দ্রূতগামী অতীত
কেউ ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো জমিয়ে রাখে না। ডায়েরীর মতো মূল্যবান নয় বলেই, তবে যারা ডায়েরী লেখে না, তারাও কি জমিয়ে রাখে? আমাদের স্মৃতিগুলো জমা হয় ঝাপসা সেলুলয়েডের মতো। মাঝে মাঝে কিছু স্বপ্নে স্মৃতিগুলো ফিরে আসে। ঘুমের মধ্যে অনুভব করতে থাকি এই বুঝি সেই সোনালী দিনে ফিরে গিয়েছি। টাইম মেশিন সত্যি কেউ বানিয়েছে, যদি তাকে কাছে পেতাম, বড্ড করে জড়িয়ে ধরে বলতাম,"তুমি আমার স্বপ্ন পূরন করেছো।" মাঝে মাঝে স্বপ্নের মাঝে এসব ভাবতে ভাবতে স্মৃতিমাখা আসল স্বপ্নটা দেখা হয় না। ঘুম ভাংতেই ভর করে এক শূন্য হাহাকার।
ব্যার্থ শীতকালের মৌসুম দেখে বিরক্ত স্টকহোমবাসী। টানা কয়েকঘন্টা তুষারপাত দেখে মনে হবে, এই বুঝি এক ঘেয়ে শহরটা সাদা কাপড়ে ঢেকে যাবে। থাকবে না নোংরা কোনো কিছু, শুভ্র পরিষ্কার। অথচ সকাল বেলা উঠেই দেখি বরফগলে পানি হয়ে গেছে, স্যাঁতস্যাঁতে মাঠ আরও থ্যাক থ্যাকে। রাস্তায় গলতে থাকা বরফ গুলো ক্রিস্টালের মতো পিচ্ছিল। যেই শিশুটি স্কেটবোর্ড কিনে সারা বছর অপেক্ষা করেছিলো বরফে ধুমছে খেলবে, সে আজকল মন খারাপ করে স্কুল পথে হাটা দেয়। তার কাছে ফ্রান্সের চার্লি এবদু হত্যার জন্য ইসলামী জেহাদ অথবা জাতীয় অর্থনীতির দৈন্যদশা থেকে বাঁচতে এ বছর আঁতশবাজী কেন হলো না সেসব মূখ্য নয়। তার মনে ভেসে ওঠে আজ হতে কয়েক শীত ঋতু আগে সে খেলেছিলো তার ছোট্ট স্কেটবোর্ড নিয়ে বরফের স্তুপে। তখন কোনো স্কুল ছিলো না। যে বাবা গতবছর থেকে আর বাড়ি আসে না, সেও তখন সারাদিন তাকে নিয়ে খেলতো, সাথে মা ও আনন্দে গান গাইতো। ইসস! তখন কত সুন্দর ছিলো!
: মা, একটা কথা ছিলো?
: আবারও ঝগড়া করেছিস?
: না, মা।
: তাহলে মদ খেয়েছিস?
: তাও না।
: তাহলে কি বলবি?
: বাবা ছোট বেলা আমাকে মেলায় নিয়ে যেতো। সে রাতে সারাক্ষন বাবা একটা কবিতা শোনাতো। তোমার মনে আছে কবিতাটা?
: কুন কবিতা?
: মা, আমার সন্তানকে আমার বাবার মতো মানুষ করবো। আমার বাবার মতো মানুষ এই দুনিয়া জুড়ে আর কোথাও খুজে পেলাম। তাকে শেষবার দেখতেও পারলাম না।
মা ওপাশ থেকে হাউ মাউ করে কাঁদছে। আমি ফোনটা বন্ধ করে বসে আছি। ভাবছি চোখের পেশীগুলোতে পানির বড্ড অভাব, তাই ইদানিং কাদা হয় না। মনটা খারাপ হলে মুখটা তেতো হয়ে আসে। তখন মদের নেশায় ডুবতে ইচ্ছে করে। মাইমুনা এ সময় খুব শক্ত করে হাতটা ধরে রাখতো। বলতো আমার পাশ থেকে উঠবে না। চুপচাপ বসে থাকো আর দোয়া ইউনুস পড়ো। মাইমুনা জানে আমি নাস্তিক। শুধু দোয়া ইউনুস কেনো, ইদানিং কোনো সুরাই আর মাথায় নেই। তবু সে এমনভাবে বলতো যে আমি দোয়া ইউনুস পড়ি। ইদানিং সত্যি সত্যি মনে হয় ঐ আকাশের অনেক উপরে খোদা বসে আছেন। সে আমাকে দেখছেন ফ্রাইপেনে ভাজতে থাকা মশলামাখা একটা রূপচান্দা মাছের মতো। অল্প আঁচে পুড়ছি, আর রং পাল্টাচ্ছি আর খাবার স্বাদ প্রচন্ড রকম বদলে যাচ্ছে।
ডাক্তার একটু আগে মাইমুনার অপারেশন শুরু করেছে আর আমি বসে আছি টাকিলার একটা বোতল নিয়ে। বোতলটা পুরোটা শেষ করবো নাকি বুঝতে পারছি না। বোতলটা যে খুলবো সে সাহসও পাচ্ছি না। আমি খোলা আকাশে তাকিয়ে আছি, সপ্তর্ষিমন্ডলের তারাগুলো দেখছি। অদ্ভুত সুন্দর আকাশের গায়ে গেঁথে আছে, বাবা হয়তো আছে ঐ দূর আকাশের কোনো তারা হয়ে। সত্যিই কি আছো বাবা?





মাঝে মাঝে স্বপ্নের মাঝে এসব ভাবতে ভাবতে স্মৃতিমাখা আসল স্বপ্নটা দেখা হয় না। ঘুম ভাংতেই ভর করে এক শূন্য হাহাকার।
পড়তে গিয়ে হঠাত চমকে উঠি, মনের অজান্তেই বাবা মা কে হারিয়ে ফেললাম, তারপর পাশ ফিরে দেখি মা পিছনে এসে বলছে কিরে খাবি না? কয়টা বাজে?
খুব বিষন্ন লেখা। মাইমুনা ভালো হয়ে উঠুক তাড়াতাড়ি
আপডেট দিতে ভুলবেন না যেনো
মন্তব্য করুন