ইউজার লগইন

ঠিক কি যেনো!

ফটোগ্রাফীর জন্য এক সুন্দর মন দরকার, দরকার নিখুত চাহিদাকে সংজ্ঞায়িত করার ক্ষমতা। এই মুহুর্তে যদি বলা হয় সবচেয়ে নিষ্পাপ ছবি কোনটা তাহলে আমি বলবো বস্তিতে থাকে সেই ৬-৭ বছরের ছেলেটা যে মুখ গোমড়া করে শার্টের এক কোনায় আঙ্গুল গুজে মুখে দিয়ে চুষছে। নাক দিয়ে সর্দির হিঙ্গুল গড়িয়ে পড়ছে একটা ফুটো দিয়ে। দুদিন আগে বাবা চুল কাটাবার নাম করে হাতে লজেন্স ধরিয়ে নাপিতের দোকানে নিয়ে ন্যাড়া করে দিয়েছে। ক্ষুধায় খেতে না পারার রাগের সাথে মাথা ন্যাড়া করার রাগও যোগ হয়েছে।

ঠিক তেমনি একটা পিচ্চিকে দেখছি তবে এই পিচ্চিটা পুরো জ্যাকেট পরিহিত। কিছুক্ষন আগে গুডিজ মানে মিষ্টি চকলেটের জন্য কান্নাকাটি করছিলো। তার বাবা তাকে গুডিজ কিনে না দিয়ে একটা সেভেনআপের ক্যান ধরিয়ে দেয়। পিচ্চিটা ঠিক বুঝতে পারছে না সে সেভেন আপ টা গিলবে না গুডিজের জন্য কান্নাকাটি চালিয়ে যাবে।

গাড়িতে সোফিয়া ঢুকে স্টার্ট দিলো। আমি শিশুটিকে দেখছি দেখে বলে উঠলো,"তোমারও গুডিজ লাগবে?"
: আমি ওর জায়গায় হলে গুডিজের দাবীতে স্ট্রাইক করতাম।

সোফিয়া গাড়ি স্টার্ট দিলো। মোবাইলে সময় দেখলাম ভোর ৬:৩০, হঠাৎ মাথায় এলো সোফি যখন ম্যাকডোনাল্ডে ঢুকলো তখনও তো ৬:৩০ টা বেজেছিলো, এখনও ৬:৩০। নাকি যখন ম্যাকে সোফিয়া ঢুকলো তখন ৫:৩০? সব তালগোল পাকিয়ে গেলো, সোফিয়া বলে উঠলো,"রাতের ঘুম কাটেনি?"
: তা না, ঠিক বুঝতে পারছি না কি হলো? সময়টা আমাকে ধোকা দিচ্ছে।
: সময় ধোঁকা দেয়নি, তুমি তো রাতে ফুল ফর্মে ছিলে। ১ বার ২ বার নয়, ৪ বার। কি হয়েছিলো?

আমি হতবুদ্ধ হয়ে সোফিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। জ্যাকেটের চ্যান খোলা, উপরে সাদা স্যন্ডোগ্যান্জ্ঞি....ক্লিভেজের অংশটা সাদাটে হলুদাভ হয়ে গেছে অনেকটা পাঁকা ফজলি আম কাটলে সে রংটা হয়। সোনালী চুল গুলো খোলা, চোখের কাজলটা আরব বেদুঈনের মতো লাগছে। সোফিয়ার বয়স ৩৬ হলেও মাঝে মাঝে বিষম খাই ২২ ভেবে।

: তোমার ইনভেনটরীর অবস্হা কি দেখলে?
: ভালোই, সামান্য এদিক ওদিক।
: মোটেই না। গত মাসে রাজা সহ বিদেশী ডেলিগেটদের অনুষ্ঠান ছিলো পর পর কয়েকদিন। আর সে অনুষ্ঠানেই শ্যাম্পেইন, ওয়াইট ওয়াইন, শেরীর শর্ট পড়ে যায়। ইভেন্ট ম্যানেজার বার বার বলছিলো ইনভেনটরী কে দেখছে। জোয়ানা আর ইয়েলদার মধ্যে যেকোনো একজনকে তুমি রাখতে পারবে।

আমি কিছু বললাম না। ইনভেনটরীর অবস্হা আসলেই শোচনীয়। এদিকে জোয়ানা আর ইয়েলদা দুটোকেই দোষ দিয়ে লাভ নেই। দু'জনই নতুন যদিও ইসরাইলে জোয়ানা গ্রান্ড হোটেলে কাজ করে এসেছে। শুনেছি তেল আবিব গ্রান্ড হোটেল আছে তিনটা যার প্রত্যোকটা ইনভেন্টরী আমাদের মতো। তার চেয়ে বড় কথা জোয়ানার এই মুহুর্তে চাকরী চলে গেলে তার ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে সমস্যায় পড়ে যাবে। ৪ মাস পর ওর আবার ২য় বারের এপ্লাই। এর মধ্যে নতুন ফুলটাইম জব না পেলে ওকে সুইডেন ছাড়তে হবে।

