ইউজার লগইন

আহমদ ছফার দুনিয়া

মরার জন্য ছফা কেন শ্রাবণকেই বেছে নিলেন? এই প্রশ্নের জবাব আমি খুঁজেছি অনেকদিন। নুরুল আনোয়ার লিখিত 'ছফামৃত' বইতে আছে, শরীর যখন খারাপ লাগছিলো, সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়লো হাসপাতালে নিতে, তিনি নাকি না যাওয়ার পক্ষে ছিলেন। বারবার একটাই কথা বলছিলেন, 'অযথা পেরেশানী করে লাভ নাই, আমি যাবোগা আজকেই।' এর মাস দুই আগে থেকেই তিনি বলছিলেন, আমার হাতে সময় বেশি নাই। এইজন্য তিনি আত্মজীবনী লেখারও চিন্তা করছিলেন, কিন্তু লিখতে পারছিলেন না, শেষে নুরুল আনোয়ার টেপ রেকর্ডার নিয়ে বসে থাকে। তাতেও উনার সুবিধা লাগে না। বিভিন্ন সাক্ষাৎকারে তিনি বলে রেখেছেন, তার শরীরের সবখানেই রোগ, এত কষ্ট নিয়ে বেঁচে থাকতে মন সায় দেয় না। সুতরাং ৫৯ বছরের জীবনে পার করে তিনি মোটামুটি প্রস্তুতই ছিলেন ওপারে যাওয়ার জন্য।

চলে যাওয়ার পর শুরু হলো আসল কান্ড, শত শত মানুষের ভীড় টিএসসি জুড়ে। লাশ কোথায় দাফন হবে? তাঁর মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় নিয়ে তেমন জানা শোনা ছিলনা তখনকার মুক্তিযোদ্ধা সংসদের প্রধানের। কারন তাঁর কোনো সার্টিফিকেট নাই। অথচ মোটামুটি দেশের কিংবদন্তী যে উনি কলকাতায় বুদ্ধিবৃত্তিক লড়াইতে ছিলেন। সেই সময়ের বিভিন্ন সংকলন গুলোতে তাঁর লেখা আছে, সেই সময়ের দুটো ভারতের কাগজে তাঁর লেখা ছাপিয়েছে, পত্রিকা অফিসে কাজ করেছেন। বোধ করি আওয়ামীলীগের কয়েকজন নেতাদের যুদ্ধের সময় আরাম আয়েশে থাকা নিয়ে প্রায়শই কটাক্ষ করার জন্য তাঁর এই শাস্তি। তবুও তাঁর বন্ধুবান্ধব ছিল, বড়লোক শুভানুধ্যায়ী ছিল, অগুনতি তরুণ ভক্ত মিলে তাঁর দাফন হয়েছে মিরপুর বুদ্ধিজীবি কবরস্থানে। কবরটা এখনও ঠিকঠাক আছে।

ছফার কিছু ছবি তুলেছে এরকম এক ফটোগ্রাফারের সাথে আমার আলাপ হয়েছিল। তিনি আমাকে মজার গল্প শুনিয়েছিলেন। যে উনি একবার বাড়ী থেকে কিছু শাক সব্জী আর তরি তরকারী এনেছিলেন সাথে চাল ডালও ছিল। ছফা খুশী হয়ে সবাইকে বলতে শুরু করলেন, জানো ও কি করেছে, এক মন চাল এনেছে। ফটোগ্রাফার জানালো, ছফা ভাই সামান্য আনলাম আপনি এত বাড়িয়ে বললেন। ছফা হা করে বলে উঠলেন, মানুষের সামনে ওমন বলতে হয়। এক এমেরিকান প্রফেসরের কথা শুনেছিলাম, আগে ঢাকা ভার্সিটিতে পড়িয়েছেন। তিনি বলছিলেন হাসতে হাসতে, ' গ্যোটে ইন্সটিউট তাঁকে ১ লাখ টাকা দিবে বলেছিল। তিনি দুর্দশাগ্রস্থ প্রেসে বসেই, হিসাব করছিলেন কাকে কত টাকা দিবেন, কার কি লাগবে? এমনকি টাকা পেয়ে সে সেই টিচারও একটা শাড়ী গিফট পেয়েছিলেন, ৯০০ টাকার। উনি যত বলেন লাগবে না ছফা নাছোড়বান্দাই, শেষে নিতেই হলো। সাখাওয়াত টিপু সেই একি গল্পটা বলে ছফাকে নিয়ে, 'একতা' থেকে লোক পাঠিয়েছেন একটা সাক্ষাৎকার নিবে বিল ক্লিন্টনের দেশে আসা উপলক্ষ্যে, প্রশ্ন রাখলেন সেই ছেলে, ক্লিন্টন মনিকা কেস নিয়ে? ছফা নাকি সেদিন সাংঘাতিক রেগে গেলেন, রেগে মেগে বলেন কারো ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে আমার ভাবনা নেই, বাংলাদেশে এসে তিনি কি কি নিয়ে যাচ্ছেন সেটাই চিন্তার। পরে টিপুকে ফোন দিয়ে জানালেন, 'মিয়া কি লোক পাঠাও? ক্লিনটনের প্যান্ট নিয়ে টানাটানি করে? কবি মোহন রায়হান, মোরশেদ শফিউল হাসান, আখতারুজ্জামান এদের অসংখ্য এইসব গল্প আমার জানা, বারবার গল্প শুনে আমার মনে হয় ছফা মনে হয় খানিকটা পাগলাটে।

