়ার বিশাল জিগজাগ স্লিপার, টেবিল টেনিস, ফুটবল ভলিবলের মাঠ, ইনডোর এথলেটিক্সের জায়গা। প্রায় সারাটা দিন কাউকে না কাউকে পার্কে পাওয়া যায়, শরীর সচেতন সুইডিশরা কেউ জগিং করছে, কেউ পার্কের বেঞ্চে বসে সিগারেট টানছে, চুমুতে ভরিয়ে দিচ্ছে প্রেমিকার ঠোট। এত নিখুত পরিসর নিয়ে গড়া ওঠা মনোরম পার্কটায় তবু শিশুরা হারিয়ে যায়। বলা বাহুল্য, আমার মতো বঙ্গজপুঙ্গব এর রহস্য উদঘাটনে ব্যার্থ হলো। আমি মনোনিবেশ করলাম নিজের কাজে। মাথা থেকে এই পার্ক ব্যাপারটাই ঝেড়ে ফেললাম।

প্রতিদিন ১২ টা-৮ টা কাজ, উইকেন্ডে কখনো কখনো লেট নাইট কাজ, ওভার টাইম। এসব নিয়েই দিন গুলো দিব্যি চলে যাচ্ছে। আমার ছোট ঘরটা নিজের কাছেই একটা বাক্সের মতোই মনে হয়, নিজেকে একটা বাক্স বন্দী ইদূর মনে হয় বৈকি। সোনিয়া বা মোনামীর স্মৃতি বলতে কিছুই নেই ঘরে। নিজের সন্তান আকবরকে চাইল্ড সার্ভিস নিয়ে গেছে। বুকে তবু কোনো শূন্যতা নেই।

আজ ১লা মে সকালে উঠেই মনে হলো চার্চে যাবো। সোনিয়া চার্চে যেতো। মোনামী ধর্মে কর্মে খুব একটা মন দিতো না। বর্তমানে আমাদের দেশ দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে: আস্তিক আর নাস্তিক। আগে দুটো ভাগে ভাগ ছিলো: নারী আর পুরুষ। নারী পুরুষের বিভাজনের থেকে আস্তিক নাস্তিক বিভাজন একটু কম খারাপ। সে যাই হোক, মোনামীকে আমি ঠিক কোনভাগে ফেলবো সেটা আমি কোনো দিন বুঝতে পারিনি। তাকে ইসলামিক বা ধর্মীয় কোনো ব্যাপার নিয়ে কোনো বিকার দেখিনি। মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করলে বলতো শিরকা গিয়েছিলাম। এখানে যেকোনো ধর্মীয় উপসনালয়কে শিরকা বলে। ও কখনোই বলতো না কোন শিরকায় গিয়েছিলো। আমরা তখন যে এলাকায় থাকতাম সেখানে কোনো ইসলামিক শিরকা ছিলো না, ছিলো জিহোবাস শিরকা। আমি ঠিক জানি না এই শিরকার অনুসারী কারা। শিরকার ভেতর আমি কাউকে যেতে দেখিনি বা বের হতেও দেখিনি তবে তার পার্কিং লটে ফেরারী, মার্সিডিজ, বিএমডব্লিউর মতো লেটেস্ট মডেলের বিদেশী কোম্পানীর গাড়ি (সুইডেনে নিজেদের ব্রান্ড ভলভো স্ক্যানিয়া) পার্ক করা থাকতো সব সময়।

আমি চার্চে ঢুকেই দেখি কিছু শিশু সারা চার্চময় হেটে বেড়াচ্ছে আরেকজন পুরো কমপ্লিট স্যুট পড়ে সবার সাথে কথা বলছে। বাকি লোকজনের বেশীরভাগ বৃদ্ধ বৃদ্ধা। বোঝাই যাচ্ছে দাদা দাদীরা তাদের নাতি নাতনীদের নিয়ে চার্চে এসেছে। আমাকে ঢুকতে দেখে চার্চের ঐ কমপ্লিট স্যুটা পড়া ভদ্রলোক সহাস্যে আমার দিকে এগিয়ে এসে সুইডিশে শুভেচ্ছা জানালেন,"তো ইয়ং ম্যান, আপনার নামটা জানতে পারি?"
আমার নাম শুনে একটু কপাল কুচকালেন, পরক্ষনেই তা মিলিয়ে গিয়ে পুরোনো হাসি হেসে বললেন,"ঈশ্বরের দরজা সবার জন্যই খোলা, তার রহমত সবার জন্যই বর্ষিত হয়।" আমাকে দুপুরের লাঞ্চ করার নিমন্ত্রনও জানালেন। সে এক বিশাল আয়োজন। শিশুরা খাবারের টেবিলে বসে চুপচাপ প্রার্থনায় মনোযোগ দিলো। আমার ঠিক জানা ছিলো না যে সুইডেনের মানুষজন এতটা আস্তিক কবে থেকে যে তাদের শিশুদেরকেও প্রার্থনা কিভাবে করতে হয় সেটা শেখাবে। খাবারের টেবিল ভর্তি খাবার। প্রতিটা প্লেটে সুইডিশে লেখা,"খাবার যেন নস্ট না হয়, বেচে যাওয়া খাবার সিরিয়ান শরনার্থীদের জন্য পাঠানো হবে।"

