ইউজার লগইন

পীচ ঢালা পথে

এহতেশামের ছবির নাম ছিল, পীচ ঢালা পথ। রবিন ঘোষের সাথে এহতেশামের সম্পর্ক সেই 'রাজধানীর বুকে' ছবি থেকে। পুরো ষাট থেকে সত্তর, রবীন ঘোষ প্রচুর উর্দু ছবিতে কাজ করেছেন। বাংলা ছবিতে কাজ হাতেগোনা। তবে পীচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি আমার ধারণা তারও অন্যতম পছন্দের কাজ। কারন তিনি ব্যক্তিগত জীবনে ছোটবেলায় ছিলেন কোরাস শিল্পী। এই গানের যে কোরাস- লা লালা লালালা কিংবা হায় দিন যায় রাত যায় এমনি করে/ অলিগলি রাজপথ ঘুরে ঘুরে। আমার ধারণা বাংলা সিনেমায় এত ভালো কোরাস স্বাধীনতার আগে আর হয় নি। পরেও হয়েছে কিনা সন্দেহ। আর আবদুল জব্বারের গলা যখন ছিল সবচেয়ে সুন্দর তখন তিনি গেয়েছিলেন এ গান।

গানটার গীতিকার গাজী মাজহারুল আনোয়ার। এত সুন্দর লিরিক কিভাবে তিনি লিখলেন সেই বয়সে সেটাও কম নয়। এটা সত্য সাহার সুর করা আকাশের হাতে আছে একরাশ নীলের মতোই মাস্টারক্লাস। কিছু লাইনের পর আসলে বলার কিছু থাকে না। ছোট ছোট মানুষের অন্ন কেড়ে/ বড় বড় বাড়িগুলো উঠছে বেড়ে/ তবু যেথা যাই আরে নাইরে কোনো ঠাই/ বেঁচে থাকার তরে নগদ কিছু চাই। কি সুন্দর, একজন স্ট্রিট স্মার্ট পকেট মার সিনেমার পর্দায় এসব বলছেন। গানটার চিত্রায়ণ এত সুন্দর, পঞ্চাশ বছর আগের ঢাকাকে দেখতে খারাপ লাগে না। ছিমছাম, তিন চারটা গাড়ি, পাঁচ দশটা বাস, কিছু বিল্ডিং, আইয়ুবের শাসনের প্রতীক হয়ে থাকা কিছু সরকারি স্থাপনা, এই তো। নায়ক রাজ্জাক সাহেব যতদিন বেঁচে ছিলেন তারা খালি বলতেন, 'আমাদের সময় এসি ছিল না, মেক আপ রুম ছিল না, তোমরা কত লাকি।' আমি ভাবি না থাকাও একটা ব্লেসিং। এই সিনেমার চার পাঁচ বছর পর মুক্তি পাওয়া এক পাকিস্তানী সিনেমার গান মনে পড়ে। উর্দু ছবি, 'নেহি আবি নেহি'। সেটারও সুর রবীন ঘোষের। আখলাক আহমেদ গেয়েছিল। নায়ক ফয়সাল সাইকেল চালায়, বাসের জানলার পাশে বসে, করাচির রাস্তায় রাস্তায় হাঁটে। করাচিকে ৫০ বছর আগে দেখতে বেশ লাগে। ফুরফুরে পরিস্কার ও ফাঁকা ফাঁকা। কিন্তু পাকিস্তান তো পাকিস্তানই। কমেন্ট সেকশনে সেখানেও ঝগড়া, দোষ বেশি বেশি জনগণ নাকি রাজনীতির, কোনটা করাচিকে শেষ করেছে?

