ফ্রম চিটাগাং
সবাই যখন ব্লগে টাংগুয়ার হাওর থেকে শুরু করে বড় বড় ভারত ভ্রমনের গল্প করে তখন মনটা খারাপ হয়ে উঠে। ভাবতে থাকি আমি জীবনে ঘুরতে খুব কমই গেছি। খালি নিজের মতো করে দিনগুলোই চলে গেছে। এই ছয় বছরের ঢাকা জীবনে আমি সিলেটের ঐদিক গেছি একবার একবার লাকসাম নোয়াখালী একবার খুলনা যাবার কথা ছিলো আমার কারনেই যাওয়া হয় নাই। আর গোটা দশ বারো বার চিটাগাং গেছি এমনিতেই আর জামালপুরে বাড়ী সেখানে তো প্রয়োজনেই যেতে হয়। এটাই ভ্রমনের ইতিহাস। তাই কত জায়গা সমন্ধ্যে কত গল্প পড়ি কত লোকজন সেন্টমার্টিনের গল্প করে কত বন্ধু কতো জায়গায় যেয়ে ভাজা ভাজা করে আসছে। কিন্তু এই অভাগা আমি যার কোনো ভ্রমনেরই গল্প নাই। এই যে এতো এতো বার আমি চিটাগাংয়ে গেছি একটা কাজেও না। মন চাইছে নন এসি বাসে চড়ে এসে পড়ছি। বেশীর ভাগ জার্নি হইছে গোপনে। গোপনে মানে বাসায় জানে না। এই সব গোপনে সফর আসলে রিসকি। তার কারন বাসা থেকে ফোন আসতেছে আর আমি ক্রমাগত জানাচ্ছি যে আমি ঢাকায়। ধরা পড়ার ভয়ে থাকতে হয়। চিটাগাং খুব ঘুরি তাও না। তিন চারজন প্রিয় বন্ধু আর ছয় সাতজন ক্লাসমেট বন্ধু এদের সাথেই দিন কাটাই। অল্প দিনের জন্য আসি হইচই করে চলে যাই। গত নয়মাসে আমি চিটাগাং যাই নাই। কারন একে তো টাকা থাকে না তারপর যাদের জন্য যাই তারা একটু ব্যাস্ত। তাই নিজেই সিদ্ধান্ত নিছিলাম যাবো না আর। হুট করেই আবীর আসলো একটা ইন্টারভিউয়ের জন্য। আবীরের ক্রমাগত প্রেশার ও অনুপ্রেরনায় ভাবলাম যাই তিন চার দিনের জন্য। স্কুলের রিইউনিয়ন বন্ধুদের বিয়ে কিছুতেই যখন আসলাম না এবার অসময়ে ঘুরে আসি। এ এক সত্যি অসময়। বিসিএসের রিটেনের ডেট দিছে, নতুন সেমিষ্টারের ক্লাস শুরু, কিছু করি না বলে হতাশা সব মিলিয়ে বাজে সময়। তাও সব কিছু ছেড়েছুড়ে টাকা ধার করে রওনা দিলাম আবীরের সাথে চিটাগাং। আগেই বলছিলাম চিটাগাংয়ে কোথাও যাই না। সানমার আরো নানান মার্কেটের চাকচিক্য আমাকে টানে না। রাংগামাটি বান্দরবনেও আমার যাওয়া হয় না। চট্টগ্রামে এতো এতো জায়গা কোথাও যাই না। পড়ে থাকি এই পতেংগাতেই। সেই ইপিজেড, নেভী গেইট, নারিকেলতলা, স্টীর মিল, কাঠগড় হালিশহর এই আমার ঠিকানা। প্রত্যেক দিন বিকালে সীবীচের পাশে দিয়ে ঘেরা দইজ্জার পারে ফুটবল খেলা সেখানে আড্ডা মারা। নেভী হাসপাতাল গেইটের ওখানে যেয়ে চেনাজানা সব লোকের সাথে দেখা করা। ইকবাল ভাইয়ের বনফুলে আড্ডা মারা, রেল লাইনে চা খাওয়া, কর্নফুলী ইপিজেডের সামনে চায়ের দোকানে আড্ডা মারা। আমার যারা সাক্ষাত্ প্রার্থী আছে তাদের সাথে দেখা করা। এই করেই দিন কাটে। সাথে বন্ধু কামরুলের বাসায় আন্টির অসাধারন যত্ন আত্মি রাত জেগে গল্প সব কিছুই দারুন। প্রিয় বন্ধুরা আমার জন্য টিউশনি করায় না, ক্লাস মিস দেয়, কেউ অফিস ফাকি দেয় এই সব কিছুতেই আমি মুগ্ধ হই। তবে এখন প্রবলেম হলো সবাই খুব ব্যাস্ত। চাকরী নিয়ে টেনশিত। গার্মেন্টসে আট হাজার টাকা নিয়ে ঢুকবে কিনা তা নিয়ে দ্বিধায় থাকা। চিটাগাং ভার্সিটি থেকে এমবিএ করে ভালো জব না পাওয়া। সব মিলিয়ে হতাশা। আড্ডাতে বসলেই আলাপ একটাই চাকরীর সার্কুলার, সিভিড্রপ, ইন্টারভিউ ডেট, অনেকের হতাশার গল্প। গার্মেন্টসে আট হাজার টাকা বেতন দিয়ে শুরু কর্মাশিয়াল অফিসারের চাকরীটা খুব পাওয়া যায়। কিন্তু এই চাকরী কেউ করে না। কারন লিভিং কস্ট এখন যে হাই এই টাকায় নিজের চলাই সম্ভব না। তবে আমি যদি থাকতাম বাবা মায়ের সাথে চিটাগাং তবে ঢুকে যেতাম এই জবেই। কারন জীবনে চিটাগাংয়ে থাকার মতো আনন্দ আর নাই। চাকরীর কষ্ট কম বেতন এই সব ভুলে যাবে অবলীলায় যখন প্রতি সন্ধ্যায় অসাধারন আড্ডা বসে। যখন এমনিতেই দশ বারো জন বন্ধুদের সান্নিধ্য একসাথে পাওয়া যায়। তাই ঢাকাতে বসে আমি অনেকরেই বলি চিটাগাংয়ে একটা চাকরী দেখতে। কিন্তু কেউ দেয় না আমারো থাকা হয় না এই শহরে। মোটামোটি একটা হলেই সব ছেড়েছুড়ে এসে পড়তাম। কারন চিটাগাংয়ের পতেংগার প্রত্যেকটা জায়গার সাথে আমার ভালো লাগা শৈশব ও যৌবনের শুরুর গল্প। এখনো আমার অনেক বন্ধু এই শহরেই। ঢাকার জীবন গতিময়তা সেন্টারে থাকার আনন্দ নিজের স্পেস সব কিছুই ভালো কিন্তু চিটাগাংয়ের মতো না। আর অনেক কিছুই এখন পাওয়া যায় যা আগে শুধু ঢাকাতেই ছিলো। তাই থাকতে চাই এ শহরেই। কিন্তু থাকার কোনো উপায় নাই। তাই চিটাগাংয়ে আজ শেষ দিনে এই পোষ্ট টা লিখে ফেললাম মোবাইলে।





