এলিয়েনেশন
এলিয়েনেশন কাকে বলে সেটা জামালপুরে এসে টের পাই। মানে মনে হয় অমিয়ভূষণ মজুমদারের ফ্রাইডে আইল্যান্ডে এসে বসবাস করছি, মানুষ আছে কিন্তু মনে হয় একটা দ্বীপ। হাদি প্রথম আলো দীপু এসব নিয়ে কোনো আলাপই নাই। মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে জামাতের ক্যান্ডিডেট মাওলানা আবদুস সাত্তারের দু চারটা পোস্টার। আর দেখা যায় বেশী- বিএনপির দাঁড়ানো ওয়ারেস আলী মামুনের বিভিন্ন বয়সের ছবি সম্বলিত বিলবোর্ড ও পোস্টার। সেটায় একটা জিনিস বোঝা যায় দল ক্ষমতায় না থাকলেও ভদ্রলোকের পেট দিনদিন উর্ধমূখী। শহরে গেলে জেলা স্কুলের এনসিপির এক নেতার বিলবোর্ডে চোখ পড়ে। তিনি ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফিল্মমেকার, জামালপুরকে পরিবর্তন করতে চান। আমি ঢাকার ভোটার, এনসিপি থেকে এখনো এ আসনে ঘোষিত হয়নি, জামালপুরে হলে তাকে ভোট দিতাম কারণ তার একটা প্রতিশ্রুতি আর কোনো লোককে আমি দেখলাম না দিতে। যে ইলেকশনে জিতলে তিনি জামালপুরে আবার সিনেমার হল নির্মাণ করবেন। এ সামান্য আলাপ আমি আরো কাউকে বলতে দেখলাম না। এক কালে জামালপুর শহরে চারটা হল ছিল এখন সব বন্ধ। শিল্পকলা একাডেমী একটা আছে যেখানে আমি কিছু চলতে দেখি না। মীর্জা আজমের কারণে মডেল মসজিদ ও দয়াময়ী মন্দির যে শহরে এক সাথে প্রায় লাগানো সেখানে কালচারাল কোনো আলাপ নাই। একটা বইয়ের দোকান নাই। পাবলিক লাইব্রেরি আছে পাঠক নাই। তবে এখানের কিশোর শিশুরা ভাগ্যবান। মোবাইল আসক্তি থাকলেও তারা বিকালে ফুটবল খেলে। রাতে পাড়ায় পাড়ায় ব্যাডমিন্টন। ঢাকায় এই সামান্য ব্যাপারটাই নেই। টার্ফের মাঠ ভাড়া নিয়ে খেলে আমার চট্টগ্রামের বন্ধুরা। এরকম যদি এদেশে সবকিছু ভাড়া দেয়া লাগতো- না খেয়ে মরতো গোটা জাতি। ভারত থেকে ৫০,০০০ টন চাল আমদানি করবে যে সরকার তার কোলে পেলে পুষে নেতারা দেয় স্লোগান দিল্লি না ভারত। পিয়াজের দাম কমে গেল এক ভারত থেকে আমদানির ঘোষণাতেই। আর কথায় কথায় এখন এক নতুন শব্দ শুনি ভারতীয় আধিপত্যবাদ। আগে নিজে স্বয়ংসম্পূর্ণ হোন তারপর এসব ডায়লগ দিয়েন।
জামালপুরে এখন তীব্র শীত ও বিয়ের সিজন। আমার তো রেডমিট মানা তাই যাওয়া হয় না কোথাও, এসব সব প্রোগ্রামেই বাজে হিন্দি ভোজপুরী গান। ভোজপুরী গানের যে এরকম এক নীরব স্রোতা গোষ্ঠী আছে তা এ দশমাসে প্রথম জানলাম। ১৭ বয়সেই মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। এ ফেনমেনন এখনো বন্ধ করা গেল না। সামনে তো নিশ্চয়ই আরো অন্ধকার। কিশোরী মেয়েদের পার করতে পারলেই সাধারণ মানুষ বেঁচে যায়৷ সেটাও সহজ নয়। নিম্নবিত্ত হলেও দেড় দু লাখ টাকা দেয়া লাগে। এক লাখ টাকার ফার্নিচারও পাঠানো লাগে। আর অনুষ্ঠানের আয়োজন তো আলাদা। তাই জমি জমা নিয়ে ঝগড়া বিবাদ আছেই। তবে সেটা খুবই শান্ত ভাবে। চায়ের দোকানেই এসব আলাপ পাবেন, উপরে উপরে ভালো সম্পর্ক কিন্তু ভেতরে ভেতরে ভাই ভাইকে দেখতে পারেন না। অসংখ্য পরিবারেই আছে বাবা মা স্ত্রীকে চিকিৎসা করাতে গিয়ে জমিজমা হাতছাড়ার গল্প। আমি এসব পাশ কাটিয়ে হাঁটি। মার্কেটের দিকে গেলে আমার খুব গ্রীল খেতে মন চায়। খাওয়া হয় না কারণ ঔষধ কিনতে কিনতেই সব শেষ। এদের ভালো হোটেলের চা ট্রাই করছিলাম। সব ফালতু, চিনি কিংবা গুড়ে ভরা। এরচেয়ে ভালো আমার বাজারের আনিসের চা। আনিস লোক হিসাবে অত্যন্ত ভদ্র। এবং কথাবার্তায় মনে হবে হুমায়ুন আহমেদের নভেল থেকে উঠে আসা। সে প্রায়শঃই দোকান বন্ধ রাখে কারণ তার একটা সন্তান হয়েছে। আমাকে দায়িত্ব দিয়েছিল নাম রাখার যা আ দিয়ে এবং ইসলামিক। আমার মাথায় আহমাদুল্লাহ আর আলহামদুলিল্লাহ ও নিজের আরাফাত নাম ছাড়া আর কিছুই আসে না। পরে আমার এক খুলনার বন্ধুর নামে নাম দিয়েছি, আসওয়াদ। তার আসওয়াদ পছন্দ হয়নি। আমিও সারেন্ডার করেছি। যাক সে দোকান না খুলে বাসার কাজ করে। তার একটা মেয়ে আছে ছোট। আমি খুবই আদর করি তাকে। আমাকে খুব ভালো পায় কারণ আইস্ক্রিম কিনে দেই সমানে। তাকে দেখলে আমার নয়নতারা মামীর এক মৃত ভাইয়ের কথা মনে পড়ে। দুজনের নামই সেম আতিকা। সেই আতিকার বাবা তার জন্মের আগেই মারা যায়। আতিকা মায়ের বিয়ে হয় আবার। আতিকা মাদ্রাসায় পড়ে টরে। মাঝেমধ্যে নয়নতারা মামীকে ইমোশনাল করে টাকা পয়সা নেয়। আহা কতদিন মামী বারেক সাবদের দেখিনা। আনিসের সাথে বারেকের গল্প করি। উনি খুব খুশী বারেক ভক্তি শুনে। দুপুরে বসে আছি পুকুরপাড়ে, আজ হঠাৎ করে অনীক ফোন দিয়েছিল। অনেকদিন পরে সে কি মনে করে এসেছিল বারেকে। জুয়েলের থেকে আমার নং নিয়েছে। বলে, ভাই আপনি না লাস্ট ডিফেন্ডার অফ মোহাম্মদপুর। কেমনে আছেন ওখানে? পুরাই এতীম লাগতেছে আমার। চোখে পানি এসে গেল। কিন্তু বুদ্ধিজীবি আমি হেরে গেলে চলবে না তাই বললাম, যোগাযোগহীনতাই আমাদের নিয়তি।





মন্তব্য করুন