ইয়েলদার অবস্হা আরো শোচনীয়। নিজের বাবা মাকে আফগানিস্তান থেকে আনতে প্রায় ২ লাখ সুইডীশ ক্রোনা (বাংলাদেশী ২২ লাখ টাকা) লেগে গেছে। তার ওপর আবার সাংসারিক খরচ। আর কাজের হিসাব করলে দুইটার একটাও কাজ পারে না। একজন ইনভেন্টরীর নাম্বার দেখলে সব গুলিয়ে ফেলে আর আফগানিটা মদের বোতল হাতে নিলে এমন ভাব করে যেন ওষুধের বোতল হাতে নিয়েছে। কোনটা কোন মদ সেটা চিনিয়ে দেবার জন্য এরি মধ্যে দুবার বাসায় দাওয়াত দিয়েছে আফগানী খাবার খেতে।

: জোয়ানাকে বারে আর ইয়েলদাকে সার্ভিসে নেয়া যায় না?
: শাফি, আমার সব জায়গাতে ওভারলোড।
: আমাকে এন্হনী দাও। আমি ওর সাথে কথা বলেছি। ও রাজী আছে।
: তাহলে তুমি জোয়ানা আর ইয়েলদা, কাউকেই বাদ দিতে চাইছো না।
: এর জন্য নেক্সট সামারে তোমাকে আমি গটল্যান্ডে নিয়ে যেতে রাজী আছি।

সোফি চলন্ত গাড়ির স্টেয়ারিং আমার দিকে ঝুকে এসে গালে চুমো দিয়ে বললোম," এই ক্রিস্টমাসের ছুটিতে চল ইজিপ্ট ঘুরে আসি!"

মন মেজাজ আরও খিচে গেলো। মাইমুনা এসে পড়বে, ওকে রেখে ইজিপ্ট! মাথাটা এরি মধ্যে তালগোল শুরু হয়ে গেলো।

কাজে ঢুকে জামা কাপড় চেন্জ্ঞ করতে গিয়ে দেখি মনসুর ভাই ফোনে বাংলা গালাগাল ঝাড়ছে। যদিও গলার স্বরটা এমন যে সে তার স্ত্রীর সাথে কথা বলছে। এটা এজন্য যে আশেপাশের সুইডিশ কলিগরা বুঝতে না পারে সে কি বলছে। আমি জামা কাপড় চেন্জ্ঞ করতে ঢুকলাম এরই মধ্যে ফোনের গালাগাল শেষ করে মনসুর ভাই বলছে,"শফি ভাই, ছুটি কেমুন কাটালেন? শরীর মন ভালো?"
: তা ভালো কিছুটা।
: আর বইলেন না, দেশে যারা আছে এরা মনে করে আমরা এইখানে রাজা বাদশার জীবনযাপন আছি। এগো যদি সুইডেনে আইনা এই কাম এক দিন করন যায় এরা তারপরের দিন হাতে পায়ে ধইরা বাংলাদেশ যাইবো গা। মাসের পয়লা তারিখে টাকার বান্ডিল গুনে আর মাস ভইরা টের পায় না কি খাটান খাটানিডা দেই। দেশের মানুষের উপর থিকা মন উইঠা যাইতেছে।
: ভাবী কেমন আছে?
: আরেক যন্ত্রনার কথা মনে পড়ায় দিলেন। ৫ মাস চলে, কিন্তু ঢং দেখলে মনে হয় সারা দুনিয়ায় এই মাইয়া একলাই গর্ভবতী হইছে।

মনসুর ভাইয়ের এই পার্ভার্ট মার্কা কথা বার্তা বুকে বিধছিলো। জোয়ানা বললো উনি নাকি ওর নিতম্বে সময় পেলেই স্পর্শ করে। আমি যেহেতু এখন ওর উপরে কাজ করি সেহেতু এর একটা ব্যাবস্হা নিতে হবে। যদি না নেই তাহলে ও পুলিশের কাছে মুখ খুললে আমার চাকুরীর সাথে জেল জরিমানাও হবে।অথচ এই মানুষটা সেদিন যদি আমাকে ডেকে এই চাকুরীটা না দিতো তাহলে এতদিন হয়তো দেশে গিয়ে জেলে বা লীগের সন্ত্রাসীদের হাতে মার খেয়ে পড়ে থাকতে হতো।

: ভাই, একটু সময় আছে?
: আর সময়! ফ্রুকোস্ট (ব্রেক ফাস্ট) ৫০০ জনের রেডী করতে হইবো তারপর লান্ঞ্চের ধাক্কা।
: ৫ টা মিনিট নিবো। জোয়ানা অলরেডী একটা কমপ্লেইন করছে। ও আমাকে রিপোর্ট করে। আমি সোফিয়াকে।
: কি? আর তুমি মিয়া আমারে এইসব কি বলতেছো?
: ভাই, আপনে জানেন এইসব ব্যাপারে কি হয়! আমি কমপ্লেইনটা পাস করবো ১২ টার দিকে। আপনি শুধু বলবেন আপনি বাংলাদেশের পুরোনো একটা জোক বলছেন, আর কিছুই না। আর আমি জোয়ানাকে রাজী করাচ্ছি। ভাই, এরপর আমি কিন্তু আর কিছুই করতে পারবো না।