ফুকো আমাদের জানায়, পাগলামীর কথকতা কিন্তু তা দিয়ে ছফাকে বোঝা যায় না। যেমন মনসুর মুসা থেকে শুরু করে রুদ্র সবার প্রথম বই বের করা ছফার হাত দিয়ে। এত যিনি উন্মুখ, তাঁর পান্ডুলিপি বছরের পর বছর পরে থাকে প্রকাশকের কাছে, প্রকাশক লোক পাঠিয়ে জানায়, 'আপনার একটা পান্ডুলিপি দিছিলেন, ছাপাবো?' ছফা আকাশ থেকে পরে জানান,' লিখেছি মনেই নাই, পাঠান তো বাসায়, দেখে ছাপানোর অনুমতি দিচ্ছি।' যেটা অনেকেই জানেন না, ইমদাদুল হক মিলনেরও শুরুর দিকের উপন্যাস পত্রিকায় দেয়ার জন্য ছফা চেষ্টা করেছেন। সাহিত্য সম্পাদকের পছন্দ হয় নি বলে তা আলোর মুখ দেখেনি। বিভিন্ন বই নিয়ে নানান মানুষকে দিয়ে অনুবাদ করিয়েছেন। কারো লেখনী প্রচেষ্টায় খুশী হলে, সে বই নিজে কিনে সবাইকে পড়তে দিতেন। আবার বিভিন্ন মনিষী ব্যাক্তিদের সাথে গেঞ্জাম হলে, তাদের বই টিএসসিতে রেখে আসতেন। জীবনে বলা যায় কখনোই তাঁর স্টেবিলিটি ছিল না তবুও প্রচুর পড়তেন। একটা লেখায় পড়েছিলাম, টানা ১২ ঘন্টা লাইব্রেরীতে বসে ছফা পড়তেন বিভিন্ন বই অনেকদিন। অনেকে ছফা কি বই পড়ে আজ তা দেখার জন্য বসে থাকতেন। আনিসুজ্জামানের মত বিদ্বান লোকেরা অবাক হতেন, গাছবাড়িয়া থেকে আসা, তিতাসের কোল ঘেষা এক কলেজ থেকে বিএ পাশ ছেলে এত কিছুতে কিভাবে ক্লিয়ার। সব সম্ভব হয়েছে কারন ছফার মনীষার কারনে। তিনি যেভাবে সততার সাথে চারপাশে দেখতেন সেরকম বুদ্ধিবৃত্তিক লোক খুব কম ছিল।