লেখা শেষ করি এই গানের অভিনেতা আবদুল জলিলের গল্প বলে। অনন্ত জলিল নাকি দাবী করে সিনেমার আবদুল জলিলের কারণে তার নাম জলিল রাখা। আমার ধারণা, অনন্ত আবদুল জলিলকে চিনেই না। খুব কম মানুষই তাঁকে চিনে। সিনেমা তিনি করেছেন হাতে গোনা কয়েকটা। পেশায় ছিলেন আমার প্রিয় সাহিত্যিক রশীদ করীমের কলিগ। মেঘনা পেট্রোলিয়ামের সিইও হয়ে অবসরে গেছেন। যে অল্প কয়টা কাজ করেছেন তাতেই তিনি নিজের অভিনয় প্রতিভাটা দেখাতে পেরেছেন। সেই আমলের টেলিভিশনের জনপ্রিয় সিরিজ ‘ত্রিরত্ন’ জনপ্রিয় ও প্রতিভাবান অভিনয়শিল্পী ছিলেন জলিল। ‘ত্রিরত্ন’র এক রত্ন ‘পান্না’ চরিত্রে অত্যান্ত সাবলিল অভিনয় দক্ষতায় স্থায়ী আসন জয় করেছিলেন তখনকার টিভি দর্শকদের মনে। জলিলের অভিনয় নৈপূণ্যের এতটাই প্রদর্শিত হয়েছিল ‘ত্রিরত্ন’তে, যা কারো কারো মনে গেঁথে রয়েছে আজো। ১৯৬৯ সালে মুক্তিপ্রাপ্ত, কাজী জহির পরিচালিত বিখ্যাত ছবি ‘ময়নামতি’তে অভিনয়ের মাধ্যমে চলচ্চিত্রে প্রবেশ করেন জলিল। এরপরে তিনি আরো অভিনয় করেন- মধু মিলন (১৯৭০), পীচ ঢালা পথ (১৯৭০) ও আদর্শ ছাপাখানা (১৯৭০) চলচ্চিত্রে। ময়নামতিতে এখনও মানুষ মনে রেখেছে গানটা, টাকা তুমি সময় মতো আইলানা। নবাবী ড্রেস পরিধান করা জলিলকে দেখলে হিউমার ও মন খারাপ দুটোই আসে। টাকা পাখি গানের চেয়ে ভালো গান ৫৩-৫৪ বছর আগেই বাংলা সিনেমায় হয়ে গেছে। শিল্পী আনোয়ার উদ্দীন খানের কি রস করে গেয়েছিলেন। যাই হোক জলিল সাহেব এত সাফল্যের পরেও সিনেমার দিকে ফিরেও তাকান নাই। তার বন্ধু ছিল নায়ক রাজ রাজ্জাক। লেগে থাকলে হয়তো জলিল সাহেব বিশাল অভিনেতা তো হতেন, সেলিব্রেটেড নায়কও হতে পারতেন। পীচ ঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছিতে তার যে চাহনী ও হাসি, ভোলা যায় না। এত স্মার্ট পকেটমারকে দেখলে নিজ উদ্যোগে সব দিয়ে দিতে ইচ্ছে করে। রেসের মাঠ থেকে পুর্বানী হোটেল সব দেখতে ভালো লাগে। আবদুল জলিল কিন্তু পারিবারিক ভাবেই অভিজাত বংশের। তার বাবা জাস্টিস ছিলেন। তিনি আবার সে আমলেই রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মাস্টার্স ঢাকা ভার্সিটি থেকে। এইসব লোকদের বাংলা সিনেমা ধরে রাখবে আজীবন, এটা হয়তো অসম্ভব ব্যাপারই ছিল। প্যাট্রোলিয়াম কোম্পানীতে চাকরী করতে করতে কখনো হয়তো তার মনে হয়েছিল, কৌতুক অভিনেতা কিংবা সাইড নায়কের বাইরেও তিনি একজন দারুণ স্ক্রিন প্রেজেন্স দিতে পারতেন। অথচ এরপরে তিনি মিডিয়া থেকেই নির্বাসনে ছিলেন। অনন্ত জলিলের নাম যদি জলিল সাহেবের নাম থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে থাকে তাও বলা যায় অনন্ত জলিল ভাগ্যবান।

পোস্টটি ২ জন ব্লগার পছন্দ করেছেন

মন্তব্য করুন

(আপনার প্রদান কৃত তথ্য কখনোই প্রকাশ করা হবেনা অথবা অন্য কোন মাধ্যমে শেয়ার করা হবেনা।)
ইমোটিকন
:):D:bigsmile:;):p:O:|:(:~:((8):steve:J):glasses::party::love:
  • Web page addresses and e-mail addresses turn into links automatically.
  • Allowed HTML tags: <a> <em> <strong> <cite> <code> <ul> <ol> <li> <dl> <dt> <dd> <img> <b> <u> <i> <br /> <p> <blockquote>
  • Lines and paragraphs break automatically.
  • Textual smileys will be replaced with graphical ones.

পোস্ট সাজাতে বাড়তি সুবিধাদি - ফর্মেটিং অপশন।

CAPTCHA
This question is for testing whether you are a human visitor and to prevent automated spam submissions.

বন্ধুর কথা

আরাফাত শান্ত's picture

নিজের সম্পর্কে

দুই কলমের বিদ্যা লইয়া শরীরে আমার গরম নাই!