খাবারের আগে ওদের প্রার্থনায় অংশগ্রহন করলাম। লাঞ্চের পর্ব শেষ করে পাদ্রী সাহেব এগিয়ে আসলেন,"তোমার জন্য কিছু করতে পারি?"
: অবশ্যই। আমি খুব একটা ধার্মিক নই, আমি নিজেও জানি না আমি ঈশ্বরে বিশ্বাসী কি না।আমি একজনকে খুব ভালোবাসতাম। সে এখন আর বেচে নেই।সে ক্যাথলিকে বিশ্বাস করতো। ইদানিং আমি তার অস্তিত্ব আমার আশেপাশে অনুভব করছি।

পাদ্রীর হাসি মুখ থেকে উবে গেলো। আমাকে একটা বাইবেল উপহার দিলো। বললো প্রতি রবিবার আমি যেনো ওনার সাথে দেখা করি। আর প্রতিদিন যখন মন চাইবে চার্চে এসে জোনাথনের খোজ করি। জোনাথন কয়ারের দায়িত্বে আছে। মাঝে মাঝে সে কনফেশনের দায়িত্বেও থাকে। আমি বাইবেলটা হাতে নিয়ে বেরিয়ে পড়ি। পার্কে ঢুকেই দেখি সেই একই চিত্র, পুলিশ আর উংদমভার্ডের লোকজন "সামান্থা" নামে কাউকে খুজে চলেছে। আমিও তাদের ভীড়ে মিশে গেলাম। পুরো বিকালটা ওদের সাথেই দৌড়ালাম। আশ্চর্য্যজনক ব্যাপার হলো সামান্থাকে খুজে পাওয়া যায়নি তখনো পর্যন্ত। হারিয়ে যাওয়া কাউকে খুজে পাওয়া যাচ্ছে না এরকম প্রথম হলো। পার্কে সবাই তাবু করে টানিয়ে ফেলছে। আমি বেশ কিছু টর্চ লাইট কিনে দিলাম। এক বৃদ্ধা আমার হাতের বাইবেলটা দেখে কেঁদে ফেললো। আমাকে পাশে বসিয়ে বাইবেল পড়া শুরু করলো। কিছুক্ষন বাইবেলের বানী শুনে মনে হলো কথা গুলো এমনভাবে লেখা হয়েছে যেকোনো পরিস্থিতিতেই এসব কথা যেন খাটে। যিনি বাইবেলটা লিখেছেন (ঈশ্বর বলে যদি কিছু নাই থাকে) তিনি খুব হতাশাগ্রস্থ ব্যার্থ মানুষ ছিলেন। তার শেষ জীবনের বেশীর ভাগ সময় কেটে যেতো পুরোনো দিনের স্মৃতি রোমন্থনে। সে ভাবতে ভালোবাসতেন আদর্শ আর নৈতিকতাবোধ দিয়ে তার জীবনের ব্যার্থতা গুলো কিভাবে শোধরানো যেতো। সেগুলো নিয়েই এই পুরো বাইবেল লিখে ফেলেছেন। এমনভাবে লিখেছেন যে এসব ঘটনাগুলো সবার জীবনের উত্থান পতনের সাথে মিলে যায়।

আমি উঠে চলে আসলাম রুমে। বেশ ক্লান্ত লাগছিলো। রুমটা পুরো অন্ধকার। আমি জুতো খুলতেই মনে হলো রুমে কে যেনো বসে আছে। সেই পরিচিত ল্যাভেন্ডারের সুবাস। আমার কাছে কোনো ল্যাভেন্ডারের সেন্ট নেই। সোনিয়া মারা যাবার পর ল্যাভেন্ডার কখনো কিনিনি। অন্ধকার রুমে সোজা দাড়িয়ে থাকি। ভাবতে চেষ্টা করি ল্যাভেন্ডার মাখা মেয়েটা যেখানেই বসে আছে সেখানেই বসে থাকুক,"কে রুমে?"
কিন্নরী আওয়াজের হাসির কন্ঠ শুনতে পেলাম....আমি যেনো নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না। আমি আধারেই একটা চেয়ার টেনে বসলাম শান্ত হয়ে। আমি ঘামছি। আর অন্য কোনো অশরীরির গভীর নিঃশ্বাসের শব্দ শুনছি।আমার বুকের স্পন্দন বেড়েই চলেছে।
: সোনিয়া তুমি? তুমি এখানে?
অশরীরির নিঃশ্বাসের ওঠানামায় বুঝতে পারলাম সে মাথা নাড়ছে।
: তুমি.....তুমি কেমন আছো?
: ভালো। তুমি চার্চে গিয়েছিলে কেন?
: আমি চার্চে গিয়েছি....তোমার দেশের অনেক মানুষ এখানে আশ্রয় নিয়েছে, ওদের জন্য টাকা দিতে গিয়েছিলাম।
: সামান্থাকে খুজে পাচ্ছো না?
: তুমি জানো সামান্থা কোথায়?