মনসুর ভাই মুখ কালো করে বসে রইলেন। আমি ড্রেসিং রুম থেকে বেরিয়ে আমার হাতের মেনি লগ নিয়ে ইনভেন্টরীতে চলে গেলাম। ইনভেন্টরীর তাপমাত্রা ৮ ডিগ্রী, মনে হচ্ছে একটু পরে বরফ পড়বে। একটু দূরেই দেখি জোয়ানা দাড়িয়ে দাড়িয়ে ঝিমাচ্ছে কানে হেডফোন দিয়ে। আমি সামনে দাড়ালাম, ওর হুঁশ নেই। চোখ বন্ধ করে ঝিমানো চলছে।

আমি বা কানের হেডফোনটা আস্তে করে খুলে কানের কাছে আস্তে করে বললাম,"ও জলপাই দেশের পরী! গুড মর্নিং।"

ও চমকে উঠলো, চোখ খুলে আমার দিকে তাকিয়ে শফি বলে চিৎকার করে জড়িয়ে ধরলো।
: আরে কি হলো? কাহিনী কি?
: আমি মনে মনে তোমাকেই ভাবছিলাম।
: কেন?
: এমনি। মনটা ভালো নেই।
: সোফি কিছু বলেছে?

তখনি মনে হলো একটা কথা, যদি মনসুর ভাইকে বাচাতে যাই তাহলে জোয়ানার নামটা সোফিকে ম্যাসেজ করে দিলেই হবে। ওর কালকে থেকে কাজ না থাকলে তাহলে আমাকে সোফির মনসুর ভাইয়ের ঘটনাটা বলতে হবে না। আবার এরকম একটা ব্যাপার চাপা দিতেও মনের ভেতর লাগছে।

: নাহ! সোফি কিছু বলেনি। কিন্তু তোমাকে এই বোরিং কাজটা করতে হবে না। বারে কাজ করবে?
: ওহ শাফি! আই মিস ইউ।
: মিস করার দরকার নেই, মাঝে মাঝে হুইস্কি দিলেই খুশি এবং অবশ্যই খাতায় লিখে রাখবে।
: ও তোমাকে একটা কথা বলতে ভুলে গিয়েছিলাম, মনসুরের ব্যাপারটা নিয়ে কিছু বলবে না। আমি ওকে খুব এনজয় করি।
আমি কিছুক্ষন চুপ করে থাকলাম। তারপর বললাম," আজকে যদি এটা নিয়ে চুপ করে থাকি তাহলে কালকে আরেকজন করবে। আমি বেচে থাকতে এটা হতে দেবো না। যদিও আমি মনসুরকে অলরেডী শাসিয়েছি এবং ১২ টার ব্রেকে সোফিকে এটা বলবো।"
: নাহ শাফি! আমার এই ব্যাপারটা নিয়ে কোনো কথা বলবে না।

মেজাজটা খিচে গেলো নিজের ওপর। কাজের পরিবেশটা ধরে রাখতে পারলাম। কেমন যেনো নিজেকে অপরাধী মনে হতে লাগলো। এই মেয়েটা অনেক বুদ্ধিমান, হয়তো কোনো এক কারনে বুঝতে পেরেছে আমি বাংলাদেশী হয়ে আরেক বাংলাদেশীকে কখনো বিপদে ফেলবো না, তার ওপর জোয়ানার চাকুরীটাও টলমলে।

উপকারের নুনের শোধটা মেটাতে গিয়ে একটা বড্ড অপরাধ করে ফেললাম আজ!

পোস্টটি ১০ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

বিষণ্ণ বাউন্ডুলে's picture


হুম..সামলে চলেন, ভালো থাকেন।

দূরতম গর্জন's picture


আপনিও ভালো থাকেন

আরাফাত শান্ত's picture


অনেক অনেক শুভকামনা!

দূরতম গর্জন's picture


আপনার জন্যও শুভকামনা। জয়েন করেছেন?

তানবীরা's picture


সান্তনা

দূরতম গর্জন's picture


Wink

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

দূরতম গর্জন's picture

নিজের সম্পর্কে

মহাশূন্যের গুন গুন শুনতে চাই, কান পেতে রই তারাদের আহ্বানে। দূরতম গর্জন যখন সৈকতে আছড়ে পড়ে, আমি পা ফেলে উপভোগ করি সাগরের কূর্ণিশ। মানুষ হয়ে জন্মাবার অহংকারই শুধু বিদ্যমান, অথচ নিত্য বেচে আছি তেলাপোকার শৌর্য্যে!