আহমদ ছফার ভেতরে যে সংবেদনশীল মন তা নাজিমুদ্দিন মোস্তানের সাথে বন্ধুত্ব হওয়া নিয়েই বোঝা যায়। দুজনই একটা বিদেশী বই পড়ে, পথ শিশুদের জন্য স্কুল খোলার জন্য আকুল হয়ে উঠেন ও স্কুল খোলেন। পরিচয় পর্বটাও অদ্ভুত। ছফা জানাচ্ছেন, "এই সময়ে মোস্তানের সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। ...কী করে পরিচয় হল, উপলক্ষটার কথা বলি। পাকিস্তানি পদার্থ বিজ্ঞানী প্রফেসর আবদুস সালাম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর আবিষ্কৃত তত্ত্বের ওপর একটি বক্তৃতা দিয়েছিলেন। সেই বক্তৃতা শোনার ভাগ্য আমার হয়নি। কিন্তু ইত্তেফাক পত্রিকার রিপোর্ট পড়ে আমার মনে হলো, প্রফেসর সালামের তত্ত্বটি বুঝতে আমার কোনো অসুবিধে হচ্ছে না। এটাতো বড়ই আশ্চর্যের কথা। এমন সাংবাদিক আমাদের দেশে আছেন, সালাম সাহেবের দুরূহ তত্ত্বকে অ তে অজগর এরকম সহজ করে বোঝাতে পারেন। ঠিক করলাম সেদিনই সন্ধ্যে বেলায় ইত্তেফাক অফিসে যেয়ে খোঁজ করব। এরকম একজন কামেল মানুষ আমাদের দেশে আছেন। সশরীরে গিয়ে যদি সালাম না করি নিজেকেই অসম্মান করব। গেলাম ইত্তেফাকে। ...টেবিলে ঝুঁকে পড়ে রিপোর্ট লিখছেন। শুধু মাথাটাই দেখা যাচ্ছে। এই একটুখানি মানুষ!"
আমরা ছফা খুঁজি। ছফা সম্ভব না, তার বন্ধুদেরও পাওয়া সম্ভব না, কারন নাজিমুদ্দিন মোস্তানের মত সাংবাদিকেরা আর এই শহরে আর কাজ করে না।
ছফা খুব জরুরী ভাবে বলে গেছেন, কেন এই রাষ্ট্রের অসাম্প্রদায়িক হওয়া জরুরী। ছফার দারুণ একটা কথা আছে, যদি সাম্প্রদায়িক বাংলাদেশই চাই, তাহলে পাকিস্তানের সাথে থাকাই তো ছিল শ্রেয়। একাত্তরের পর এইদেশে হিন্দুরা কি রকম বিট্রেইট ফিল করেছে, উনি ছাড়া আর কাউকে এই নিয়ে লিখতে দেখি নাই। এই যে বন্যা হচ্ছে, বন্যা ত্রাণ কাজ, সুশীল সমাজ, স্থানীয় জনগন সব নিয়ে উনার যে দারুণ লেখা আছে সেরকম লেখা আর কেউ লিখলো কই?
আমার এক বন্ধু বিদেশে গিয়ে আমার দেয়া উপন্যাস সমগ্র তার কলকাতা নিবাসী বন্ধুকে গিফট দিয়েছিল। সেই বই সেই পরিবারের লোকজন পড়ে জানিয়েছিল, এত দারুণ উপন্যাস কই পেলি? তারা চিনেইনা আহমদ ছফা কে কি আশয় বিষয়। জীবনদশাতেও ছফা এত জনপ্রিয় ছিলেন না, প্রয়ানের এতদিন পরও তিনি যে লেভেলে জনপ্রিয়। । আমার চোখের সামনেই ছফা কাল্টে পরিনত হচ্ছে এটা ভালো লাগে। শেষ করবো বদরুদ্দীন ওমরের কথা দিয়ে, 'ছফা বিপ্লবী না হয়েও বিপ্লবী, সমাজ বদলে নিজের মত করে অনেক কিছু করতে চাইতো, একটা অনুন্নত পশ্চাদপদ দেশে তার কাজ কর্ম ও সংগ্রাম ছিল অনুকরণীয়। এত মেধা, এত প্রচেষ্টা, এতকিছু করার ক্ষমতা আর কারো ভেতরেই দেখি নাই।' আমিও আহমদ শরীফের মত বিশ্বাস করি, আরো কয়েকজন ছফা পাওয়া গেলে দেশটা বদলে ফেলা যেত'। প্রয়ান দিবসে বিনম্র শ্রদ্ধা।

পোস্টটি ৩ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

নাঈম's picture


সালাম, ভাইয়া ভালো আছেন?

আরাফাত শান্ত's picture


নাঈম ভাই কত বছর পর? ভালো আছেন আপনি?

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!