ভাল লাগলো জীবনের গল্প।
বরাবরের মত দারুণ লেখা। আমারো আজকাল ঢাকায় থাকতে একদম মন টানে না। কেন যে আসছিলাম এখানে! ১০হাজার টাকার একটা কাজ পেলেও চলে যেতাম নরসিংদী। কাজ ছাড়া তো এখন আর থাকা যায় না। অলস সময় বড্ড কষ্ট দেয় ।
শান্ত চমতকার হইছে।
আমার সমস্যা আরো বড় আর গভীর। এখানে থাকলে ওখানে মিস করি আর ওখানে থাকলে এখানকে। কোথাও সুখ নাইরে পাগলা
(
আঁরা চাটগাঁইয়া পোয়া, মেডিত পইল্লে লোয়া

..উইদ লাভ?!
পতেঙ্গাতেই প্রথম সমুদ্র দেখি,
সে অভিজ্ঞতা এই জীবনে ভুলবো না।
এমন ভাললাগা বলে বোঝানো যায় না কখনও।
চট্টগ্রামে আমার জন্ম নয়,আমার বাড়িও নয়।
তবু এই চট্টগ্রামই আমার সবকিছু।
চট্টগ্রামেই আমার সব প্রিয়তা।
লেখা ভালো হয়েছে। :)


আপনার একটা চাকরী হোক চট্টগ্রাম শহরে।
তাহলে আপনি ফিরে পাবেন প্রিয় শহর,আর আমরা পাবো আপনাকে।
দারুণ একটা ব্যাপার হবে।
চাটিগাঁ শহর আঁত্তন গম লাগে...
শান্ত ভাইজান, সার্চ দিয়া খুঁজে আপনার লেখা পড়লাম। আমার ক্ষুদ্র পরিশ্রম সার্থক। ভালো লিখেছেন।

শান্তর লেখা খুঁজে খুঁজে পড়ি
মন্তব্য করুন