বিজয় দিবস ২০২৫
জেলা শহরে এখনো একটু আধটু বিজয় দিবস আছে। দূরে কোথাও মাইকে গান বাজে, গোলাপ গাদা বেলী ফুল বিক্রি হয়, কেউ কেউ জাতীয় পতাকা কিনে। বিএনপির অফিসে বাজে, প্রথম বাংলাদেশ আমার শেষ বাংলাদেশ। অনেকদিন পর এই গানটাও শুনতে এত ভালো লাগে। মনে মনে গলা মেলাই, 'মাটির মমতায় ঘাস ফসলে সবুজের আল্পনা/ আমার তাতেই হয়েছে স্বপ্নের বীজ বোনা।'
জাহানারা ইমামের প্রিয় দেশের গান ছিল কোনটা? এটা জানলাম সেদিন পড়তে গিয়ে, 'পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা আমার এ দেশ ভাইরে/ ধানের মাঠে ঢেউ খেলানো এমন কোথাও নাই রে।' গানটা ছোটবেলায় বিটিভিতে খুব দেখাতো, আমার ভাইয়ের খুলনায় গানের ক্লাসে শেখানো হতো। তিন চার বছর আগে আতিক ভাই, যিনি ইউটিউবে পুরোনো গান আপলোডের লিজেন্ড, তিনি এটার একটা দলীয় ভার্শন আপলোড দিয়েছেন। এটা এত সুন্দর। ওল্ড স্কুল রেকর্ডিং, শুনতে শুনতে চোখে পানি আসে। এখন আপনি নতুন যুগের চিন্তা ভাবনায় আলোকিত হয়ে বলতেই পারবেন, তোরে বলছে ধানের মাঠে ঢেউ খেলানো এমন কোথাও নাই রে? ভারতে বার্মায় কম্বোডিয়ায় আছে এরচেয়ে কত সুন্দর ধানক্ষেত। সেটা হয়তো আপনাদের জন্য সুন্দর। আমাদের মত মানুষদের জন্য গানের ভাষায় এটাই সুন্দর।
গানটা জিনাত রেহানা থেকে শুরু করে দিলরুবা খানম অনেকেই গেয়েছে। আমার এদের কারোরটাই ভালো লাগে না। আমার ভালো লাগতো সাহিদা ম্যাডামেরটা। আমাদের খুলনার টিচার ছিল। খুবই মুডি মানুষ। তিনি হারমোনিয়াম বাজিয়ে গাইতেন অনুষ্ঠানে। ম্যাডাম আমাদের বেঁচে নেই অনেক বছর যাবত। সে আমলে সব কিছুতেই ছিলেন স্মার্ট। কম্পিউটার পারতেন শিক্ষক হিসাবেই, গান পারতেন, গার্লস গাইডও করাতেন। আমাদের স্কুলে গার্লস গাইডের এমন ডিসেম্বরে ক্যাম্প হতো। আমাকে দেখলেই বলতেন, তুমি জিপুর ভাই না? তোমাকে দেখি সবসময় বাইরে বাইরে? ম্যাডামের স্বামী খুলনা বেতারে গান লিখতেন। 'এই স্বাধীনতা আমাদের বাঁচার দলিল/ এই স্বাধীনতা আমাদের স্বপ্ন সনদ।' এরকম ছন্দে অমিল গান গাইতে আমরা বিরক্ত হলেও ভালো লাগতো, নিজেদের গান।
যাই হোক পলাশ ঢাকা কোকিল ডাকা গানটার মূল সুরকার মীর কাশেম খান। ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর ভাতিজা। যুবক বয়স থেকেই বুলবুল চৌধুরীর সাথে ইউরোপে প্রচুর শো করেছেন। এই অঞ্চলের বিখ্যাত সেতার বাদক ও সংগীত পরিচালক এবং শিক্ষক। একুশে পদক পেয়েছেন অনেকদিন আগেই। রশীদ করীমও সেবার তার সাথে একুশে পদক পান। বেতার ও টেলিভিশনে অনেক কাজ করেছেন। আর গীতিকার আজিজুর রহমান। যিনি তেমন প্রথাগত শিক্ষায় নাই কিন্তু ছোটবেলা থেকেই কবি। বেতারে কাজ করেছেন ও পত্রিকাও সম্পাদনা করতেন। আমরা যে গানটা শুনে নষ্টালজিক হই, 'আকাশের ঐ মিটি মিটি তারার সনে কইবো কথা', সেটা আজিজুর রহমানের লেখা। এমনকি যে গানকে অনেকেই নজরুল সংগীত ভাবেন, 'আমি রূপনগরেরর রাজকন্যা রূপের যাদু এনেছি।'
সবসময় প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার দরকার হয় না। 'এই দূর পরবাসে' গানটা আশিকুজ্জামান টুলু, বিদেশে না গিয়েই করেছেন। তখন কেবল তার কানাডার ভিসার কাগজ পত্র রেডি হচ্ছিলো। তিনি সাবিনা ইয়াসমিনের সাথে দেশের বাইরে কিছু শোতে বাজিয়েছেন। দেখেন কিছু লোক সাবিনা ইয়াসমিনের সিনেমার গানের ভক্ত না, তাঁরা রেল লাইনের ঐ মেঠো পথটার পাড়ে দাঁড়িয়ে অথবা সব কটা জানালা খুলে দাও না শুনলেই কাঁদে। সেই আবেগ নিয়ে চিন্তা করে আসিফ ইকবালকে গান লিখতে বলেন, গানটা লিখেন- সুর করেন, তৈরি হয়ে যায় এই মাস্টারপিস। তাই দেশের গান অনেক ভাবেই ভাবাতে পারে মানুষকে।





মন্তব্য করুন