হঠাৎ ঘর থেকে শ্বাস প্রশ্বাসের শব্দটা চলে গেলো। আর আমি ওখানেই বসে থাকলাম। আমি ঠিক কতক্ষন বসেছিলাম, যতক্ষন বসেছিলাম আমার জ্ঞান ছিলো কি ছিলো না, ঠিক মনে নেই। মোবাইলের কলে আমি সম্বিৎ ফিরে পেলাম। রুমের লাইটটা জ্বালিয়েই দেখি রুমটা পুরো ফাঁকা। কেন যেন মনে হলো সামান্থা কোথায় আছে আমি জানি। আমি দরজা খুলে দৌড়ে চলে গেলাম পার্কের পশ্চিম দিকে। ওখানে স্কুলের ইনডোর স্টেডিয়ামটা। ছোট্ট টিলার চূড়া থেকে ইনডোর জিমন্যাশিয়াম শুরু, শেষ হয়েছে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে। ওখানে ছোট্ট একটা দরজা আছে, তার পাশে বিশাল একটা ভ্যান্টিলেশনের ঢাকনা। আমি ঢাকনাটা টানতেই খুলে গেলো। আমাকে দেখে দু জন পুলিশ এসে লাইট মারলো। আমি বললাম আমি ভেতরে ঢুকবো। পুলিশের একজন তার বুলেট প্রুফ জ্যাকেট আর অন্যান্য গেজেট খুলে বললো আমিও আসছি তোমার পিছে। হাতে ধরিয়ে দিলো হ্যালোজেন টর্চ।

আমি লাইট টা হাতে নিয়ে ঢুকে গেলাম। ঢুকে আমার চক্ষু ছানাবড়া। ভেতরে বিশাল পরিস্কার জায়গা। অনেক খেলনা, পুতুল ছড়িয়ে আছে। টানেল শেষ হতেই বিশাল একটা রুম। সেখানে আছে একটা সোফা। সোফায় শুয়ে আছে একটা স্বর্নকেশী মেয়ে। আমি ঢুকে সাথে সাথে কোলে নিয়ে চিৎকার করলাম,"সামান্থাকে পেয়েছি!" আমার পিছে পিছে আসা পুলিশটাও রুমে ঢুকে গেছে। সে তার ওয়াকিটকিতে জানিয়ে দিলো সামান্থাকে পাওয়া গেছে, মেডিক্যাল এসিস্ট্যান্ট যেনো পাঠানো হয়।

সামান্থাকে জ্ঞান ফেরাবার জন্য পুলিশটা মুখে শ্বাস দিয়ে দুএকবার বুকে চাপ দিলো। সামান্থার জ্ঞান ফিরলো। সামান্থাকে দ্রুত বের করে নিয়েই এম্বুলেন্সে উঠিয়ে দেই। পরে জানতে পারলাম সামান্থার এজমা ছিলো। ওখানে গিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়। চারিদিকে আনন্দের রোল পড়ে গেলো। আমাকে সন্দেহ করার বদলে ওর বাবা মা আমাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদলো। পুলিশসহ বাকি সবাই প্রচুর ছবি তুললো আমার সাথে। স্কুলের প্রায় সব টিচাররাই ছিলো তারা বললো খুব দ্রুত ওখানটা রেনোভেট করবে।

১ ঘন্টার মধ্যে সব কিছু দ্রুত ঘটে গেলো। ঘোর লাগা নিয়ে ঘরে ফিরতেই মনে হলো, আমি কিভাবে জানলাম সামান্থা ঠিক ওখানেই থাকবে?

পোস্টটি ৮ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

দূরতম গর্জন's picture

নিজের সম্পর্কে

মহাশূন্যের গুন গুন শুনতে চাই, কান পেতে রই তারাদের আহ্বানে। দূরতম গর্জন যখন সৈকতে আছড়ে পড়ে, আমি পা ফেলে উপভোগ করি সাগরের কূর্ণিশ। মানুষ হয়ে জন্মাবার অহংকারই শুধু বিদ্যমান, অথচ নিত্য বেচে আছি তেলাপোকার শৌর্য্যে!